**সবুজ ভেন্টিলেটর**
—নবকুমার চক্রবর্ত্তী (নবু)
সেদিন সূর্যটা বোধহয় সকাল থেকেই মানচিত্রের ওপর কোনো এক চরম প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ করেছিল। আমাদের এই দমদম ক্যান্টনমেন্টের আকাশে মেঘের লেশমাত্র নেই, বরং নীল আকাশটা যেন একটা বিশাল পোড়া কড়াই হয়ে ওপর থেকে তপ্ত তেল ঢালছে। আমি সবে ট্রেন থেকে নেমে প্ল্যাটফর্মের ওপর দাঁড়ালাম। ট্রেনের কামরার ভেতরটা ছিল এক জীবন্ত তন্দুর। মানুষের ঘাম আর গরম বাতাসের সেই যে অদ্ভুত রসায়ন—যাকে আমরা ভদ্রসমাজে ‘গণপরিবহন’ বলে চালিয়ে দিই—তা থেকে মুক্তি পেয়ে ভাবলাম স্টেশনের বাইরে গেলেই বুঝি একটু হাওয়া পাব। কিন্তু কোথায় কী!
অটো স্ট্যান্ডে এসে দেখি এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। একটাও অটো নেই, টোটোর তো নামগন্ধও নেই। যে চালকগুলো রোজ ‘দাদা যাবেন নাকি?’ বলে পিরিতের আলাপ জমায়, আজ রোদের তেজে তারা বোধহয় গর্তে সেঁধিয়েছে। রাস্তার ওপর পিচ গলে চটচট করছে। গরমের এমন ‘চাদর’ শুধু নয়, এ যেন আগুনের একটা লেপ সারা শরীরের ওপর চেপে বসেছে। পকেট থেকে রুমালটা বের করে মাথায় চাপা দিলাম। লোকে পাগল ভাবলে ভাবুক, মগজটা তো আর পাবলিক প্রপার্টি নয় যে যাকে তাকে অমলেট বানাতে দিয়ে দেব! চাতক পাখির মতো ইতিউতি তাকালাম যদি একটাও রিকশ পাওয়া যায়। নাহ্, নিয়তি আজ পদব্রজেই লিখে রেখেছে।
মাথায় রুমাল, চোখে রোদচশমা আর হাতে একটা পুরনো বাজারের ব্যাগ নিয়ে আমি হাঁটতে শুরু করলাম। বড় রাস্তা ধরলাম যদি একটু ছায়া পাই। কিন্তু আমাদের এই তথাকথিত আধুনিক নগরায়ন ‘ছায়া’ শব্দটাকেই যেন ডিকশনারি থেকে মুছে দিয়েছে। দুপাশে পেল্লায় সব কংক্রিটের খাঁচা দাঁড়িয়ে, অথচ তাদের পায়ের কাছে এক চিলতে সবুজের দেখা নেই। আমরা আসলে বহুতলের লিফটে চড়ে ওপরের দিকে উঠতে গিয়ে পায়ের তলার মাটি আর মাথার ওপরের ছাতা—দুটোই বন্ধক রেখে এসেছি নগরায়নের ব্যাংকে। মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমে এখন প্লাস্টিকের টবে বনসাইয়ের শৌখিনতা, অথচ জানালার বাইরে এক চিলতে বাস্তুহারা ঘাসের জন্য কোনো জায়গা নেই। তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ এসি ঘরের ঠান্ডা হাওয়ায় বসে গ্লোবাল ওয়ার্মিং নিয়ে ফেসবুকে দীর্ঘ স্ট্যাটাস টাইপ করছে, আর বাইরে প্রকৃতি তখন নিজের চামড়া পুড়িয়ে তার ট্যাক্স আদায় করছে। ঘামটা গেঞ্জি পার হয়ে পাঞ্জাবির বুক পকেটে পৌঁছতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটল।
হঠাৎ অনুভব করলাম, দুটো ছোট ছোট হাত আমার পাঞ্জাবির হাতা ধরে টানছে। তাকিয়ে দেখি দুটো বাচ্চা ছেলে। বয়স বড়জোর আট-নয় হবে। চোখদুটো বেশ চকচকে, কিন্তু ঘামে মুখটা লাল হয়ে আছে। তাদের একজন হাসি হাসি মুখে বলল, “দাদু, ও দাদু! আমাদের অনুষ্ঠানে একটু আসুন না!”
