বিকাল পাঁচটা
বারিদ বরণ
প্রতিদিন বিকেল পাঁচটা বাজলেই রমেনবাবুর বাড়ির রান্নাঘর থেকে চায়ের গন্ধ বেরোত।পাড়ার সবাই জানত—এটাই তাদের ঘড়ি।
পাঁচটা মানেই দু’কাপ চা।এক কাপ রমেনবাবুর জন্য।আর এক কাপ তাঁর স্ত্রী মাধবীর জন্য।
বিয়ের পর পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে এই নিয়মের কোনোদিন ব্যতিক্রম হয়নি।
মাধবী চা বানাতেন, রমেনবাবু বারান্দার চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়তেন।
চা নিয়ে এসে মাধবী বলতেন,
“এই নাও, তোমার চা। আবার চিনি কম হয়েছে বলবে না যেন।”
রমেনবাবু চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলতেন,
“চিনি কম না, তোমার হাতের মায়া কমেছে।”
“বুড়ো বয়সে খুব কথা শিখেছ!”
তারপর দু’জনেই হাসতেন।
এই সামান্য কথোপকথনটাই ছিল তাঁদের সন্ধ্যা।
বড় কোনো বিলাসিতা ছিল না জীবনে। বড় বাড়ি নেই, দামি আসবাব নেই, বেড়াতে যাওয়ার গল্প নেই। ছেলেমেয়ে দু’জনেই দূরের শহরে সংসার পেতেছে। বছরে দু-একবার মন চাইলে আসে।
কিন্তু তাঁদের নিজেদের একটা পৃথিবী ছিল। আর সেই পৃথিবীর নাম ছিল—
দু’কাপ চা।
একদিন মাধবী রমেন বাবুকে জিজ্ঞাসা করেন,
“আচ্ছা আমি যদি না থাকি তখন তুমি চা খাবে?”
“তুমি না থাকলে আমি চা খাব কেন?”
মাধবী তখন একটু থেমে বলতেন,
“আমি আগে চলে গেলে কিন্তু তুমি চা খাওয়া বন্ধ করবে না।”
রমেনবাবু হেসে উড়িয়ে দিলেন।
“তুমি আগে যাবে কোথায়?”
মাধবী কোনো উত্তর দিলেন না।
সেই কথাটার অর্থ রমেনবাবু বুঝেছিলেন অনেক পরে।
সেদিনও বিকেল পাঁচটায় চা তৈরি হয়েছিল।কিন্তু মাধবী চা নিয়ে বারান্দায় আসেননি।সকাল থেকেই তাঁর শরীরটা ভালো লাগছিল না।
বুকে ব্যথা হচ্ছিল।
রমেনবাবু বলেছিলেন,
“চল, ডাক্তার দেখিয়ে আসি।”
মাধবী মাথা নেড়ে বলেছিলেন,
“চা খেয়ে যাই।”
রমেনবাবু রেগে বলেছিলেন,
“চা পরে হবে।”
মাধবী হেসে বলেছিলেন,
“তোমার সঙ্গে পাঁচ মিনিট বসে চা খাওয়াটাই তো আমার দিনের সবচেয়ে বড় ওষুধ।”
কথাটা বলতে বলতেই হঠাৎ তাঁর হাত থেকে কাপটা পড়ে গেল।চা ছড়িয়ে গেল মেঝেতে।
মাধবী মেঝেতে পড়ে যাওয়ার আগে শুধু বলেছিলেন,
“রমেন… কাপটা ভেঙে গেল?”
তারপর চোখ বন্ধ হয়ে গেল।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়ার সময় রমেনবাবু তাঁর হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন।অক্সিজেনের মাস্কের ভেতর দিয়ে মাধবী খুব কষ্ট করে শ্বাস নিচ্ছিলেন।
ডাক্তাররা ছুটছেন।
নার্সরা ব্যস্ত।
রমেনবাবু শুধু একটাই কথা বলছিলেন,
“মাধবী, চোখ খোল। আমি আছি।”
কিছুক্ষণ পর মাধবী চোখ খুললেন।
খুব আস্তে বললেন,
“আজ… চা খাওয়া হলো না।”
রমেনবাবু কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“হাসপাতাল থেকে বাড়ি নিয়ে যাব। তারপর দু’কাপ চা খাব।”
মাধবী খুব মৃদু হাসলেন।
তারপর তাঁর আঙুলগুলো রমেনবাবুর হাতটা খুঁজে নিল।
“একটা কথা রাখবে?”
