অবশেষে
সলিল চক্রবর্ত্তী
স্ট্যান্ড রোড থেকে আহেরীটোলা গঙ্গার ঘাট অবদি আসতে অভিজিতের মিনিট পাঁচ ছয় সময় লাগে। বিকাল পাঁচটায় অফিস ছুটির পর অভিজিৎ গঙ্গার ধারে এই বট গাছটার নীচে এসে বসে থাকে। হালকা খিদে বাদাম ভাজা মুড়ি মাখা দিয়ে চালিয়ে নেয়, ফেরিওয়ালার থেকে চা-টাও পেয়ে যায়। থাকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত। একাই বসে গঙ্গার হালকা ঢেউ গোনে, আর গঙ্গার ঘাটে বৈকালিক কর্মকান্ড দেখে। গঙ্গার ঘাটে অভিজিতের যে দৃশ্যটি সবথেকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে সেটা হল – নৌকা বিহার , কত কাপেল আসে, নৌকা ভাড়া করে গঙ্গাবক্ষে চলে যায়। দেখে মনে হয়, এই কাপেলদের মধ্যে বেশির ভাগই ভাড়া করা, অল্প কিছু প্রণয় ঘটিত সম্পর্ক। এইসব দেখে অভিজিতের নিজের কাছে নিজেকে বোকাবোকা লাগে। নিজের শিক্ষাদীক্ষা জলাঞ্জলি দিয়ে ভাবতে ইচ্ছা করে – জীবনটাকে উপভোগ করতে গেলে স্বার্থপরতাই শ্রেষ্ঠ পথ। দেখা,ভাবা,আর চা বাদাম খেতে খেতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। তারপর সোজা বাড়ি ফেরে। ছুটি ছাড়া এটাই তার তিনশ পঁয়ষট্টি দিনের রুটিন। বন্ধু বান্ধব আছে, কিন্তু সে নিজেই আর যোগাযোগ রাখে না। কারণ তারা সব সংসারী।
একটা সময় সে ভাবেইনি যে এই দিনটা তার জীবনে আসবে। দুই ভাই, অভিজিৎ ছোট, পড়াশোনাতে মেধাবী,খেলাধুলায় পারদর্শী। অভিজিৎ যখন কলেজে পড়ে তখন ওর দাদার বিয়ে হয়ে যায়। বৌদি বড় চাকুরে। বছর খানিক পরে পরিবারে একটা ফুটফুটে কন্যা সন্তান আসে। ঠিকঠাকই চলছিল, কিন্তু সংসারের নিয়ম এক ছন্দে চলে না, ছন্দপতন ঘটল বাবার মৃত্যুর পর।
শিক্ষাপর্ব শেষ করে অভিজিৎ তখন একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ করছে। মাহিনা কম হলেও চলে যাচ্ছিল।
একদিন রাত্রে খাওয়ার টেবিলে দাদা মাকে বলল, তার মেয়ে বড় হয়েছে , প্রাইভেট টিউটর আসে, তা ছাড়া ওর একটা নিজস্বতাও আছে। ফলে একটা ঘরে সমস্যা হচ্ছে। মা তো সিঙ্গল, যদি কিচেন লাগোয়া কামরাতে মা শিফট করে তবে ওই ঘরটা মেয়ে ব্যাবহার করতে পারে। মমতাময়ী মা হেসে বললেন-” ও ভাবে বলছিস কেন! তোর মেয়ে কি আমার কেউ নয়! আমি একা মানুষ কি হবে আমার এত বড় ঘর!” অভিজিৎ খুব প্রয়োজন ছাড়া বাড়িতে তেমন কথা বলে না। এমনিতেই মায়ের সাথে বৌদি যে বিহেভ করে তা অভিজিতের পছন্দ নয়। ওর মতে এই বাড়ী বাবার তৈরী, তাঁর অবর্তমানে মা-ই সব। দাদা নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে মায়ের কাছে তার সমস্যার কথা বলতে পারত। সে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে মাকে থামিয়ে দাদাকে উদ্দেশ্য করে জানায় যে সেটা সম্ভব নয়। ফাঁকা জায়গা তো আছে, প্রয়োজন হলে ঘর করে নাও। সেদিন আর কথা এগোয়নি, দাদা বৌদি মুখ ভার করে ডিনার টেবিল ছাড়ে।
