বিশেষ প্রতিবেদন, নিউজ আমার আলো: পরিবেশ বাঁচাতে এবং খনিজ তেলের ওপর আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশজুড়ে পেট্রোলের সঙ্গে ‘ইথানল’ মেশানোর (Ethanol Blending) ধুম লেগেছে। বর্তমানে আমরা অজান্তেই ২০% ইথানল মিশ্রিত ‘E20’ পেট্রোল ব্যবহার করছি এবং খুব দ্রুত তা ১০০%-এ নিয়ে যাওয়ার আইনি প্রস্তুতিও চলছে। কিন্তু এই তথাকথিত ‘সবুজ জ্বালানি’ বা ‘গ্রিন ফুয়েল’ তৈরির আড়ালে কি নিঃশব্দে ঘনিয়ে আসছে এক ভয়ঙ্কর জলসংকট? ১ লিটার ইথানল তৈরি করতে যে পরিমাণ ভূগর্ভস্থ জল উবে যাচ্ছে, তা শুনলে কপালে চোখ উঠতে বাধ্য।
বিজ্ঞান ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের একাংশ এখন প্রশ্ন তুলছেন— আমরা কি পেট্রোলের খরচ বাঁচাতে গিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তৃষ্ণার্ত রেখে মারার খাদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?
মাত্র ১ লিটার ইথানল এবং হাজার হাজার লিটার জলের অপচয়!
পরিসংখ্যান বলছে, মাত্র ২.৫ মিলিমিটার ইথানল তৈরিতে গড়ে ২৫ লিটার জল খরচ হতে পারে। আর যদি সেই ইথানল সরাসরি চাল বা খাদ্যশস্য থেকে তৈরি করা হয়, তবে ১ লিটার ইথানল উৎপাদনে সর্বোচ্চ ১০,৭৯০ লিটার পর্যন্ত জল খরচ হতে পারে! ভারতের মতো একটি কৃষিপ্রধান দেশে, যেখানে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর প্রতি বছর আশঙ্কাজনকভাবে নামছে, সেখানে জ্বালানি তৈরির জন্য এই বিপুল পরিমাণ জলের ব্যবহার ডেকে আনছে চরম বিপর্যয়।
ভারতের প্রধান শহরগুলোতে জলের জন্য হাহাকার
যে সময় জ্বালানি তৈরির নামে কোটি কোটি লিটার জল মাটির তলা থেকে তুলে নেওয়া হচ্ছে, ঠিক সেই সময়েই ভারতের একাধিক মেট্রো শহর ও গ্রামীণ এলাকায় জলের জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে:
-
পুনে ও বেঙ্গালুরু: পুনেতে তীব্র জলকষ্টের কারণে একদিন অন্তর জল সরবরাহ করা হচ্ছে। অন্যদিকে, সিলিকন ভ্যালি বেঙ্গালুরুতে জলের ট্যাঙ্কারের চাহিদা একধাক্কায় ২৫% বেড়ে গেছে।
-
মুম্বাই ও হায়দরাবাদ: মুম্বাইয়ের জলাশয়গুলোতে মাত্র ৪০ দিনের ব্যবহারযোগ্য জল অবশিষ্ট রয়েছে। হায়দরাবাদে ভূগর্ভস্থ বোরওয়েল শুকিয়ে যাওয়ার কারণে দৈনিক ট্যাঙ্কারের চাহিদা ২০,০০০-এর গণ্ডি পার করেছে।
-
দিল্লি ও বিহার: রাজধানী দিল্লিতে অতিরিক্ত জল ছাড়ার পরেও সাধারণ মানুষের নলকূপ ও কল শুকনো। আর বিহারে গত বছরগুলিতে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর নেমে যাওয়ায় লাখ লাখ সাধারণ চাপাকল (Handpump) একসঙ্গে অকেজো হয়ে পড়েছিল।
