ঝিঙেফুল
ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়
(1)
ঝিঙেফুলের মতো রোদ ঝলমলে আকাশ। এমন দিনে মনটাও উছলে ওঠে যেন। মাঝিপাড়ার প্রতিটি ঘরে আজ আনন্দের ঢেউ। গরীব গুর্বোদের এই পাড়াতে অরন্ধন উৎসব। কত কী যে রান্না হবে ঘরে ঘরে। এই পাড়ার একটাই তো মন্দির। সেখানে মা মনসা পূজিত হন। জেলেরাই পুজো করে। ভাদ্দর মাস।সংক্রান্তিতে সবাই ভিজেভাত খাবে। আগের দিনের রান্না বাসি করে খাওয়া। এটাই দস্তুর।
গোটা পাড়াতে বাড়ি বাড়ি কুটুম আত্মীয়ের যেন ছড়াছড়ি। তবে যাদের রান্নাপুজো নেই তারা এই পুজোতে হাত লাগাতে পারবে না। পাশের গ্রামে বাজার আছে। তিনটে মুদির দোকান আর বেশ কয়েক টা মনোহারী দোকান আছে। ওই গ্রামটা বেশ উঁচু। আষাঢ় শ্রাবণে যখন দামোদর রেগে যায় তখন মাঝিপাড়াটাই ডুবে যায়। পাশের বেনেপাড়ায় সোনার বেনেদের কিছুই হয় না। ওরা সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মেছে। ভগবান ওদের ভয় পায়। ওদের সিন্দুক ভর্তি টাকা।
বেনেপাড়াতে সকাল থেকেই হত্যে দিয়ে পড়েছিল অনন্ত। এদের পুকুর থেকে খাপলা জালে মাছ ধরে দিয়েছে সে। সুবর্ণ এ বাড়ির কর্তা। বছর পাঁচেকের বেশি হবে অনন্তর বউ শেফালী এদের বাড়িতে ঠিকে ঝি এর কাজ করে।
বাড়ির গিন্নি বলেছিল “শোন রে শেফালী। পরশু বিশ্বকর্মা পুজো। কাল অনন্ত জেলেকে বলিস আমাদের কোটাল পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরে দিতে।”
শেফালীর চোখ চকচক করে। মাছ ধরে দিলে নিশ্চয়ই একটা মাছ দেবে। রান্নাপুজোতে মাছের আগুন দাম। ওর ঘরেও তো রান্নাপুজো। এক জায়গায় কচুর লতি দেখেছে। ভালো চাল কিনতে হবে। সব্জী চাই। মা মনসা খুব জাগ্রত দেবী। কে না জানে এই নিমাইজেলে মনসার পুজো করে নি। বছর ঘুরলো না সাপে কেটে মরল।
শেফালী জানে অনন্ত ভীষণ মুখচোরা। কিছুতেই মুখ ফুটে কিছুই চাইবে না।আর এই বড়লোক দের মনে আগুন।গরীবের গতর সস্তা দেখে। দুটো শুকনো মুড়ি আর র চা দিয়ে দায় সারবে।
শেফালী ঘর মুছতে মুছতে বললে “বলবো খনে গিন্নিমা। তবে আমার মেয়েটার জন্য একটা বড়ো মাছ দিও মা। তোমার কোটাল পুকুরে মাছে জলে হয়ে আছে। আমার আন্না পুজো মাগো। একটা বড়ো মাছ দিলে তোমার কমে যাবে না গো”।
গিন্নিমার মুখ তিজেল হাঁড়ি হয়ে যায়। বলে “তোর আবার আহিঙ্কে কম নয়। কুতায় পুঁটি চারা চাইবে না বড়ো মাছ। এককাঁড়ি টাকায় পুকুর চাষ। তোদের গতর আছে। খাটলেই টাকা। আর আমাদের তো ওই পুঁজি।”
