নিঝুম রাতে মায়ার কান্না (থ্রিলার)
বাসুদেব দাশ
শহরের এক কোনে একটা ছোট্ট পুরানো বাড়ীতে পনেরো বছর আগে একটা খুন হয়ে ছিল। খুনের কিনারা হয়নি তখন। শহরটির নাম কালিয়া গঞ্জ। কালিয়া গঞ্জ একটি অনামি শহর। জন সংখ্যা খুবই কম। যে কোন ব্যস্ত শহরের তুলনায় একদমই হাল্কা। ফাঁকা ফাঁকা বাড়ী ঘর। গাছপালা আছে প্রচুর। এক কথায় সবুজে মোরানো শহর। আজকাল তো বড় বড় শহরে গাছপালা, পাখি, পোকা-মাকড় সব কিছুই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবু এই অনামি শহরে অল্প হলেও দেখতে পাওয়া যায়। রাস্তা গুলো সব মসৃন। শহরের প্রায় সব রাস্তাই কালো পিচ দিয়ে ঢালাই করা সাপের মত সোর্পিল আর তেলতেলে । তেলতেলে রাস্তায় সো সো করে গাড়ি গুলো ছুটে চলে যায়। রাস্তা দিয়ে যেমন প্যাসেঞ্জার নিয়ে বাস চলাচল করে তেমনি পণ্যবাহী বড় বড় লরি, ট্রাকও চলাচল করে। এক ছুটির দিন মাঝ রাতে একটা তৈল বাহী ট্যাঙ্কার ওর নরমাল গতির থেকে একটু বেশি গতিতে এসে বাঁক ঘুরতে গিয়ে উল্টে যায়। উল্টে গিয়ে গাড়িটা ঘষটাতে ঘষটাতে অনেকটা পথ এগিয়ে যায়। ড্রাইভারের বিশেষ একটা চোট লাগেনি। ট্যাঙ্কের একটা মুখের ঢাকনা খুলে গিয়ে ভক ভক করে প্রচুর সর্ষের তেল রাস্তায় পরে ছড়িয়ে যায়। তেল পরে রাস্তা ভীষণ স্লিপারী হয়ে যায়। কোন গাড়ি ঐ রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে পারছিল না। এমন কি পায়ে হেঁটে মানুষের পক্ষ্যে চলাচল করাও সম্ভব হচ্ছিল না। ঐ দিন সন্ধ্যা বেলা বেশ মুষল ধারে বৃষ্টি হয়েছিল ঐ অঞ্চলে । ঐ ট্যাঙ্কারের ড্রাইভার বৃষ্টির কথা জানতে না পাড়ায় সেই ভাবে সাবধানতা অবলম্বন করে গাড়ি চালাতে পারেনি। তাই ট্যাঙ্কারটা উল্টে যায় । পুলিশ এসে উদ্ধারকার্য শুরু করে । সারা রাত গিয়ে পরের দিন দুপুর বেলা পর্যন্ত উদ্ধার কার্য চলে । ততক্ষন গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকে ঐ রাস্তায় । শহরের ইয়ং ছেলেরা রাস্তার বাঁকে বাঁকে সকাল সন্ধ্যা আড্ডা মারে। গরম কালে যখন কুলকুল করে গাছের ডাল পালার ফাঁকা দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া বয়ে আসে তখন অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা চলে । সেদিনকার জন্য ঐ আড্ডাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এই গ্রাম ঘেঁষা শহরটা এক বার খবরের কাগজের শিরোনামে জায়গা পেয়েছিল। এই শহরের বয়স্ক লোকদের কারো কারো মুখে সেই কাহিনী আজও শুনতে পাওয়া যায় । এই ছোট্ট শহরের এক কোনে বহু দিনের পুরানো একটা এক তলা বাড়ী আছে। বাড়ীর বর্তমান মালিক বাড়ীটা এক জনের কাছ থেকে সেকেন্ড হ্যান্ড কিনেছিলেন। কেনার পর থেকেই তিনি বাড়ীটা বিক্রি করার জন্য বিভিন্ন ভাবে চেষ্টা চরিত্র করতে থাকেন কিন্তু বিক্রি করতে পারেন না। এক জন কাস্টমারও পাওয়া