পথচলাই জীবন
নবকুমার চক্রবর্ত্তী ( নবু )
“এক যাযাবর আখ্যান”
সল্টলেকের সেক্টর ফাইভের সেই আকাশচুম্বী কাঁচের কঙ্কালগুলোর ঠিক পেছনেই একটা মস্ত পোড়ো জমি আছে। ওপাশে নিউটাউনের ফ্লাইওভারটা একটা বিশালাকার অজগরের মতো এঁকেবেঁকে চলে গেছে দিগন্তের দিকে। এই বৈপরীত্যটা বড় অদ্ভুত— একপাশে আইটি সেক্টরের বিলিয়ন ডলারের ঝকঝকে স্বপ্ন, আর অন্যপাশে কয়েকটা ছেঁড়া-খোড়া নীল প্লাস্টিকের তাবু। এ যেন সভ্যতার চকচকে পিঠে গজিয়ে ওঠা একটা কুৎসিত জন্মদাগ।
অফিসের ঘানি টানা মরা রোবটিক কাজ শেষ করে সেদিন চশমাটা নাক থেকে নামিয়ে ওদিকেই হাঁটছিলাম। পকেটে একটা পুরনো ফাউন্টেন পেন— যেটা মাঝেমধ্যে কালি উগড়ে দিয়ে মনে করিয়ে দেয় যে কলম আর কপাল, দুইই লিক করতে পারে। ঠিক তখনই দেখা হলো মানুষটার সাথে। নাম সুরুজ সর্দার। বয়স সত্তর না সাতাশি, বোঝা দায়। রোদে পোড়া চামড়ায় বয়সের রেখাগুলো যেন এক একটা ফাটা মাটির মানচিত্র, যেখানে কোনো গন্তব্য লেখা নেই।
সুরুজ বসে ছিল তার ঝুপড়ির সামনে। এক পাশে সাদে মেশান তামাটে রঙের একটা হাড় জিরজিরে কুকুর তার পায়ে মাথা গুঁজে ঘুমাচ্ছে। আমাকে দেখে ফোকলা দাঁতের এক চিলতে হাসি ছুঁড়ে দিল সে— যে হাসিতে আনন্দ নেই, আছে কেবল বহু ঘা খাওয়া মানুষের পলিটিক্যাল কারেক্টনেস।
“বাবু, সাপের খেলা দেখবেন? এখন আর কেউ দেখতে চায় না। সবাই তো এখন ওই হাতের তালুর সমান বাক্সের ভেতর সাপ-খোপ নিয়ে ঘোরে।”
আমি দাঁড়ালাম। বললাম, “সাপ কোথায় সুরুজ? ও তো এখন আইন করে নিষিদ্ধ।”
সুরুজ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, যাতে মিশে ছিল বহু বছরের ধুলো। “ঠিকই ধরেছেন। সাপ এখন কফিনে বন্দি। বন দপ্তরের ভয় আছে, আবার পেটেরও তো টান। এই যে বাক্সটা দেখছেন, এর ভেতরে এখন সাপ নেই, আছে কিছু ভেষজ শিকড় আর বাতের তেল। লোকে বলে জাদুকরী ওষুধ, আসলে সবটাই হলো অন্ধবিশ্বাসের কিস্তি কিস্তিতে কেনাবেচা।”
ঠিক তখনই ঝুপড়ির ভেতর থেকে একজন বেরিয়ে এল। পরনে উগ্র লাল রঙের শাড়ি, উপচেপরা যৈবন, চোখে চড়া কাজল— যেন কোনো বিদেহী আত্মা সস্তায় মেকআপ করেছে। নাম তার মুক্তা। সুরুজের মেয়ে। ওর দিকে তাকালে বোঝা যায়, জীবনটা ওর কাছে একটা যুদ্ধের ময়দান। মুক্তার হাতে একটা সস্তা স্মার্টফোন, কিন্তু তার চোখে সেই আদিম যাযাবরদের তীব্র শিকারি দৃষ্টি। একজন পাকা অভিনেত্রীর মত রঙিন ঠোঁটের কোনায় লেগে থাকা হাঁসি।
মুক্তা আমার দিকে তাকিয়ে সরাসরি বলল, “বাবু, দাঁত তোলাবেন? বাতের মালিশ নেবেন? নাকি ভাগ্য জানবেন?”