আমি একটু থমকে দাঁড়ালাম। এই দাবদাহে বাচ্চাগুলো কী অনুষ্ঠান করছে? অন্যজন অমায়িক সুরে যোগ করল, “আমরা আপনাকে চিনি দাদু। আপনি তো সেই বড় লেখক না? নবু দাদু? আমাদের সাথে একটু চলুন না দাদু, আপনার আশীর্বাদ চাই।”
‘লেখক’ সম্বোধনটা চিরকালই আমার কাছে একটা ভয়ের, আবার সম্মানেরও। নিজেকে বড় একটা লেখক-টেখক মনে করি না কোনোদিন, হয়তো সমাজের ভুলগুলো একটু জোরে চেঁচিয়ে বলে ফেলি বলে লোকে লেখক বলে গাল দেয়। আজকাল তো সস্তা হাততালির বাজারে সত্য কথা বলাটাই সবচেয়ে বড় অপরাধ, আর সেই অপরাধটা আমি প্রায়ই করে ফেলি। কিন্তু বাচ্চাদের ওই নিষ্পাপ আবদারটা উপেক্ষা করার সাধ্য কার আছে? আমি ঘাম মুছতে মুছতে হাসলাম। বললাম, “তা বাবা, তোদের এই গরমের মধ্যে কীসের অনুষ্ঠান? আমি যে গলদঘর্ম হয়ে বাড়ি ছুটছি।”
“কাছেই দাদু, ওই তো হেলথের মাঠে। আপনি একবার এলেই আমরা ধন্য হব।”
হেলথ-এর মাঠ! দমদম ক্যান্টনমেন্টের মানুষের কাছে এই মাঠটা একটা অক্সিজেনের সিলিন্ডারের মতো। প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলায় এখানে একটু হাওয়া খাওয়ার জন্য মানুষ ভিড় করে—যেন প্রকৃতির ফ্রি এসি! তবে দিন দিন তার শ্রীহানি হয়েছে। উন্নয়নের কোপে পড়ে মাঠের সবুজটুকু আজ আইসিইউ-তে চলে গেছে। আমি কোনো কথা না বলে ওই কচি হাতদুটোর টানে এগিয়ে চললাম। আমার মনে হচ্ছিল, এই মরুময় দুপুরে এই বাচ্চা দুটোই বোধহয় কোনো মরীচিকার পথ দেখাচ্ছে।
মাঠে পৌঁছাতেই আমার চোখের চশমাটা কি একটু ঝাপসা হয়ে গেল? না, গরমের জন্য নয়, সম্ভবত বিস্ময়ে। মাঠের মাঝখানে একটা সামিয়ানা টানানো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা মাঠের চারপাশটা যেন আজ অন্যরকম সাজে সেজেছে। অনেক মানুষ চার পাশে, তাদের গায়ে সাদা জামা, সাদা প্যান্ট, মাথায় সবার ‘সবুজ স্বপ্ন’ লেখা কাপড়ের টুপি। সামনে একটা বড় ব্যানারের দিকে নজর পড়ল আমার। তাতে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা:
“আপনিও এগিয়ে আসুন। সবুজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিন। আপনিও বনানীর পরিবেশ সহায়ক হোন। আপনার কৃষিজ সম্পদ উৎসবে অনুষ্ঠানে প্রিয়জনকে উপহার দিন একটি বৃক্ষশিশু – যা আপনার স্মৃতিকে দেবে চির বসন্তের ছোঁয়া, আগামী প্রজন্মকে দেবে নিরাপত্তা, পরিবেশকে দূষণমুক্ত করবে এবং এই গরমের গুণ্ডামি থেকে মুক্তি দেবে।”
পড়ে মনটা হঠাৎ কেমন হালকা হয়ে গেল। ‘গরমের গুণ্ডামি’—বাঃ! কথাটা দারুণ তো! রোদটা সত্যিই তো আজ গুণ্ডামি করছে। মানুষকে ঘরবন্দি করে শাসন করছে। ব্যানারের নিচে ছোট ছোট টবে সার দিয়ে সাজানো আছে কয়েক’শ চারাগাছ। বকুল, শিরীষ, বট, আম, জাম, জুঁই, বেলি—কী নেই সেখানে!
