গুরুদক্ষিণা
কাকলি ঘোষ
দূর থেকে ঠিক বুঝতে পারেন নি রথীন বাবু। কারা যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে এটুকু শুধু অনুমান করতে পারছিলেন। কাছে এলে স্পষ্ট হল। একি! এ সব কি! তার ঘরের সামনে এরা কারা? জিনিস পত্র সব এদিক ওদিক হল কি করে? তার টেবিল চেয়ার, বাচ্চাদের বসার বেঞ্চ সব ওলট পালট! এসবের অর্থ কি! বিস্ময়াহত চোখে সামনে তাকান রথীন বাবু। চোঙা প্যান্ট, চক্কর_ বক্কর জামা, ডানহাতে বালা, বাঁ হাতে দামী মোবাইল, চোখে সানগ্লাস। তদারকিতে দুজন। বাকি দুজন ঘরের ভেতর থেকে মালপত্র বার করে করে বাইরে ছুড়ে ফেলছে। ভয়ে কাঁপছে বাচ্চাগুলো। তাকে দেখেই ছুটে এসে ঘিরে ধরলো।
” মাস্টার মশাই ওরা আমাদের বার করে দিয়েছে। আর এখানে পড়ানো যাবে না বলছে__”
অসহায় মুখ গুলোর দিকে একবার চোখ বুলিয়ে এবার বেশ দৃঢ় গলায় বলে ওঠেন রথীন বাবু,
” কি ব্যাপার? আপনারা কারা? এখানে কি করছেন? এসব কি হচ্ছে?”
” কি হচ্ছে দেখতেই তো পাচ্ছেন। ঘর খালি করা হচ্ছে।” , নির্বিকার মুখে হাতের কাজ সারতে সারতে উত্তর দেয় একজন।
” খালি করা হচ্ছে মানে? এটা আমার ঘর। আমি এখানে____”, বিস্ময়ে কথা হারিয়ে ফেলেন রথীন বাবু।
” দাদু কি বলে রে? আমার ঘর! ” ,গলা ফাটিয়ে হেসে ওঠে সবাই। , ” তা দাদু আপনার ঘর তো বুঝলাম! ক’ টাকা ভাড়া দেন! হ্যাঁ! “
” ভাড়া লাগে না। নরেশ বাবু আমাকে এখানে পড়াতে দিয়েছেন। ”
নিমেষ খ্যা খ্যা করে হেসে উঠল ছেলেগুলো।
” আমরা নরেশদারই লোক। দাদাই পাঠিয়েছেন। আর এখানে পড়ানো যাবে না। রাস্তার ধারের জায়গা। পার্টি অপিস হবে।”
পার্টি অফিস! তার এই ছোট্ট স্কুল তুলে দিয়ে? মানে!
” কিন্তু ছ মাস আগে উনি আমাকে নিজেই বলেছিলেন ___ যে এখানে আমি স্কুল করতে পারি। আর এখন —-! ”
আবার একচোট হাসির ফোয়ারা ছুটল।
” দাদু কি হাসাতেই পারেন ! মাইরি বলছি! ছ মাস আগে! তখন কি ছিল? ভোট। আর ভোটের সময় অমন দু চারটে’পমিস’ করতেই হয়। আপনি দাদু মাস্টার, এত লেখাপড়া জানেন ! আর এটা বোঝেন নি! ”
” আমি বিশ্বাস করি না। কি প্রমাণ আছে যে আপনারা নরেশ দত্তরই লোক! আমি ওনার কাছে যাচ্ছি।”
” আরে দাদু। এত মাতা গরম করবেন না। দাদা নেই এখানে। দিল্লি গেছেন। যাবার আগে অর্ডার করে গেছেন। কাজ ‘সুরু ‘ হবে কাল থেকেই। দাদা এলেই উদ্বোধন। ”
” কিছুতেই না। আমার স্কুল ভেঙ্গে এখানে পার্টি অফিস আমি হতে দেবো না।” চিৎকার করে ওঠেন রথীন বাবু, “মগের মুলুক পেয়েছো! যা খুশি তাই করবে? থানা পুলিশ নেই? দেশে আইন আদালত নেই? “
” তো যান। ”
ঘরের ভেতর থেকে যে মুর্তি বেরিয়ে এলো তাকে দেখে থমকালেন রথীনবাবু,