প্রতিটা সচেতন মানুষের একটা বড় সমস্যা হল, আপন জনের সাথে কলহ করতে পারেনা। পরাজিত হলে মনটা খচখচ করে, অপরাজিত হলেও মন খচখচ করে, অর্থাৎ আত্মগ্লানি থাকবেই। অভিজিতেরও একই অবস্থা হল। খাওয়ার টেবিলে দাদা বৌদির আশাহত মুখ দুখানি দেখে মনটা খচখচ করছিল। মেয়ে বড় হয়েছে, সমস্যা যে হচ্ছে এটা তো মিথ্যা নয়। যাইহোক পরের দিন রাত্রে ডিনারে এসে অভিজিৎই উপজাজক হয়ে দাদাকে জানায় যে সেও তো একা, ফলে কিচেন লাগোয়া কামরাতে সেই চলে যাবে। সংসারে যে যত ত্যাগ করবে সে তত ভাল। ব্যাস এক নিমেষেই বরফ গলে জল।
কেটে গেল আরও কয়েক বছর। অভিজিতের বয়স বাড়ছে। অভিজিতের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে অভিভাবক দাদা কখনো কোন কথা তোলে না। অভিজিৎ তো নিজের কথা বলতে পারে না। ফলে ওর মা একদিন দাদার কাছে বিয়ের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে। দাদা মাকে নিরাশ করে জানায় যে, অভিজিৎ সামান্য রোজগার করে,মুদি দোকানের টাকাটা দিতেই ওর ত্রাহি ত্রাহি রব ওঠে, এর উপর বিয়ে! আসলে দাদার হিসাব আলাদা, সে যে অনেক গভীর জলের মাছ। ভাইয়ের বিয়ের উদ্যোগ নিলে দায়টা যে তার ঘাড়ে এসে পড়বে, সেটা সে বিলক্ষণ জানে। প্রথমত এই মুহূর্তে একটা ঘর করতে হবে। দ্বিতীয়ত যৌথ সংসারে একজন মানুষ বাড়া মনে আর্থিক চাপ তার উপর এসে পড়বে। এছাড়া লোক লৌকিকতা তো আছেই। অভিজিতের মা তার বড় ছেলের মতিগতি বুঝে ঠিক করে নিলেন, যা করার ওনাকেই করতে হবে।
মোনালিসাকে অভিজিৎ আজও ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। সে যে ঠিক কি চায় তাও অভিজিতের কাছে ধোঁয়াশা। এটা ঠিক যে সে ভাল একটা চাকরি করেনা, কিন্তু মোনালিসা তো ছোটখাটো একটা কাজ করে,দুজনে ঠিক চালিয়ে নিত। তবুও বিয়ের কথা বললে মোনালিসা তেমন আগ্রহ দেখায় না। একটা ছাড়াছাড়া ভাব। বন্ধু বান্ধবীরা একেএকে সংসারী হয়ে যাচ্ছে। সে ভেবেছিল মোনালিসার বাড়ি থেকে ওর বাবা মা এসে বিয়ের ব্যাপারে কথাবার্তা বলবে। কিন্তু তেমন কোন লক্ষণ দেখছে না। আবার বাড়ীতেও নিজের বিয়ের প্রস্তাব নিজে উত্থাপন করতে পারছেনা।
অভিজিতের বন্ধু কাম ফিলজফার একজন আছে, মোড়ের মাথার পান, বিড়ি, সিগারেটের দোকানদার, সদু রায়। চব্বিশ ঘন্টায় চোদ্দ ঘন্টা দোকান খুলে রাখে। দুনিয়ার লোকের সমস্যার সমাধান সূচক বুদ্ধি যোগায়। নিজে কোন নেশা না করে সারা জীবন নেশার জিনিস বিক্রি করে গেল। কেউ যদি নেশা নিয়ে প্রশ্ন করে,তাকে থামিয়ে দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে-” বলত রিভলবারের আবিস্কারক স্যামুয়েল কোল্ড কতগুলো মানুষ খুন করেছেন? কথায় আছে না ‘মদআলা মদ বেচে দুধ খায়, আর দুধআলা দুধ বেচে মদ খায়’। আসলে ইচ্ছেটা একেবারেই নিজস্ব।”
এমনি মানুষ সদু রায়, এনার দোকানে যারা এসে দাঁড়ায় তারা যে সব খরিদ্দার তা কিন্তু নয়, এদের মধ্যে কিছু মানুষ আসে সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজতে। অভিজিৎ সদু রায়ের থেকে বয়সে অনেক ছোট, কিন্তু মেশে বন্ধুর মতো। অফিস থেকে ফিরে সদু রায়ের পানের দোকানে এসে ঘন্টা খানিক দাঁড়ায়। ভালোমন্দ গল্পগুজব করে বাড়ী ফেরে। অভিজিৎ তার সব কথা সদু রায়কে বলে। চলেও সদু রায়ের বুদ্ধিতে।