ইথানলের তিন প্রজন্ম (1G, 2G, 3G) – আসল সমাধান কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইথানল তৈরি করা কোনো অপরাধ নয়, কিন্তু কোন পদ্ধতিতে তা তৈরি হচ্ছে সেটাই আসল বিষয়। ইথানল মূলত তিন ধরনের প্রযুক্তিতে তৈরি হয়:
-
১ম প্রজন্ম বা 1G Ethanol (বর্তমান বিপর্যয়): এটি সরাসরি মানুষের খাদ্যশস্য যেমন— আখ, ভুট্টা এবং চাল থেকে তৈরি হয়। এতে বিপুল পরিমাণ জল ও ফসলের অপচয় হয়। দুঃখের বিষয়, ভারতে ২০২৫-২৬ বর্ষে যে ৫১৫ কোটি লিটার ইথানল সরবরাহ করা হয়েছে, তার ৯৯%-এর বেশি ছিল এই ক্ষতিকারক 1G ইথানল।
-
২য় প্রজন্ম বা 2G Ethanol (আসল সমাধান): এটি তৈরি হয় কৃষিজাত বর্জ্য বা আবর্জনা থেকে; যেমন— ধানের খড় বা পরালি, গম ও আখের ছিবড়ে থেকে। এর জন্য কোনো অতিরিক্ত জল বা চাষের জমির প্রয়োজন হয় না।
-
৩য় প্রজন্ম বা 3G Ethanol (ভবিষ্যতের প্রযুক্তি): এটি সম্পূর্ণ আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি, যা নোংরা বা দূষিত জলের ওপর জমে থাকা সবুজ শ্যাওলা (Algae) এবং অণুজীব থেকে তৈরি করা সম্ভব।
পরালি পোড়ানো ও দূষণমুক্ত ভারতের চাবিকাঠি
একটি সমীক্ষা (২০২১ সালের অ্যানালিসিস) অনুযায়ী, ভারতে প্রতি বছর প্রায় ৪.৮ কোটি টন পরালি বা খড় মাঠে পুড়িয়ে দেওয়া হয়, যা উত্তর ভারতে মারাত্মক বায়ু দূষণ ঘটায়। যদি এই বর্জ্য অংশকে 2G ইথানলে রূপান্তরিত করা যায়, তবে দেশেই প্রতি বছর প্রায় ২২,০০০ কোটি লিটার ইথানল উৎপাদন করা সম্ভব — যা আমাদের বার্ষিক প্রয়োজনের তুলনায় দ্বিগুণ! এর ফলে কৃষকদের আয় বাড়বে, বায়ু দূষণ কমবে এবং মাটির তলার মূল্যবান জলও বেঁচে যাবে।
তাহলে কেন পিছিয়ে ভারত?
প্রশ্ন উঠতেই পারে, ২য় প্রজন্মের (2G) এত সুন্দর বিকল্প থাকা সত্ত্বেও কেন ভারতে এর উৎপাদন ১%-এরও কম? মূল কারণ হলো, 2G ইথানল তৈরির আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্ল্যান্ট স্থাপনের খরচ বেশ চড়া। কিন্তু পরিবেশবিদদের মতে, সাময়িক মেশিনের খরচের চেয়ে কোটি কোটি মানুষের জীবন এবং জলের মূল্য অনেক বেশি।
সবুজ জ্বালানির নামে ভূগর্ভস্থ জল শেষ করার এই “মহাপাপ” বন্ধ করতে সরকারকে অবিলম্বে 2G এবং 3G ইথানল প্ল্যান্ট তৈরিতে জোর দিতে হবে। অন্যথায়, খনিজ তেলের আমদানি কমলেও, ভারতকে অদূর ভবিষ্যতে জলের তীব্র সংকটে ভুগতে হবে। পেট্রোলে ইথানল ব্লেন্ডিং অবশ্যই হোক, কিন্তু তা যেন মানুষের মুখের জল কেড়ে নিয়ে না হয়।
#জলসংকট #ইথানলপেট্রোল #পরিবেশদূষণ #ভূগর্ভস্থজল #সবুজজ্বালানি #নিউজআমারআলো #ভারত #E20পেট্রোল #জলবাঁচাও
#WaterCrisis #EthanolBlending #E20Fuel #SaveWater #GroundwaterDepletion #GreenFuel #2GEthanol #BiofuelIndia #EnvironmentalCrisis #NewsAmarAlo
![]()







