পরম পূজনীয় শ্রীমৎ শ্রীল জয়পতাকা স্বামী গুরু মহারাজ
সায়ন মজুমদার
🪷 জয় পতিত পাবন শ্রীল গুরু মহারাজ কি জয় 🪷
আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন)-এর প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য জগৎগুরু শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদের এক অন্যতম প্রধান ও অত্যন্ত প্রিয় পার্ষদ হলেন শ্রীমৎ শ্রীল জয়পতাকা স্বামী গুরু মহারাজ। গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার ও প্রসারে এবং বিশেষ করে মহাপ্রভুর লীলাভূমি শ্রীধাম মায়াপুরকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করতে তাঁর অবদান অনন্য। ১৯৪৯ সালের ৯ই এপ্রিল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের মিলওয়াকিতে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন গর্ডন এর্ডম্যান নামে এই মহান আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের জন্ম হয়। যৌবনে আমেরিকার বিখ্যাত ব্রাউন ইউনিভার্সিটিতে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে অধ্যায়ন করার সময়ই তাঁর অন্তরে গভীর আধ্যাত্মিক ব্যাকুলতা জেগে ওঠে। এই সত্যানুসন্ধানের তীব্র ইচ্ছাই তাঁকে শেষ পর্যন্ত পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভক্তিভাবনার দিকে ধাবিত করে।
পরবর্তীকালে ১৯৬৮ সালে কানাডার মন্ট্রিয়লে শ্রীল প্রভুপাদের সঙ্গে তাঁর চাক্ষুষ সাক্ষাৎ ঘটে এবং তিনি ইসকনে যোগদান করেন। শ্রীল প্রভুপাদ তাঁকে প্রথম দীক্ষা প্রদান করে নাম রাখেন ‘জয়পতাকা দাস ব্রহ্মচারী’। আধ্যাত্মিকতার প্রতি তাঁর গভীর নিষ্ঠা, গুরুভক্তি ও সেবাপরায়ণতা দেখে ১৯৭০ সালে কলকাতার রাধাশষ্টমীর এক পরম পবিত্র তিথিতে শ্রীল প্রভুপাদ তাঁকে সন্ন্যাস দীক্ষা দান করেন। সন্ন্যাস গ্রহণের পর থেকেই তাঁর কাঁধে এক বিশাল ঐশ্বরিক দায়িত্ব অর্পিত হয়। স্বয়ং শ্রীল প্রভুপাদ তাঁকে শ্রীধাম মায়াপুরের উন্নয়নের মুখ্য দায়িত্বভার অর্পণ করেছিলেন। গুরুদেবের আদেশকে শিরোধার্য করে তিনি তৎকালীন গ্রামীণ মায়াপুরের প্রতিকূল পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নেন। প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি সেখানে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে কৃষিকাজ শুরু করেন এবং স্থানীয় মানুষদের অতি আপন করে নিতে গভীর মমতায় তাদের কাছ থেকে বাংলা ভাষা আয়ত্ত করেন। আজ তাঁর সাবলীল বাংলা ভাষণ এবং কীর্তন বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ ভক্তের হৃদয় জয় করে নিয়েছে।
চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মস্থান শ্রীধাম মায়াপুরকে আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করার পেছনে তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও দূরদর্শিতা জড়িয়ে রয়েছে। তিনি শুধু মায়াপুর উন্নয়নের পুরোধা ব্যক্তিত্বই নন, বরং বিশ্বজুড়ে ইসকনের গ্রন্থ বিতরণ, বহু নয়নাভিরাম মন্দির নির্মাণ এবং বিশেষ করে গ্রামীণ বাংলায় আর্ত মানুষের সেবায় ‘ফুড ফর লাইফ’ (অন্নামৃত) কর্মসূচির এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। ইসকনের সর্বোচ্চ পরিচালনা পর্ষদ বা গভর্নিং বডি কমিশনের (GBC) একজন অত্যন্ত সক্রিয় ও দীর্ঘকালীন সদস্য হিসেবে এবং আন্তর্জাতিক সদর দফতর মায়াপুরের কো-ডাইরেক্টর রূপে তিনি আজও ইসকনকে সঠিক দিশা দেখাচ্ছেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে অনুপ্রেরণামূলক দিকটি হলো তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও গুরুভক্তি। বিগত বছরগুলোতে তিনি তীব্র শারীরিক অসুস্থতা, স্ট্রোক এবং পরবর্তীতে অত্যন্ত জটিল লিভার ও কিডনি প্রতিস্থাপনের মতো বড় অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে গেছেন। কিন্তু কোনো শারীরিক প্রতিবন্ধকতাই তাঁর প্রচার কাজে বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি। হুইলচেয়ারে বসেও তিনি নিরলসভাবে দেশ-বিদেশে ছুটে চলেছেন ভগবানের বাণী প্রচারের জন্য। তাঁর এই অতিমানবীয় সহনশীলতা ও সেবাপরায়ণতার জন্য ভক্তসমাজে তিনি শ্রদ্ধার সাথে “জেন্টল জায়ান্ট” বা “নম্র মহাবীর” নামে অভিহিত হন।
শ্রীল জয়পতাকা স্বামী গুরু মহারাজের এই প্রচার আন্দোলনকে বৈষ্ণব ইতিহাসে শ্রীমন মহাপ্রভুর লীলার সাথে তুলনা করা হয়। গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু যেমন পুরীতে সন্ন্যাস গ্রহণের পর তাঁর সবচেয়ে প্রিয় পার্ষদ পরম দয়ালু শ্রী নিত্যানন্দ প্রভুকে গৌড়দেশে অর্থাৎ নবদ্বীপে ভক্তিধর্ম প্রচারের জন্য পাঠিয়েছিলেন, ঠিক তেমনি শ্রীল প্রভুপাদও তাঁর অত্যন্ত প্রিয় এবং বিশ্বস্ত এই শিষ্যকে পশ্চিমবঙ্গের শ্রীধাম মায়াপুরের পবিত্র মাটিতে প্রচারের গুরুদায়িত্ব দিয়ে নিযুক্ত করেছিলেন। আজ বিশ্বজুড়ে তাঁর হাজার হাজার দীক্ষিত শিষ্য ও কোটি কোটি অনুরাগী তাঁর কৃপায় কৃষ্ণভাবনামৃতের সন্ধান পেয়েছেন। গুরু মহারাজের এই অপার করুণা ও আশীষকে স্মরণ করে ভক্তবৃন্দ পরম শ্রদ্ধায় গেয়ে ওঠেন যে, তাঁর অসীম প্রসাদ ও কৃপাবারি লাভ করেই আমাদের হৃদয়ের জীর্ণ ভক্তি-লতিকা আবার সজীব হয়ে উঠেছে, তাই জনমে জনমে শ্রীল জয়পতাকা স্বামীই যেন আমাদের পরম গুরু ও পথপ্রদর্শক হয়ে থাকেন।
পরিশেষে, এই মহান আচার্যের চরণে প্রণতি জানিয়ে ভক্ত সমাজ উচ্চারণ করেন তাঁর পবিত্র প্রণাম মন্ত্র:— “নমো ওম বিষ্ণুপদায়ক কৃষ্ণ পৃষ্ঠায় ভূতলে শ্রীমতে জয়পতাকা স্বামী নীতি নামিনি। নামায়া আচার্য পদায়ক নিতাই কৃপা প্রদানে গৌর কথা দামোদয় নগর গ্রামে তারিনী।” অর্থাৎ, যিনি পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র, সেই শ্রীমৎ জয়পতাকা স্বামী গুরু মহারাজের চরণে পরম শ্রদ্ধা জানাই। যিনি আচার্য পদে অধিষ্ঠিত হয়ে পরম দয়ালু শ্রী নিত্যানন্দ প্রভুর কৃপাবারতা এবং গৌরকথা আবালবৃদ্ধবনিতা সবার মাঝে বিলিয়ে দিচ্ছেন এবং প্রতিটি নগরে ও গ্রামে গ্রামে পতিত জীবদের উদ্ধার করছেন, সেই পতিত পাবন গুরু মহারাজের জয় হোক।
—oooXXooo—
![]()