শেফালীর গা রী রী করে। এইসব মানুষের সাথে মেশা যেন যমের অরুচি।খাটিয়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া।
শেফালী বলল :গিন্নিমা। কাল রান্নার জোগাড় করতে লাগবে। কাল আমি আসতে পারবো না গো। এই ভাদর মাসে বড়ো টানাটানি। মুদির মালসামান নেই। তার উপরি বাড়িতে কুটুম আসবে। ছোটো মাছের কম্মো নয়। চালতার টক হবে। ওলের বড়া হবে। কিছুই ঘরে নেই।
সুবর্ণ বেনের বউ চোখ কপালে তুলে বললে “তোদের যত আদিখ্যেতা। কথায় বলে ঘরে নাই ইন্দি/ভজরে গোবিন্দি।তোরা ছোটো জাত। তোদের এত পুজো পাব্বনের ঘটা কীসের লো। ঢঙ দেখলে বাঁচি নে”।
শেফালীর অভ্যাস হয়ে গেছে এসব শোনা। হাসতে হাসতেই বললে “মা মনসা তো পেরথম আমরাই পুজো করেছিলুম গো গিন্নিমা। উঁচুজেতের লোকেরা করে নি। তাপ্পর বেহুলা এসে তবে পুজো পেচার। এতো শাস্তরে আছে গো।”
গিন্নিমা বিরক্ত হয়ে বললে “রাখ তোর শাস্তর। তুই সেসবের কতটুকুই বুঝি? কাল কামাই করলে হবে নে। সে কটা বাটাছানা নিবি ।তবুও আমার বাড়িতে কাল পুজো। এত কাজ একা করতে গেলে নাটা ঝামটা খাবো”।
শেফালীর রাগ হল। মনে মনে বলল “ধুত্তোরি। তোর কাজের নিকুচি। কাজের বেলা কাজি/কাজ ফুরোলে পাজি। “শেফালী সত্যিই যায় নি। তবে অনন্ত মাছ ধরে দিয়ে বসেই আছে তীর্থের কাক হয়ে”।
শেফালী মনে মনে ঠিক করেই নিয়েছিল কাজে সে যাবে না। তাতে যদি কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেয় তো দেবে। আর মাছ যে ওরা দেবে না সেটা তো ওদের ব্যবহার বুঝিয়ে দিচ্ছে। সকালে উঠে ঘর দোর পরিস্কার করল শেফালী। কড়ির আয়না, কাঠের একটা আলনা, বিয়েতে পাওয়া একটা বাক্স । এই তো ওর সম্বল। তবুও ওর মন আজ আনন্দে ভরপুর। অনেক দিন পর বাড়িতে সবাই আসবে। সবকিছু গুছাতে গুছাতে বাক্সের মধ্যে একজোড়া কানের দুল পেল শেফালী। তার শাশুড়ি দিয়েছিল সেই তার বউকালে।
কানের দুল দুটো ওর অসময়ের সাথী। সেই যেবার ডাক্তার বলল অনন্তর যক্ষা হয়েছে ।পুষ্টি চাই। শেফালী তখন এই দুল দুটো বন্ধক দিয়ে তিনহাজার টাকা এনেছিল। কত কান্ড করে সোয়ামীর ব্যামো সারালে। মুরগী পুষেছিল শেফালী। ঘরের ডিম সেদ্ধ করে দিত অনন্তকে। নিধে গয়লা বলেছিল “গরু পোষ না বউমা। আমি তোকে পোষানী দেবো। প্রথম বাছুরটা শুধু আমি নেবো।”
শেফালীর কোনও কিছুতেই না ছিল না। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শেফালী পরিশ্রম করে। তবুও ভিতরে কে যেন বলে “শোন শেফালী। এমন দুখের দিন চিরকাল যায় না। একদিন সব হবে”।