ওর কণ্ঠস্বরে কোনো মিনতি নেই, বরং একটা অদ্ভুত অধিকার বোধ আছে। এই বেদে সম্প্রদায়ের মেয়েরাই আসলে ঘরহীন সংসারের খুঁটি। পুরুষরা তাবুর মায়া কাটায় না, কিন্তু মেয়েরা ঝুলি কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে অনিশ্চিত পথে। কখনো স্টিলের বাসন বিক্রি করে, কখনো পাড়ার গিন্নিদের ভুলিয়ে তাদের পুরনো কাপড় হাতিয়ে নেয়। আর দিনশেষে যখন পেট ভরে না, তখন তারা নিজেদের শরীরটাও বাজারে নামিয়ে দেয়। কারণ এদের কাছে ক্ষুধার চেয়ে বড় কোনো নীতিশাস্ত্র বা ইশতেহার নেই। এর জানে তাঁবুতে ফিরতে হলে টাকা নিয়েই যেতে হবে। না হলে কালকের খাওয়া জুটবে না।
সুরুজ একটা বিড়ি ধরিয়ে বলতে শুরু করল, “জানেন বাবু, আমাদের কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। আজ এখানে, তো কাল হয়তো ধর্মতলার কোনো ফুটপাতে। আমাদের রক্তে আছে হাঁটা। আমরা যদি এক জায়গায় থিতু হই, তবে আমাদের দেবতারা রাগ করেন। ওই যে দেখছেন আকাশটা— ওটাই আমাদের ছাদ। আর ওই যে পিচের রাস্তা— ওটাই আমাদের আয়না। আর একটু গাছের ছায়া যেখানে শীতল বাতাস তার মার্জি মাফিক খেলে বেড়ায়।”
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে, কুয়াশাটা হঠাৎ ঘনীভূত হয়ে উঠল। সুরুজের কথার মাঝখানে একটা ম্যাজিক রিয়েলিজম কাজ করল যেন। ও হুট করে একটা ছোট বাঁশি বের করে বাজাতে শুরু করল। ওটা সাপুড়ের বিন নয়, বরং এক বিষণ্ণ হাহাকার। সল্টলেকের সেই কৃত্রিম আলো আর এসির শব্দ যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। ঠিক তখনই অন্ধকারের ভেতর থেকে এক জোড়া পা ভেসে উঠল। এক গাছি সরু দড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে আসছে একটা বাচ্চা মেয়ে। উচ্চতা বড়জোর পাঁচ ফুট। হাতে একটা বাঁশের লাঠি। ওটা সুরুজের নাতনি— বকুল।
সুরুজ নিচু গলায় বলল, “দেখছেন তো? ওটা শুধু খেলা নয় বাবু, ওটা বেঁচে থাকার লড়াই। ওই সরু দড়ির নিচে আছে খিদের গর্ত। একবার ভারসাম্য হারালে শুধু হাড় ভাঙবে না, জ্যান্ত কবর হবে। ওর শরীরটা এখন নরম, তাই ওই দড়ির ওপর নাচছে। আর কদিন পরে ওর শরীর যখন পেকে যাবে, তখন ওকেও মুক্তার মতো অন্য দড়িতে নাচতে হবে— তবে সেটা তাবুর ভেতরে, কোনো শৌখিন ভদ্র খদ্দেরের লালার নিচে।”
মুক্তা হঠাৎ আমার হাতের কাছে এসে নিচু গলায় বলল, “বাবু, বিকেলে অনেক শৌখিন ভদ্রলোক আসে এখানে। আমাদের মেয়েরা তখন সেজেগুজে বেরোয়। সমাজ আমাদের দিনের আলোয় ঘৃণা করে, আর অন্ধকার হলে ওই প্যান্টের চেইন খুলে আমাদের কাছেই নিজেদের হারানো পুরুষত্ব খোঁজে। আমরা শরীর বেচি না বাবু, আমরা আসলে ওই তথাকথিত ভদ্রলোকদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা পশুটাকে একটু ঘাস-জল দিই।”
রাত বাড়ার সাথে সাথে কুয়াশা যেন আরও জমাট বাঁধল। সুরুজ হঠাৎ একটা গল্প শুরু করল— যাযাবরদের এক প্রাচীন অভিশাপের কাহিনী।
“জানেন বাবু, যে রাতে আমরা এক জায়গায় বেশিদিন থেকে যাব, সেই রাতে আমাদের রক্ত ঠান্ডা হয়ে যাবে।”
আমি ভাবলাম এটা নিছক গল্প। কিন্তু পরমুহূর্তেই পোড়ো জমির ওদিক থেকে চার-পাঁচজন যুবক এল। তাদের পরনে দামী জিন্স আর জ্যাকেট। তারা মুক্তার তাবুর দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাল। সুরুজ বাধা দিল না। ও শুধু ওর হুকোর ধোঁয়া ছাড়তে লাগল।
আমি স্তম্ভিত হয়ে বললাম, “সুরুজ, তুমি বারণ করছ না কেন?”
