বিশেষ প্রতিবেদন: বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে যখন যুদ্ধ পরিস্থিতি, সাপ্লাই চেইনের তীব্র সংকট এবং আকাশছোঁয়া পরিবহন খরচে জেরবার বিশ্বের তাবড় তাবড় অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলো, ঠিক তখনই নিঃশব্দে এক অভাবনীয় ইতিহাস তৈরি করল ভারত। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারত যে রেকর্ড ছুঁতে পারেনি, সদ্য প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যানে সেই ম্যাজিক ফিগারই অর্জন করল নয়াদিল্লি। দেশের বাণিজ্য মন্ত্রকের (Commerce Ministry) পক্ষ থেকে মে মাসের যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং রপ্তানির (Export) তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, তা দেখে একপ্রকার চক্ষু চড়কগাছ বিশ্ব অর্থনীতিবিদদের।
ইতিহাসের পাতায় নাম তুলে গত মে মাসে ভারতের মোট পণ্য রপ্তানি (Marchandise Export) ছুঁয়ে ফেলেছে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ভারতীয় অর্থনীতির ইতিহাসে একক কোনো মাসে এটিই এযাবৎকালের সর্বোচ্চ বা ‘অল-টাইম হাই’ রেকর্ড।
রেকর্ড ভাঙা বৃদ্ধির খতিয়ান
বাণিজ্য মন্ত্রক সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, বিশ্ববাজারে ভারতের এই অবিশ্বাস্য উত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ফসল।
-
১৮ শতাংশের রেকর্ড বৃদ্ধি: গত বছরের মে মাসের তুলনায় এই বছরের মে মাসে ভারতের মার্চেন্ডাইজ এক্সপোর্ট বা পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ। যেখানে বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতি শ্লথ, সেখানে ভারতের এই দ্ব্যর্থহীন দ্ব্যর্থহীন প্রবৃদ্ধি বাকি দেশগুলোকে অবাক করেছে।
-
টানা দুই মাসের মেগা পারফর্ম্যান্স: চলতি আর্থিক বছরের প্রথম দুই মাস অর্থাৎ এপ্রিল এবং মে মাস মিলিয়ে ভারতের মোট রপ্তানির পরিমাণ পৌঁছে গিয়েছে ১৬২.৬৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। দুই মাসের এই ধারাবাহিকতা গত বছরের তুলনায় ডবল ডিজিট বা দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে।
-
১ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা: অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, যদি এই ধারা আগামী কয়েক মাস বজায় থাকে, তবে চলতি অর্থবর্ষেই ভারত ১ ট্রিলিয়ন ডলারের (প্রায় ১ লক্ষ কোটি মার্কিন ডলার) ঐতিহাসিক সামগ্রিক রপ্তানির মাইলফলক স্পর্শ করে ফেলবে।
সার্ভিস সেক্টরের ম্যাজিক এবং কারেন্ট অ্যাকাউন্ট সারপ্লাস
সাধারণভাবে ভারতের আমদানি বা ইম্পোর্ট (Import) বেশি হওয়ার কারণে যে বাণিজ্য ঘাটতি বা ‘ট্রেড ডেফিসিট’ (Trade Deficit) তৈরি হয়, তা নিয়ে অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে। মে মাসেও ভারতের পণ্য আমদানি হয়েছে প্রায় ৭৩ বিলিয়ন ডলার, ফলে পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি ছিল ২৮ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। কিন্তু আসল খেলাটা ঘুরে গিয়েছে ভারতের শক্তি বাড়িয়েছে ‘সার্ভিস এক্সপোর্ট’ বা পরিষেবা রপ্তানি এবং রেমিট্যান্সে।
১. পরিষেবা রপ্তানির দাপট: মে মাসে ভারত কেবল পরিষেবা বা সার্ভিস সেক্টরে রপ্তানি করেছে প্রায় ৩৬ বিলিয়ন ডলার, যার বিপরীতে পরিষেবা আমদানি ছিল মাত্র ১৯ বিলিয়ন ডলার। ফলস্বরূপ, শুধুমাত্র এই একটি খাতেই ভারত ১৮ বিলিয়ন ডলারের সারপ্লাস বা উদ্বৃত্ত লাভ করেছে।
২. কারেন্ট অ্যাকাউন্ট সারপ্লাস: গত মার্চ ত্রৈমাসিকে (March Quarter) ভারত প্রায় ৭.১১ বিলিয়ন ডলারের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট সারপ্লাস (Current Account Surplus) নথিভুক্ত করেছে। এর অর্থ হলো পণ্য, পরিষেবা, বিদেশি বিনিয়োগ এবং রেমিট্যান্স—সব মিলিয়ে ভারতের অর্থনীতিতে ডলার আসার গতি, ডলার বেরিয়ে যাওয়ার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
৩. রেকর্ড প্রবাসী ভারতীয়দের রেমিট্যান্স: প্রবাসী ভারতীয়দের পাঠানো টাকার (Remittance) পরিমাণও এই কোয়ার্টারে একলাফে বিশাল বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ত্রৈমাসিকে প্রায় ৪৩ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে দেশে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৩৪ বিলিয়ন ডলার।
কীভাবে সম্ভব হলো এই অসাধ্য সাধন?