শাশুড়িও বলতো “ভগমানে দিলে ফুরায় না।/আর মানুষে দিলে কুলায় না”।
একটা দিশা আজ পেয়ে গেল শেফালী। কদিন থেকেই ভাবছিল কী করে রান্নাপুজোর পাই উদ্ধার হবে। আর এখন ভাবছে ভীষণ আনন্দ করবে সে। তার মতো গরীব মানুষ কানের দুল বন্ধক দেবে এটা গাঁয়ে গঞ্জে নতুন কথা নয়। তার উপর মনসাতলায় মেলা বসবে। কত দোকান। মণিহারী রকমারী দোকান। আগের বার কাচের চুড়ি পরার নিয়ে কী অশান্তি করেছিল অনন্ত।তখন শাশুড়ি বেঁচে। শেফালীর আবদার “আমাকে কাচের চুড়ি কিনে দাও “।
অনন্তর গোঁ সাংঘাতিক। বললে “কাজের হাত। কাচের চুড়িতে হাত কাটবি। তুই রবারের চুড়ি নে”।
অভিমান হয়েছিল শেফালীর। মাগো।রবারের চুড়ি!কী কান্না! কী কান্না! অনন্ত বলেছিল “যত পারিস কাঁদ। তবুও তোকে কাচের চুড়ি দেবো না”।
পরে রাতের অন্ধকারে বউকে খুব আদর করেছিল অনন্ত। বলেছিল “তুই একটা পাগলী। বড়ো ছেলেমানুষ তুই”।
পরের দিন ভাঙামেলা থেকে শাশুড়ি এনে দিয়েছিল কাচের চুড়ি। এইটুকু পাওয়াতেই নিজেকে রাজরাণী মনে হয়েছিল শেফালীর। সেই যখন সে স্কুলে যেত তখন একটা কবিতা শিখেছিল শেফালী। ঝিঙেফুল। ওর নিজেকে ঝিঙেফুল মনে হয়।
ঘরের কাজ সেরে দুল দুটো নিয়ে তারু ঘোষের কাছে গেল শেফালী। অনন্তকেএসব বলা যাবে না। তখন বলবে “ওইটুকু বিদুরের খুদ।তাও বন্ধক দিবি। তোর এত আয়োজন করার কী পেয়োজন “।
শেফালী পাঁচবাড়ি কাজ করে ।মনে মনে ঠিক করলো পুজোর সময় সব বাড়ি থেকে টাকা নেবে সে। আর তখন ছাড়িয়ে নেবে দুল দুটো।
(2)
অনন্ত এখনও আসে নি। এই সুযোগ। বেনেপাড়াতেই তারু ঘোষের বাড়ি। এখানকার যত বড়ো বড়ো ব্যবসা সবকিছুর মালিক এই তারু। প্রথম জীবনে এই তারুর বাপের কিছুই ছিল না ।একটা চায়ের দোকান আর দশকাঠা জমি ভরসা। তার উপর বড়ো মেয়েটার বিয়ে দিয়ে যাকে বলে ঝুলঝাড়া হয়ে গিয়েছিল। তারুর বয়স অনন্তের থেকে কম ই হবে। অনন্ত নিজেই বলেছে ছোটো মেয়েটার মুখ দিয়ে লালা পড়ত বয়সকাল অবধি।
তারুর বাপ চিন্তায় পড়লে। আর একটা সম্বন্ধ এল। একজন তারুর ছোটোবোন কে পছন্দ করলে বটে তবে একটা শর্তে। অনেক গয়না চাই। ওই তারুর কী বুদ্ধি কী বুদ্ধি। বাপকে বললে আগে আমার বিয়ে দাও। আমার বউ এলে সেদিন ই বোনের বিয়ে হবে। আমার বউ এর গয়নাগুলো পরিয়ে দেবো।