কেলে মস্তান! এলাকার ত্রাস! এক কালে কালাচাঁদ না কি যেন নাম ছিল ছেলেটার! খুন, রেপ, ডাকাতি, সব কিছুতেই সিদ্ধ হস্ত। ধরা পড়ে আর অদ্ভুত যাদুমন্ত্র বলে দুদিন পরেই ছাড়া পেয়ে যায়। যখন যে দল আসে চমৎকার ভাবে রং বদলে সেই দলের হয়ে কাজ শুরু করে। এখন যেমন নরেশ দত্তর দলে। অথচ ভোটের সময় ও দেখেছেন বরেন মিত্তিরের একেবারে কাধ ঘেঁষে চলছে ছেলেটা। ভোটে হারলো বরেন মিত্র। কেলে মস্তান ও হাত ধুয়ে ঢুকে গেল নরেশ দত্তর দলে। আর এখন এসেছে তার সাধের স্কুল টুকু কে ধ্বংস করতে।
নিশ্চল ভাবে চেয়ে থাকেন রথীন বাবু। এই স্কুল তার স্বপ্নের। অকৃতদার মানুষ। সারা জীবন প্রাইমারি স্কুলে পড়িয়ে এসেছেন। বরাবর ইচ্ছে ছিল বস্তির গরীব ,অভুক্ত মানুষ গুলোর জন্য কিছু করার। এরা বেশির ভাগ ই মেয়ে পুরুষ কাজে বেরিয়ে যায়। বাচ্চাগুলো সারাদিন এদিক ওদিক ঘুরে, নোংরা থেকে, খারাপ ভাষা, খারাপ কাজ করে বড় হয়। ভবিষ্যতে এদের ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসে আরো এক _ একটা কেলে মস্তান, ন্যাপা গুন্ডা।
তাও কাজ করবেন ভাবলেই কি করা যায়? প্রথম
দিকে এরা তাকে সন্দেহের চোখেই দেখত। একটা লোক বিনা কারণে তাদের ছেলে মেয়েদের পড়াবে,
বই খাতা পেন্সিল কিনে দেবে, ভাল করে মানুষ করার চেষ্টা করবে এটা বিশ্বাস যোগ্য ছিল না ওদের কাছে। সময় লেগেছে। একটু করে সবার বিশ্বাস , শ্রদ্ধা অর্জন করেছেন। সবার দোরে দোরে ঘুরেছেন সাহায্যের জন্য। পাঁচ বছরে একটু একটু করে বেশ ভালই সাড়া ফেলেছে তার পড়ানো। দু চার জন এই স্কুল থেকেই ভালো স্কুলে চান্স পেয়েছে। অনেক স্বপ্ন দেখেছেন রথীন বাবু। আরো বড় , ভালো করতে হবে। দরকার হলে তার ই মত দু একজন কে পড়ানোর ভার দেবেন। কথা ও বলেছেন কয়েকজনের সাথে।
সব শেষ। চারদিকে অসহায়ের মত দেখলেন একবার। কেউ নেই। ভালো সময় বেছেছে এরা।
জানে এই সময় কেউ থাকবে না। বস্তির সব লোক গুলোই কাজে বেরিয়েছে।
” চুপ কেন? থানায় যাবেন বলেছিলেন না? তো যান। ”
খি খি করে হেসে ওঠে একজন। ” তোমাকে দেখে দাদু বোমকে গেছে কেলে দা।”
“মটকা গরম করাবেন না দাদু। কাল থেকে একে ই কেলেদার মেজাজ ঠিক নেই। শালা ফুলির ঘরে অন্য লোক! ”
” এই চুপ বে। খালি বক বক। চল। কাজ খতম কর। জলদি কর।” ধমকে ওকে থামায় একজন।
” শোন । তোমরা বুঝে দেখো। বাচ্চারা এখানে পড়ে। স্কুলটা উঠিয়ে দিলে ওরা আবার সেই আগের মত রাস্তায় রাস্তায় ফ্যা ফ্য করে ঘুরে বেড়াবে। ওরা___” নিরূপায় হয়ে শেষ বারের মত বোঝাবার চেষ্টা করেন রথীন বাবু।
” তাতে আপনার কি? আপনি ফুটুন এখান থেকে। খালি ভাষণ।”
” এই ! চুপ! আর একটা বাজে কথা মাষ্টারমশাই কে বলেছিস তো গলা টিপে ধরব। ”
বাজ খাঁই গলার আওয়াজে চমকে তাকান রথীন বাবু। এ আবার কে!
” পিলু। ___ এখানে দাদাগিরি করতে আসিস না। এটা নরেশদার অর্ডার। ” হুমকি দিয়ে ওঠে কেলে।
” সে আমি নরেশ দা এলে বুঝে নেবো। আপাতত তোরা পাতলা হ এখান থেকে। ”
” তোর হুকুমে?”
