বিশেষ প্রতিনিধি, কলকাতা: গার্ডেনরিচ কিংবা তারাতলার মতো একের পর এক আবাসন বিপর্যয় এবং বেআইনি নির্মাণের জেরে তিলত্তমার বুকে যে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাগুলি ঘটে গিয়েছে, তা থেকে শেষ পর্যন্ত বড় শিক্ষা নিল রাজ্য সরকার। মানুষের জীবনের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এবার রাজ্যের নির্মীয়মাণ বেসরকারি ও বাণিজ্যিক বহুতলগুলির ওপর নজিরবিহীন এবং কঠোরতম পদক্ষেপ গ্রহণ করল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার।
নবান্ন সূত্রে জানানো হয়েছে, কলকাতা, বিধাননগর, হাওড়াসহ দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক বিস্তীর্ণ এলাকায় আগামী ১ মাসের জন্য সমস্ত ‘জি প্লাস ফাইভ’ (G+5) এবং তার ওপরের বাণিজ্যিক বহুতল নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের অডিট কমিটি প্রতিটি নির্মীয়মাণ বহুতলের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও নকশা যাচাই করবে। নকশায় কোনো বড়সড় গলদ বা কাঠামোগত ত্রুটি ধরা পড়লে সরাসরি বাতিল করে দেওয়া হবে সংশ্লিষ্ট বহুতলের অনুমোদন।
কোন কোন এলাকায় জারি নিষেধাজ্ঞা? শুক্রবার পিডব্লিউডি (PWD) টেন্টে আয়োজিত এক সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট করে দেন, কোন কোন এলাকা আপাতত এই বিশেষ স্ক্রিনিং বা স্ক্যানারের আওতায় থাকছে। আগামী ১ মাস যে সমস্ত এলাকায় নতুন বহুতল ও বাণিজ্যিক নির্মাণ বন্ধ থাকবে, সেগুলি হলো:
-
কলকাতা পৌরনিগম এলাকা
-
বিধাননগর, রাজারহাট ও নিউটাউন
-
দক্ষিণ ২৪ পরগনার পূঁজা, বারুইপুর, মহেশতলা এবং রাজপুর-সোনারপুর
-
হাওড়ার বালি এবং উত্তর ২৪ পরগনার দক্ষিণ দমদম, কামারহাটি ও বরানগর।
তবে আমজনতার স্বস্তির জন্য মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, সাধারণ মানুষের বসতবাড়ির সংস্কার বা ছোটখাটো ঘরোয়া কাজ এই নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকবে। সাধারণ মানুষ তাঁদের বাড়ি মেরামতির কাজ স্বাভাবিকভাবেই করতে পারবেন।
১১ সদস্যের অডিট কমিটি এবং কড়া অ্যাকশন: বেআইনি ও দুর্বল নির্মাণ রুখতে ইতিমধ্যেই সরকার একটি ১১ সদস্যের বিশেষজ্ঞ ‘অডিট কমিটি’ গঠন করেছে। এই কমিটি প্রতিটি বহুতলের গুণমান পরীক্ষা করবে। পরীক্ষার পর মূলত দুটি উপায়ে পদক্ষেপ করা হবে:
১. বড় ত্রুটি: যদি দেখা যায় বিল্ডিংয়ের মূল পরিকাঠামো বা নকশায় মারাত্মক কারচুপি রয়েছে, তবে সেই বহুতলের বিল্ডিং প্ল্যান বা অনুমোদন পুরোপুরি বাতিল করা হবে।
২. স্বল্প বা ছোট ত্রুটি: পরিকাঠামোয় ছোটখাটো কোনো গলদ থাকলে নির্মাণ সংস্থাকে তা শুধরে নেওয়ার একটি সুযোগ দেওয়া হবে।
অডিট কমিটির এই অগ্নিপরীক্ষায় যে সমস্ত আবাসন বা বাণিজ্যিক প্রকল্প পাস করবে, তারা আগামী ১লা আগস্ট থেকে পুনরায় নির্মাণকাজ শুরু করার অনুমতি পাবে। মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়েছেন, “নগরায়ন বা আবাসন শিল্পকে আটকে দেওয়া সরকারের উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু মানুষের জীবনের দাম অনেক বেশি”।