যায় নিয বাড়ীটা কেনার জন্য । এই কিনতে না চাওয়ার পিছনে নিশ্চই কোন কারণ আছে । হয়তো সেই কারণ সত্য হোলেও হতে পারে আবার ভুলও হতে পারে। বেশ কিছু দিন ধরেই এই বাড়ীটার সম্মন্ধে একটা খবর চারি দিকে চাউর হয়ে আছে যে দুপুর রাতে এই বাড়ীটার মধ্যে থেকে একটা মেয়ের কান্নার আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়। এই কান্নার খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়তেই এলাকার মানুষের মধ্যে একটা চাপা আতঙ্ক দেখা দেয়। সব সময় কানাঘুষা চলতেই থাকে। ভয়ে রাত বিরোতে মানুষ এই বাড়ীটার ধারে কাছে ঘেষতে চায় না। একটু দূরত্ব বজায় রেখে চলে। যাকে বলে সাবধানের মার নেই । কেউ এক জন বাড়ীটা কেনার জন্য দেখতে এলেই এলাকার লোকে তাকে সাবধান করে বলে যে বাড়ীটার মধ্যে রাতে কান্নার আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়। তখন আর সেই ক্রেতা বাড়ীটা কিনতে চায় না। এই ভাবেই চলছিল । এক দিন একটি ছেলে, “বাবিন” এই সাঁতাশ আঠাশ বছর বয়স হবে বাড়ীটা দেখতে আসে। সে কলকাতা পুলিশে চাকরি করে। কয়ক দিনের ছুটি নিয়ে সে ঐ শহরে ঐ বাড়ীটা কিনবে বলে দেখতে আসে । বাড়ীটার আশপাশ ঘুরে দেখে নেয় সে। এলাকার কয়েক জন প্রবীণ ব্যক্তি তাকে সাবধান করে বলে দিয়েছেন যে ঐ বাড়ীতে রাতে মেয়ে মানুষের কান্নার আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়। কিন্তু বাবিন তাতে ভয় পায় নি । সে বাড়ীটা কিনতে চায়। এত কম দামে এই রকম একটা বাড়ী এই শহরে সে আর পাবে না । তাই সে এই বাড়ীটা কিনবে বলে মন স্থির করেছে । বাড়ীর মালিকের সঙ্গে তার কথা বার্তা হয়েছে । বাবিন বাড়ীর মালিককে বলেছে যে কেনার আগে সে কয়েকটা দিন রাতে এই বাড়ীতে থাকতে চায়। এই বাড়ীতে থেকে সে দেখবে যে কান্নার বিষয়টা ঠিক কি। মালিক বাবিনের এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান এবং এই বাড়ীতে তার থাকার ব্যবস্থা করে দেন।
প্রথম দিন বাবিন তাড়াতাড়ি করে রাতের খাবার খেয়ে সারে দশটার দিকে ঘুমাবে বলে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। অচেনা জায়গা অচেনা সব লোকজন। তাই কার সঙ্গে আর কথা বলে সময় কাটাবে। যেহেতু সে অচেনা লোক তাই যার সঙ্গেই সে কথা বলতে যায় সেই তাকে রাতের কান্নার বিষিয়ে সাবধান করে। অযাচিত ভাবে জ্ঞান দিয়ে মানুষকে দুর্বল করে দিয়ে মানুষ যে কি আনন্দ পায় সেটাই একটা অদ্ভুত বিষয়। সেটা শুনতে বাবিনের একদম ভালো লাগে না। তাই সে সেভাবে কারো সঙ্গে কথা বাড়ায় না। সে ঘরে গিয়ে তাড়াতাড়ি করে রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পরে। শোবার দু ঘন্টা বাদে সে প্রথম বার কান্নার আওয়াজ শুনতে পায়। সে উঠে বিছানায় বসে কান খাঁড়া করে থাকে। আবার! হ্যাঁ আবার কান্না!