মায়ের অপেক্ষা
ডাঃ রঞ্জন কুমার দে (বারিদ বরণ)
পর্ব ১
সরকারি হাসপাতালের মর্গটার সামনে দিয়ে খুব কম মানুষই স্বেচ্ছায় হাঁটে। যারা যায়, তারা দ্রুত পা চালিয়ে চলে যায়।কেউ চোখ তুলে তাকায় না।একটা অদ্ভুত গন্ধ সবসময় ভেসে থাকে সেখানে—ফেনাইল, পুরোনো দেওয়াল, ভেজা সিমেন্ট, পচা মাংস আর মৃত্যুর নীরবতা মিশে থাকা একটা গন্ধ।
হাসপাতালের মূল ভবনের কোলাহল থেকে একটু দূরে, পিছনের দিকে ছোট্ট একতলা ঘর।দেওয়ালের চুন উঠে গেছে।লোহার দরজায় মরচে পড়েছে।
উপরে একটা ম্লান বাল্ব জ্বলে—দিন হোক বা রাত, আলোটা কখনো পুরো উজ্জ্বল লাগে না।
এই ঘরেই কাজ করে শিবু। এমএসসি পাস করার পরেও বহু চেষ্টাতেও একটা চাকরি জোটেনি। অবশেষে হাসপাতালের চুক্তিভিত্তিক ডোম।
লোকেরা তাকে নাম ধরে খুব কমই ডাকে। বেশিরভাগ সময় বলে,
“মর্গের ডোম”।
শিবু এতে কিছু মনে করে না।সে খুব কম কথা বলে।
প্রয়োজন ছাড়া কারও সঙ্গে কথা বলে না।চোখে চোখ রাখতেও যেন অস্বস্তি হয় তার।সকাল আটটার মধ্যে সে এসে যায়।চুপচাপ তালা খোলে।ভেতরে ঢুকে প্রথমে জানালার কাঁচ মোছে।তারপর মেঝেতে জল ছিটিয়ে পরিষ্কার করে।লোহার ট্রলিগুলো ঠিক জায়গায় রাখে।
কেউ তাকে বলেনি এসব করতে।তবু সে করে।
যেন এই ঘরটাও মানুষের শেষ আশ্রয়।হাসপাতালের অন্য কর্মীরা তাকে একটু দূরে দূরেই রাখে।চা খেতে ডাকলেও সে খুব কম যায়।ক্যান্টিনে বসলে সবাই একটু চুপ হয়ে যায়।কারণ শিবুর শরীরে যেন সবসময় মৃত্যুর গন্ধ লেগে থাকে।
কেউ কেউ বলে,
“এত মৃতদেহ দেখে মানুষটা অদ্ভুত হয়ে গেছে।”
কেউ আবার বলে,
“ওর নাকি পরিবারও নেই।”
শিবু এসব শোনে।কিন্তু কোনো উত্তর দেয় না। দুপুরবেলা যখন হাসপাতালের ভিড় বাড়ে, তখনও মর্গের পাশটা নিঃশব্দ।শুধু মাঝে মাঝে অ্যাম্বুলেন্স এসে থামে।দু’জন লোক স্ট্রেচার নামায়। সাদা কাপড়ে ঢাকা একটা শরীর ভেতরে ঢোকে। আর শিবু ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়।
অন্যদের মতো তাড়াহুড়ো করে না।প্রতিটা দেহের পাশে সে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়ায়।কখনও কাপড়টা একটু ঠিক করে দেয়।কখনও মুখের ওপর পড়ে থাকা চুল সরিয়ে দেয়।যেন মৃত মানুষটার এখনও অস্বস্তি হতে পারে।
একদিন নতুন এক ওয়ার্ডবয় তাকে জিজ্ঞেস করেছিল,
“তুমি এত আস্তে কাজ করো কেন?”
শিবু একটু থেমে বলেছিল,
“জীবিতরা সবসময় তাড়াহুড়ো করে। মৃতদের তো আর কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই।”
ছেলেটা উত্তর দিতে পারেনি।
সন্ধ্যার পর মর্গটা আরও নিঃশব্দ হয়ে যায়।বাইরে কুকুর ডাকে।দূরে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আলো জ্বলে।
শিবু তখন একা বসে থাকে।
টেবিলের ওপর পুরোনো একটা রেজিস্টার খোলা।
কাগজে লেখা,
“অজ্ঞাত পুরুষ।”
“বয়স আনুমানিক পঞ্চাশ।”
“দুর্ঘটনা।”
“হৃদরোগ।”
নামহীন মানুষের তালিকা।প্রতিটা নামের পাশে একটা শেষ বিন্দু। একদিন রাতের ডিউটিতে থাকা নার্স বলেছিল,
“তুমি এত রাতে একা ভয় পাও না?”
