নয়াদিল্লি, মে ১৫: মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে এক অভূতপূর্ব জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন কিংবা জার্মানির মতো উন্নত দেশগুলিতে যখন পেট্রোল-ডিজেলের দাম আকাশ ছুঁয়েছে, তখন ভারত সরকার নিজের কাঁধে বিপুল আর্থিক লোকসান নিয়ে দেশের আমজনতাকে এতদিন সুরক্ষিত রেখেছে। তবে এই বৈশ্বিক মহামন্দা ও সংকটের আঁচ থেকে দেশের অর্থনীতি এবং ১৪৫ কোটি দেশবাসীকে বাঁচাতে এবার সরাসরি ময়দানে নেমেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। গত ২৪ ঘণ্টায় হায়দরাবাদ ও ভদোদরা থেকে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তিনি ৭টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কড়া ‘আর্থিক শৃঙ্খলা’ বা অর্থনৈতিক অনুশাসনের বার্তা দিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তা আসলে একবিংশ শতাব্দীর এক নতুন ‘অর্থনৈতিক দেশপ্রেমের’ আহ্বান। করোনা আমলের লকডাউনের মতো এবারও দেশের স্বার্থে সাধারণ মানুষকে জীবনযাত্রায় কিছু জরুরি পরিবর্তন আনার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বৈশ্বিক মানচিত্রে পেট্রোলের দাম বনাম ভারত:
গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতিতে জ্বালানির দাম ২৫% থেকে ৫০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু ভারতই বিশ্বের একমাত্র বড় দেশ যেখানে এখনও পেট্রোলের দামের বৃদ্ধির হার ০%! এক নজরে দেখে নিন বিশ্ববাজারের বর্তমান পরিস্থিতি:
-
সিঙ্গাপুর: ₹২৪০ প্রতি লিটার (৩০% বৃদ্ধি)
-
ইতালি: ₹২১০ প্রতি লিটার (৩০% বৃদ্ধি)
-
জার্মানি: ₹২০৫ প্রতি লিটার (২৭% বৃদ্ধি)
-
ফ্রান্স: ₹২০০ প্রতি লিটার (২৫% বৃদ্ধি)
-
ব্রিটেন: ₹১৯৫ প্রতি লিটার (২২% বৃদ্ধি)
-
আমেরিকা (বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদক হওয়া সত্ত্বেও): ₹১১৫ প্রতি লিটার (৫১.৪% বৃদ্ধি)
-
ভারত: মাত্র ₹৯৫ প্রতি লিটার (০% বৃদ্ধি)
সরকারের ‘রক্ষাকবচ’ ও প্রতিদিন ১,০০০ কোটির লোকসান
বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লেও ভারতের সাধারণ মানুষের পকেটে যাতে টান না পড়ে, তার জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে কেন্দ্র সরকার। সরকার পেট্রোলে লিটার প্রতি ₹২৪ এবং ডিজেলে লিটার প্রতি ₹৩০ করে কর মকুব করে সমস্ত বোঝা নিজের কাঁধে নিয়েছে। ডিজেলে আবগারি শুল্ক ₹১০ থেকে কমিয়ে শূন্য এবং পেট্রোলে ₹১৩ থেকে কমিয়ে মাত্র ₹৩ করা হয়েছে। এর ফলে দেশের সরকারি তেল সংস্থাগুলির প্রতিদিন প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে।
তবে ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত। দেশের কাছে বর্তমানে ৭০৩ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৬৬ লক্ষ কোটি টাকা) বৈদেশিক মুদ্রা ভাণ্ডার (Foreign Exchange Reserve) রয়েছে, যা দিয়ে আগামী ১০-১১ মাস অনায়াসে যেকোনো আমদানি সামলানো সম্ভব। এছাড়াও দেশে ৬০ দিনের অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস এবং ৪৫ দিনের রান্নার গ্যাসের (LPG) স্টক মজুত রয়েছে। তবুও ভবিষ্যৎ সংকট এড়াতে আগাম সতর্কতাই প্রধানমন্ত্রীর এই ৭টি মহানির্দেশ।
