উড়ন্ত ইলিশ ও একচোখো হুলো
-নবকুমার চক্রবর্ত্তী ( নবু )
মধ্যমগ্রাম চৌমাথা ও মহাজাগতিক চক্রান্ত
উত্তর চব্বিশ পরগনার মধ্যমগ্রাম চৌমাথা মোড় এমন এক জায়গা, যেখানে সময়ের কোনো নিজস্ব ছন্দ নেই; আছে কেবল অবিরাম ধুলো ও ধোঁয়ার কোলাহল। মাথার ওপর দিয়ে সটান চলে যাওয়া সুবিশাল ফ্লাইওভারের নিরেট কংক্রিটের ছায়ায় যশোর রোড আর বাদু রোডের সঙ্গমস্থলটি দিনরাত ফুটন্ত তেলের কড়াইয়ের মতো টগবগ করে। বারাসাতগামী বেসরকারি বাসের কালো ধোঁয়া, হাবড়ামুখী অটোচালকদের তারস্বরে হাঁকডাক, আর পিলারের গায়ে সাঁটা ভেষজ তেল ও পুরোনো জ্যোতিষীর পোস্টারের ভিড়ে ফুটপাত ঘেঁষে বসেছে কাটা ফল আর কাঁচা মাছের পসরা।
ফ্লাইওভারের চার নম্বর পিলারের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তপন তখন তার মেটালিক স্মার্টওয়াচের স্ক্রিনে চোখ আটকে রেখেছিল। কসবায় পুরোনো ল্যাপটপ মেরামতের দোকান ‘ডিজিটাল সমাধান’ চালালেও তার মন সর্বদা ইন্টারপোলের আন্তর্জাতিক অপারেশনের সমান্তরালে ওড়ে। চশমার মোটা কালো ফ্রেমটা নাকের ডগায় ঠেলে সে গম্ভীর গলায় বলল, “সিচুয়েশন অত্যন্ত জটিল, সিদ্ধার্থ। বঙ্গোপসাগরের দিক থেকে একটা অদ্ভুত লো-ফ্রিকোয়েন্সি ওয়েভ ঠিক এই মধ্যমগ্রাম চৌমাথায় এসে ইন্টারসেপ্ট করছে। আন্ডারগ্রাউন্ডে মারাত্মক কিছু একটা পাকছে।”
তার পাশেই দাঁড়িয়ে সিদ্ধার্থ ফোনের স্ক্রিনে অবিরাম ডার্কওয়েব রিফ্রেশ করছিল। ভিনগ্রহী আক্রমণের আশঙ্কায় তার চোখ দুটো কোটরাগত। সে কাঁপা গলায় যোগ করল, “তপনদা, ব্যপারটা ডার্কনেটের বাইরে চলে গেছে! গ্যালাকটিক স্পেসের এক মাদারশিপ মধ্যমগ্রামের আকাশে পার্ক করেছে। মাছের খাঁটি প্রোটিন দিয়ে ওরা নাকি ন্যানো-ব্যাটারি চার্জ করছে! আজ আড়তের ইলিশ যাচ্ছে, কাল হয়তো পুরো ফ্লাইওভারটাই টেলিপোর্ট করে তুলে নেবে!”
কাঠের বেঞ্চে বসে মাটির ভাঁড়ে চা খাচ্ছিল তরুণ সংঘের পেশিবহুল সেনাপতি ভোলা। সিদ্ধার্থের কথা শুনে মেজাজ চড়ে যেতেই সে চায়ের ভাঁড়টা ফেলে সিদ্ধার্থের পিঠে এমন এক চড় কষাল যে ফোনের স্ক্রিন হাত ফসকে পড়ার উপক্রম হলো। চোখ গোল গোল করে ভোলা গর্জে উঠল, “আ-আরে থামবি তুই বিশ্বযুদ্ধের নাতি! স্পেসশিপের এলিয়েনরা কি বাদু রোডের অটো ধরে মধ্যমগ্রামে মাছের পেটি কিনতে এসেছে? তো-তোর মাথার ঘিলুর বদলে কি পোড়া মবিল ভরা রে সিধে?”