শিবু মাথা তুলেছিল।তার চোখে অদ্ভুত শান্তি।
ধীরে বলেছিল,
“মরা মানুষকে ভয় পাই না গো দিদি।জীবিত মানুষকে বেশি ভয় লাগে।”
নার্স হেসেছিল।কিন্তু শিবু হাসেনি।কারণ কথাটা সে মজা করে বলেনি।তার সত্যিই ভয় লাগত। জীবিত মানুষের প্রশ্ন, ব্যস্ততা, সম্পর্ক, অভিমান—এসবের সামনে দাঁড়াতে তার কষ্ট হতো।
মৃত মানুষেরা কিছু চায় না।কোনো অভিযোগ করে না।শুধু নীরব থাকে।আর সেই নীরবতাই শিবুর সবচেয়ে পরিচিত ভাষা।
সেদিন রাতেও সে একা বসে ছিল।
বাইরে হালকা বৃষ্টি পড়ছিল।মর্গের টিনের চালের ওপর টুপটাপ শব্দ হচ্ছিল।হঠাৎ দূরে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শোনা গেল।
শিবু ধীরে মাথা তুলল।
সে জানত,
আবার কেউ আসছে।
আবার কারও গল্প শেষ হয়ে গেলো।
পর্ব ২
শিবুর ছোটবেলার বাড়িটা ছিল নদীর ধারে।মাটির দেয়াল, খড়ের চাল, সামনে একটা নিমগাছ।
বৃষ্টি হলেই চাল চুঁইয়ে জল পড়ত।শীতকালে দেয়ালের ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকত। তবু সেই ছোট্ট ঘরটাকেই শিবুর পৃথিবী মনে হতো। কারণ সেখানে তার মা ছিল।
শিবুর বাবা খুব ছোটবেলাতেই মারা গিয়েছিল। বাবার মুখটা ঠিকমতো মনে নেই তার। শুধু মনে আছে, একদিন বাবা কাজ থেকে ফিরেছিল সাদা কাপড়ে ঢেকে।অনেক লোক বাড়িতে এসেছিল, মা খুব কাঁদছিল।
তারপর থেকেই সংসারটা বদলে যায়।মা অন্যের বাড়িতে কাজ করতে শুরু করেন।সকাল হলে একটা পুরোনো শাড়ি পরে বেরিয়ে যেতেন।
কখনও বাসন মাজা,কখনও রান্নার কাজ, কখনও ধান শুকোনো।
দিনশেষে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ফিরতেন।
তবু বাড়ি ফিরে প্রথম প্রশ্ন করতেন,
“খেয়েছিস?”
শিবু জানত, মা অনেকদিন নিজে না খেয়ে তাকে খাইয়েছে।রাতে মাটির প্রদীপের আলোয় পড়তে বসলে মা পাশে বসে থাকতেন।
মা পড়তে জানতেন না।
তবু খাতার দিকে তাকিয়ে বলতেন,
“ভালো করে পড় বাবা। তুই যেন আমার মতো মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ না করিস।”
শিবু তখন বুঝত না।কিন্তু মায়ের চোখের ভেতরে একটা স্বপ্ন দেখতে পেত।ছোট্ট, ক্লান্ত, অথচ জেদি একটা স্বপ্ন। স্কুলে শিবু ভালো ছাত্র ছিল।তবে পড়ার চেয়ে সংসারের চিন্তা বেশি ছিল।মায়ের কষ্ট দেখে সে লুকিয়ে কেঁদেছে করো। একটু বড় হয়ে সে কখনও মাঠে কাজ করেছে,কখনও বাজারে মাল টেনেছে।
তবু স্কুল ছাড়েনি।
মা ছাড়তে দেননি।
একদিন শিবু বলেছিল,
“পড়ে কী হবে?”
মা খুব শান্ত গলায় বলেছিলেন,
“সবকিছু না হোক,মানুষের সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবি।”
এই কথাটা শিবুর মনে গেঁথে গিয়েছিল।
সময় যেতে লাগল। শিবু বড় হলো। এমএসসি পাস করলো।কিন্তু একটা চাকরি জোটাতে পারল না। সংসারের অবস্থা বদলালো না।বরং মায়ের শরীরটা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে শুরু করল।
প্রথমে কাশি।তারপর জ্বর।তারপর হাঁটতে কষ্ট।
মা বলতেন,
“কিছু না, ঠিক হয়ে যাবে।”
কিন্তু ঠিক হতো না।রাতে শুয়ে শুয়ে কাশতে কাশতে হাঁপিয়ে উঠতেন।কখনও বুক চেপে ধরতেন।
শিবু ভয় পেত।
একদিন পাশের বাড়ির এক মহিলা বলল,
“ডাক্তার দেখাও।”
শিবু মাকে নিয়ে গ্রাম্য ডাক্তারের কাছে গেল।ডাক্তার কিছু ওষুধ দিলেন।কয়েকদিন ভালো, তারপর আবার আগের মতো।মা দুর্বল হতে লাগলেন।আগের মতো কাজেও যেতে পারতেন না।ঘরে বসে থাকতেন।
চোখদুটো কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল।
পেটের তাগিদে আর মায়ের চিকিৎসার জন্য শিবু সমস্ত আশা আকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দিয়ে এই ডোমের চাকরি তে ঢুকল।
একদিন বিকেলে শিবু কাজ থেকে ফিরে দেখল,মা উঠোনে বসে আকাশ দেখছে।হাওয়ায় নিমপাতা উড়ছে।মা ধীরে বললেন,
“শিবু…”
“কি মা?”
“একদিন আমাকে বড় হাসপাতালে নিয়ে যাবি?”
শিবু একটু চুপ করে রইল। তার পকেটে তখন মাত্র একশ টাকা। ওই সম্বল দিয়ে মাসের আরো পাঁচদিন কাটাতে হবে।
তবু সে বলল,
“নিয়ে যাব।”
মা হেসেছিলেন।সেই হাসিটা খুব ক্লান্ত ছিল।
কিন্তু বিশ্বাসে ভরা।তারপর থেকে মা মাঝেমধ্যে একই কথা বলতেন।
“বড় হাসপাতালে নিয়ে যাবি তো?”