এই ভাবেই তারু বোনের বিয়ে দিলে। তারপর দশকাঠা জমি বিক্রি করে শুরু করলে তেজারতি ব্যবসা। এখন কয়েক কোটি টাকার মালিক তারু। তবে বোনের বিয়ে দিতে গিয়ে নিজের পছন্দ মতো মেয়ে তো আর বিয়ে হল না। তার উপরে বউটা কিছুদিন আগে রান্না করতে গিয়ে পুড়ে গেছে।
তারু এখন তারকবাবু। জীবনে সব পেয়েও ওর শান্তি নেই। ওর ছেলেটা কত ভালো লেখাপড়া করত। তারপর বাপের কাঁড়িকাঁড়ি টাকা দেখে উচ্ছন্নে গেল। এখন আবার মদ ধরেছে। অথচ অনন্ত জেলের ভাগ্য দেখো। চাল নেই চুলো নেই অমন সোমত্ত বউ।
তারু চেয়ারে বসেছিল। শেফালী এগিয়ে এসে বললে “এই জিনিস টা রেখে পাঁচহাজার টেকা দাও ঠারপো। “
শেফালীর উপস্থিতিতে তারুর হাসি আর ধরে না। বলল “বেশ তো। এখনই দিচ্ছি। তা অত কষ্ট করার দরকার কী। তোমার মতো বউকে কেন যে অনন্ত এত খাটায় কে জানে! তোমার কর্তাটা একেবারেই অপদার্থ। এবার থেকে আমাকে ডাকবে। আমি নিজেই তোমার সব দায়িত্ব নেবো এখন “।
শেফালীর ইচ্ছা করছিল ঠাস করে চড়িয়ে দেয়। টাকার জন্য লোকটা ন্যায় অন্যায় মানে না।
পাঁচহাজার টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরল শেফালী ।কিন্তু এসে হতবাক। অনন্ত বিরাট একটা মাছ এনেছে। আশ্চর্য হল শেফালী। অনন্ত বললে :”তুই কাজে যাস নি। তাতে গিন্নিমার ভয়। কাজের লোক গেলে কাজ করবে কী করে। তার আবার গিঁটেবাত। আমাকে কত তোয়াজ করলে। আর বললে শেফালী বড় মাছ চেয়েছিল। তা নিয়ে যাও অনন্ত “।
এদের কথার মাঝেই হৈ হৈ করে ঢুকে পড়ে শেফালীর দুই বোন আর ভাজ। সারা বাড়িতে যেন আনন্দের ঢেউ বয়ে যায়। এখন অনেক কিছু আনতে হবে।
উনানের চারপাশটা গোবরমাটি দিয়ে নিকিয়ে তার পাশে ফণীমনসার গাছ আর তুলসী গাছ পোঁতা হল। তারপর বড় বঁটিতে মাছ কাটতে বসলো শেফালীর। অনন্ত বলল “মাছের পিস ছোট্ট করবি না। তুই সরে যা। আমি মাছ কাটছি”।
শেফালী হাসতে থাকে। একটা আনন্দের জোয়ার তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় যেন। শেফালীর ভাজ মনসার বেদীটাকে শোলা দিয়ে সাজিয়েছে। আর এক মুহূর্ত দেরি করল না শেফালী। চলে গেল চালতে তলায়। ওখানে অনেক চালতা পড়ে আছে। দুতিনটে নিয়ে এল। কচুর লতি এসেছে। এখনও অনেক সব্জী কিনতে হবে। তার সাথে চাই ইলিশ মাছ। অনন্তকে তাড়া দেয় শেফালী। বাজার করে আনো। অনেক টা সর্ষের তেল চাই।
অনন্ত বলে “অত হাঁপাস না। সব হবে।তুই বরং নেয়ে আয় দিকি। তবে অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থা। তুই যেসব জিনিস বলছিল তার দাম জানিস”?