ঠিক তখনই বাদু রোডের ফুটপাত ধরে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন ডক্টর রাসবিহারী সেনগুপ্ত। কাঁচাপাকা চুল খাড়া, হাঁটু অবধি গোটানো খয়েরি ধুতি, গায়ে বহু পকেটের ফতুয়া আর কাঁধে চামড়া-চটা ক্যাম্বিসের ঝোলা। তপনের কাঁধ চেপে ধরে ক্ষ্যাপাটে বিজ্ঞানী ফিসফিস করে উঠলেন, “তোরা আড্ডা মারছিস? আমার মামাতো ভাই তারাপদর চালের গুদামে সর্বনাশ ঘটে গেছে! আমার সাধের ‘এজিআর-নাইনটি-নাইন’—অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি রে-গানটা কেউ ছিনতাই করেছে!”
চালের গুদামের রহস্য ও ভাসমান ইলিশ
বাদু রোডের মুখে পুরোনো অশ্বত্থ গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে ‘সেনগুপ্ত অ্যান্ড সন্স: চাল ও ডাল ভাণ্ডার’। স্যাঁতসেঁতে গুদামের ভেতর বাতাসে পোড়া তার আর পচা আঁশটে গন্ধের এক অদ্ভুত ককটেল। ভেতরে তেলের ড্রামের ওপর মাথায় হাত দিয়ে বসেছিলেন তারাপদবাবু।
চারজনকে ঢুকতে দেখে তিনি প্রায় কেঁদে ফেলে বললেন, “দাদা গো! গত তিন রাত ধরে আড়ত থেকে আনা চার-পাঁচ কেজির প্রমাণ সাইজের ইলিশ আর রুই মাছের ঝাঁকাগুলো ঠিক রাত বারোটায় হাওয়ায় ভাসছে! পাঁচ মিনিট শূন্যে চক্কর কেটে চোখের পলকে ভ্যানিশ! সকালে শুধু আঁশ পড়ে থাকে, কাঁটাও নেই! এলাকার লোকে বলছে অপদেবতার নজর, আর আড়তের মহাজনরা বলছে আজ মাছ না পেলে গুদামে তালা দেবে!”
রাসবিহারীবাবু ঝোলা থেকে ডিজিটাল মিটার বের করে মেঝের ধুলো মাপতে মাপতে বললেন, “অপদেবতা নয় তারাপদ, এ হলো উল্টো-মাধ্যাকর্ষণের খেলা! আমার তৈরি অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি রে-গান যে-কোনো জৈব বস্তুর ওজন সাময়িকভাবে শূন্য করে দিতে পারে। কোনো আন্তর্জাতিক চোর চক্র এর সন্ধান পেয়ে গেছে!”
তপন ঘড়ির লাল বোতাম চেপে পেশাদার ভঙ্গিতে বলল, “জেঠুর ডায়াগনোসিস নির্ভুল। ইন্টারপোলের সি-ফোর ফাইল বলছে একে বলে ‘অ্যাকোয়াটিক সাইবার ট্র্যাফিকিং’। রিমোট দিয়ে রে-গান অন করে মাছ হাওয়ায় ভাসিয়ে ড্রোন দিয়ে তুলে নিচ্ছে।”
মেঝেতে হোঁচট খেয়ে পড়ে থাকা সিদ্ধার্থ চিৎকার করে উঠল, “তপনদা, নীল চকচকে দাগটা দেখো! ওটা এলিয়েনদের স্পেস-স্লাইম! মাছগুলো যাতে মহাকাশের ঘর্ষণে পুড়ে না যায়, তাই প্রলেপ দিচ্ছে!”
মেঝের ছাই শুঁকে দেখে ভোলার মেজাজ আবার বিগড়ে গেল। সে কোমরে হাত দিয়ে বলে উঠল, “স্পেস-স্লাইম তোর মুণ্ডু! এ হলো মাছের পচা চর্বি আর ক্যা-কেরোসিনের দাগ! নেটের পোকা তোর মাথায় বাসা বেঁধেছে রে সিধে। জেঠু, আপনি ভাববেন না। আ-আমি গিয়ে আড়তের ছাদ পাহারা দেব। চোরকে মেঝেতে আছাড় না মারলে আমার নাম ভোলা নয়!”