শিবু প্রতিবার বলত,
“হ্যাঁ।”
কিন্তু দিন কেটে যেত।টাকা জুটত না। মাস গেলে যেটুকু মাইনে পেতো তাতে হয়তো দুবেলা দুমুঠো ভাত জোটে যেতো কিন্তু বিশেষ কিছু সে জমিয়ে উঠতে পারেনি। শিবু শুনেছে যে সব জায়গায় ডেডবডি বারিরলোকের হতে দেওয়ার সময় বখশিস পাওয়া যায় কিন্তু শিবু কোনোদিন হাত পাততে পারেনি।
শিবুর মনে হতো,আরেকটু টাকা জমুক।
আরেকটু।
তারপর নিয়ে যাবে।কিন্তু অসুখ অপেক্ষা করতে জানত না।শিবু তার হাসপাতালের ডাক্তারবাবু কে দেখিয়েছিল। কিন্তু মায়ের রোগটা বাড়তেই থাকে।সে বুঝেছিল যে করেই হোক মাকে বড় হাসপাতালে নিয়ে যেতেই হবে।সেই সময় থেকেই শিবুর মধ্যে একটা অদ্ভুত অস্থিরতা জন্মায়।কাজে থাকলেও মনে পড়ত,
মা একা আছে।
কাশছে কিনা।
খেয়েছে কিনা।
রাতে বাড়ি ফিরলে মা বলতেন,
“খেয়ে নে।”
নিজে না খেয়েও।
একদিন শিবু দেখেছিল,
মা নিজের ভাতের অংশটা লুকিয়ে রেখেছে।জিজ্ঞেস করতেই বলেছিল,
“ক্ষিধে নেই রে।”
শিবু বুঝেছিল,মিথ্যে।
কিন্তু কিছু বলার ছিল না।দারিদ্র্যের সবচেয়ে বড় কষ্ট,সব বুঝেও অনেক সময় চুপ করে থাকতে হয়।
শীত পড়তে শুরু করেছে।রাতে ঠান্ডা বাড়ছে।মায়ের কাশি আরও বেড়েছে।এক রাতে শিবু ঘুম থেকে উঠে দেখল,মা বসে আছে।শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
মুখে ঘাম।
শিবু ভয় পেয়ে গেল।
“হাসপাতালে যাব?”
মা ধীরে মাথা নাড়লেন।
তারপর বললেন,
“কাল নিয়ে যাস।”
শিবু বলল,
“ঠিক আছে।”
কিন্তু সেই “কাল” যে এত দূরে চলে যাবে,তখনও সে জানত না।
পর্ব ৩
পরদিন সকালটা অদ্ভুত নিস্তব্ধ ছিল।রাতে মায়ের কাশি খুব বেড়েছিল।শিবু ঠিকমতো ঘুমোতে পারেনি।
ভোরে উঠে সে দেখল,মা আধশোয়া হয়ে শ্বাস নিচ্ছেন।বুকটা দ্রুত উঠছে-নামছে।সে তাড়াতাড়ি জল এগিয়ে দিল।মা খুব কষ্ট করে একটু খেলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
“আজ নিয়ে যাবি তো?”
শিবুর বুকটা হালকা কেঁপে উঠল।সে মায়ের কপালে হাত রাখল।
গরম।চোখে অদ্ভুত ক্লান্তি।
শিবু নিচু গলায় বলল,
“আজ ডিউটি শেষ করেই নিয়ে যাব।”
মা কিছু বললেন না।শুধু মাথা নাড়লেন।তখনও শিবু হাসপাতালের মর্গে অস্থায়ী কর্মী।মাসের শেষে খুব সামান্য টাকা পায়।ডিউটি কামাই করলে বেতন কাটা যায়।মর্গের কাজ কেউ করতে চায় না।তাই কাজটা জুটেছিল।কিন্তু কাজটা থাকলেও জীবনটা সহজ হয়নি।মৃত মানুষকে ছুঁয়ে থাকলেও জীবনের কাছে সে প্রতিদিন হারছিল।
সেদিন সকালে হাসপাতালে পৌঁছেও শিবুর মন বসছিল না।মর্গের ভেতর ঠান্ডা।লোহার ট্রলির ওপর সাদা কাপড়ে ঢাকা তিনটে দেহ।সে রেজিস্টারে নাম লিখছিল। হাত চলছিল,মন ছিল না।
বারবার মনে পড়ছিল,
মা একা আছে।হয়তো দরজার দিকে তাকিয়ে আছে।
দুপুরের দিকে এক দুর্ঘটনার কেস এল।
পুলিশ, কাগজপত্র, পোস্টমর্টেম,সব মিলিয়ে ব্যস্ততা বেড়ে গেল।ডিউটি ডাক্তার তাড়াহুড়ো করছেন।
একটার পর একটা কাজ।শিবু মাঝেমধ্যে ঘড়ি দেখছিল।সময় যেন এগোচ্ছিল না।বিকেলের দিকে সে সুপারভাইজারকে বলেছিল,
“আজ একটু আগে যেতে পারি?”
লোকটা বিরক্ত হয়ে বলেছিল,
“এখন যাবে? নতুন বডি আসবে।”
শিবু চুপ করে গিয়েছিল।কারণ দরকারি মানুষেরা কখনো সহজে ছুটি পায় না।সন্ধ্যার একটু আগে হঠাৎ তার বুকের ভেতর অদ্ভুত অস্বস্তি শুরু হলো।কেন জানি না।কোনো কারণ নেই।
তবু মনে হচ্ছিল,
আজ বাড়ি ফিরতে দেরি করা ঠিক হবে না।সে দ্রুত কাজ শেষ করল।হাত ধুয়ে বেরিয়ে পড়ল।বাড়ির সামনে এসে সে থেমে গেল।
আজ অদ্ভুত নীরব।
ঘরের সামনে কয়েকজন দাঁড়িয়ে।কেউ তার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিল।শিবুর বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে দৌড়ে ভেতরে ঢুকল।
ঘরের কোণে মাটির খাটিয়ায় মা শুয়ে আছেন।
চোখ বন্ধ।মুখে কষ্ট নেই।শুধু এক অদ্ভুত শান্তি।
যে শান্তি জীবিত মানুষের মুখে খুব কম দেখা যায়।
শিবু দাঁড়িয়ে রইল।
তার মনে হলো,এটা সত্যি না। এখনই মা চোখ খুলবেন।বলবেন,
“এত দেরি করলি?”
