শীলি মিশটেক
বাসুদেব চন্দ
আজ বিশু বোস তাঁর একমাত্র মেয়ে টুসি বোসের বিয়ের জন্য খুশিদির সঙ্গে হারান ঘোষের ছেলে যিশু ঘোষকে দেখতে যাবেন। মুশকিল হল পাত্র’র মা ছাড়া কেউই বাড়িতে থাকেন না। সবাই যে-যার কাজে ব্যস্ত থাকেন।
অগত্যা তাঁরা ছেলের মায়ের সঙ্গে পাকা কথা বলার জন্য ওঁদের বাড়িতে পৌঁছলেন। আনন্দের ভাগ নিতে খুশিদিও সঙ্গে আছেন।
“নমস্কার! আসুন আসুন! বসুন বসুন!
আমার বাড়ির লোকজনের কথা আর কী বলব, বাবুরা বড় বড় কাজের দায়িত্ব নিয়ে এখন আর সামলাতে পারছে না। মাঝখান থেকে আমি গেছি বেসামাল হয়ে!
দেখি…, অন্তত একজনকে যদি পাওয়া যায়।”
ভদ্রতা করে বিশু বোস বললেন-
“কী আর করা যাবে দিদি, কাজ তো সবার আগে।”
ফুলি বোস বললেন-
অন্তত ছেলের বাবাকে যদি পাওয়া যেত তাহলে এগোনো যেত।”
“দেখছি…..,
আপনারাও শুনুন কী বলেন তারা-“
কথাটা বলেই ভদ্রমহিলা একটা বারোমেসে ক্যালেন্ডারের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে মোবাইলে আঙুল দাবাতে শুরু করলেন-“টুই টুই টুই টুই টুই- টুই টুই টুই টুই টুইই।”
হ্যাঁ গো, পৌঁছে গেছো? ওনারা এসেছেন তো।”
“কী করব বলো, কোর্টের যা অবস্থা, আজ কিছুতেই বেরোতে পারব না। যিশুকে একবার বলে দেখো, যদি দশ মিনিটের জন্যেও আসতে পারে।”
কোর্টের কথা শুনে খুশিদি বুক ফুলিয়ে ফুলি বোসের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে ছেলের পরিবারের ওজনখানা বুঝিয়ে দিলেন।
আবার সবাই ফোনে কান পাতলেন-
“হ্যাঁ রে যিশু, তুই তো জানিস আজ ওনারা আসবেন, তাও চলে গেলি? কোর্ট আর ব্যাংক করলেই হবে? ভদ্রতা- সভ্যতা বলে একটা ব্যাপার আছে তো না কি?”
“আমি তো তখনই তোমায় ‘না’ বলেছিলাম, শুনলে না আমার কথা!
ঠিক আছে, সামনের শনিবার ছুটি আছে, ওইদিন অংশুকে নিয়ে ওদের বাড়িতে গিয়ে কথা বলে আসব। এখন ছাড়ছি। বুঝতেই তো পারছো, আজ মাসের এক তারিখ, পেনশন তোলার দিন। বুড়ো বুড়িদের ভিড় সামলাতে সামলাতে আমি হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি!”
ছেলের কথা শুনে খুশিদি এবার বিশু বোসের দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে পরিবারের বাজারদরখানা বুঝিয়ে দিলেন।
বিশু বোস খুশি হয়ে ছেলের মা-কে বললেন-
“দুজনের একজনও যখন আসতে পারছেন না তখন আর কী করা যাবে, এক কাজ করুন; ছেলের এক জ্যাঠামশাই আছেন শুনেছি, ওনাকেই ডাকুন,, সব ঠিক থাকলে ওতেই হয়ে যাবে।”
“দাদার কথা আর বলবেন না! তাঁর ঝামেলা সবথেকে বেশি!
ঠিক আছে, বলছেন যখন….”
ফোন করলেন ভাসুর ঠাকুরকে-
টুই টুই টুই টুই টুই- টুই টুই টুই টুই টুইই।”
“দাদা, এনাদের কাছে যে সম্মান থাকছে না!”
“কী করতে হবে তাড়াতাড়ি বলো। ঝামেলায় আছি।”
“বলছিলাম, আপনি কি থানায় পৌঁছে গেছেন? একবারটি যদি আসতে পারতেন….!”
আচ্ছা দেখছি, ফুরসত পেলেই আসছি।”
“আসছি” শুনে সবাই স্বস্তি পেলেন!
পাশের বাড়ির টেপিকে দিয়ে তাড়াতাড়ি মিষ্টি আনিয়ে ছেলের মা অতিথি সেবা শুরু করে দিলেন-
গল্প করতে করতে আর চা-মিষ্টি খেতে খেতে জ্যাঠামশাই এসে গেলেন। পরম অতিথিদের সামনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে বললেন-
“ক্ষমা করবেন হুজুর! আমার কোনও দোষ নেই!”
জ্যাঠামশাইয়ের এমন আদবকায়দা দেখে বিশু বোস তো বেজায় খুশি! গদগদ হয়ে বললেই ফললেন- “মেয়ের বিয়ে এখানেই দেব!”