মেয়েলি কান্না! বাবিন উঠে সঙ্গে সঙ্গে বিছানা থেকে নেমে ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে । অন্ধকারের মধ্যে কারোকে সে দেখতে পায় না। সে তার হাতে থাকা তিন ব্যাটারির টর্চ জ্বালিয়ে চারি দিকে খোঁজ করে কিন্তু কোথাও কারোকে খুঁজে পায় না। সে ঘরে ঢুকে দরজা ভালো করে বন্ধ করে আবার শুয়ে পরে। তার শরীরে জার্নির ধকল ছিল তাই সে অল্প সময়ের মুধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে। এক ঘুমে রাত গড়িয়ে সকাল হয়ে যায়। রাতের এই সব কথা সে আর কারোকে বলেনি। এই কথা পাঁচ কান হয়ে চারি দিকে আতঙ্ক ছাড়াবে সেই ভয়ে । পরের দিনও বাবিন তাড়াতাড়ি করে খেয়ে রাত এগারোটার দিকে শুয়ে পরে। সবে একটু হাল্কা হাল্কা ঘুম এসেছে তার চোখে । এমন সময় সেই মেয়েলি কান্নার শব্দ তার কানে ভেসে আসে। বাবিন উঠে বিছানায় বসে মোবাইলের সুইচ অন করে দেখে যে রাত একটা বাজে। সে বসে থাকে চুপ করে। একটু পরে আবার সেই কান্নার আওয়াজ। বাবিন ধরফর করে উঠে টর্চ হাতে করে বাইরে বেরিয়ে আসে । কিন্তু আজও সে টর্চের আলোতে বাইরে কারোকে দেখতে পায় না। বাইরে থেকে যখন ঘরে ঢুকতে যাবে এমন সময় দেখে যে ঘরের বারান্দায় সাদা সাদা কি একটা পরে আছে। টর্চ জ্বালিয়ে ভাল করে দেখে যে একটা মেয়ের ছবি পরে আছে। ছবিতে মেয়েটা হাসছে। ছবিটার পিছনে লেখা,” আমি মায়া, আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করে আছি “। বাবিন ভাবলো যে কেউ এক জন মজা করে হয়তো এই সব করছে। সে পাত্তা দিল না। সে ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর আবার সেই মেয়েলি কান্না। এবার সে ঘর থেকে বেরিয়ে একটু এগোতেই দেখে যে তার সামনে সামান্য একটু দূরে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে চুপ করে । সাদা শাড়ি পড়া। চুল খোলা,কোমর পর্যন্ত ঝুলছে।সে মুখটা লুকিয়ে রেখেছে। দেখতে দিচ্ছে না। বাবিন মুখটা দেখতে না পাওয়ায় মেয়েটিকে চিনতে পারলো না । হঠাৎ মেয়েটি কোথায় ভ্যানিস হয়ে যায়। মেয়েটিকে সে ধারে কাছে আর দেখতে পায় না। হঠাৎ মেয়েটা অদৃশ্য থেকে কথা বললো। সে বললো “তুমি আমাকে খুঁজে বের করো। আমাকে খুঁজে বের করতে না পারলে তুমি এখানে আটকে পড়ে থাকবে। আমি তোমাকে এখান থেকে বের হতে দেবো না। তোমার বের হবার সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। তুমি গোলক ধাঁধায় আটকে থাকবে । ” বিষয়টা হাড় হীম করা ভূতের গল্পের মত ভয়ঙ্কর হলেও বাবিন ভয় পেলো না। বাবিন ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ে। তার অল্প সময়ের মধ্যে রাত শেষ হয়ে ভোর হয়ে যায়।