মুখভার করে শেফালী। বললে “মা মলতো। দেবী মনসা হলেন শিবের মেয়ে। দেবী চন্ডী মনসার একটা চোখ কানা করে দিয়েছিল। আর বেহুলা লখীন্দর হল গিয়ে স্বর্গের অনিরুদ্ধ আর উষা”।বলেই মাথায় হাত ঠেকালে। আর জোরে জোরে গান ধরলে
“জয় জয় মা মনসা /জয় বিষহরি গো/বন্দনা করি মাগো মা মনসার চরণে”।
(3)
রান্না পুজোর আয়োজন গাঁয়ের ঘরে ঘরে। সবার ঘরেই কুটুম। আবার কুটুম রা এবাড়ি ওবাড়ি আসে। গাঁয়ের মুখেই মনসার মন্দির। কাল ঝাপান।মেলা বসেছে বটে। নিস্তরঙ্গ গ্রাম্য জীবনে একটা ঢেউ। শেফালী একটা ঘড়া নিলে। পিতলের ঘড়া। পাঁচকেজি ওজন।
“ঘড়া আমাদের দু দুটো আছে ” আদিখ্যেতা করে বলে অনন্ত। যেন কুটুম আত্মীয়ের কাছে জাহির করে কত কী আছে ওর। তবে অনন্ত জানে তার ঘরে লক্ষ্মী আছে।
শেফালী সারা সাপটা কাপড় পরে গাছকোমড় বাঁধে। মাথায় ঘোমটা দেয়। আর কোমরে ঘড়া নিয়ে দুলকি চালে চলতে থাকে। ওর ভাজ সাথে যায়। তবে ছোঁয়া যাবে না ঘড়া।
কোটালে নামলে শেফালী। অনেক টা সাঁতার কাটলে। ও যেন আজ মৎস্যকন্যা। ওর ভাজ উঁচুদাঁত নিয়ে হাসছিল। শেফালী বললে চারটে ডুব দিয়ে একঘড়া জল তুলে ঘরকে যাবো। মুখে খড় দিয়ে। কথা বলাই যাবে নে।
চারটে ডুব দিলে শেফালী। কিন্তু এখন আবার ওকে কে ডাকে! একটা গজগজানি। সেই গেলি আর এমুখো হলি নে। সিষ্টির কাজ করতে হল। নবাবনন্দিনী সব।
লজ্জাতে মাথা কাটা গেল। লোকের বাড়ির ঠিকে ঝি শেফালী। ভাজ নিশ্চয়ই বুঝতে পারলো। মুখে খড় দিয়ে রা কাটলো না। ভর্তি ঘড়া নিয়ে চললো। এখনও কয়েক ঘড়া জল তুলতে হবে। প্রতিষ্ঠিত পুকুর না হলে জল নেওয়া যাবে না।
ভিজে কাপড়ে শেফালীর যৌবন যেন উছলে পড়ছে। ঘড়ার জলটা একটা পাত্রে রেখে আবার জল আনতে গেল শেফালী। এবার সে একাই এল। সন্ধ্যা নামছে। আলো আঁধারে পথ।
মনটা বিষিয়ে আছে। গিন্নিমার কথার কী ছিরি। লোকের বাড়ি কাজ করি বলে কি মানসম্মান নেই। মনে মনে ঠিক করেছে শেফালী। ওই কাজ সে আর করবে না।
এখন মুখে খড়। মা মনসা খুব রাগী। নিয়মকানুন ঠিক করে পালন করতে হবে। তার চরণ ধরে পড়ে থাকা।বাঁশবাগানে শুকনো পাতার মর্মর। কে জানে লতা কী না। গাঁয়ের নিয়ম। সন্ধ্যা হলেই সাপ বলতে নেই। লতা বলতে হয়। হঠাৎই অন্ধকার রাস্তায় কে যেন হাত ধরে টান দেয় শেফালীর। কে ও। শেফালীর চোখে আগুন। এতবড়ো স্পর্ধা। খালি ঘড়াটা সপাটে তার মুখে মারে। একটা আর্তনাদ ওঠে। না।না। শেফালীর আজ কথা বলা বারণ।আজ রান্নাপুজো।