সুরুজ ম্লান হাসল। “ওরা বাইরে থাকে শিক্ষিত বাবু, কিন্তু ভেতরে ওরা আমাদের পোষা কুকুরের চেয়েও অবুঝ। খিদের কোনো জাত নেই, আর কামনার কোনো আধার কার্ড নেই। মুক্তা আজ রাতে ‘রাণী’ সাজবে। ওই ছেলেদের পকেট থেকে যা খসাতে পারবে, তা দিয়েই কাল আমাদের চাল কেনা হবে।”
এর পরে যা ঘটল, তা কোনো যুক্তিতে ব্যাখ্যা করা যায় না। একটা হিমশীতল স্রোত আমার মেরুদণ্ড দিয়ে নেমে গেল। যুবকেরা যখন মুক্তার তাবুর ভেতরে ঢুকল, হঠাৎ একটা তীব্র চিৎকার ভেসে এল। কিন্তু ওটা মানুষের চিৎকার নয়। ওটা যেন হাজার হাজার সাপের একযোগে গর্জন।
আমি এগোতে গেলাম, কিন্তু সুরুজ আমার হাত ধরে ফেলল। ওর হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা।
“যাবেন না বাবু। পর্দা খুললে আপনি যা দেখবেন, তা সহ্য করার ক্ষমতা আপনার নেই। আপনি কি জানেন, আমাদের মেয়েরা যখন প্রথম শরীর বিক্রি করে, তখন তাদের শরীরে এক বিশেষ ধরণের শেকড়ের রস ঘষে দেওয়া হয়? ওটা ওদের চামড়াকে পাথর করে দেয়। শহুরে মানুষ যতই তাদের কামান্ধ শরীর আমাদের মতো মেয়েদের শরীরে মিশিয়ে দিক, আমাদের অনিচ্ছায় কোনো ভ্রূণের জন্ম হবে না। আর যারা ওদের ছোঁয়, তাদের ভেতরে এক নীল বিষ ঢুকে পড়ে। ওরা ঘরে ফিরে গিয়ে বউয়ের ঠোঁটে চুমু খাবে ঠিকই, জমে থাকা গরলটা স্থানান্তর করবে, তারপর ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। দিন শুরু হবে, দিন শেষ হবে— আর তারা তিল তিল করে শেষ হবে ওদের সেই সাজানো বাগানে।”
আমি আর সুরুজের কাছে দাঁড়ালাম না। আমার ভেতরটা কেমন যেন গুলিয়ে আসছিল। পাকস্থলী বেয়ে একটা ঠাণ্ডা পিত্তরস গলার কাছে উঠে আসতে চাইছে। আমি দৌড়াতে শুরু করলাম মূল রাস্তার দিকে। পেছনে ফেলে এলাম সেই কুয়াশায় মোড়ানো নীল তাবু, সুরুজ সর্দারের সেই দাঁত-বের-করা বিষণ্ণ, হিংস্র হাসি আর বকুলের সেই প্রেতচ্ছায়ার মতো নগ্ন নাচ। শীতের গভীর কুয়াশায় বকুলের শরীরটা যেন কোনো প্রাচীন, অভিশপ্ত উপজাতির অবিনাশী প্রতীক হয়ে উঠেছিল। আমি দৌড়াতে দৌড়াতে ভুলে গেলাম আমার নাগরিক সাহিত্য, আমার তথাকথিত ভদ্রতার প্লাস্টিক মুখোশ।
আমি শুধু মেরুদণ্ড দিয়ে বুঝতে পারলাম— ওই বুনো ঘাসগুলোর শিকড় আমাদের আধুনিক কংক্রিটের চেয়েও অনেক গভীরে প্রোথিত। আমাদের আইডেন্টিটি কার্ড আছে, প্যান কার্ড আছে, নাগরিকত্বের অহংকার আছে; কিন্তু ওদের আছে এই পৃথিবীর আদিম অধিকার, যা কোনো রাষ্ট্রীয় সিলমোহর দিয়ে মাপা যায় না। ওদের এই যাযাবর অস্তিত্ব আসলে আমাদের তথাকথিত সভ্যতার এক অন্ধকার, ঔপনিবেশিক ইতিহাসের জীবন্ত কঙ্কাল, যাকে আমরা প্রগতির নামে মাটির নিচে চাপা দিতে চেয়েছি।