প্রতিদিন রাতে খাওয়ার পর অভিজিৎ মায়ের সাথে ঘন্টা দুই গল্প করে। অবিবাহিত পুরুষের কাছে মাই সব। সুখ, দুঃখের আশ্রয়স্থল মায়ের আঁচল। সেদিনও শোয়ার আগে মায়ের সাথে গল্পগুজব করতে করতে মা অভজিতের বিয়ের কথা তোলেন। অভিজিৎ একটু ইতস্তত করে বলে-” খাচ্ছি তো মা তাঁত বুনে ,আবার এড়ে গরু কিনে লাভ কি!” মা অভিজিৎকে বোঝান- “সকল জীবনের তো একটা নিয়ম আছে। বেনিয়ম হতে নেই তাহলে পরে ফল ভুগতে হয়, তোর তো বয়স হচ্ছে, আমি মা হয়ে কি করে চুপ করে বসে থাকি বল!” অভিজিৎ আসল কথা মাকে বলতে পারছেনা, যে মোনালিসা নিজেই বিয়ের ব্যাপারে আগ্রহি নয়। একটু সময় চুপচাপ থেকে বলল-” তোমার উপর বৌদির নজর তো দেখছি, আবার আর একজন এসে কি করবে তার ঠিক নেই, তখন আমার ‘শাঁখের করাত’ অবস্থা হবে।” মা অভজিতের কথা হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেন-” এখনকার চাকরি করা বউরা সংসারের সবদিকে অত নজর দিতে পারে নাকি, অত ধরতে গেলে সংসারে শান্তি থাকেনা। কেনরে তোরও কি চাকরি করা মেয়ে পছন্দ করা আছে নাকি! থাকলে একদিন বাড়ীতে নিয়ে আয়, আমি গড়েপিটে আমার মত করে নেব।”
সেবার জামাইষষ্ঠীতে দাদা বৌদি বাড়িতে না থাকায় মোনালিসকে অভিজিৎ তাদের বাড়িতে আনে।অভজিতের মা খুব খুশি হন, কিভাবে আপ্যায়ন করবেন ভেবে পাচ্ছেন না।এদিকে অভিজিৎ খেয়াল করছে, মোনালিসা মাকে যতটা না গুরুত্ব দিচ্ছে, তার থেকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বাড়ীর পরিবেশ পরিস্তিতিটা বুঝে নিতে। অভিজিতের বেডরুম যে কিচেন লাগোয়া কামরাটি, সেটি দেখে মোনালিসার চোখমুখের অভিব্যক্তি একেবারেই না পছন্দ বুঝিয়ে দিল।অভিজিতের মা সেটি খেয়াল করে বললেন-” বিয়ের পর তুমি থাকবে আমার ঘরে, আমি একা মানুষ এত বড় ঘর কি করব! কামরাতে আমি থাকব।” অভিজিৎ মাকে বাধা দিতে গিয়েও কিছু ভেবে চুপ করে গেল।
রাস্তায় বেরিয়ে মোনালিসাকে চুপচাপ থাকতে দেখে অভিজিৎ কিছু অনুমান করে বলল-” তুমি ঘর নিয়ে কিছু ভেব না, ও প্রবলেমটা ঠিক সলভ হয়ে যাবে।”
মুশকিল আসান সদু রায়ের পানের দোকান। অভিজিৎ তার কাছে গিয়ে সমস্ত ঘটনা বলল। সঙ্গে এও জানাল, মাকে তাঁর ঘর থেকে বার করতে পারবেনা। সদু রায় অভজিতের মাতৃভক্তি দেখে ভীষণ খুশি হয়ে বললেন-” তুমি মাকে এত শ্রদ্ধা কর আর তোমার একটা হিল্লে হবেনা তাই আবার হয় নাকি! তুমি একটা কাজ কর, কামরাটাকে ভেঙে বড় ঘর বানিয়ে নাও, ব্যাস কেল্লাফতে।” অভিজিৎ মাথায় হাত দিয়ে বলে-” ওরে বাবা সে অনেক টাকার ব্যাপার, যেটুকু গচ্ছিত আছে বিয়েতে লাগবে না? তুমি অন্য কোন প্লান দাও।” সদু রায় একটু মাথা চুলকে বলল-” তোমার তো কামরা আছে ,অর্থাৎ হাফ আছে, আর হাফ করতে হবে।” সদু রায় সঙ্গেসঙ্গে এক রাজমিস্ত্রীকে ফোন করে কথা বলে নিল। কমপ্লিট পঞ্চাশ হাজারের মত খরচ আছে। তারপর এক পরিচিতকে ফোন করে টাকার কথা বলল। ফোনে কথা শেষ করে বলল-” ব্যাস, আর চিন্তা নেই, এক সপ্তাহের মধ্যে হাতে টাকা এসে যাচ্ছে। টাকাটা রাজ মিস্ত্রির হাতে দিয়ে দেব, ও এক মাসের মধ্যে ঘর কমপ্লিট করে দেবে। তুমি শুধু চার বছর ধরে আমার হাতে প্রতি মাসে দেড় হাজার টাকা দিয়ে যাবে। কি পারবে না?”