কিন্তু ঘর নিঃশব্দ।সে ধীরে মায়ের কাছে গেল।
হাত ছুঁল।বরফের মতো ঠান্ডা।তার বুকের ভেতর জমে থাকা সব শব্দ যেন হঠাৎ হারিয়ে গেল।মাটিতে বসে পড়ল।
কেউ পেছন থেকে খুব আস্তে বলল,
“শেষ সময়েও তোর নাম ধরছিল…”
শিবু মাথা তুলল না।তার চোখ পড়ল খাটের পাশে রাখা একটা পুরোনো কাপড়ের ব্যাগে।ভেতরে একটা গামছা।একটা শাল।আর প্রেসক্রিপশন।মা তৈরি হয়েই ছিলেন।হাসপাতালে যাওয়ার জন্য।শুধু যাওয়াটা আর হলো না।
সেদিন প্রথমবার শিবু বুঝেছিল,
মৃতদেহের মুখে যে শান্তি থাকে,সেটা সবসময় শান্তি নয়।কখনও কখনও সেটা অপেক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার চিহ্ন।
পর্ব ৪
মায়ের মৃত্যুর পর কত বছর কেটে গেছে, শিবু ঠিক হিসেব রাখে না।সময় তার কাছে আর ক্যালেন্ডারের পাতায় মাপা হয় না। তার সময় মাপা হয়,কতগুলো মুখ এসেছে,কতগুলো মুখ চলে গেছে,আর কতগুলো মুখের পাশে শেষ পর্যন্ত কেউ দাঁড়ায়নি।
এখন সে পুরোপুরি মর্গের মানুষ।হাসপাতালের পেছনের সেই স্যাঁতসেঁতে ঘরটাই তার সবচেয়ে চেনা জায়গা।ভোরে সে আসে।রাতে সবচেয়ে শেষে বেরোয়।তার জীবনের দিনগুলো প্রায় একইরকম।
সকালে তালা খোলে।মেঝে ধোয়।রেজিস্টার খুলে বসে।তারপর অপেক্ষা।কখন অ্যাম্বুলেন্স ঢুকবে।
কখন সাদা কাপড়ে ঢাকা আরেকটা শরীর আসবে।
প্রথম প্রথম শিবুর খুব কষ্ট হতো।মৃতদেহ ছুঁতে গা কেমন করত।কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝে গেল, মৃত মানুষদের মধ্যে কোনো ভয় নেই।
তারা চুপচাপ।তারা তাড়া দেয় না।তারা বিচার করে না।শুধু নীরব হয়ে শুয়ে থাকে।আর সেই নীরবতা শিবুর খুব পরিচিত।
মর্গে আসা প্রতিটা দেহের জন্য একটা নির্দিষ্ট নিয়ম আছে।নাম লিখতে হয়।সময় লিখতে হয়।কোথা থেকে এসেছে লিখতে হয়।কিন্তু শিবু শুধু কাগজে নাম লেখে না।সে মানুষটাকে একটু দেখে।চুপ করে দাঁড়ায়।মুখের কাপড় ঠিক করে।কখনও চোখ খোলা থাকলে আস্তে বন্ধ করে দেয়।যেন ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে।অনেক সময় আত্মীয়রা এসে দ্রুত কাজ সেরে চলে যায়।
কেউ কাঁদে।কেউ ফোনে ব্যস্ত থাকে।কেউ শুধু সই করে চলে যায়।শিবু এসব দেখে।কিন্তু কিছু বলে না।
তার মনে হয়,
মানুষের কান্নারও সময় কমে গেছে।সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় যখন কেউ আসে না।মাঝে মাঝে অচেনা মানুষ আসে।রাস্তায় দুর্ঘটনা।স্টেশন থেকে উদ্ধার।
ফুটপাথের বৃদ্ধ। নদী থেকে পাওয়া শরীর।
রেজিস্টারে লেখা হয়,
“অজ্ঞাত পরিচয়।”
এই শব্দটা শিবুর খুব অপছন্দ।কারণ সে জানে, কেউ না কেউ তাকে চিনত।কেউ একদিন তাকে কোনো নামে ডাকত।কেউ হয়তো অপেক্ষা করত।কিন্তু মৃত্যুর পর মানুষটা শুধু “অজ্ঞাত” হয়ে যায়।
মর্গের অন্য কর্মীরা শিবুকে অদ্ভুত ভাবে।একদিন নতুন ওয়ার্ডবয় জগা বলেছিল,
“তুই এত যত্ন করিস কেন?”
শিবু উত্তর দেয়নি।
জগা আবার বলেছিল,
“মরা মানুষ তো কিছু বোঝে না।”
শিবু তখন ধীরে মাথা তুলেছিল।
অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলেছিল,
“মরে যাওয়ার পরও মানুষ একা থাকতে চায় না।”
জগা হেসে ফেলেছিল।
“মরা মানুষ আবার একা লাগে নাকি?”
শিবু কিছু বলেনি।কারণ এই কথার উত্তর ভাষায় বোঝানো যায় না।কিছু অনুভূতি শুধু বয়ে নিয়ে যেতে হয়।
রাতে মর্গটা সবচেয়ে বেশি নিঃশব্দ হয়ে যায়।বাইরে হাসপাতালের আলো জ্বলে।দূরে অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ আসে।শিবু টেবিলের পাশে বসে রেজিস্টার লেখে। তারপর মাঝে মাঝে উঠে যায়।একেকটা ট্রলির পাশে দাঁড়ায়।চুপ করে দেখে।
মনে হয়,কেউ কি আসবে?
