বিশেষ প্রতিবেদন: ভোপাল:
ধোঁয়া-ধুলো শুষে নেবে শৈবাল! ভোপালের এই বিপ্লবী প্রযুক্তি কি তবে দিল্লির দমবন্ধ করা দূষণের শেষ ওষুধ?
দিন দিন দেশের বড় শহরগুলোর বাতাস যেন বিষাক্ত গ্যাসে পরিণত হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে দূষিত শহরের তালিকায় প্রথম সারিতেই নাম থাকে ভারতের একাধিক মহানগরের। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত দেশের তালিকায় ভারতের স্থান ষষ্ঠ। রাজধানী দিল্লি বা বাণিজ্য নগরী মুম্বাইয়ের একিউআই (AQI) প্রায়শই ৫০০-র গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের ফুসফুসকে কার্যত অকেজো করে দিচ্ছে। এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিতে এবার ভারতে পা রাখল এক বৈপ্লবিক পরিবেশ-বান্ধব প্রযুক্তি— ‘অ্যালগি ট্রি’ (Algae Tree) বা ‘লিকুইড ট্রি’ (তরল গাছ)।
মধ্যপ্রদেশের ভোপাল শহরের স্বামী বিবেকানন্দ পার্কে ভারতের প্রথম এই লিকুইড ট্রি সফলভাবে স্থাপন করা হয়েছে। ‘মশরুম ওয়ার্ল্ড গ্রুপ’ নামক একটি সংস্থার হাত ধরে এই পরিবেশ-বান্ধব আশ্চর্য যন্ত্রটি ভারতে প্রথম আত্মপ্রকাশ করল।
কী এই লিকুইড ট্রি? কীভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি?
দেখতে কোনো সাধারণ গাছের মতো না হলেও, এটি আসলে একটি বিশেষ বৈজ্ঞানিক কাঠামো, যা কাজ করে ‘ফটোবায়ো রিয়্যাক্টর’ (Photobioreactor) নীতিতে। এটি মূলত একটি বড় কাঁচের চৌবাচ্চা বা ট্যাংক, যার ভেতরে রয়েছে জল এবং এক বিশেষ ধরণের সবুজ শৈবাল বা সাধারণ ভাষায় আমরা যাকে ‘কাদানি’ বা ‘শ্যাওলা’ বলি।
-
সূর্যলোক ও সোলার প্যানেল: এই কাঠামোর শীর্ষে একটি সোলার প্যানেল বসানো থাকে। দিনের বেলা সূর্যের আলো এবং রাতে সোলার প্যানেল থেকে পাওয়া কৃত্রিম আলোর সাহায্যে ভেতরের শৈবাল নিরবচ্ছিন্নভাবে সালোকসংশ্লেষ (Photosynthesis) প্রক্রিয়া চালিয়ে যায়।
-
কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ: মেশিনের নিচে থাকা একটি শক্তিশালী পাম্প চারপাশের দূষিত বাতাসকে সাকশন বা টেনে ট্যাংকের ভেতরে পাঠায়। শৈবাল বাতাসে থাকা ক্ষতিকর কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2) সম্পূর্ণ শুষে নেয়।
-
অক্সিজেন চ্যাম্বার: CO2 শোষণের পর সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শৈবাল বিশুদ্ধ অক্সিজেন (O2) বাতাসে ছেড়ে দেয়। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি চারপাশের ১০ থেকে ১৫ মিটার ব্যাসার্ধের এলাকাকে একটি সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ অক্সিজেন চ্যাম্বারে পরিণত করতে পারে।
সাধারণ গাছের চেয়ে ২৫ গুণ বেশি শক্তিশালী!
শুনতে অবাক লাগলেও, একটি লিকুইড ট্রি একটি সাধারণ পূর্ণাঙ্গ গাছের তুলনায় প্রায় ২৫ গুণ বেশি দ্রুত গতিতে এবং বেশি পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করতে সক্ষম! এছাড়া বাতাসের সবচেয়ে মারাত্মক ক্ষতিকর উপাদান PM 2.5 এবং PM 10-এর মতো সূক্ষ্ম ধূলিকণাকেও এটি নিজের শরীরে আটকে ফেলে বাতাসকে একদম পরিশুদ্ধ করে তোলে।
প্রকৃতির এক অদ্ভুত সমীকরণ হলো, পৃথিবীর প্রায় ৭১ শতাংশ সমুদ্র এবং এই সমুদ্রের শৈবালই কিন্তু পৃথিবীর সিংহভাগ অক্সিজেন তৈরি করে বাতাসকে সতেজ রাখে। সেই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকেই এবার শহরের বুকে কৃত্রিমভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে।
পরিবেশের সাথে মিলবে জৈব সার
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, ভেতরের শৈবাল বা শ্যাওলা যখন পুরনো বা নষ্ট হয়ে যাবে, তখন কী হবে? গবেষকরা জানিয়েছেন, এই ট্যাংক পরিষ্কার করার সময় যে বর্জ্য বা ‘বায়োমাস’ (Biomass) পাওয়া যাবে, তা ফেলে দেওয়া হবে না। এটি অত্যন্ত উচ্চমানের ‘বায়ো-ফার্টিলাইজার’ বা জৈব সার হিসেবে চাষাবাদ ও বাগানে ব্যবহার করা যাবে, যা মাটির উর্বরতা বাড়াতে সাহায্য করবে।
শহুরে অর্থনীতির নতুন রক্ষাকবচ
দূষণের কারণে প্রতিনিয়ত মানুষ ফুসফুসের ক্রনিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কর্মক্ষম মানুষ অসুস্থ হলে দেশের কর্মদিবস নষ্ট হয়, যা সরাসরি অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলে। লিকুইড ট্রি একদিকে যেমন দূষণ কমাবে, অন্যদিকে তীব্র দাবদাহ বা ‘হিট ওয়েভ’ (Heat Wave)-এর প্রকোপ থেকেও শহুরে জনজীবনকে কিছুটা স্বস্তি দেবে।
তবে পরিবেশবিদদের মতে, এই লিকুইড ট্রি কখনোই আমাদের প্রাকৃতিক বনাঞ্চল বা আসল গাছের বিকল্প নয়। আসল গাছ মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখে। কিন্তু বর্তমান সময়ে যেখানে ভারতের বড় বড় শহরে গাছ লাগানোর মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই, সেখানে ফুটপাতে বা রাস্তার মোড়ে এই লিকুইড ট্রি বসানো দূষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এক ব্রহ্মাস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। ভোপালের এই পাইলট প্রজেক্ট সফল হলে আগামী দিনে কলকাতা, দিল্লি, মুম্বাইয়ের মতো মেগাসিটিগুলোর প্রতিটি রাস্তার মোড়ে মোড়ে দেখা মিলতে পারে এই তরল গাছের।
#লিকুইডট্রি #অ্যালগিটি #পরিবেশদূষণ #বায়ুদূষণ #ভোপালনিউজ #সবুজপ্রযুক্তি #বিজ্ঞানওপ্রযুক্তি #অক্সিজেনপ্ল্যান্ট #পরিবেশরক্ষা #ভারতপ্রথম
#IndiaFirstAlgaeTree #LiquidTreeBhopal #GreenTechnology #AirPollutionSolution #SaveEnvironment #EcoFriendlyTech #AlgaeTree #AirPurifier #FutureTech #TrendingNews #GoogleDiscoveryViral
![]()