রাতের গাঢ় অন্ধকার ঠেলে সূর্যদেব প্রখর আলোক রশ্মি নিয়ে স্বমহিমায় প্রকাশ পায় পূর্ব দিগন্তে। দিক দিগন্তে আলোর প্লাবন বইয়ে দেয়। সকালের উজ্জ্বল স্নিগ্ধ আলো পর্দার ফাঁক দিয়ে বাবিনের চোখে এসে পরে। বাবিন ঘুম থেকে উঠে চোখ পিট পিট করতে করতে বিছানা ছেড়ে বেরিয়ে আসে। পাখিরা মিচিরমিচির করতে করতে বাসা ছেড়ে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পরে পাখা মেলে আকাশের বুকে । বাবিন এই কেসের তদন্ত শুরু করবে বলে স্থির করে । তার মাথায় নানা রহস্য ঘুরপাক খেতে থাকে । বাবিন ভাবলো যে এই কেসের রহস্য উদ্ধার করতে হলে তাকে এই বাড়ীটার ইতিহাস জানতে হবে। এই বাড়ীর ইতিহাস ঘেটে দেখতে হবে যে এই বাড়ীতে কোন মৃত্যু রহস্য আছে কিনা। সেটা আত্ম হত্যা হোক বা খুন হোক। মোট কথা এবনরমাল ডেথ না ন্যাচারাল ডেথ সেটা তাকে জানতে হবে । যদি আনন্যাচারাল ডেথ হয়ে থাকে তবে সেই ক্ষেত্রে তার অতৃপ্ত আত্মা বাড়ীটার মধ্যে ঘুরে বেড়াতে পারে। মাঝে মাঝে সে তার প্রিয়জন দের দেখা দিতে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে। কারো উপর রাগ থাকলে তার প্রতিশোধ সেই অতৃপ্ত আত্মা নিতে পারে। সেই ক্ষত্রে একটা ভয়ের বিষয় অবশ্যই থাকে।
বাবিন পুলিশ অফিসার হিসাবে এই কেসের তদন্ত ভার নিজের হাতে নিজেই নিয়ে নেয় । সে তদন্ত শুরু করার প্রস্তুতি নিতে থাকে । তদন্ত শুরু করার আগে সে ভাবে যে পনেরো বছরের পুরানো একটা কেসের সমাধান করা খুবই কঠিন কাজ। এই কেসের ফাইল পত্তর সব চাপা পড়ে পড়ে তার উপর পাহাড় জমে গেছে। ফাইলের উপর বিস্তর ধুলো বালি জমে গেছে। এই ধুলো বালি ঝেড়ে ঝেড়ে সেই ফাইল খুঁজে বের করা এক প্রকার অসম্ভব ব্যাপার । কিন্তু যেভাবেই হোক এই কেসটার সমাধান সুত্র তাকে খুঁজে বের করতেই হবে। এই কেসটা তার জীবনের সঙ্গে সম্প্রীক্ত হয়ে আছে বলেই সে মনে করে । এই কেসটাকে কোন ভাবেই হাল্কা ভাবে নেওয়া যাবে না। এই কেসের প্রায়োরিটি তাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েই বিচার করতে হবে। বাবিন এক দিকে পুরানো ফাইল পত্তর ধুলো ঝেড়ে ঝেড়ে ঘাঁটতে থাকে আর অন্য দিকে পুরানো খবরের কাগজ ঘাঁটতে শুরু করে। যদি কোন এবনরমাল ঘটনা এই বাড়ীটার সঙ্গে যুক্ত থেকে থাকে তবে সেটা খবরের কাগজ ঘেঁটেও পাওয়া যেতে পারে । যদি কোন সাংবাদিক বন্ধু খবর সংগ্রহ করতে এসে এই মর্মান্তিক খুনের ঘটনাটা সে জানতে পারে এবং সে তার খবরের কাগজে ঘটনাটা প্রকাশ করে থাকে তবে কাগজ ঘেঁটে সেটা পাওয়া যাবার সম্ভবনা আছে। বাবিন দিন রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে খবরের কাগজ ঘাঁটতে থাকে। ঘাঁটতে ঘাঁটতে পনেরো বছর আগেকার একটা খবরের কাগজ সে খুঁজে পায়। সেই কাগজটার শিরোনামে এই বাড়ীটার একটা হত্যা রহস্যর স্টেটমেন্ট আছে। কাগজটা বের করে এনে বাবিন পড়ে বাড়ীটার বিষয় সব জানতে পেরে যায় । পনেরো বছর আগে এই বাড়ীতে একটি মেয়ে খুন হয়েছিল। মেয়েটির নাম মায়া। খুনের লাশ পাওয়া যায় নি আর খুনিও ধরা পড়েনি। এই বাড়ীটাতে সেই সময় একটা