মা
সলিল চক্রবর্ত্তী
আজ বাগবাজার মাল্টিপারপাস প্রাইমারি স্কুলের বাৎসরিক ফলাফলের উপর পুরষ্কার বিতরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। সমস্ত অভিভাবকরাই তাদের সন্তানকে নিয়ে স্কুল প্রাঙ্গণে উপস্থিত। দর্শকে পরিপূর্ণ স্কুল অডিটোরিয়াম। নাচ, গান, কবিতা আবৃত্তি ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে প্রতিটি শ্রেণির সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপককে বিদ্যালয় কতৃপক্ষ পুরষ্কৃত করবেন।
তৃতীয় শ্রেণীতে এবার একই নম্বর পেয়ে প্রথম হয়েছে দুইজন ছাত্র, দেবপ্রিয় দত্ত এবং প্রীতম সরকার। হিসাব অনুযায়ী দু’জন ছাত্র-ই পুরষ্কার পাওয়ার অধিকারী, কিন্তু ঘোষণা করা হয়েছে, পুরস্কার পাবে একজন, সে হল দেবপ্রিয় দত্ত। ঘোষণার সাথে-সাথেই সকলের মনে উঁকি মারছে একটাই প্রশ্ন, সম নম্বরের অধিকারী প্রীতম সরকার নয় কেন?
প্রীতম সরকার স্বল্পভাষী, ভদ্র, মুখচোরা, শান্ত স্বভাবের বছর দশেকের ছাত্র। সে-ও উপস্থিত আছে। অভিভাবকের আসনে প্রীতমের বাবা একই প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় উদগ্রীব হয়ে বসে আছেন।
অনুষ্ঠান শুরু হল, উদ্বোধনী সঙ্গীত দিয়ে। তারপর প্রধান শিক্ষক এবং ক্লাস টিচাররা ছাত্রোপযোগী বক্তৃতা রাখলেন। তারপর একে একে গান নাচ আবৃত্তি। এরপর শুরু হল পুরষ্কার বিতরণী। এক এক করে লোয়ার নার্সারী,আপার নার্সারী, ওয়ান, টু-তে পুরষ্কার বিতরণীর পর তৃতীয় শ্রেণীর সর্বোচ্চ প্রাপককে মঞ্চে ডাকতে গিয়ে ঘোষক, দেবপ্রিয় দত্ত এবং প্রীতম সরকার দুজনার নাম ঘোষণা করলেন। সাথে সাথে অভিভাবকদের উদ্দ্যেশ্যে বিনীত ভাবে বললেন -” দু’জন একই নম্বর পেলেও পুরষ্কার পাবে এক মাত্র দেবপ্রিয় দত্ত। প্রীতম সরকার কেন পুরষ্কার পাবে না আমরা জন সমক্ষে কারণ ব্যাখ্যা করব। যাতে অন্য ছাত্র অথবা তাদের অভিভাবকরা সচেতন হতে পারেন।
উদ্দীপ্ত দেবপ্রিয় দত্ত অতি উৎসাহে মঞ্চে এসে দাঁড়াল। পেছনে ভাবলেশহীন অবস্থায় গুটিগুটি পায়ে প্রীতম দেবপ্রিয়ের পাশে এসে দাঁড়াল।
প্রধান শিক্ষকের হাত থেকে দেবপ্রিয় দত্ত পুরষ্কার গ্রহণ করার পর ঘোষক কাম ক্লাস টিচার ব্যাখ্যা করতে থাকেন কেন প্রীতম সরকার পুরষ্কার পেল না—-
প্রথমত, প্রীতম প্রায়শই প্রেয়ার শুরু হলে স্কুলে উপস্থিত হয়।
দ্বিতীয়ত, মাথার চুল অবিন্যস্ত থাকে।
তৃতীয়ত, প্রতিদিন কাচা পোশাক পরে আসেনা, এমন কি জুতো জোড়াও ঠিকঠাক পালিশ করা থাকে না।
চতুর্থত, মাঝে মধ্যে টিফিন ছাড়াই স্কুলে চলে আসে।
পঞ্চমত, ক্লাসে পড়া চলাকালীন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে।
ষষ্ঠত, মাঝে মধ্যেই স্কুল ব্যাগে রুটিন মাফিক বই খাতা থাকে না।
এই সমস্ত নেতি বাচক কারণে প্রীতম সরকার পুরষ্কার পেল না। এখন সকলের সামনে প্রীতম কে এই নেতি বাচক কাজের কারণ ব্যাখ্যা করার একটা সুযোগ দেওয়া হবে।
মঞ্চ নিস্তব্ধ। সকলে উদগ্রীব ওইটুকু ছেলে কি বলে সেটা শোনার জন্য। কারণ দোষ যদি হয় সেটা তো তার অভিভাবকের!
প্রীতমের বাবা প্রথম সারির দর্শকাশনে বসে নিজেকে ক্ষমা করতে পারছেন না। তাঁদের অসচেতনতার অভাবে ছোট্টো শিশুটি এতো ভালো নাম্বার পেয়েও মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে আছে। লজ্জা, ঘৃণা, অপরাধ বোধে তাঁর মাথা হেঁট হয়ে গেল। পুত্রের দিকে তাকাতে পারছেন না, চোখ ঝাপসা হয়ে উঠল।
প্রীতম মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। ইলেক্ট্রিশিয়ান এগিয়ে এসে প্রীতমের হাতে মাউথ স্পিকারটা দেয়।
প্রীতম মাউথ স্পিকার হাতে নিয়ে মাথা উঁচু করে সামনে বসা মানুষ গুলোর দিকে একবার তাকায়, হয়ত বাবাকে অসংখ্য উজ্জ্বল মুখ গুলোর মধ্যে খোঁজার চেষ্টা করল। তারপর খানিকটা হতাশায় আবার ধীরেধীরে মাথাটা নিচু করে নিল। ক্লাস টিচার অভয় দিয়ে প্রীতমকে কারণটা বলতে বললেন। প্রীতম নতমস্তকে মৃদুস্বরে বলল- “দেবপ্রিয়র যে ‘মা’ আছে।”
অডিটোরিয়ামে উপস্থিত সমস্ত শিক্ষক, অশিক্ষক, অভিভাবকরা ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে পড়লেন। তারপর প্রত্যেকে নয়ন ভরা অশ্রু দিয়ে প্রীতমকে সম্বর্ধনা জানালেন। যে অশ্রু হাজার পুরষ্কারের মর্যাদাকে ম্লান করে দিতে পরে।
সমাপ্ত
![]()






