শোকদূত
ড. মদনচন্দ্র করণ বিদ্যালঙ্কার
দিবস রাত্রি পূর্ণিমা অমানিশা
দেখিতে দেখিতে আজি প্রায়
দশ বর্ষ অতীত হইল—
তথাপি গৃহের দক্ষিণ জানালায়
সন্ধ্যাতারার ম্লান আলো পড়িলেই মনে হয়,
তুমি বুঝি নিঃশব্দে কেশবিন্যাস করিয়া দাঁড়াইয়া আছ।
আকাশের কৃষ্ণ মেঘমালার অন্তরে
দর্শন করি তোমার অশ্রুজল,
বিদ্যুতের ক্ষণিক দীপ্তিতে
জাগিয়া উঠে আমার গোপন হাহাকার।
সাগরের নোনা শেওলার ভিতরে
দুলিয়া উঠে তোমার কেশগুচ্ছ,
জোয়ারের উন্মত্ত ঢেউ আসিলেই মনে হয়—
তুমি বুঝি দূর অচিন তট হইতে
আমাকে আহ্বান করিতেছ।
শুভ্র বকের বিস্তৃত ডানায় দেখি
তোমার শাঁখার ধবল স্মৃতি,
শরতের কাশফুলের দোলায়
ভাসিয়া উঠে তোমার শাড়ির কোমল আঁচল।
বনের অন্তরালে কোকিলের কুহুস্বরে
শুনি তোমার প্রভাত-সংগীত,
ঝরা পাতার মর্মরধ্বনিতে
জাগিয়া উঠে তোমার চুড়ির মৃদু অভিমান।
চন্দ্রালোক আজিও
শয্যার অর্ধাংশে নিঃশব্দে শয়ন করে,
অপর অর্ধাংশ শূন্য রহিয়া যায়—
যেন মৃত্যু সেখানে
শ্বেত শাপলার ন্যায় স্তব্ধ হইয়া আছে।
রাত্রির শিশিরবিন্দুতে
ঝরিয়া পড়ে তোমার নয়নের শেষ অশ্রু,
আমি একাকী বসিয়া থাকি—
দূর নক্ষত্রলোকের পানে চাহিয়া।
লোকেরা কহে—
কাল নাকি সকল দুঃখ বিলুপ্ত করিয়া দেয়;
কিন্তু তাহারা কি জানে,
কিছু প্রেম গঙ্গার স্রোতের ন্যায়—
মৃত্যুর পরেও শুষ্ক হয় না কদাপি।
আজিও হেমন্তের কুয়াশায়
অন্বেষণ করি তোমার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা,
আজিও বাতাস আসিয়া
মনে করায়—
তুমি বুঝি স্নেহভরে স্পর্শ করিয়া গেলে
আমার ক্লান্ত ললাট।
হে প্রিয় পত্নী,
তুমি নাই—
তথাপি সমগ্র প্রকৃতির মাঝে
তোমারই বিস্তৃত সংসার রহিয়াছে।
আমি কেবল এক বিপত্নীক মানব,
নক্ষত্রহীন রজনীর ন্যায় নিঃসঙ্গ—
যে আজিও
প্রতিটি পাখির কুজনে,
প্রতিটি মেঘের ক্রন্দনে,
প্রতিটি সাগর-ঢেউয়ের দীর্ঘনিশ্বাসে
তোমাকেই অনুসন্ধান করিয়া ফিরিতেছে।
—-oooXXooo—
![]()