কেউ কি বলবে,
“এই মানুষটা আমার”।
অনেকদিন এমন হয়েছে,সবাই চলে যাওয়ার পরও শিবু দরজা বন্ধ করতে পারেনি।মনে হয়েছে,হয়তো শেষ মুহূর্তে কেউ ছুটে আসবে।
বলবে,
“একটু দাঁড়ান… আমি দেরি করে ফেলেছি।”
এই অপেক্ষা সে খুব ভালো চেনে।কারণ জীবনে একবার সে নিজেও দেরি করে ফেলেছিল।আর সেই দেরির শাস্তি সে এখনও প্রতিদিন বয়ে বেড়ায়।
পর্ব ৫
সেদিন বিকেল থেকেই আকাশটা ভারী ছিল। হাসপাতালের পুরোনো ভবনের ওপর কালো মেঘ জমেছিল।বাতাসে কাঁচা বৃষ্টির গন্ধ।রাতে ডিউটিতে ছিল শিবু।মর্গের সামনে ছোট্ট টিনের ছাউনি থেকে জল পড়ছিল টুপটাপ।রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতাল একটু ফাঁকা হয়ে আসে। করিডোরের আলো ম্লান লাগে।নার্সদের হাঁটার শব্দ দূর থেকে ভেসে আসে।
শিবু রেজিস্টার লিখছিল।
হঠাৎ দূরে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শোনা গেল।সে মাথা তুলল।এই শব্দের সঙ্গে তার বহু বছরের পরিচয়। কিছুক্ষণের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্সটা এসে থামল।
দু’জন পুলিশ নামল।পিছন থেকে স্ট্রেচার নামানো হলো।সাদা চাদরে ঢাকা একটা শরীর।
ভিজে।
চাদরের এক কোণা থেকে জল পড়ছে।পুলিশের একজন ক্লান্ত গলায় বলল,
“রাস্তার পাশে পড়েছিল।বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর লোকজন দেখতে পায়।”
শিবু ধীরে এগিয়ে গেল।নিয়মমতো কাগজ নিল।
নাম নেই।ঠিকানা নেই।
শুধু লেখা,
“অজ্ঞাত মহিলা। আনুমানিক বয়স সত্তর।”
শিবু সই করল।স্ট্রেচারটা ভেতরে নিয়ে এল। চাদরটা একটু সরাতেই মুখটা দেখা গেল।
এক বৃদ্ধা। চোখ বন্ধ। চুল ভেজা। কপালের পাশে কাদা লেগে আছে।মুখে অদ্ভুত ক্লান্তি। যেন অনেক দূর হাঁটতে হাঁটতে থেমে গেছে।
শিবু কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। অদ্ভুতভাবে তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। কেন জানি না। বৃদ্ধার মুখটা খুব সাধারণ।তবু কোথাও যেন পরিচিত। অপেক্ষার ছাপ।
শিবুর মনে পড়ল,মায়ের শেষ দিনের মুখ।সেই একই রকম নিঃশব্দ ক্লান্তি।সে ধীরে বৃদ্ধার চুলের পাশে লেগে থাকা কাদা পরিষ্কার করল। ভেজা শাড়িটা একটু ঠিক করে দিল। চাদরটা গলা পর্যন্ত টেনে দিল।
তারপর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
এত বছর ধরে অসংখ্য মৃতদেহ দেখেছে। তবু আজ অদ্ভুত লাগছে। যেন এই মানুষটাকে এভাবে ফেলে রাখা যায় না।
পুলিশ চলে গেল।মর্গ আবার নিঃশব্দ।বাইরে বৃষ্টি বাড়ছে।টিনের ওপর শব্দ পড়ছে।শিবু রেজিস্টারে নাম লিখতে বসলো।
কলম থেমে গেল।
সে কিছুক্ষণ খালি ঘরের দিকে তাকিয়ে রইল।
“অজ্ঞাত মহিলা।”
এই শব্দটা লিখতে তার কেমন যেন কষ্ট হচ্ছিল।
মনে হচ্ছিল,এই মানুষটার একটা নাম ছিল। কেউ একদিন তাকে ডেকেছিল।
হয়তো “মা” বলে। রাত অনেকটা গড়িয়ে গেল। শিবু একবার উঠে বৃদ্ধার পাশে গেল। চাদরটা একটু সরে গেছে। সে আবার ঠিক করে দিল।
তারপর খুব আস্তে বলল,
“কেউ আসবে।”
কথাটা সে কাকে বলল, নিজেও জানে না।
বৃদ্ধাকে?
নিজেকে?
নাকি বহু বছর আগের তার মাকে?
পরদিন সকাল।
নিয়মমতো কাগজপত্র হলো।পুলিশ ছবি তুলল।খবর পাঠানো হলো।কেউ এলে শনাক্ত করবে। শিবু দূর থেকে সব দেখছিল। তার চোখ বারবার বৃদ্ধার মুখে গিয়ে থামছিল।
মনে হচ্ছিল, এই মুখটা অপেক্ষা করছে।
দিন কেটে গেল।
প্রথম দিন—কেউ এল না।
দ্বিতীয় দিন—কেউ না।
তৃতীয় দিনেও কেউ না।
মর্গে নতুন দেহ এল।পুরোনো গেল।সবকিছু বদলাল।
শুধু বৃদ্ধাটা একই জায়গায় রয়ে গেল।
শিবু প্রতিদিন তার কাছে যেত।চাদরটা ঠিক করত।
মুখের পাশে জমে থাকা বরফের জল মুছে দিত।
একদিন ওয়ার্ডবয় জগা হেসে বলল,
“তোর কি আত্মীয় নাকি?”
শিবু উত্তর দিল না।
সেদিন রাতে শিবু একা বসে ছিল।মর্গে শুধু ম্লান আলো।বৃদ্ধার ট্রলির দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো,
কেউ কি সত্যিই আর আসবে না?
মানুষ কি এভাবেই হারিয়ে যায়?
একদিন যার জন্য একটা বাড়িতে রান্না হতো, যে কারও জন্য অপেক্ষা করত,সে কি শেষে শুধু একটা নম্বর হয়ে যায়?
শিবু ধীরে উঠে দাঁড়াল।বৃদ্ধার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
খুব আস্তে বলল,
“আরেকটু অপেক্ষা করুন…নিশ্চয় কেউ আসবে।
হয়তো কেউ পথ ভুলে গেছে। তাই সময় লাগছে ”
পর্ব ৬
চতুর্থ দিনেও কেউ এল না।
সকালে শিবু মর্গের দরজা খুলেই প্রথমে বৃদ্ধার ট্রলির দিকে তাকাল।সবকিছু একই রকম।সাদা চাদর, নিঃশব্দ ঘর, ম্লান আলো, শুধু সময়টা বদলেছে। আর অপেক্ষাটা একটু দীর্ঘ হয়েছে।
মর্গে প্রতিদিন নতুন দেহ আসে।তাদের কেউ কয়েক ঘণ্টা থাকে,কেউ একদিন।তারপর আত্মীয় আসে।
কাগজপত্র হয়।কেউ কাঁদতে কাঁদতে নিয়ে যায়, কেউ দ্রুত,কেউ চুপচাপ।কিন্তু এই বৃদ্ধা এখনও রয়ে গেছে।
যেন তার গল্পটা শেষ হতে চাইছে না।
বিকেলে একবার চা খেতে খেতে জগা বলল,
“তুই ওই বৃদ্ধার কাছে এত যাস কেন?”
