বিশেষ প্রতিবেদন: মহাভারতের পাতায় রাজা যযাতির সেই বিখ্যাত গল্প আমরা অনেকেই পড়েছি, যিনি নিজের বার্ধক্য দূর করতে ছেলে পুরুর কাছ থেকে যৌবন চেয়ে নিয়েছিলেন। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ যে কাল্পনিক স্বপ্ন গল্প, কবিতা বা সিনেমায় দেখে এসেছে, ২০২৬ সালের এই সময়ে এসে চিকিৎসাবিজ্ঞান তাকে বাস্তবে রূপ দিতে চলেছে। বয়সের ঘড়িকে উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার এই যুগান্তকারী থেরাপির নাম ‘ER-100’ (Epigenetic Reprogramming)।
যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড Drug Administration (FDA) সম্প্রতি এই থেরাপির হিউম্যান ট্রায়াল বা মানুষের ওপর সরাসরি পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছে, যা চিকিৎসা ইতিহাসের এক মহাবিপ্লব।
নোবেলজয়ী আবিষ্কার থেকে ‘ER-100’-এর জন্ম
২০০৬ সালে জাপানের কিওটো ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী শিনিয়া ইয়ামানাকা প্রথম আবিষ্কার করেন যে, শরীরের বৃদ্ধ কোষকেও চারটি নির্দিষ্ট জিনের মাধ্যমে পুনরায় যুবকের মতো সতেজ করা সম্ভব। এই আবিষ্কারের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পান। তবে সেই ৪টি জিন একসাথে ব্যবহার করলে কোষে টিউমার বা ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকত।
পরবর্তীতে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা সেই ঝুঁকি এড়াতে একটি জিন বাদ দিয়ে বাকি তিনটি জিন (OCT-4, SOX-2, KLF-4 — সংক্ষেপে OSK) নিয়ে কাজ শুরু করেন, যাকে বলা হচ্ছে ‘পার্শিয়াল এপিজেনেটিক রিপ্রোগ্রামিং’ (Partial Epigenetic Reprogramming)।
সহজ ভাষায় এপিজেনেটিক্স – কোষের ‘রান্নার বই’
আমাদের ডিএনএ (DNA) যেন একটি রান্নার বইয়ের মতো। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই বইয়ের পাতায় ধুলো জমে, লাইনগুলো অস্পষ্ট হয়ে যায়, ফলে শরীর তার সঠিক কাজ পরিচালনা করতে পারে না। ‘ER-100’ থেরাপির কাজ হলো ডিএনএ-র সেই জমে থাকা ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলে কোষের ‘সফটওয়্যার’ আপডেট করা, যার ফলে কোষ তার আসল পরিচয় না হারিয়েই আবার যুবকের মতো কর্মক্ষম হয়ে ওঠে।
ইঁদুর থেকে বানর – অন্ধত্ব দূর করার অলৌকিক ম্যাজিক
২০২০ সালে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের ল্যাবে বিজ্ঞানী ডেভিড সিনক্লেয়ারের তত্ত্বাবধানে একটি অবিশ্বাস্য পরীক্ষা করা হয়। গ্লুকোমায় আক্রান্ত অন্ধ ইঁদুরের চোখে এই OSK জিন প্রবেশ করানোর মাত্র ৪ সপ্তাহের মধ্যে ইঁদুরটি তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে পায়। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তাদের চোখের বয়সের ঘড়ি বা ডিএনএ মিথাইলেশন ক্লক (DNA Methylation Clock) প্রায় ৩০% থেকে ৫০% পর্যন্ত পিছিয়ে গেছে। এরপর বানরের ওপর পরীক্ষা করেও কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই একই সফল ফলাফল পাওয়া যায়।
২০২৬-এ মানুষের ওপর প্রথম ট্রায়াল – চোখ ফেরানোর লড়াই
বস্টনের খ্যাতনামা বায়োটেক কোম্পানি ‘লাইফ বায়োসাইন্স’ (Life Biosciences) এই প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করেছে জিন থেরাপির বিশেষ ইনজেকশন ‘ER-100’…
-
অনুমোদন: ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে এফডিএ (FDA) এর হিউম্যান ট্রায়ালের চূড়ান্ত সবুজ সংকেত দেয়।
-
ট্রায়ালের রূপরেখা: ২০২৬-এর প্রথম কোয়ার্টার থেকে শুরু হওয়া প্রথম ধাপের (Phase 1) এই ট্রায়ালে ১২ থেকে ১৮ জন রোগীর ওপর পরীক্ষা চালানো হচ্ছে, যারা ওপেন-অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমা এবং ‘আই স্ট্রোক’ (NAION)-এর মতো মারাত্মক সমস্যায় দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন।
-
পদ্ধতি: রোগীর চোখে একটি একক ইনজেকশন দেওয়ার পর, ৮ সপ্তাহ ধরে ‘ডক্সিসাইক্লিন’ (Doxycycline) নামক একটি ট্যাবলেট খেতে হয়, যা এই থেরাপির নিয়ন্ত্রণকারী সুইচ হিসেবে কাজ করে।
মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন ও ২০৩০-এর ভবিষ্যৎ
এই গবেষণার গুরুত্ব বিবেচনা করে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই ক্ষেত্রটিতে বিপুল বিনিয়োগ আসছে। লাইফ বায়োসাইন্স কোম্পানিটি এই গবেষণার পরিধি বাড়াতে নতুন করে ৮০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৮০০ কোটি টাকা) ফান্ডিং পেয়েছে। রিজুভিনেট বায়ো বা ইউথ বায়ো-এর মতো বিশ্বসেরা কোম্পানিগুলোও এখন এই প্রতিযোগিতায় নেমেছে । বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এই থেরাপির চূড়ান্ত সুফল সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে আসতে পারে।
চ্যালেঞ্জ ও সুস্থ বার্ধক্যের স্বপ্ন
তবে এই প্রযুক্তির সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে:
১. নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: শরীরের নিয়ন্ত্রণকারী ডক্সিসাইক্লিন সুইচটি যেন ঠিকঠাক কাজ করে এবং থেরাপি যেন চোখের বাইরে অন্য কোথাও ছড়িয়ে না পড়ে।
২. মূল্য: প্রাথমিক অবস্থায় এই জিন থেরাপির খরচ সাধারণের নাগালের বাইরে হতে পারে, যা পরবর্তীকালে উৎপাদন বাড়লে কমে আসবে।
বিজ্ঞানীরা পরিষ্কার জানিয়েছেন, এটিকে অমরত্ব পাওয়ার কোনো ওষুধ ভাববেন না; বরং এর মূল লক্ষ্য হলো ‘সুস্থ বার্ধক্য’ (Healthy Healthspan) নিশ্চিত করা। যাতে একজন মানুষ ৯০ বছর বয়সেও ৬০ বা ৩০ বছরের যুবকের মতো নিরোগ ও কর্মক্ষম শরীর নিয়ে বাঁচতে পারেন।
#বিজ্ঞানসংবাদ #যৌবনধরেরাখা #ER100 #চিকিৎসাবিজ্ঞান #এপিজেনেটিক্স #অন্ধত্বদূরীকরণ #লাইফবায়োসাইন্স #জিনথেরাপি #গ্লুকোমাচিকিৎসা #ভবিষ্যতেরবিজ্ঞান #অমরত্ব
#ScienceNews #ER100 #EpigeneticReprogramming #AntiAging #CellularRejuvenation #LifeBiosciences #GeneTherapy #GlaucomaCure #DavidSinclair #YamanakaFactors #Healthspan #MedicalBreakthrough2026
![]()