বিশ্বের অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেও ভারতের এই বাজিমাতের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করেছে:
-
‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ পণ্যের বিশ্বজোড়া চাহিদা: ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা যতই থাকুক না কেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় ইলেকট্রনিক্স, ইঞ্জিনিয়ারিং গুডস, ফার্মাসিউটিক্যালস (ওষুধ) এবং টেক্সটাইল পণ্যের চাহিদা দিন দিন আকাশছোঁয়া হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে একের পর এক বড় বড় অর্ডার ভারতের ঝুলিতে আসছে।
-
পেট্রোলিয়াম রিফাইনিং ও এক্সপোর্ট বুস্ট: আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লেও ভারত অপরিশোধিত তেল আমদানি করে তা দেশে রিফাইন বা পরিশোধিত করার পর পুনরায় পেট্রোলিয়াম পণ্য হিসেবে এক্সপোর্ট করছে। মে মাসে এই পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট এক্সপোর্টে ব্যাপক বুস্ট আসায় তেলের মূল্যবৃদ্ধি ভারতের বাণিজ্যে শাপে বর হয়েছে।
-
আসন্ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA): ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্য (UK) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) সাথে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে এবং তা বাস্তবায়নের পথে। এর পাশাপাশি আমেরিকার (US) সাথেও বড়সড় বাণিজ্যিক চুক্তি পাইপলাইনে রয়েছে। এই চুক্তিগুলি সম্পূর্ণ কার্যকর হলে ভারতের রপ্তানি গ্রাফ কোথায় পৌঁছাবে, তা সহজেই অনুমেয়।
চীন ও আমেরিকার কপালে চিন্তার ভাঁজ
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলের ধারণা ছিল, বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ এবং সাপ্লাই চেইনের অচলাবস্থার কারণে ভারতের রপ্তানি বাজার ভেঙে পড়বে। অনেক পশ্চিমী দেশই আশা করেছিল, অর্থনৈতিক সংকটে পড়লে ভারত তাদের নিজস্ব শর্তে বাণিজ্য করতে বাধ্য হবে। এমনকি পশ্চিমী সংবাদমাধ্যমগুলোতেও ভারতের ‘ট্রেড গ্যাপ’ বা বাণিজ্য ঘাটতি কমে যাওয়া নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করা হচ্ছে।
কিন্তু সমস্ত জল্পনা ও নেতিবাচক পূর্বাভাসকে উড়িয়ে দিয়ে ভারতীয় অর্থনীতি এখন রকেটের মতোই দ্রুতগতি সম্পন্ন, শক্তিশালী এবং সুরক্ষিত অবস্থানে রয়েছে। ভারতের এই ধামাকা পারফর্ম্যান্স এশিয়া তথা বিশ্ব বাণিজ্যে চীনের একাধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। আত্মনির্ভর ভারতের এই অর্থনৈতিক জয়যাত্রা আগামী দিনে দেশকে বিশ্বের শীর্ষতম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করার পথকে যে আরও প্রশস্ত করল, তা বলাই বাহুল্য।
#ভারতেররপ্তানি #ভারতঅর্থনীতি #আমদানিইম্পোর্ট #মেডইনইন্ডিয়া #ব্যবসাবাণিজ্য #রেকর্ডরপ্তানি #কারেন্টঅ্যাকাউন্ট #ভারতেরইতিহাস #অর্থনৈতিকউত্থান #বাংলাখবর
#IndiaExport #IndianEconomy #ImportExportBusiness #MadeInIndia #EconomicRecord #CommerceMinistry #TradeSurplus #IndiaGrowthStory #GlobalTrade #BusinessNews #TrendingNewsIndia
![]()