শিবু চুপ করে ছিল।
জগা হাসল।
“চারদিন হয়ে গেল। কেউ আসবে না।”
শিবু ধীরে চা নামিয়ে রাখল।তারপর খুব আস্তে বলল,
“সবাই আসে। কেউ আগে, কেউ পরে।”
জগা মাথা নাড়ল।সে এসব বোঝে না।
সেদিন রাতেও বৃষ্টি নামলো।মর্গের টিনের চালের ওপর টুপটাপ শব্দ।শিবু একা বসে ছিল।
হঠাৎ তার মনে হলো,আজ বৃদ্ধার পাশে একটু বসা যায়।সে ধীরে ট্রলির পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণ চুপ।
তারপর খুব আস্তে বলল,
“আপনার কেউ নেই?”
ঘরে কোনো শব্দ নেই।শুধু দূরে ফ্রিজের মৃদু আওয়াজ।সে নিজেই জানে না কেন কথা বলতে শুরু করল।মনে হলো,অনেকদিন কাউকে কিছু বলেনি।
“আমার মাও এমন কাশি দিত।”
সে নিচু গলায় বলল।
“শেষ দিনেও হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারিনি।”
তার গলা আটকে গেল।
কথাগুলো যেন বহু বছর ধরে ভেতরে আটকে ছিল।
আজ বেরোচ্ছে।শিবু ট্রলির পাশে বসে পড়ল।তার মনে হচ্ছিল,এই বৃদ্ধা শুনছে। কেউ না থাকলেও শুনছে।
সে বলল,
“শেষ দিনেও বলেছিল… তাড়াতাড়ি ফিরতে।”
বাইরে বাতাসে জানালার কাঁচ কেঁপে উঠল।
শিবু মাথা নিচু করল।
তারপর ধীরে বলল,
“আমি ফিরেছিলাম।কিন্তু একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল।”
ঘরটা নিঃশব্দ।
তবু আজ সেই নীরবতা তাকে কষ্ট দিচ্ছিল না। রাত গভীর হলে সে উঠে দাঁড়াল। চাদরটা আবার গলা পর্যন্ত টেনে দিল।এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, এই বৃদ্ধা যেন শুধু একজন অচেনা মানুষ নয়। যেন বহুদিনের কোনো অসমাপ্ত অপেক্ষা। যেন এমন কেউ, যার কাছে সে ক্ষমা চাইতে পারেনি।
শিবু আবার বৃদ্ধার পাশে দাঁড়াল।
দীর্ঘক্ষণ।
তার মনে হচ্ছিল, যদি কেউ না আসে, তাহলে এই মানুষটার শেষ বিদায়টা অন্তত একা হওয়া উচিত নয়।
সে খুব আস্তে বলল,
“আমি আছি।”
পর্ব ৭
পঞ্চম দিনের সকালটা অন্য দিনের মতোই শুরু হয়েছিল।মর্গের ভেতরে ঠান্ডা বাতাস আর ফেনাইলের গন্ধ। দূরে হাসপাতালের করিডোরে মানুষের হাঁটার শব্দ।
শিবু রেজিস্টার লিখছিল।
হঠাৎ বাইরে কারও তাড়াহুড়োর শব্দ শোনা গেল।
দরজার সামনে এক যুবক দাঁড়িয়ে।
বয়স তিরিশ-পঁয়ত্রিশ।
চোখে ক্লান্তি নেই, মুখে উদ্বেগও না, শুধু অস্থিরতা।
তার হাতে মোবাইল। পাশে এক পুলিশকর্মী।
পুলিশ বলল,
“ছবিটা দেখে মনে হয়েছে চিনতে পারবে।”
যুবকটা ভেতরে ঢুকল।
মর্গে ঢুকেই সে একটু অস্বস্তি নিয়ে চারদিকে তাকাল।
যেন যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে বেরিয়ে যেতে চায়।
শিবু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। সে বৃদ্ধার ট্রলির কাছে গিয়ে চাদরটা ধীরে সরাল। মুখটা দেখা গেল।
যুবকটা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।
তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
“হ্যাঁ… আমার মা।”
শিবুর বুকের ভেতর কেমন যেন শব্দ হলো। এত সহজ? এত ছোট্ট একটা বাক্য?
“আমার মা।”
কিন্তু সেই কথার মধ্যে কোনো ভাঙন নেই,কোনো কাঁপন নেই। যুবকটা মোবাইল বের করে কারও সঙ্গে কথা বলতে লাগল।
“হ্যাঁ, পেয়ে গেছি… হাসপাতালে।”
তার গলায় ক্লান্তি নেই।শুধু কাজ শেষ করার তাড়া।
শিবু কাগজ এগিয়ে দিল।
“এখানে সই করতে হবে।”
লোকটা দ্রুত সই করল।
তারপর বলল,
“কতক্ষণ লাগবে?”
শিবু তাকিয়ে রইল।কিছুক্ষণ চুপ।
তারপর বলল,
“আপনি… খুঁজছিলেন?”
যুবকটা একটু বিরক্ত হলো।
“না… মানে… উনি বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।”
শিবু কিছু বলল না।
লোকটা নিজেই বলল,
“বয়স হলে মানুষ একটু জেদি হয়ে যায়।”
ঘরটা হঠাৎ ভারী লাগছিল।শিবু বৃদ্ধার মুখের দিকে তাকাল।এই মানুষটার জন্য কেউ পাঁচদিন আসেনি।
আর এখন যে এসেছে,তার চোখে জল নেই।
যুবকটা বলল,
“তাড়াতাড়ি হলে ভালো হয়।আমার একটু কাজ আছে।”
এই কথাটা শুনে শিবুর বুকের ভেতর কেমন ব্যথা উঠল।
“কাজ!”