” খুব পারব দাদা।” অতি আনন্দে অভিজিৎ উত্তর দেয়। উত্তর শুনে সদু রায় বলে-” যাও বিয়ের পিঁড়িতে বসার জন্য তৈরী হও। বয়স তো হয়েছে, আর কত দেরি করবে! ছেলেপুলে মানুষ করতে হবে না?” অভিজিৎ মনে একটা নতুন উদ্যম নিয়ে বাড়ী ফিরল।
মোনালিসা অভিজিতের দেখা হয় কম, ফোন চ্যাটেই যোগাযোগ রাখে। ঘর প্রায় কমপ্লিট। অভিজিৎ সারপ্রাইস দেবে বলে মোনালিসাকে কিছুই বলেনি। ঠিক করেছে, মাকে নিয়ে মোনালিসাদের বাড়িতে গিয়ে বিয়ের দিনক্ষণ কনফার্ম করে আসবে। শুধু মোনালিসাকে ফোনে মেসেজ করে, ‘আগামী রবিবার তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।’
রবিবার সকালে ঘুম থেকে উঠেই অভিজিৎ ঠিক করল মোনালিসাকে ফোনে মেসেজ পাঠাবে যে, আজ বিকালে সে মাকে নিয়ে তাদের বাড়ীতে যাচ্ছে। ফোনের নেট কানেকশন অন করতেই দেখল মোনালিসার একটা মেসেজ ঢুকেছে। অতি উৎসাহে মেসেজটা ওপেন করতেই দেখল—
অভিজিৎ, অনেক ভেবেচিন্তে আমি এই সিদ্ধান্তে আসলাম। দেখ বিয়েটা আবেগের নয়,বাস্তবতার। আমাদের মধ্যে প্রথম থেকেই যদি অর্থনৈতিক সমস্যা শুরু হয়, তার হাত ধরেই আসবে মানসিক সমস্যা। এডজাস্টমেন্ট যখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকাবে, তখন সম্পর্ক ব্রেকাপ হতে বাধ্য। তাছাড়া তোমার মায়ের কাছে তোমার দাদা বৌদির বিহেভ যা শুনলাম, তাতে মনে হয় উনি আমৃত্যু আমাদের ভরসায় থাকবেন। আমি সামান্য রোজগার করি ঠিকই, তবে সেতো আমার পার্সোনাল খরচের জন্য। ফলে আমি ছবির মত দেখতে পাচ্ছি, তোমার অর্থনৈতিক অবস্থার উপর ভরসা করে বিয়ে করলে বিবাহ পরবর্তী জীবন কতটা দুর্বিসহ হতে পারে। সেইজন্য সম্পর্কটা এখনই ব্রেকাপ করলে ভবিষ্যতে দুজনেই ভাল থাকব। আমার খুব খারাপ লাগলেও বলতে বাধ্য হচ্ছি, তুমি আমার সাথে আর যোগাযোগ কোরনা।
মোনালিসা
মেসেজটা পড়ে অভিজিৎ চুপ করে খানিকক্ষণ বসে থাকল। সে কখনও ভাবতে পারেনি এই ভাবে একটা সম্পর্ক ব্রেকাপ হয়ে যেতে পারে। এক কাপ চা হাতে করে ওর মা এসে বললেন-” আমরা যে আজ মোনালিসাদের বাড়ীতে যাব ওদের সেটা জনিয়েছিস?” অভিজিৎ চায়ের কাপটা মায়ের হাত থেকে নিয়ে শান্ত ভাবে বলল-” সম্পর্কটা মোনালিসা ব্রেকাপ করে দিয়েছে।” ওর মায়ের ফোন করে সমস্যা সমাধানের একটা ইচ্ছা ছিল,কিন্তু অভিজিৎ সেটা করতে দেয়নি। কারণ ওর বিশ্বাস জোর করে কোন সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায়না।