আয়োজকদের মধ্যে দু-তিনজন বয়স্ক মানুষ আমায় দেখে এগিয়ে এলেন। আমাকে চিনতে পেরে তারা প্রায় লুফে নিলেন। আমাকে একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে এক গ্লাস ঠান্ডা লেবুর জল হাতে দিলেন। প্রাণটা যেন ফিরে এল। একজন বললেন, “নবু দা, আপনি এসেছেন খুব ভালো হয়েছে। আমরা কয়েকজন মিলে ঠিক করেছি, এই যে শহরটা নরক হয়ে যাচ্ছে, এটাকে অন্তত কিছুটা বাসযোগ্য করতে হবে। গাছ না থাকলে আমরা যে আর শ্বাস নিতে পারব না, সেটা মানুষকে বোঝানো যাচ্ছে না।”
আমি ব্যানারের দিকে আবার তাকালাম। আমার ভেতরের লেখকটা তখন ডানা মেলতে শুরু করেছে। আমি ভাবলাম, আমরা তো কত কিছুই না উপহার দিই—দামী শাড়ি, ঘড়ি, ইলেকট্রনিক গ্যাজেট। জন্মদিনে কিংবা বিয়েবাড়িতে দামী কাচের বাসনের আড়ালে আমরা আসলে নিজেদের অহংকারটাই পার্সেল করে দিই। কিন্তু একটা প্রাণ, একটা ‘বৃক্ষশিশু’ উপহার দেওয়ার কথা কজন ভাবি? যে শিশুটা একদিন বড় হয়ে মহীরুহ হবে এবং দাতার স্মৃতিকে চিরকাল সবুজ করে রাখবে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, ‘অরণ্য তাহার কুহেলিকা-জাল আবৃত করিয়া রূপকথা রচনা করিয়াছিল’—আজ সেই রূপকথাকে আমরা কংক্রিটের জাঁতাকলে পিষে মারছি। গাছ আমাদের না থাকার গল্পটা সবুজের পাতায় লিখে রাখে।
সেখানে উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশ্যে আমাকে দুটি কথা বলার জন্য অনুরোধ করা হলো। আমি সাধারণত মঞ্চের লোক নই, কিন্তু ওই ব্যানারের লেখা গুলো আমাকে উসকে দিয়েছে। আমি উঠে দাঁড়ালাম। দেখলাম বাচ্চা দুটো আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
আমি শুরু করলাম, “বন্ধুগণ, আজ যখন আমি স্টেশন থেকে ফিরছিলাম, মনে হচ্ছিল রাস্তাটা বুঝি শেষ হবে না। মাথার ওপরে ওই সূর্যটা আজ আমাদের শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু কেন? সূর্য তো আগেও ছিল। তফাতটা হচ্ছে, আগে আমাদের মাথার ওপরে একটা ছাতা ছিল। সেটা কাপড়ের ছাতা নয়, সেটা ছিল গাছেদের ছাতা। আমরা নিজেদের আরামের জন্য, নিজেদের চারচাকা গাড়ি পার্কিং করার জন্য সেই ছাতাটা ভেঙে ফেলেছি। এখন যখন আকাশ থেকে আগুন বৃষ্টি হচ্ছে, তখন আমরা এসির রিমোট খুঁজছি, কিন্তু শেকড় খোঁজার কথা ভুলে গেছি।”
সামনের ভিড়টা নিশ্চুপ হয়ে শুনছিল। আমি একটু জোরেই বললাম, “এই যে ব্যানারে লেখা আছে—গাছ লাগালে সে বিনামূল্যে আপনাকে উপহার দেবে। কী দেবে সে? সে প্রথমে দেবে অক্সিজেন। অক্সিজেন মানে কী জানেন? এই যে হাসপাতালে মানুষ অক্সিজেনের সিলিন্ডারের জন্য হাহাকার করে, গাছ সেটা আপনার জন্য প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে তৈরি করছে বিনামূল্যে আপনাকে দেবে বলে। আপনারা কতজন জানেন আমি জানি না, একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রতি মিনিটে কতটা অক্সিজেন প্রয়োজন? ২.৮ গ্রাম। তারপর দেবে ছায়া। এমন নিবিড় ছায়া যা পৃথিবীর কোনো এয়ার কন্ডিশনার দিতে পারবে না। রাস্তার ধারে যদি একটা গাছ লাগিয়ে আপনি তাকে বড় করতে পারেন, তবে জানবেন আপনি আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটা জীবন বিমা করে গেলেন। অথচ আমরা কী করছি? জীবন বিমার প্রিমিয়াম দিচ্ছি ঠিকই, কিন্তু যে জীবনটা বাঁচবে, তার শ্বাস নেওয়ার বাতাসটুকু কেটে কুচোকুচো করে দিচ্ছি প্রমোটারদের হাতে!”