শব্দটা খুব পরিচিত। একদিন এই শব্দটার কারণেই
সে মায়ের কাছে ফিরতে পারেনি।
সে ধীরে জিজ্ঞেস করল,
“শেষবার কবে কথা হয়েছিল মায়ের সাথে?”
যুবকটা একটু ভেবে বলল,
“ঠিক মনে নেই।”
তারপর যোগ করল,
“বছরখানেক হবে।”
শিবুর হাত থেমে গেল।
“বছরখানেক…!”
একটা মানুষ নিজের মায়ের সঙ্গে শেষ কথা বলার সময়টাও মনে রাখতে পারে না? যুবকটা ঘড়ি দেখছিল। মোবাইলে মেসেজ করছিল।মর্গের ভেতরে দাঁড়িয়েও তার মন যেন অন্য কোথাও।
শিবুর মনে মনে বলল,
“এই বৃদ্ধা পাঁচদিন একা ছিলেন না। হয়তো বহু বছর ধরেই একা ছিলেন।”
সব কাগজপত্র শেষ হলো। লোকটা বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ঘুরল।
হঠাৎ থেমে বলল,
“বডিটা আজ নিয়ে যেতে হবে?”
শিবু তাকিয়ে রইল।কিছু বলতে পারল না।তার গলায় যেন শব্দ আটকে গেছে। জন্মদাত্রী মা আজ শুধুই একটা বডি।
লোকটা বেরিয়ে গেল।দরজাটা ধীরে বন্ধ হলো। মর্গ আবার নিঃশব্দ।শুধু সাদা আলো, ঠান্ডা বাতাস, আর ট্রলির ওপর বৃদ্ধা।
শিবু ধীরে এগিয়ে গেল। চাদরটা আবার মুখ পর্যন্ত টেনে দিল।তার হাত কাঁপছিল।
আজ প্রথমবার তার মনে হলো,
কিছু মানুষ মৃত্যুর পর একা হয় না। তারা অনেক আগেই একা হয়ে যায়। আর মৃত্যু শুধু সেই একাকীত্বটাকে দৃশ্যমান করে দেয়।
পর্ব ৮
কাগজপত্র তৈরি।
আজ হয়তো মানুষটা চলে যাবে।পাঁচদিনের অপেক্ষার অবসান আজ।কিন্তু শিবুর মনে শান্তি আসছিল না।
কেন যেন মনে হচ্ছিল,কিছু একটা এখনও বলা বাকি।
আজ ঘরটা অদ্ভুত ভারী।
যেন বাতাসেও একটা চাপা কষ্ট জমে আছে।
নিয়মমাফিক সে খুব ধীরে চাদরটা গুছিয়ে দিল। বৃদ্ধার শাড়ির ভাঁজ ঠিক করছিল।
ঠিক তখনই তার চোখে পড়ল, শাড়ির আঁচলের ভেতরে ছোট্ট একটা গিঁট।খুব শক্ত করে বাঁধা, আগে খেয়াল করেনি সে।
শিবু থেমে গেল।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর খুব সাবধানে গিঁটটা খুলল।ভেতরে একটা ছোট কাপড়ের থলি।
পুরোনো।
ভেজা দাগ শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে।থলির ভেতরে কয়েকটা কয়েন,একটা পুরোনো চাবি,আর ভাঁজ করা ছোট্ট একটা কাগজ।শিবুর বুকের ভেতর ধীরে কেঁপে উঠল।
সে কাগজটা খুলল।কাগজটা অনেক পুরোনো। বারবার ভাঁজ করার দাগ, কালি ছড়িয়ে গেছে।তবু লেখা বোঝা যায়।
কাঁপা হাতে লেখা,
“আমার ছেলে রাগ করে আছে। তবু যদি কোনোদিন আমাকে খোঁজে…”
তার নিচে একটা ফোন নম্বর। শিবুর হাত কেঁপে উঠল।
সে আবার পড়ল….ধীরে।
বারবার।
“আমার ছেলে রাগ করে আছে…”
কোনো অভিযোগ নেই,কোনো অভিমান নেই, শুধু অপেক্ষা, শুধু বিশ্বাস।শিবুর চোখ ঝাপসা হয়ে এল।
তার মনে হলো,এই বৃদ্ধা শেষ পর্যন্তও ছেলেকে দোষ দেয়নি। মৃত্যুর আগেও বিশ্বাস করে গেছে, একদিন ছেলে খুঁজবে, একদিন দরজায় দাঁড়াবে।
একদিন বলবে,
“মা, বাড়ি চল।”
শিবুর গলা শুকিয়ে গেল।
সে ধীরে বসে পড়ল ট্রলির পাশে।
কাগজটা হাতে।
তার মনে পড়ল, তার মা-ও কখনও অভিযোগ করেনি।
শেষ দিনেও বলেনি,
“তুই দেরি করেছিস।”
মায়েরা হয়তো শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করেই যায়।, যত কষ্টই হোক। শিবু কাগজটার ওপর আঙুল বুলিয়ে দিল।কাগজে ভেজা দাগ।
হয়তো বৃষ্টির,হয়তো বা চোখের জলের।
কে জানে।
হঠাৎ তার মনে হলো,যে ছেলে আজ এত নির্লিপ্তভাবে চলে গেল, সে কি জানে, তার মা শেষ পর্যন্ত তাকে খুঁজেছে?
তার নাম আঁচলে বেঁধে রেখেছে?
রাস্তার ধারে পড়ে যাওয়ার পরও হয়তো বুকের কাছে এই থলিটা শক্ত করে ধরে ছিল?