মা রণে ভঙ্গ দেন। অভিজিতের সদুদা সমস্ত ঘটনা শুনে বলে-” দেখ অভিজিৎ, সবকিছু শুনে আমার মনে হচ্ছে, মেয়েটি যা করেছে ঠিকই করেছে। মেয়েটি ভীষণ সেলফ সেন্টার মেন্টালিটি। বিয়ে হলে তোমাকে সারা জীবন জ্বলতে হত। মনে রাখবে নিজের জন্যে ভোগ সহ্য করা যায়, কিন্তু অপরের জন্যে ভোগান্তি জীবনকে দুর্বিসহ করে তোলে।”
এই ভাবে দুটো বছর কেটে যায়। একে অভিজিতের মায়ের বয়স হয়েছে, তারপর অভিজিৎকে নিয়ে চিন্তায় চিন্তায় তিঁনি এখন হাই সুগার রুগী। অভিজিৎ অফিস আর মায়ের সেবা শুশ্রূষা করতেই বছর খানিক কাটিয়ে দেয়, কিন্তু মাকে ধরে রাখতে পারেনি। তার মা অনেক হতাশা, আক্ষেপ, অপূর্ণ আশা বুকে নিয়ে পরপারে পাড়ি দিলেন। মায়ের মৃত্যুটা অভিজিৎ কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলনা। মা যেন সর্বদাই তার পাশেপাশে আছে, এই ভাবনাটা জাগ্রত রাখতে সে এক অভিনব পন্থা বার করল। মায়ের ঘরটা মায়ের আত্মার জন্য বরাদ্দ রাখল। তাঁর রেখে যাওয়া ব্যবহৃত দ্রব্য গুলো দিয়ে ঘরটা টিপটপ করে সাজাল। খাটে বিছানা পেতে তার মধ্যে মায়ের একটা বড় ফটো রাখল। অভিজিৎ যখনই খায় মাকে দিয়ে খায়। দাদার মতে এটা মেন্টালি ডিসবাল্যান্স। তিঁনি মৃদু আপত্তি তুলেছিলেন, কিন্তু ওই পর্যন্তই, ঘরের অধিকার যে ভাইয়েরী সেটা তিঁনি বিলক্ষণ জানেন।
সদু রায় তখন বুঝল, যখন অভিজিৎ সদু রায়ের কাছে তার মায়ের আত্মার উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা শুরু করল। সদু রায় বুঝল অভিজিৎ অবিবাহিত, ওর সতন্ত্র নিজস্ব কোনো পরিসর তৈরী হয়নি, মা-ই জীবনে সবকিছু, সেই জন্য এই মতিভ্রম। তিঁনি অভিজিৎকে বললেন-” দেখ, মা বাবা কারোর চিরকাল বেঁচে থাকে না। সবার যা হয়, তোমারও তাই হয়েছে। যেহেতু তোমার স্ত্রী সন্তান নেই, ফলে বাড়িতে প্রবেশ করলে তোমার মায়ের স্মৃতি জাল বিস্তার করছে। এইভাবে তুমি তো অসুস্থ হয়ে পড়বে! তুমি বরং যতটা সম্ভব বাইরে সময় কাটাও। রাত করে ঘরে ফের, খাওয়া দাওয়া করে শুয়ে পড়। শরীর ক্লান্ত হয়ে থাকে, তাড়াতাড়ি ঘুম এসে যাবে।”
সেই থেকে অফিস ছুটির পর অভিজিৎ গঙ্গার ধারে দুই ঘন্টা বসে থাকে। বাড়ীতে ঢোকার আগে সদু রায়ের দোকানে ঘন্টা খানিক আড্ডা মারে। তারপর একটু বেশি রাতে বাড়ী ঢুকে ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দাওয়া করে শুয়ে পড়ে।
![]()