প্ল্যাটফর্মের রণকৌশল
সন্ধ্যায় চার মূর্তি বসল মধ্যমগ্রাম স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথার চায়ের দোকানে। ট্রেনের তীব্র হুইসল আর ধোঁয়ার মাঝে ন্যাপকিনে ম্যাপ এঁকে তপন বোঝাল, রেললাইনের হাই-টেনশন তারের ম্যাগনেটিক ফিল্ড ব্যবহার করে চোরেরা দূর থেকে রে-গান অপারেট করছে।
জলের ট্যাঙ্কের ওপর লাল আলো দেখে সিদ্ধার্থ ফের এলিয়েন ড্রোন বলে চেঁচাতে গেলে ভোলা তার জামার কলার চেপে চোখ রাঙিয়ে শাসাল। অবশেষে রাসবিহারীবাবু জানালেন, আজ রাতে আড়তে নতুন লটের পাঁচটা আট কেজির পদ্মার ইলিশ ঢুকবে। আজ রাতেই গুদামে ফাঁদ পেতে চোরকে হাতেনাতে পাকড়াও করতে হবে।
অন্ধকারের লম্ফ ও মহাধ্বংস
রাত পৌনে বারোটা। বাদু রোডের মোড় শুনশান। গুদামের আলো সম্পূর্ণ নিভিয়ে চার কোণে ওঁত পেতে রইল চারজন। মেঝের মাঝখানে বরফের গামলায় সাজানো তাজা রূপোলি ইলিশ।
ঠিক বারোটা বাজার দুই মিনিট আগে, কোণের পুরোনো মেহগনি কাঠের সিন্দুক থেকে তীক্ষ্ণ ‘ঝিঁ-ঝিঁ’ যান্ত্রিক আওয়াজ ভেসে এল। সিন্দুকের ফুটো দিয়ে ঠিকরে বেরোল এক অতিপ্রাকৃতিক নীলাভ সবুজ রশ্মি। সেই আলো পড়তেই গামলার আট কেজির ইলিশগুলো আলতো করে বরফ ছেড়ে মেঝের থেকে তিন-চার ফুট শূন্যে ভেসে উঠল!
“অ্যান্টি-ম্যাটার বিম শুরু হয়ে গেছে! মাদারশিপ আমাদের টেনে নিচ্ছে!”—সিদ্ধার্থের বিকট চিৎকারে নিস্তব্ধতা খানখান হলো। ভয়ে ছুটতে গিয়ে সে ড্রেনের ঢাকনায় পা পিছলে সোজা তপনের জ্যাকেট জাপটে ধরল।
“আরে মূর্খ, ছাড়! আমার গ্র্যাভিটি ভেক্টর ঘেঁটে যাচ্ছে!” তপন ব্যালান্স রাখতে শূন্যে এক অন্ধ উড়ন্ত লাথি ছুঁড়ল। সেই লাথি গিয়ে সজোরে আঘাত করল চালের নিচে ঝোলানো পুরোনো খড়ের গাদার বাঁধনে।
ঠিক একই মুহূর্তে বাইরে থেকে গুদামের ছাদে কোনো স্পাই উঠছে ভেবে সীমানা প্রাচীর থেকে এক অন্ধ লম্ফ দিল ভোলা। কিন্তু জীর্ণ টিনের চাল ভোলার পাহাড়প্রমাণ ওজন সইতে পারল না।
কড়কড়-মড়মড়-ধড়াস!
ভোলার পতন, শত মণ শুকনো খড়, ঝুলকালি আর ভাঙা টিনের কাঠামো হুড়মুড়িয়ে মেঝের ওপর আছড়ে পড়ল। এক লহমায় পুরো গুদাম পরিণত হলো ধূলিধূসর ধ্বংসস্তূপে।
খড়ের গাদার উদঘাটন
ধুলোর মেঘ থিতিয়ে এলে রাসবিহারীবাবু টর্চের তীব্র সাদা আলো ফেললেন ধ্বংসস্তূপের ওপর। আলো পড়তেই সবার চোখ ছানাবড়া।
কোনো আন্তর্জাতিক সাইবার কমান্ডো নেই, কোনো এলিয়েন রোবটও নেই। খড়ের গাদার ওপর পরম আয়েসে চার পা ছড়িয়ে বসে আছে মধ্যমগ্রাম মাছের আড়তের কুখ্যাত, প্রকাণ্ড একচোখো বাঘা হুলো! তার মুখে কামড়ে ধরা সেই শূন্যে ভাসা পদ্মার ইলিশের রূপোলি মুড়ো, আর তার পেছনের বাঁ পায়ের তলায় শক্ত হয়ে চেপে রয়েছে রাসবিহারীবাবুর বহুমূল্য রে-গানের ‘অটো-পালস’ সুইচ!