শিবুর বুকের ভেতর জমে থাকা বহু বছরের অপরাধবোধ হঠাৎ যেন নড়ে উঠল। সে কাগজটা ভাঁজ করল, খুব যত্ন করে। আবার থলির ভেতর রাখল। তারপর থলিটা বৃদ্ধার হাতের পাশে রেখে দিল।যেন এটা তার সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস।
মর্গের আলো স্থির। ঘর ঠান্ডা।
কিন্তু শিবুর চোখের কোণে উষ্ণ জল জমে উঠেছে।
সে ধীরে বলল,
“আপনিও শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন…”
তারপর কিছুক্ষণ চুপ।
খুব নিচু গলায় যোগ করল,
“মায়েরা বোধহয় কখনও হেরে যায় না।”
পর্ব ৯
সেদিন ডিউটি শেষ হওয়ার পরও শিবু অনেকক্ষণ মর্গ থেকে বেরোতে পারেনি।
সব কাজ শেষ।রেজিস্টার বন্ধ।দরজার তালা লাগানোর সময়ও তার হাত ধীরে চলছিল। একবার খালি ট্রলিটার দিকে তাকালো সে—কেউ চলে গেছে, কিন্তু একটা অপেক্ষা রয়ে গেছে।মনে হচ্ছিল,আজ কিছু একটা ভেতরে বদলে গেছে।
বাইরে তখন রাত।
হাসপাতালের আলো দূর থেকে ঝাপসা দেখাচ্ছিল।
হালকা বৃষ্টি পড়ছিল।শিবু ধীরে হাঁটতে লাগল।রাস্তা প্রায় ফাঁকা।
চায়ের দোকান বন্ধ।
ভেজা বাতাসে কুকুরের ডাক ভেসে আসছে।তার হাতে এখনও সেই কাগজের স্পর্শ লেগে আছে।
“আমার ছেলে রাগ করে আছে…”
এই কয়েকটা শব্দ বারবার মাথায় ঘুরছিল।
বাড়ি পৌঁছে সে দরজা খুলল।ছোট্ট ঘর,একটা খাট,একটা টেবিল, দেওয়ালের রং উঠে গেছে।ঘরে কেউ অপেক্ষা করে না।
কেউ জিজ্ঞেস করে না,
“খেয়েছিস?”
শিবু অভ্যস্ত।
তবু আজ ঘরটা অন্যরকম লাগছিল।অস্বাভাবিক নীরব।সে ভেজা জামা খুলে চুপচাপ বসে রইল।ঘড়ির টিকটিক শব্দ শোনা যাচ্ছে।
বাইরে বৃষ্টি।
অনেকক্ষণ পর সে ধীরে টেবিলের ড্রয়ার খুলল।
ভেতর থেকে একটা পুরোনো টিনের বাক্স বের করল।
বাক্সটা বহুদিন খোলা হয়নি।
ধুলো জমেছে।
সে ধীরে খুলল।ভেতরে কিছু পুরোনো কাগজ, একটা ভাঙা চিরুনি, একটা লাল সুতোর টুকরো,আর একটা সাদা-কালো ছবি।
তার মা।
ছবিটা অনেক পুরোনো।কোণ ভেঙে গেছে।মা হালকা হাসছেন।চোখে ক্লান্তি, তবু শান্ত।
শিবু ছবিটা হাতে নিল।অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তার বুকের ভেতর জমে থাকা শক্ত অংশটা যেন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছিল।
বহু বছর সে এই ছবিটার দিকে ঠিকমতো তাকায়নি।
কারণ তাকালেই একটা প্রশ্ন জেগে ওঠে।যার উত্তর তার কাছে নেই।সে খুব আস্তে ছবিটার ওপর হাত রাখল।
তারপর ফিসফিস করে বলল,
“সেদিন যদি একটু আগে ফিরতাম…”
কথাটা শেষ করতে পারল না।গলা কেঁপে উঠল।চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।বহু বছর পর সেদিন প্রথমবার শিবু কাঁদল।
শব্দহীন কান্না।ধীরে কিন্তু ভেতর থেকে।যেন জমে থাকা পাথর ভেঙে জল বেরোচ্ছে।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল।
জানালার কাঁচে জল গড়িয়ে নামছিল।ঘরের ভেতর ম্লান আলো।শিবু ছবিটা বুকের কাছে চেপে ধরল।
তার মনে হচ্ছিল,আজ এতদিন পরে সে সত্যিই একা।
হঠাৎ তার মনে পড়ল,বৃদ্ধার থলির কাগজ। শেষ মুহূর্তেও ছেলে ফিরে আসবে,এই বিশ্বাস।
মায়েরা কত সহজে ক্ষমা করে।কত সহজে অপেক্ষা করে।শিবু ধীরে মাথা তুলল।
তার চোখে জল।
সে খুব নিচু গলায় বলল,
“মা… আমি দেরি করে ফেলেছিলাম।”
ঘরে কোনো উত্তর নেই।
শুধু বৃষ্টির শব্দ।
টেবিলের ওপর রাখা ছবিটার পাশে একফোঁটা জল পড়ে রইল।কান্না, না বৃষ্টির ফোঁটা—বোঝা গেল না।
সেই রাতে অনেকদিন পর শিবু আলো নিভিয়ে ঘুমোতে পারেনি।সে শুধু শুয়ে ছিল, কিন্তু চোখ খোলা।
অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে তার মনে হচ্ছিল, মর্গে যত মৃতদেহ সে দেখেছে,তাদের সবার ভেতরে হয়তো একটা গল্প ছিল।
কেউ শেষবার বাড়ি ফিরতে পারেনি।
কেউ শেষবার ক্ষমা চাইতে পারেনি।
কেউ শেষবার “মা” বলতে পারেনি।
ভোরের আগে বৃষ্টি থেমে গেল।জানালার ফাঁক দিয়ে হালকা আলো ঢুকল।শিবু এখনও জেগে।তার চোখ বন্ধ, কিন্তু মুখে অদ্ভুত শান্তি।
মায়ের ছবিটা তার পাশে।
বহুদিন পরে আজ সে একটা সত্যি মেনে নিয়েছে।
কিছু মানুষ চলে যায়।কিন্তু তাদের জন্য অপেক্ষা কখনও শেষ হয় না।কারণ পৃথিবীর সব সম্পর্ক একদিন শেষ হয়ে যায়।
শুধু মায়েরা মরে যাওয়ার পরও অপেক্ষা করে।
*** সমাপ্ত ***
![]()