“সব কথা রাখব।”
“আমি যদি…”
রমেনবাবু সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মুখ চেপে ধরলেন।
“চুপ কর। এসব কথা বলবে না।”
মাধবী একটু হাসলেন।
তিনি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।
তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললেন,
“আমি যদি কোনোদিন না থাকি…বিকেল পাঁচটার চা বন্ধ কোরো না।”
“তুমি থাকবে। তুমি আছো বলেই তো আমি আছি।”
মাধবী তাঁর হাতটা আরও শক্ত করে ধরলেন।
“জানি।”
এটাই ছিল তাঁদের শেষ কথা।
রাত ২টা ১৭ মিনিটে মাধবীর হৃদস্পন্দন থেমে গেল।
রমেনবাবু তখনও তাঁর হাত ধরে বসেছিলেন।
হঠাৎ মনিটরের শব্দটা একটানা হয়ে গেল।
নার্স এসে তাঁর কাঁধে হাত রাখলেন।
“কাকু…”
রমেনবাবু তাকালেন না।
তিনি মাধবীর হাতটা নিজের দুই হাতের মধ্যে নিয়ে বললেন,
“ওঠ মাধবী… ভোর হতে চলেছে। আর কত ঘুমাবে?”
কেউ উত্তর দিল না।
নীরবতা।
তিনি প্রথমবার মাধবীর হাতের ঠান্ডা হয়ে যাওয়া বুঝতে পারলেন।
তারপর শিশুর মতো কেঁদে উঠলেন।
মাধবীর শ্রাদ্ধের দিনটাও রমেনবাবু একাই সামলালেন।
ছেলে ফোন করে বলেছিল,
“বাবা, অফিস থেকে ছুটি পেলাম না। আসতে পারব না। সবকিছু তুমি সামলে নিও।”
মেয়েরও আসা হলো না। তারও নাকি সংসারের কিছু জরুরি কাজ ছিল।
রমেনবাবু ফোনটা রেখে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন।
যে মেয়েটাকে মাধবী নিজের হাতে মানুষ করেছিলেন, যে ছেলেটার জন্য রাত জেগে পড়াশোনা করিয়েছিলেন, আজ মায়ের শেষ কাজের দিনেও তাদের সময় হলো না।
পুরোহিত এসে যখন বললেন,
“কর্তা কে?”
রমেনবাবু ধীরে ধীরে হাত তুললেন।
“আমি।”
পুরোহিত বললেন,
“কর্তা, এগিয়ে আসুন।”
রমেনবাবু কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে গেলেন।
তারপর এল সেই মুহূর্ত—মুখাগ্নির।
নিজের হাতেই তিনি মাধবীর মুখে আগুন দিলেন।
আগুন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল।
রমেনবাবু দাঁড়িয়ে রইলেন।
চারপাশে মানুষ ছিল, পুরোহিত ছিলেন, আত্মীয়-পরিজন ছিল—তবু তাঁর মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে তিনি একাই দাঁড়িয়ে আছেন।
সেদিন শুধু মাধবীর দেহটাই পুড়ছিল না,রমেনবাবুর জীবনের পঁয়তাল্লিশ বছরের একটা সংসারও ধীরে ধীরে ছাই হয়ে যাচ্ছিল।
আর সেই ছাইয়ের মধ্যে পড়ে রইল,
একটা খালি চেয়ার,একটা পুরোনো কাপ,আর প্রতিদিন বিকেল পাঁচটার অপেক্ষা।
শ্রাদ্ধের প্রতিটি আচার তিনি নিজের হাতে করলেন।
মাধবীর প্রিয় শাড়িটা পাশে রেখে দিলেন।তার প্রিয় খাবার রান্না হলো।সাথে রইলো এক কাপ চা। শেষবারের মতো তাঁর নাম উচ্চারণ করলেন।
জীবনে কতবার মাধবীর হাত ধরেছেন,রাস্তা পার হতে, অসুখে, ভয় পেলে, আনন্দে। কিন্তু আজ সেই হাতটা ধরার কোনো উপায় নেই।
আগুন হাতে নিয়ে তিনি কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই বিকেল পাঁচটার বারান্দা।
দু’কাপ চা।
মাধবীর হাসি।
“চিনিটা কম হয়ে গেছে”—এই বলে তাঁর সঙ্গে ঝগড়া করা।
আর হাসপাতালের সেই শেষ রাত।
“আমি যদি কোনোদিন না থাকি… বিকেল পাঁচটার চা বন্ধ কোরো না।”
রমেনবাবুর হাত কেঁপে উঠল।চোখের জল মুছে তিনি খুব আস্তে বললেন,
“তুমি বলেছিলে, আমি চা বন্ধ করব না… কিন্তু তুমি তো আমাকে একেবারে একা করে দিয়ে গেলে।”
পরদিন বিকেল পাঁচটা।
রমেনবাবু রান্নাঘরে ঢুকলেন। উনুনে জল বসালেন।
দুটো কাপ বের করলেন।
একটায় চা ঢাললেন।
আরেকটায়ও।
চিনি দেওয়ার সময় তাঁর হাত থেমে গেল।মাধবী সবসময় একটু বেশি চিনি খেতেন।তিনি অভ্যাসবশত সেই কাপটায় দু’চামচ চিনি দিলেন।তারপর কাপ দুটো নিয়ে বারান্দায় এলেন।
একটা নিজের সামনে রাখলেন।
অন্যটা মাধবীর চেয়ারের সামনে।
চেয়ারটা খালি।
রমেনবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে মাধবীর কাপটা নিজের দিকে টেনে নিলেন।
চায়ে চুমুক দিলেন।চোখের জল চায়ের মধ্যে পড়ল।
তিনি কাপটা নামিয়ে রেখে ফিসফিস করে বললেন,
“আজ একটু বেশি চিনি হয়ে গেছে।”
তারপর নিজের অজান্তেই বললেন,
“তুমি আবার বলবে, এত চিনি খেলে ডায়াবেটিস হবে।”
কথাটা শেষ করেই থেমে গেলেন।
বারান্দাটা নিস্তব্ধ।কেউ উত্তর দিল না।
সেদিন প্রথমবার রমেনবাবু বুঝলেন,
কিছু নীরবতা শব্দের থেকেও বেশি কষ্ট দেয়।
দিন চলে গেল।
এক সপ্তাহ।
এক মাস।
দু’মাস।
মাধবীর ঘরটা যেমন ছিল, তেমনই রইল।
আলমারিতে তাঁর শাড়ি।ড্রেসিং টেবিলে চিরুনি।
বিছানার পাশে পড়ে থাকা পুরোনো উপন্যাস।
আর রান্নাঘরের তাকের এক কোণে দুটো একই রকম চায়ের কাপ।
রমেনবাবু কোনো কিছু সরালেন না।
ছেলে ফোন করে বলেছিল,
“বাবা, তুমি আমাদের কাছে চলে এসো।”
রমেনবাবু বলেছিলেন,
“আমি ভালো আছি।”
“একা থাকো কীভাবে?”