বাড়ি ফিরে জল রেখে ঠাকুর থানে উপুড় হয়ে পেন্নাম করলো শেফালী। অনন্ত চিৎকার করতে থাকে। তোর কী মাথা খারাপ হয়ে গেছে? এই ভিজে কাপড়ে যদি জ্বর জ্বালা হয়। ওঠ। নতুন কাপড় পরে সন্ধ্যার দীপ জ্বালা।”
সাঁঝের দীপ জ্বলে শেফালীর ঘরে। ঝলমল করে চারদিক। উনানে কাঠ দেয় শেফালী। উলুধ্বনি আর শঙ্খধ্বনিতে গোটা পাড়া মাতোয়ারা। অনন্ত ইলিশ মাছ কাটে। বললে “তারু ঘোষের দিল আছে। নৈলে এতবড়ো ইলিশ কেনা আমাদের কম্মো নয়”।
শেফালীরা গরীব। প্রতিনিয়ত জীবন বুঝিয়ে দেয় কত ধানে কত চাল। অনন্ত আর ওর মধ্যে একটা তফাত। শেফালীর আত্মসম্মান আছে। ওর জীবনের একটা ছন্দ আছে। যে ছন্দে ছোট্ট নদীগুলো এগিয়ে যায় গেরস্থ ঘরের মেয়েদের মতো। এদের সীমানা ছোট্ট। পরিধিও তাই। তবে এদের সৌন্দর্য অপার। যেন বৃক্ষছায়ার নীচে শীতলপাটি। এদের হাতে সোনা ঝলমল করে না। কাচের চুড়িতেই এরা অসীমের আহ্বান জানায়।
আজ শেফালী রান্না করছে। নিপুণ হাত। যেন সাক্ষাত অন্নপুন্নে। চালতার ডাল। কত রকমের ভাজা। ওল সেদ্ধ করে বড়া। আর ইলিশ মাছের টক। আজ রেঁধে সব কালকের জন্য তুলে রাখতে হবে। কিছুটা আজ খাবে।
অনন্ত লক্ষ করে শেফালীর নিস্তব্ধতা। এত চুপ করে থাকে না তো। কী হয়েছে ওর। বেশ তো ছিল। কী এমন হল যে শেফালী মৌন হয়ে গেল! আজ পুজোর দিন। বাড়ির বাইরে গেল অনন্ত। ওমা। এখানে এই মরাই এর পিছনে একটা ঝিঙে গাছ। অনন্ত ভাবতে লাগল গাছটা কি আপনা আপনি হয়েছে? নাকি শেফালী বীজ পুঁতেছে। বেশ সতেজ গাছটা। লকলক করছে আগাটা। এখানে একটা মাচা করে দিতে হবে। কয়েক টা কঞ্চি বাঁশবাগান থেকে আনতে গেল অনন্ত। কিন্তু। এ কী! এখানে এত রক্ত এলো কোথা থেকে? আর কাউকেই দেখতে পেল না অনন্ত। তবে একটা জিনিস তার অত্যন্ত পরিচিত মনে হল। একটা পাঁয়জোর পড়ে আছে। এটা তো শেফালীর। তবে কী জল আনতে এসে পড়ে গেছে। একটা সন্দেহ গ্রাস করল অনন্ত কে।
ঝিঙে গাছে মাচা করল অনন্ত। গাছটাকে একটা অবলম্বন দিল। এদিকে ইলিশ মাছের গন্ধ গোটা বাড়িতে। অনন্ত দেখল শেফালীর একটা পায়ে পাঁয়জোর নেই। তার মানে ওর অনুমান মিথ্যা নয়। কিন্তু একটা কোনও হিসেব মিলছে না। বাঁশবাগানে রক্ত কেন? এর সাথে কী শেফালীর কিছু যোগ আছে?
পরের দিন বাড়িতে আর উনান জ্বলবে না। এটাই দস্তুর। শেফালীর মন আজ উদাসীন। মনে হল একবার দেখে আসি। কাল যে ঘটনা ঘটল তাতে শেফালীর কোনও দোষ ছিল না। কিন্তু। বেঁচে আছে তো লোকটা। ওই পাঁচকেজি ঘড়ার আঘাত কী কম কথা। অনন্ত কে শেফালী কিছুই বলতে পারে নি। ও কী কিছু আন্দাজ করতে পেরেছে?