পরিবার বাস করতো। সেই পরিবারে খুন হওয়া মেয়ে টি, তার বাবা ও তার এক দাদা থাকতো এই বাড়ীটাতে । মেয়েটির নাম ছিল মায়া । তখন মেয়েটি এবং তার দাদা খুবই ছোট ছিল। মেয়েটিকে কয় দিন বাড়ীতে দেখতে না পেয়ে তার দাদা তার বাবাকে এক দিন জিজ্ঞেস করেছিল যে,” বাবা মায়া কোথায় ?” তার উত্তরে বাবা ছেলেকে বলেছিল যে “মায়া হারিয়ে গেছে। ” ” কোথায় হারিয়ে গেছে ? ” “জানি না।” বাবার মুখে এই কথা শুনে বাবিন সে দিন ভীষণ কষ্ট পায়। তার বুক ফাঁটা কান্নার কথা সেদিন সে বলতে পারেনি কারোকে । আবার মেনেও নিতে পারেনি বোনের এই হারিয়ে যাবার রহস্য । তার বয়স কম বলে সে এই হারিয়ে যাওয়া নিয় সে দিন বেশি কথা করতে পারেনি। তার বাবা তাকে ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিয়েছিল । এই হারিয়ে যাওয়া তার কাছে রহস্য হয়েই রয়ে গিয়েছিল এতো দিন ধরে । ভাঙা মন নিয়ে সে যন্ত্রনায় দগ্ধ হচ্ছে এতো গুলো বছর ধরে । ভঙ্গ হৃদয়ে সে প্রতিজ্ঞা করে যে এক দিন বোনের হারিয়ে যাবার রহস্য সে উদ্ঘাটন করবে এবং দোষী যেই হোক না কেনো তাকে সে জেলের ঘানি টানাবে।
তৃতীয় দিন রাতে মেয়েটি আবার আসে বাবিনের কাছে। এবার মেয়েটি তার মুখ দেখায় । মেয়েটিকে দেখে বাবিনের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। মেয়েটিকে তার চেনা চেনা লাগে।আরে!! এ যে অবিকল তার বোন মায়ার মত দেখতে। না! বোনই তো । হ্যাঁ মেয়েটি তার বোন মায়া। বাবিন বলে, ” তুই আমাকে আগে বলিসনি কেনো ? ” বাবিন কেঁদে ফেলে। মায়া হাসতে থাকে। বলে, ” দাদা তুই আমাকে খুঁজতে এসেছিস এবার আমি মুক্ত হয়ে যাবো। আমার আত্মা তৃপ্ত হয়ে গেছে। আমার আর কোন কষ্ট নেই। আমার নিজের দাদা আমাকে মনে রেখে পনেরো বছর পর আমাকে খুঁজতে এসেছে এটাই আমার পরম তৃপ্তি।” বাবিন যে বোনকে ছোটবেলায় হারিয়ে ফেলেছিল। এই মেয়েটি তার সেই বোন মায়া। বাবা তাকে বলেছিল, ” মায়া হারিয়ে গেছে। ” কিন্তু মায়া কেনো হারালো আর কিভাবে হারালো বাবিন তার কিছুই সে দিন জানতে পারেনি বাবার কাছ থেকে । সেই দিনের খবরের কাগজ অনুযায়ী মায়া খুন হয়েছিল কিন্তু খুনি ধরা পড়েনি। খুনের তদন্ত হয় নি। পুলিশ কেস হয়নি। মৃত্যু মর্মান্তিক হলেও সেদিন সব কিছু নরমাল ছিল। কিন্তু নরমাল থাকতে পারেনি একমাত্র বাবিন। তার মনে শান্তি ছিল না । তার মনের মধ্যে চিন্তার ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। সে কাটা পাঠার মত ছটফট করছিল। সে সেই যন্ত্রনা থেকে সিদ্ধান্ত নেয় যে যেভাবেই হোক এই কেসের তদন্ত করে খুনিকে ধরে তার প্রাপ্য শাস্তি দিতেই হবে। বাবিন খুনের তদন্ত ভার হাতে নেয় । খুনের তদন্ত শুরু করার আগে বাবিনের সন্দেহ হয় তার বাবা,বক্রজিৎ মল্লকে । যতই সে চেষ্টা করুক অন্য দিকে খুনের মোড় ঘোরাতে কিন্তু তার সন্দেহের তীর ঘুরে ফিরে