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিলেন,
“একা কোথায়?”
ছেলে বুঝতে পারেনি।
কয়েক মাস পর পাড়ার নতুন ভাড়াটে অরুণ একদিন বিকেলে রমেনবাবুর বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছিল।
দেখল, রমেনবাবু বারান্দায় বসে আছেন।টেবিলের ওপর দু’কাপ চা।
অরুণ অবাক হয়ে বলল,
“কাকু, আপনি তো একাই থাকেন। দু’কাপ চা কেন?”
রমেনবাবু একটু হাসলেন।
কোনো উত্তর দিলেন না।
অরুণ আবার জিজ্ঞেস করল,
“কাকু, দু’কাপ কেন?”
রমেনবাবু এবার খালি চেয়ারটার দিকে তাকালেন।
মৃদু গলায় বললেন,
“এক কাপ ওর জন্য।”
অরুণ চুপ করে গেল।
রমেনবাবু কাপটা হাতে তুলে নিয়ে ধীরে ধীরে বললেন,
“মানুষটা নেই…”
একটু থামলেন।
তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন,
“অভ্যাসটা তো আছে।”
অরুণের বুকটা হঠাৎ কেমন করে উঠল।
সে বুঝতে পারল, কিছু মানুষ মারা যাওয়ার পরও ঘর থেকে চলে যায় না।
তারা থেকে যায়—একটা চেয়ারে, একটা পুরোনো শাড়ির গন্ধে, একটা অসমাপ্ত কথায়,আর প্রতিদিন বিকেল পাঁচটার দু’কাপ চায়ের মধ্যে।
সেদিন সন্ধ্যায় অরুণ চলে যাওয়ার পর রমেনবাবু আবার দুটো কাপ নিয়ে বসে রইলেন।
এক কাপ তাঁর হাতে।
অন্য কাপটা মাধবীর সামনে।
হঠাৎ তিনি বললেন,
“মাধবী, আজ জানো তো কী হয়েছে?”
কেউ উত্তর দিল না।
তিনি নিজেই বললেন,
“একজন আমাকে জিজ্ঞেস করছিল, দু’কাপ চা কেন বানাই।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে হেসে বললেন,
“আমি বলেছি, অভ্যাস।”
তারপর চোখ মুছে ফিসফিস করে যোগ করলেন,
“আসলে কী জানা …”
গলাটা কেঁপে উঠল।
“আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারি না যে তুমি আর চা খেতে আসবে না।”
বারান্দার বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে।
দূরের মন্দির থেকে ঘণ্টা ধ্বনি ভেসে আসছে।
রাস্তার আলো একে একে জ্বলছে।রমেনবাবু মাধবীর কাপটার দিকে তাকিয়ে বসে আছেন।চায়ের ধোঁয়া অনেক আগেই মিলিয়ে গেছে।তবু তিনি কাপটা সরালেন না।
কারণ তিনি জানেন,মানুষ চলে যায়, সংসার থেমে যায়, কথাগুলো একদিন নীরব হয়ে যায়…
শুধু ভালোবাসা কখনও মরে না।
সে থেকে যায় একটা খালি চেয়ারে,একটা পুরোনো শাড়ির গন্ধে,একটা অসমাপ্ত কথায়।
আর কিছু অপেক্ষার কোনো শেষ হয় না।
তাই কিছু ভালোবাসা,থেকে যায় প্রতিদিন বিকেল পাঁচটায় এক কাপ চা নিয়ে কারও ফিরে আসার অপেক্ষায়।
—oooXXooo—
![]()