সিন্দুকের পেছনের পুরোনো ইঁদুরের গর্ত দিয়ে শীতের রাতে আরাম করে ঘুমাতে ঢুকেছিল বেড়ালটি। শরীর মোচড়াতে গিয়ে তার পা পড়েছিল সুইচে। চালু হওয়া চৌম্বক তরঙ্গে মাছগুলো যেই শূন্যে ভেসে উঠত, ধূর্ত হুলো কোনো পরিশ্রম ছাড়াই বাতাসে ভাসা মাছ মুখে পুরে চালের খড়ের আস্তানায় মহাভোজ সারছিল।
মাথায় ভিজে খড় আর ঝুলকালি মাখা ছেঁড়া ট্র্যাকপ্যান্ট পরা ভোলা কোনোমতে দাঁড়িয়ে কপালে করাঘাত করল, “হে হরি! আ-আন্তর্জাতিক স্পাই শেষে এক পাড়ার হুলো বেড়ালের ল্যাজের তলায় মুখ থুবড়ে পড়ল? একেই বলে শাক দিয়ে মাছ ঢাকা!”
তপন নির্লিপ্ত মুখে চশমা এঁটে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, “দেখলেন তো জেঠু? আমার ক্যালকুলেটেড ডাইভারশনে সিদ্ধার্থকে দিয়ে ধাক্কা আর খড়ের গাদা না ফেললে এই বায়োলজিক্যাল থ্রেটকে কোনোদিন লোকেট করা যেত না।”
রাসবিহারীবাবু পরম মমতায় যন্ত্রটি কুড়িয়ে নিয়ে ফতুয়ার খুঁটে মুছতে মুছতে হেসে উঠলেন, “তোরা যা-ই বলিস, আমার আবিষ্কার কিন্তু নির্ভুল! এক অজ্ঞ বেড়ালও কোয়ান্টাম টেকনোলজি সফলভাবে অপারেট করে দেখাল!”
ভোরের চা ও নতুন চক্রান্ত
ভোরের আলো ফুটতেই চার মূর্তি চৌমাথার বিখ্যাত মিষ্টির দোকানে ঢুকল। ফুটন্ত ঘিয়ে ভাজা হিংয়ের কচুরি আর গরম জিলিপির গন্ধে চারপাশ ম-ম করছে।
ভোলা এক নিঃশ্বাসে চারটে কচুরি মুখে পুরে বলল, “জেঠু, এবার ক-কলকাতায় ফিরে আপনার ওই এজিআর দিয়ে ক্যারম বোর্ডের ঘুঁটিগুলো একটু ভাসিয়ে দেবেন তো, দেখি বলাই কী করে ম্যাচ জেতে!”
সিদ্ধার্থ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ফোনে চোখ রেখে হঠাৎ বলল, “দাঁড়াও, বারাসাত স্টেশনের আকাশে নাকি আবার একটা অদ্ভুত ড্রোন চক্কর কাটছে…”
তপন গম্ভীর মুখে জিলিপি ভেঙে বলল, “চুপ কর সিদ্ধার্থ! ওটা কোনো ড্রোন নয়, ইন্টারপোলের আমার পার্সোনাল ব্যাকআপ সিগন্যাল।”
মধ্যমগ্রামের ধূলিমলিন চৌমাথার চিরন্তন ব্যস্ততায় মিশে গেল বিজ্ঞান, হাস্যরস আর অদ্ভুত আত্মবিশ্বাসের এক অন্তহীন কলতান।
সমাপ্ত
![]()