ফুলি বোস স্বামীর হাতটা টেনে ধরে বসিয়ে দিয়ে বললেন-
“অতো হুটপাটি কোরো না তো; একটা মাত্র মেয়ে আমার, তার বিয়ে বলে কথা।”
ছেলের মা মেয়ের মায়ের কথায় সায় দিলেন বললেন-
“দিদি তো ঠিক কথাই বলেছেন, আগে খোঁজখবর নিন, তারপর দিনক্ষণ পাকা হবে খন।”
সেদিনের মতো ইতি টেনে ওঁরা বাড়ি চলে এলেন। মনে মনে স্থির করলেন কাজ এখানেই করবেন। এমন একটা সুপাত্রের সন্ধান দেওয়ার জন্য বিশু বোস আর দেরি করলেন না, তক্ষুণি খুশি হয়ে খুশিদিকে পাঁচ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে দিলেন!
খুশিদির খুশি আর ধরে না!
★★★
পরদিন সকালে ফুলি বোস শুয়ে থাকা স্বামীকে এক ধাক্কায় টেনে তুললেন-
“ওঠো! মেয়ের বাবার অত ঘুম কীসের!”
“কেন? হলটা কী?”
গভীর চিন্তায় ফুলি তখন ফুলেফেঁপে রয়েছেন, বললেন-
“তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও।”
“কেন? কী করব?”
“আজই জজ কোর্ট, ব্যাংক আর থানায় যাব। নিজের চোখে না দেখে আমি এক পা’ও এগোব না। আমার বাবা ভুলে করেছে বলে কি আমিও করব!”
কোনও কথা না-বলে বিশু বোস কোনোরকমে বাঁ-হাত আর ডান হাতের কাজ সেরে হাতের সামনে যা ছিল তা দিয়ে শরীর ঢেকে নিয়ে বউয়ের পিছন পিছন ছুটলেন পাত্র-সরজমিনে। সঙ্গে সেইই খুশিদি।
প্রথমে গেলেন কোর্টে। ছেলের বাবার কাজের জায়গা দেখতে।
“ফলের খোঁজ পরে হবে, আগে তো গাছের খবর নিতে হবে।”
জজ কোর্টের কাছাকাছি যেতেই একজনের সঙ্গে দেখা হল, চেহারা-ছবিতে একটা কোর্ট কোর্ট গন্ধ থাকায় বিশু বোস জিজ্ঞেস করলেন-
“দাদা, একটা প্রশ্ন করব?”
“বলুন স্যার, আপনার জন্য কী করতে পারি?”
“একজনের ঠিকানা…”
“স্যার, কোর্টের ভিতর থেকে বাইরে পর্যন্ত সব স্যারের ঠিকানা আমার নখদর্পণে, কোন স্যারকে চাইছেন বলুন?”
“হারাধন ঘোষ…..”
“হারাধন স্যার? কে না-চেনেন তাঁকে? ওই যে গেটটা দেখতে পাচ্ছেন ওখানে গেলেই পেয়ে যাবেন। একজন অন্ধকে জিজ্ঞেস করলেও বলে দেবে!”
পাশ থেকে একজন অন্ধ ভিক্ষুক যাচ্ছিলেন, ওঁদের কথা কানে যেতেই বললেন- “আসুন, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।”
হাঁটতে হাঁটতে অন্ধ ছেলেটি বললেন- আপনারা যাকে ঠিকানা জিজ্ঞেস করলেন উনি একজন পাগল-উকিল, বিবাহ-বিচ্ছেদের মামলা লড়তে লড়তে পাগল হয়ে গেছেন!”
“সেকী! এঁদের পাল্লায় পড়ে একদিন আমার হবু বেয়াইয়েও মাথাটা খারাপ হয়ে যাবে।”
গিন্নি বললেন-
“এজন্যই তো এলাম, চাক্ষুস না করলে কিছু বোঝা যায় না!”
“কোর্টের মেইন ফটকের মুখে নিয়ে এসে একজন ডাবওয়ালাকে দেখিয়ে অন্ধ ছেলেটি বললেন-
“ইনিই হলেন হারাধন ঘোষ।
এই যে কাকা, ওনারা তোমায় খুঁজচ্ছেন।”
হারাধন ঘোষ ওঁর হাতে পাঁচটাকা দিয়ে বললেন-
“আপনাদের একটু অপেক্ষা করতে হবে দাদা, আমার এখানে বেলাইনে কাউকে দেওয়া হয় না। সাহেবদেরও না।”
বিশু বোসদের অবস্থা তখন ভিমরি খেয়ে পড়ার মতো!
ড্যাব ড্যাব করে ডাবওয়ালার দিকে তাকিয়ে থেকে ভাবলেন-
“ফোনে ছেলের মা-বাবার কথাবার্তা শুনে মনে হয়েছিল- ছেলের বাবা জজ কোর্টের উকিল মোক্তার কিছু একটা হবেন, ইনি তো দেখছি জজ কোর্টের ডাবওয়ালা!!!”
বিশু বোস রাগে গজগজ করতে করতে খুশিদির দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে আকার-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলেন- “পাড়ায় চলো একবার, দেখাচ্ছি তোমার মজা!”