আজ শেফালীর কত কথা মনে পড়ছে। সেই যখন প্রথম অনন্ত কে দেখেছিল শেফালী। সে কী লজ্জা। কী সুন্দর ছিল তখন। শরীরে হাতির বল ছিল। শেফালীদের মাটির দুয়ারে মাদুর পেতে দেওয়া হয়েছিল। সেখানেই বসেছিল বরপক্ষ। অনতিদূরে একটা আসন পাতা ছিল। একটা রেশনের দোকান থেকে কেনা শাড়ি পরেছিল শেফালী। মুখে পাউডার। সুমিতার মা বলেছিল পিছনে একটা পেলেট নে যা শেফালী। বরপক্ষ কে গড় করে পেলেট পাতবি। ওরা টেকা দেবে।
দেখতে গিয়ে পরের রাত্রেই বিয়ে করেছিল অনন্ত। মোটা চালের ভাত আর এঁচোড়ের তরকারি হল।দুয়ারে হ্যাচাক জ্বলেছিল। বামুন বাড়ি তে সিধে দিয়েছিল শেফালীর মা। ওরা শেফালীকে আইবুড়ো ভাত খাইয়েছিল। বাটামাছের ঝাল আর ঝিঙে পোস্ত।
সেদিন পেলেটে তিরিশ টাকা পেয়েছিল শেফালী। সাথে ঝিঙে পোস্ত দিয়ে ভাত। এইসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎই মরাই এর কাছে ছুটে গেল শেফালী। আশ্চর্য। এখানে ঝিঙেগাছের মাচা বেঁধেছে অনন্ত। কিন্তু কখন কঞ্চি কাটলো। তবে কী অনন্ত গিয়েছিল ওখানে। একটা ভয় গ্রাস করেছে শেফালীকে। সে তো কখনও কিছুই গোপন করে নি।
দুপুরে বাসি ভাতের আয়োজন। ঘরে ঘরে আনন্দের ঢেউ। আশেপাশের পাঁচ গাঁ থেকে কত লোক এসেছে মেলা দেখতে। তবে অনন্ত এখনও আসে নি। কোথায় যে গেছে কে জানে? একটা অজানা ভয় গ্রাস করে আছে শেফালীর মন। কোথায় কোন এক অসঙ্গতি।
কুটুম রা চলে গেলে বাড়ি ফিরলো অনন্ত। সারাদিন কাজের ধকল গেছে লোকটার। খেতে বসে ইলিশ মাছ সরিয়ে রাখে। বড়ো বিস্বাদ লাগে ইলিশ মাছ। শেফালী আরও অবাক হয়। মানুষ টার হল কি?
পরের দিন শেফালী দেখলে তার পাঁয়জোর নেই একটা। গয়না বলতে তো ওইটুকুই। আর দুল দুটো তারুর কাছে ।ও দুটোর খবর অনন্ত জানে না।
সংসারের দুটি মানুষ যেন দুটি গ্রহের বাসিন্দা। একটা ছন্দ পতন ঘটেছে। অনন্ত অনেক বেশি চুপ। শেফালী আর বেনেপাড়াতে যায় না। অনন্ত তাকে নিষেধ করেছে। বলেছে “ঘরের বউ। ঘরের কাজ করবি। ছাগল গরু পুষবি”।
এমন কথা এর আগে কখনও বলেনি অনন্ত। এতদিন স্ত্রীর প্রতি তার বিশ্বাস ছিল। আজকাল শেফালীর সাথে তার অনেক দূরত্ব।
দেখতে দেখতে পুজোর আর বেশিদিন নেই। অনন্ত সেই ভোরবেলা বেরিয়েছে। মনখারাপ গ্রাস করে শেফালীকে। আজ মনে হল গিন্নিমার সাথে দেখা করবে। টাকা ধার চাইবে। বলবে পাঁঠি দুটো পুজোর পরে বেচে টাকাটা শোধ করে দেবে। তারপর অনন্ত কে নতুন জামা কিনে দেবে সে। তারুর কাছে রাখা দুল ছাড়িয়ে আনবে। সংসারে আনন্দ আনবে সে।
গিন্নিমার কাছে গিয়ে অবাক হয়ে গেল শেফালী। এসব সে কী শুনছে। গিন্নিমা দাঁত বের করে বললে “পাড়া গাঁয়ে গুজব রটেছে তোর এখন অনেক টাকা। বড়ো ঘাটে নোঙর বেঁধেছিস। “
চমকে ওঠে শেফালী। বললে “টাকা দেবে না বলে দাও। এত নোংরা কথা মুখে আনো কোন সাহসে?”