দেশের অর্থনীতি রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর সেই ৭টি বিশেষ আহ্বান:
১. পেট্রোল-ডিজেলের ব্যবহার কমান: অত্যন্ত প্রয়োজন ছাড়া গাড়ি বের না করে মেট্রো বা গণপরিবহন ব্যবহার করুন। প্রয়োজনে ‘কার পুলিং’ করুন। ভারত তার প্রয়োজনের ৯০% তেল বিদেশ থেকে আমদানি করে, যা বাঁচাতে পারলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
২. ১ বছর সোনা কেনা বন্ধ রাখুন: সোনা কেনার জন্য ভারতকে ডলারে পেমেন্ট করতে হয়। ২০২৪ সালেই দেশ ৫.৫ লক্ষ কোটি টাকার সোনা আমদানি করেছে। প্রতিদিন ভারত ১৮০০ কোটি টাকার সোনা কেনে। তাই আগামী ১ বছর বিয়ে বা অন্য অনুষ্ঠানে সোনা কেনা স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
৩. ওয়ার্ক ফ্রম হোম (Work From Home): করোনা কালের মতো কর্পোরেট ও অন্যান্য অফিসগুলিকে অনলাইন মিটিং ও ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে কাজ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়।
৪. বিদেশ ভ্রমণ ও ডেস্টিনিশন ওয়েডিং বর্জন: গরমের ছুটি বা উৎসবের মরশুমে বিদেশে গিয়ে টাকা খরচ না করে নিজের দেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে যান। ২০২৩ সালে ভারতীয়রা বিদেশে গিয়ে প্রায় ৭,২০,০০০ কোটি টাকা খরচ করেছেন। এই টাকা দেশের ভেতরে খরচ হলে দেশের অর্থনীতিই চাঙ্গা হবে।
৫. রাসায়নিক সারের ব্যবহার অর্ধেক করা: কৃষকদের প্রতি আহ্বান, জমিতে কেমিক্যাল ফার্টিলাইজারের ব্যবহার ৫০% কমিয়ে প্রাকৃতিক ও জৈব চাষের (Organic Farming) দিকে নজর দিন। কারণ সারের জন্য ভারতকে প্রতি বছর ১.৫ লক্ষ কোটি টাকা বিদেশের মাটিতে দিতে হয়
৬. বিদেশী ব্র্যান্ড বর্জন ও ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ ব্যবহার: দেশের টাকা যাতে কোনোভাবেই বাইরে না যায়, তার জন্য দেশীয় পণ্য বা স্বদেশী ব্র্যান্ডের জিনিস ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে।
৭. ভোজ্য তেলের ব্যবহার হ্রাস: রান্নায় তেলের ব্যবহার কমানোর অনুরোধ। ভারত তার ভোজ্য তেলের ৬০% বিদেশ থেকে কেনে। তেলের ব্যবহার কমলে দেশের টাকা যেমন বাঁচবে, তেমনই কমবে স্থূলতা ও হৃদরোগের ঝুঁকি।
পরিশেষে: যুদ্ধক্ষেত্রে কেবল সেনারাই লড়ে না, দেশের সংকটকালে সাধারণ নাগরিকের আর্থিক সচেতনতাও এক বড় যুদ্ধ। প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বান কোনো ভয়ের পরিবেশ তৈরির জন্য নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখার এক সম্মিলিত লড়াই। আপনার ছোট একটি সাশ্রয় দেশের অর্থনীতিকে এক মহাবিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
#পিএমমোদী #অর্থনৈতিকসংকট #ইরানযুদ্ধ #পেট্রোলডিজেলেরদাম #সোনাআমদানি #দেশপ্রেম #আর্থিকশৃঙ্খলা #ভারতসরকার #স্বদেশী পণ্য #সংবাদপ্রতিবেদন #গুগলডিসকভারি
#PMModi #EconomicCrisis #IranWarImpact #PetrolDieselPrice #GoldImportIndia #FinancialDiscipline #MakeInIndia #VocalForLocal #IndianEconomy #TrendingNews
![]()