সেই বক্রজিৎ মল্লর দিকেই চলে যায়। পুলিশ শতপ্রনোদিত হয়ে খুনের একটা FIR করে তদন্ত শুরু করে। বক্রজিৎ মল্লর বাড়ী যায় খুনের তল্লাশি চালাতে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে খুনের কেস হিস্ট্রি লিখবে পুলিশ। পুলিশ বক্রজিতের বাড়ী গিয়ে তাকে পায় না বাড়ীতে। এরপর পুলিশ বক্রজিতের সব আত্মীয় স্বজনদের বাড়ী যায় তাকে খুঁজে বের করতে । কিন্তু কোন আত্মীয়ের বাড়ীতেই পায় না বক্রজিৎকে। সবশেষে পুলিশ খবরের কাগজে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলে যে যে কেউ বক্রজিৎকে দেখতে পেলে যেন থানায় খবর দেয়। বক্রজিতের ছবি দিয়ে পোস্টার মারে বিভিন্ন জায়গায়। এর এক মাস বাদে একটা বৃদ্ধাশ্রম ( গীত গোবিন্দ ওল্ড এজ ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশন ) থেকে থানায় ফোন করে জানায় যে তাদের আশ্রমে বক্রজিৎ নামে এক জন বৃদ্ধ আছেন। পুলিশ ততক্ষণাৎ সেই বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে বক্রজিৎকে পাকড়াও করে নিয়ে আসে । পুলিশ ইন্সপেক্টর বাবিন বক্রজিৎ বাবুকে জেরা করার জন্য পুলিশ হেপাজতে নিতে চেয়ে কোর্টের কাছে আপিল করে। কোর্ট বাবিনের আপিল মঞ্জুর করে আসামীকে পুলিশ হেপাজতে রাখার নির্দেশ দেয় । ইন্সপেক্টর বাবিন, ” আচ্ছা বক্রজিৎ বাবু আপনি মায়াকে চেনেন ? “বক্রজিৎ,” হ্যাঁ চিনি। ” বাবিন,” কিভাবে চেনেন ? “বক্রজিৎ,” মায়া আমার মেয়ে। ” ইন্সপেক্টর বাবিন, “তাহলে আপনি আপনার মেয়ে মায়াকে খুন করতে পারলেন কিভাবে ? আপনার একটু হাত কাঁপলো না নিজের সন্তানকে খুন করতে ?” বক্রজিৎ, “আমি মায়াকে খুন করিনি।” বাবিন, “তাহলে মায়াকে কে খুন করেছে বলে আপনার মনে হয় ? “বক্রজিৎ, “আমি কি করে বলবো ? সেটা আপনারা তদন্ত করে বার করুন। খুনিকে ধরুন। ” বাবিন, “খুনের দিন আপনি কোথায় ছিলেন ? ” বক্রজিৎ, “আমি সারা দিন বাড়ীতেই ছিলাম। শুধু সকাল বেলা একবার বাজারে গিয়েছিলাম। “বাবিন, “মায়া যখন খুন হয় তখন আপনি কোথায় ছিলেন? ” বক্রজিৎ, “জানি না মায়া কখন খুন হয়েছে। ” বাবিন, “জানেন না, না বলতে চাইছেন না। কোনটা ঠিক ? “বক্রজিৎ,” কোনটাই ঠিক না।” বাবিন”,আপনি কখন জানতে পারলেন যে আপনার মেয়ে খুন হয়রছে ? “বক্রজিৎ,”আমি বাড়ীর পিছন দিকে গিয়েছিলাম গাছ থেকে পাতি লেবু পেরে আনতে তখন দেখি মায়ার নিথর দেহ পরে আছে সেখানে । তখন আমি ডাক্তার ডেকে আনি। ডাক্তার বাবু এসে ওকে পরীক্ষা করে দেখে বলেন যে ও মারা গেছে। ” বাবিন, “ডাক্তার বাবু ওর ডেথ সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন ? আর দিয়ে থাকলে উনি মৃত্যুর কারণ হিসাবে কি লিখেছেন ? ” বক্রজিৎ, ” না ডাক্তার বাবু ডেথ সার্টিফিকেট দেন নি। ” বাবিন,” তবে আপনি কি করে মেয়ের ডেড বডির দাহ কার্য সম্পন্ন করলেন ?” বক্রজিৎ, ” আমি মৃত দেহ দাহ করতে না পেরে বাড়ীর পিছন দিকে মাটি খুঁড়ে গর্ত করে সেখানে চাপা দিয়ে দিয়েছি।”