তদন্তের সময়সীমা ও পরবর্তী ধাপ: অডিট কমিটির কাজের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা (Timeline) বেঁধে দিয়েছে নবান্ন।
-
প্রথম ৭ দিন: আগামী ৭ দিনের মধ্যে কমিটিকে প্রাথমিক তদন্তের রিপোর্ট জমা দিতে হবে, যেখানে মূলত দেখা হবে বিল্ডিংয়ের নকশা (Design Plan) আইনসম্মত ও যথাযথ কিনা।
-
পরবর্তী ৯০ দিন: নকশা পরীক্ষার পাশাপাশি বহুতলগুলির অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা (Fire Safety) এবং বিদ্যুৎ সংযোগের ক্ষেত্রে কোনো বিপজ্জনক গলদ রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দেবে এই অডিট কমিটি।
-
গার্ডেনরিচ আবাসন বিপর্যয়: কলকাতার গার্ডেনরিচ এলাকায় গত বছর একটি বেআইনি নির্মীয়মাণ পাঁচতলা ভবন হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে পাশের ঝুপড়ির ওপর। এই ঘটনায় প্রাণ হারান একাধিক মানুষ এবং আহত হন বহু বাসিন্দা। তদন্তে উঠে আসে, পাইলিং না করেই এবং অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে জলাভূমি বুজিয়ে ওই আবাসনটি তৈরি হচ্ছিল। কোনো বৈধ প্রমোটিং লাইসেন্স বা পুরসভার অনুমোদিত নকশাও ছিল না সেখানে।
-
তারাতলা দুর্ঘটনা: তারাতলা সংলগ্ন এলাকাতেও একটি বাণিজ্যিক ভবনের অংশ ভেঙে পড়ার জেরে চাঞ্চল্য ছড়ায়। একের পর এক এই ধরণের ঘটনায় পুরসভা এবং নগরোন্নয়ন দপ্তরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
-
বর্তমান পদক্ষেপের গুরুত্ব: বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পূর্ববর্তী সময়ে স্থানীয় স্তরে একাংশের আধিকারিক ও প্রমোটারদের যোগসাজশে যে ‘বেআইনি নির্মাণ সিন্ডিকেট’ গড়ে উঠেছিল, নতুন অডিট কমিটির কড়া নজরদারির ফলে তার ওপর বড়সড় ধাক্কা আসতে চলেছে। ১ মাসের এই লক-পিরিয়ড আবাসন শিল্পে সাময়িক মন্দা আনলেও, দূরপাল্লায় তা ক্রেতাদের সুরক্ষার স্বার্থে অত্যন্ত জরুরি ছিল।
গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ | ১ মাস (১লা আগস্ট পর্যন্ত) |
| অডিট কমিটির সদস্য সংখ্যা | ১১ জন বিশেষজ্ঞ |
| আওতাধীন আবাসন | G+5 (ছয় তলা) এবং তার ঊর্ধ্বের বাণিজ্যিক/বেসরকারি বহুতল |
| প্রাথমিক রিপোর্টের সময়সীমা | ৭ দিন |
| চূড়ান্ত রিপোর্টের সময়সীমা | ৯০ দিন (ফায়ার ও ইলেকট্রিক্যাল সেফটিসহ) |
প্রশাসনের এই কড়া পদক্ষেপের পর এখন দেখার, কলকাতার বুকে গজিয়ে ওঠা অবৈধ বহুতল সিন্ডিকেটের রমরমা কতটা বন্ধ করা সম্ভব হয় এবং আগামী দিনে সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ আবাসন পায়।
#কলকাতাআবাসন #বহুতলনির্মাণবন্ধ #শুভেন্দুঅধিকারী #বেআইনিকনস্ট্রাকশন #নবান্নলাইভ #আবাসনঅডিট #গার্ডেনরিচবিপর্যয় #কলকাতাখবর #পশ্চিমবঙ্গরাজনীতি #টিনটিনসিটি
#KolkataHighriseBan #SuvenduAdhikari #BuildingAuditCommittee #KolkataRealEstate #GPlus5BuildingRules #GardenReachCollapse #WestBengalNews #BuildingPlanCancellation #KolkataCorporation #UrbanDevelopmentBengal
![]()