বক্তৃতা দিতে দিতে আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই ধূলিময় দিনগুলোর কথা, যখন ঝড়ে ঘরবাড়ি উড়ে যায়। অথচ যেখানে বনভূমি আছে, সেখানে ঝড় এসে ধাক্কা খায় গাছেদের গায়ে। গাছ শুধু পরিবেশের বন্ধু নয়, সে আমাদের প্রথম সৈনিক। সে ঝড় ঠেকায়, সে ভূমিধস আটকায়। আর পাখির কথা না বললেই নয়। আমাদের শৈশব ছিল পাখির ডাকে ভরা। এখন ভোরের কলকাতায় পাখির ডাক পাওয়া দুষ্কর, যদিও কেউ কেউ মোবাইলে রিংটোনে পাখির ডাক শোনে। কী বিচিত্র আমাদের আধুনিকতা! আসল পাখিকে তাড়িয়ে আমরা মোবাইলের মেমোরি কার্ডে ভোরের আবহাওয়া বন্দি করছি! গাছ থাকলে তবেই তো পাখি আসবে। আর পাখি মানেই তো প্রকৃতির ভারসাম্য। আমরা আসলে শিক্ষিত হওয়ার সাথে সাথে প্রকৃতির সাথে সম্পর্কহীন হয়ে পড়ছি। আমাদের শিক্ষা যত বাড়ছে, আমাদের কাণ্ডজ্ঞান ততটাই কমছে।
আমি বললাম, “মনে রাখবেন, এই যে গরমের গুণ্ডামি আমরা দেখছি, এর মোকাবিলা করার জন্য কোনো পুলিশ বা মিলিটারি নেই। এর একমাত্র রক্ষাকর্তা হলো গাছ। আপনারা যদি প্রিয়জনকে একটা চারাগাছ উপহার দেন, তবে জানবেন আপনি তাকে শুধু গাছ দিচ্ছেন না, আপনি তাকে এক বুক নির্মল বাতাস আর সুস্থ জীবনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।”
আমার কথা শেষ হওয়ার পর বাচ্চা দুটো আমার কাছে এসে এক জোড়া চারাগাছ এগিয়ে দিল। বকুল গাছ। আমি সেগুলো হাতে নিতেই এক অদ্ভুত শীতলতা অনুভব করলাম। মনে হলো, এই কচি বাচ্চা দুটোর মতো গাছ দুটোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে আগামীর বসন্ত।
আমি যখন হেলথের মাঠ থেকে বেরোচ্ছি, তখন সূর্যটা একটু পশ্চিম দিকে হেলেছে। গরম কি কমেছে? না, বোধহয় না। কিন্তু আমার মনটা এখন অনেকটা শীতল। আমি মনে মনে ঠিক করলাম, আমার বাড়ির সামনের ফালি জমিটুকুতে আর ইঁট বিছিয়ে পার্কিং করব না। সেখানে এই বৃক্ষশিশু দুটোকে সযত্নে আগলে রাখব। তারা বড় হবে, তাদের ডালে পাখি আসবে, আর আমি যখন থাকব না, তখনও আমার হয়ে তারা কাউকে না কাউকে পরম মমতায় ছায়া দেবে। সে পথের কোনও পথিক হোক অথবা কোন দুপুরে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত কোনো ফেরিওয়ালা—তাদের পেটে খাবার কম থাকতে পারে কিন্তু মাথায় ছাতার অভাব হবে না।
আমার মনে হয় আমাদের সরকারের উচিত দেশের প্রতিটি মানুষকে হুকুম দেওয়া, মাসে অন্তত একটা বড় গাছের চারা সে বাড়িতে হোক বা রাস্তার ধারে, তাকে লাগাতেই হবে। শুধু লাগালেই হবে না, তাকে যত্নও করতে হবে, তবেই সে মাসের মাইনে পাবে। নচেত নয়। যে সমাজে অকেজো কাগজের ফাইলে সই করলে মাইনে বাড়ে, সেই সমাজে একটা জীবনের জন্ম দিলে কেন পুরস্কার মিলবে না?