” আলবাত শালা আমার হুকুম । ভালোয় ভালোয় যাবি না বেল্ট ধরব? ” নিজের কোমরের কাছে হাত নামায় পিলু।
” মস্তানি করছিস? নরেশ দত্তর লোকের সাথে পাঙ্গা নিচ্ছিস?”
” কেন ঝুট মুট ঝামেলা পাকাচ্ছিস? জানিস ই তো পিলুর যে কথা সেই কাজ। চলে যা এখান থেকে। আর তোদের নরেশ দত্তকে বলিস পিলু ভাগিয়েছে তোদের”
কয়েক পলক। চোখে চোখ! দাঁতে দাঁত! দুখানা শরীর যেন দুটো ঝলসানো বিদ্যুৎ! মুহুর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত একে অন্যের ওপর!
স্তম্ভিত চোখে চেয়ে দেখেন রথীন বাবু। কেলে মস্তানের গলার আওয়াজ যতই বড় হোক চোখের কোণে ভয়। এ কে? যেই হোক আপাতত এতটুকু স্পষ্ট যে এরা ভয় করে লোকটাকে। কেমন দিব্যি হুকুম করছে !
” না। না। অমনি চলে গেলে হবে না। ঘরে জিনিস গুলো তোল সব। হ্যাঁ। চেয়ার, টেবিল, বেঞ্চ সব। “
তুলছে ওরা। একে একে সব। হাসছে বাচ্চারা। একে একে গিয়ে বসছে ওদের নির্দিষ্ট জায়গায়। এবার তাকেও যেতে হয়। কিন্তু এই অহেতুক করুনা করল যে জন তাকে কি বলে ধন্যবাদ দেবেন রথীনবাবু। আর এই করুণার কারণ টাই বা কি? কিছু উদ্দেশ্য নিশ্চয় আছে। সেটা না জানা অব্দি স্বস্তি পাচ্ছেন না মনে।
” আসুন মাস্টার মশাই। কোন ভয় নেই। পিলু থাকতে আপনার এই স্কুল বন্ধ হবে না। নিশ্চিন্ত থাকুন। চলি।”
চলে যাচ্ছে যে। আকুলি বিকুলি করে ওঠেন রথীন বাবু। কিছুই তো জানা হল না। কে লোকটা? এত দয়ার কারণই বা কি! বিনিময়ে কি চায়?
” আপনার পরিচয় টা?”
যেতে যেতে থমকে দাঁড়ায় পিলু। তারপর ফিরে তাকায়।
” আমাকে চিনতে পারেন নি মাস্টার মশাই? সারদা প্রাইমারি স্কুলে আপনার ছাত্র ছিলাম। প্রলয় আমার নাম। মনে নেই আপনার। থাকার কথাও নয়। খুব খারাপ ছাত্র ছিলাম। পড়াশুনা করতাম না। অন্যদের জ্বালাতাম। ক্লাসে বিরক্ত করতাম।পরীক্ষায় গোল্লা পেতাম। আপনি অনেক চেষ্টা করেছিলেন আমাকে শোধরানোর। পারেন নি। আর তাই আজ ____
আমি অনেক দিন আগেই দেখেছি আপনি এদের মানুষ করার চেষ্টা করছেন। আমার তো আর কিছু হল না।। যদি এই বাচ্চা গুলোর হয়। আপনি দেখুন স্যার। আমি আছি আপনার পেছনে। কোন অসুবিধে হবে না। ওরা আর আসবে না। আমাকে ওরা ঘাঁটাবেনা। চলি স্যার। ”
তাকিয়ে থাকেন রথীন বাবু। তাকিয়ে থাকেন তার প্রাক্তন ছাত্রের চলে যাবার পথের দিকে। এক মৃদু হাসি ফুটে ওঠে তার মুখে। পিলুর কি মনে আছে আজ শিক্ষক দিবস? বুঝল কি আজকের দিনে কি অসাধারণ গুরুদক্ষিণা সে দিয়ে গেলো তার পুরনো বৃদ্ধ মাষ্টারমশাই কে? জানল কি পরীক্ষায় বরাবর গোল্লা পেলেও আজ সে তার মাষ্টারমশাই এর কাছে জীবনের আসল পরীক্ষায় ফুল মার্কস পেয়ে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করে গেল? একেবারে একশো য় একশো।
—oooXXooo—
![]()