পরদিন সকালে যখন ভোরের আলো ফুটল, আমি আবার সেই জায়গায় গেলাম। কিন্তু সেখানে কিছুই নেই। কোনো তাবু নেই, উনুনের ছাই নেই। চারিদিক কেমন ধোঁয়াটে, যেন কোনো এক অদৃশ্য জাদুকর রাতের সব অপরাধ ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিয়েছে। সেখানে শুধু পড়ে আছে একটা জং ধরা টিনের বাক্স আর একটা ছেঁড়া লাল ফিতে— যেটা হয়তো মুক্তার চুলে ছিল, নয়তো আমাদের মতো সভ্য মানুষদের ফেলে যাওয়া কোনো মরা স্বপ্নের শেষ স্মৃতি।
সবচেয়ে অদ্ভুত, মেঠো আলটাও যেন ভোজবাজির মতো উধাও হয়ে গেছে! ঠিক যেমন দিল্লী, আমেদাবাদ বা কলকাতার মতো বড় শহরে কোনো বিলাসবহুল বিয়ের পরদিন সকালে সেই রাজকীয় মণ্ডপের জায়গায় গেলে এক ফোঁটা চিহ্নও খুঁজে পাওয়া যায় না— চকমকে আলো আর কৃত্রিম হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা আদিম শূন্যতার মতো। গতকাল রাতের সেই অরণ্য আদিমতা আর আজকের এই শূন্যতা— দুইয়ের মাঝখানের ব্যবধানটাই আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় রহস্য।
বাঙালি জীবনে আমরা স্থায়িত্ব খুঁজি। ঘর খুঁজি, ইএমআই দিই। কিন্তু সুরুজ সর্দাররা আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেল যে, আসলে আমরা সবাই যাযাবর। রবীন্দ্রনাথ ঠিকই বলেছিলেন, “বিপুল এ পৃথিবীর কতটুকু জানি।” কিন্তু আমি নবকুমার জানি, যতটুকু জানি তার চেয়েও বেশি আমরা লুকিয়ে রাখি। সেখানে লজ্জা, সমাজের ভয়, পাশবিকতা, হিংসা, পরের জিনিস আত্মসাৎ করা, আর সজ্ঞানে নিজের মা-বাবাকে অবহেলা করা— কী নেই সেখানে!
মুক্তাদের জীবনটা অভিশপ্ত হতে পারে, কিন্তু সেখানে কোনো মুখোশ নেই। ওরা দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটে আর দর্শক দেখে তাদের নগ্নতা। ওরা ওভাবেই অভ্যস্ত। আর আমরা? আমরা তো প্রতিদিন এক অদৃশ্য দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটছি। পা পিছলে গেলেই আমাদের সমাজ, আমাদের সম্মান আর আমাদের এই ‘ভদ্রলোক’ তকমাটা ফ্লাইওভারের নর্দমায় গিয়ে পড়বে।
আজও যখন কুয়াশাচ্ছন্ন রাতে নিউটাউনের ফ্লাইওভার দিয়ে যাই, তখন মনে হয় নিচে সেই নীল তাবুগুলো আবার গজিয়ে উঠেছে। হ্যারিকেনের ম্লান আলোয় হয়তো আজও মুক্তা কোনো এক বকাটে ছেলের কানে কানে সেই প্রাচীন নীল বিষের গল্প শোনাচ্ছে।
“আসলে জীবন কোনো সোজা রাস্তা নয় বাবু, জীবন হলো একটা সরু দড়ি। আর সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো এই যে— আমরা সবাই জানি একদিন আমরা পা পিছলে পড়ে যাব, তবুও আমরা তালি পাওয়ার আশায় নেচেই চলেছি।”
সমাপ্ত
![]()