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ভাবলাম, এই যে বনসৃজন—এটা কি কেবল সরকারের দায়িত্ব? না, এটা আমাদের প্রত্যেকের বেঁচে থাকার লড়াই। দূষণ যদি রাক্ষস হয়, তবে গাছ হলো সেই রাক্ষস কে মারার রাম বাণ। আমাদের শহরের প্রতিটি ফুটপাত যদি সারি দিয়ে গাছে ভরে ওঠে, তবে দেখবেন এই ‘গরমের গুণ্ডামি’ কেমন লেজ গুটিয়ে পালায়।
বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল গড়িয়ে গেল। গিন্নি দরজায় দাঁড়িয়েই ঝাঁঝিয়ে উঠলো, “এই গরমে কোথায় ছিলে শুনি? সারা মুখ তো রোদে পুড়ে নীল হয়ে গেছে! আর হাতে ওগুলো কিসের চারা?”
আমি হাসলাম। নবু চক্রবর্তী সব সময় হাসে যখন সে কোনো বড় সত্যের মুখোমুখি হয়। আমি বললাম, “এগুলো স্রেফ চারা নয় গো, এগুলো হলো আমাদের আগামীর ভেন্টিলেটর। হাসপাতালের আইসিইউ-র ভেন্টিলেটরে লাখ টাকা গোনার চেয়ে, আজ রাতেই এদের উঠোনে বসানোর ব্যবস্থা করি। আমাদের বাড়ির চারকোনা কংক্রিটের অহংকারটা একটু কমুক, তার বদলে আমাদের স্মৃতিগুলো বরং চিরকাল সবুজে ঢাকা থাক।” এর একটা তোমার আর একটা আমার।
সেদিন রাতে যখন বিছানায় শুলাম, মনে হলো জানালার বাইরে থেকে আসা হাওয়াটায় আগের চেয়ে একটু বেশি অক্সিজেন আছে। হয়তো সেটা মনের ভুল, কিন্তু স্বপ্নটা তো সত্যি হতে পারে। যদি আমাদের দমদমের প্রতিটি বাড়িতে একটা করে বৃক্ষশিশু বড় হতে থাকে, তবে কোনো এক দুপুরে অটো না থাকলেও কারোর মাথা পুড়বে না। সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে ফিল্টার হয়ে আসা রোদ তখন কেবল উষ্ণতা দেবে, দাহ নয়।
এই গল্পটা কেবল আমার একলার নয়। এই গল্পটা আপনার, আমার, আমাদের সবার। আমরা যদি আজ রুখে না দাঁড়াই, যদি আরও গাছ না লাগাই, তবে ভবিষ্যতে আমাদের নাতি নাতনিরা ‘বনানী’ বা ‘অরণ্য’ শব্দটা শুধু ডিকশনারিতেই খুঁজে পাবে। চলুন, আমরা সবাই মিলে আজ শপথ নিই—গাছ লাগাই, জীবন বাঁচাই। এই গরমের গুণ্ডামিকে রুখে দেওয়ার দায়িত্বটা না হয় আপনি আর আমি মিলে আমরাই নিলাম।
আমরা আসলে বোকার স্বর্গে বাস করছি; কারণ, পৃথিবীটা আসলে আমাদের সম্পত্তি নয়, আমাদের সন্তানদের কাছে নেওয়া এক দীর্ঘমেয়াদি ঋণ—আর মনে রাখবেন, প্রকৃতির সুদ বড়ই নিষ্ঠুর, যা শুধু সবুজের কিস্তিতেই শোধ করা সম্ভব, কাগজের নোটে নয়।
সমাপ্ত
![]()