খুশিদি দুঃখ প্রকাশ করে বললেন-
“শরী, একটা শীলি মিশটেক হয়ে গেছে দাদা!”
বিশু বোস তখনও আশা ছাড়েননি, বউকে বললেন-
“আজকাল রিকশাওয়ালার ছেলেও ইংরেজি স্কুলে পড়ে। ব্যাংকে চাকরি পায়।
মিনিট দশ হাঁটা পথে জজ কোর্ট লাগোয়া একটা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, পাত্র এখানেই কাজ করে।
সিকিউরিটি গার্ডকে নামটা বলতেই বাইরে একটা চায়ের দোকান দেখিয়ে বললেন- “ওখানে গেলে পেয়ে যাবেন।”
খুশিদি বললেন-
“বোধহয় টি খেতে গেছে, চলুন আমরা ওই টি-সপে যাই।”
ফুলি বোস বললেন- “ঘটে যখন বুদ্ধি নেই তখন চুপ করে থাকলেই তো পারো। বলি লজ্জা বলতে কিছু আছে তোমার?”
চায়ের দোকানের ভিড় ঠেলে বিশু বোস একটা বাচ্চা ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন-
“বাবু, যিশু ঘোষকে কোথায় পাব বলতে পারো?”
“কী দরকার আমায় বলুন। দাদার এখন কথা বলার সময় নেই। দেখছেন না কেমন ভিড়।
লিকার না দুধ? বেশি চিনি না কি কম? নাকি মোটেই না? বিস্কুট নোনতা না কি মিষ্টি? অবশ্য না-নোনতা না-মিষ্টি এমন অনাসৃষ্টিও আছে। গেলাসে দেব না ভাড়ে? তাড়াতাড়ি বলে ফেলুন, ভোর তিনটে থেকে কাজ করতে করতে ব্যথা হচ্ছে ঘাড়ে!”
ফুলি বোস ধপাস করে বসে পড়ে বললেন- “বাবা, আমায় একটু জল দিতে পারো?”
বিশু বোস রাগে গজগজ করতে করতে খুশিদির দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে আকার-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলেন- “পাড়ায় চলো একবার, দেখাচ্ছি তোমার মজা!”
খুশিদি আবার দুঃখ প্রকাশ করে বললেন-
“শরী, এটি নিয়ে দুটি শীলি মিশটেক হয়ে গেছে!”
বিশু বোস গিন্নিকে বললেন- আমাদের কপালটাই খারাপ, চলো বাড়ি ফিরে যাই।”
“তাড়াতাড়ি ট্যাক্সি ডাকো!”
বিশু দৌড়ে গিয়ে ট্যাক্সি নিয়ে এলেন-
ফুলি ট্যাক্সিতে উঠে বললেন-
“টালিগঞ্জ থানায় চলুন।”
“থানা-পুলিশ করে কী হবে ফুলি! খুশিদিকে বিশ্বাস করেই আমরা ভুল করেছি!”
“থানায় যাচ্ছি ওই বুড়োটাকে দেখতে। বুড়োভাম থানার গেটে লজেন্স বেচছে না কি চানাচুর, সেটা দেখতে হবে না? শুরু যখন করেছি শেষ দেখে ছাড়ব! সব শেষে খুশির গর্দান ধরব!”
★★★
বিশু থানার সেন্ট্রিকে জিজ্ঞেস করলেন-
“আচ্ছা, প্রাণ গোবিন্দ ঘোষকে কোথায় পাব বলতে পারেন?”
“ওই যে বেঞ্চটা দেখতে পাচ্ছেন, ওখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন, বলে দেবে।”
থানার ভিতরে ঢুকে বেঞ্চের সামনে যেতেই ছেলের জ্যাঠাকে দেখতে পেলেন। যাদের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে আছেন তাদের সবকটাকে পকেটমারের মতো দেখতে।
বিশু বোসকে সামনে পেয়ে জ্যাঠামশাই এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন-
“এ-লাইন ছেড়ে দিয়েছি অনেকদিন হয়ে গেল, তবুও কেউ নালিশ ঠুকলেই আগে আমাকে ধরে!”
বিশু বোস এক ধাক্কায় লোকটাকে দূরে ঠেলে দিয়ে বেরিয়ে এলেন!
রাগে গজগজ করতে করতে খুশিদির দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে…..”
কাকে ভ্রু নাচাবেন! খুশিদি অনেক আগেই কেটে পড়েছেন!
★★★
পাত্র খোঁজার তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিলেন! সারা রাস্তায় স্বামী-স্ত্রী কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছেন না! বাড়ি ফিরে বিশু বোসের গুষ্টির ষষ্ঠী পুজো হবে- তাতে কোনও সন্দেহ নেই! ট্যাক্সি-ড্রাইভারের সামনে কিছু না-হলেই হল!
ঘরের কাছে নেমে বিশু বোস ভাড়া দেওয়ার জন্য যেই-না পকেটে হাত দিয়েছেন অমনি বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠেছে!
“পকেটটা কে কেটে দিল রে বাবা!!!?”
—oooXXooo—
![]()