বাবিন,”সেটা তো পুরোপুরি বেআইনি কাজ। সেই কাজ আপনি করতে গেলেন কেনো ? ” বক্রজিৎ, “জানি না স্যার। ” আপনার এই সব কাজের জন্য আপনাকে অ্যারেস্ট করা হলো। বাবিন,”আপনার মেয়ে খুন হবার পর আপনি থানায় FIR করেছিলেন ? “বক্রজিৎ,” না।” ইন্সপেক্টর বাবিন, “তাহলে কি আপনি চান না যে আপনার মেয়ের খুনি ধরা পড়ুক এবং সে তার উপযুক্ত শাস্তি পাঁক। ” বক্রজিৎ, “আমি চাইলেই কি খুনি ধরা পড়বে? ” বাবিন, “আপনি চাইলেন না কেনো ? ” বক্রজিৎ, “জানি না। ” বাবিন, “জানেন না নাকি ধরা পরে যাবেন সেই ভয়ে ? “বক্রজিৎ, “কি সব বাজে কথা বলছেন স্যার । ” বাবিন, “আপনি একটাও সত্য কথা বলছেন না। আপনি যদি সত্য কথা না বলেন তবে নিজের পায়ে হেঁটে বাড়ী ফিরতে পারবেন না। আপনার হাঁটুর মালাই চাকি কিন্তু হাঁটুতে থাকবে না।” বক্রজিৎ,” এটা আপনারা পারেন না। “বাবিন, “আপনি আপনার নিজের মেয়েকে খুন করতে পারেন আর আমরা আপনার মালাই চাকি খুলে নিতে পারি না ? হাবিলদার ওনার পা দড়ি দিয়ে বেঁধে উল্টো করে ঝোলান তো । আর ঐ লাঠিটায় তেল মাখান ।” বক্রজিৎ, “না স্যার না স্যার আমি সব বলছি। সব আমি বলে দিচ্ছি।” এরপর বক্রজিৎ মল্ল পুলিশকে বলে দেয় যে সে তার মেয়ে মায়াকে নিজের হাতে খুন করেছে। খুন করার কারণও সে বলে দেয়। মায়া বড় হলে তার বিয়ে দেবার জন্য তাকে অনেক টাকা খরচ করতে হবে যে টাকা সে খরচ করতে পারবে না। তার পক্ষে এতো টাকা জোগাড় করা সম্ভব হবে না । মেয়ের বিয়ের জন্য সে ধার করতে পারবে না । এই চিন্তায় তিনি সব সময় অস্থির হয়ে থাকতেন। তার মধ্যে মায়া বাবার সঙ্গে মুখে মুখে তর্ক করতো । সেই রকম ভাবে মায়া এক দিন বাবাকে বাজার থেকে ট্যাংরা মাছ আনতে বলে ছিল কিন্তু তার বাবা ট্যাংরা মাছ আনতে পারেনি। তার জন্য মায়া সে দিন বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে। তখন তার বাবার খুব রাগ হয়ে যায় । রাগ সামলাতে না পেরে বাবা তার মেয়ে মায়াকে গলা টিপে মেরে ফেলে। মেরে ফেলে এই বাড়ীর নীচে মাটি চাপা দিয়ে দিয়েছিল। তারপর এই বাড়ীটা বিক্রি করে অন্য জায়গায় চলে গেয়েছিল। বাবিনের তদন্ত শেষ হয়ে যায়। তার তদন্তে তার বাবা বক্রজিৎ মল্লকে মায়ার খুনের জন্য দোষী সব্যস্ত করা হয় । পরের দিন পুলিশ বক্রজিৎ মল্লর নামে চার্জ শিট তৈরি করে তাকে কোর্টে চালান করে দেয়। কোর্ট সমস্ত সাক্ষ্য প্রমান এবং তথ্য প্রয়াণ সাপেক্ষে ভারতীয় দন্ডবিধি(১৮৬০) ( IPC) ধারা ৫৩ নং অনুযায়ী বক্রজিৎ মল্লকে যাবজ্জীবন কারা বাসের রায় দেয়। বাড়ীটা ? না, বাড়ীটা আর কেনা হয় নি বাবিনের। সে শুধু একটা ফুল রেখে এসেছিল ঐ বাড়ীতে মায়ার জন্য। আর কান্না ? না সেদিনের পর থেকে আর কান্না শোনা যায় নি।
সমাপ্ত
![]()