গিন্নিমার মুখ তো নয়।যেন ক্ষুর। থামতেই চায় না। গজগজ করে বলে চলে “ক্যানে। তারু তোদের ইলিশ মাছ কিনে দিয়েছে এ খবর তো গাঁয়ের সবাই জানে। আর অনন্ত নিজেই স্বীকার করেছে তোর রুপোর পাঁয়জোর বাঁশবাগান থেকে পাওয়া গেছে। আর সেদিন মাতাল তারু সেখানেই ছিল।”
শেফালীর কাছে আজ সব পরিস্কার হয়ে গেল। আজ তীব্র অভিমান গ্রাস করলো তাকে। সেই ছোট্ট বেলায় স্বামীর হাত ধরে সংসার সমুদ্রে পাড়ি দিয়েছিল। আর আজ। একটা সামান্য ঘটনা অসামান্য হয়ে স্বামী তাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। আজ তার মনে হল প্রেম মানে সবাই বোঝে শরীর। কত দিনের কত না পাওয়ার সাথে,কত জলখাবার না খাওয়া দিনে আনন্দ উপচে পড়তো শেফালীর সংসারে। আর আজ।শেফালীর ঘর যেন তাসের ঘর। আজ হেস্তনেস্ত করবে শেফালী। তারুর কাছে যাবে। ওর জিভটাকে ছিঁড়ে ফেলবে সে। তারুর মতো মানুষেরা অন্যের সংসারে আগুন লাগায়। তক্কে তক্কে থাকে কী করে অন্যের স্ত্রীকে নিজের করা যায়। অথচ সমাজে এরা গণ্যমাণ্য। আজ শেফালী নিজেই মনসা হয়ে গেছে। শেষ দেখে ছাড়বে তারুর।
প্রকৃতির গতিক ভালো নয়। কিছুক্ষণ পরেই ঝড় উঠবে। তাই বেশি শান্ত লাগছে আজ। অনন্ত সকাল সকাল বাড়ি ফিরে এল। কিন্তু বাড়িতে শেফালী নেই। অস্থির হল অনন্ত। পাশের বাড়ির মেজোবউ বললে “ওই তো ছাগল পাইকের এয়েছিল। দুটো পাঁঠি বিক্রি করে তারু ঘোষের কাছে গেছে। রান্নাপুজোতে দুল দুটো বন্ধক দিয়েছিল কি না।”
অনন্ত অবাক। তারমানে তারুর সব কথা মিথ্যে। তারু যে বলেছিল তোর বউকে টাকা দিয়ে কিনে রেখেছি আমি।
নিজেকে অপরাধী মনে হল আজ।এখনই যেতে হবে শেফালীর কাছে। ক্ষমা চাইবে সে।
তারুর বাড়িতে যখন শেফালী প্রবেশ করল তখন তারু বলল “আবার কী ব্যাপার। সেদিন বাঁশবাগানে ঘড়াতে করে আঘাত করে এখন আবার এখানে কেন?”
শেফালী বলল “টাকাটা এনেছি। আমার দুলটা চাই “।
তারু যেন অবাক হয়ে গেল। যেন একটা নতুন কথা শুনছে। বললে “কীসের দুল। তুমি কোনও দুল দাও নি। বরং আমি তোমাকে টাকা দিয়েছিলাম। কারণ অনন্তের কাছে তুমি কী পাবে। একটা ভিখারীর বাচ্ছা। যদি আমার প্রস্তাবে রাজী হও তবে রাণী করে রাখবো”।
এখানেই শেষ নয়।তারু শেফালীর শরীর স্পর্শ করার চেষ্টা করলো।আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলো না শেফালী। দরজার সামনে একটা শাবল নজরে এল।এখন একটু অভিনয় করতে হবে এই জানোয়ার টার সাথে।তারপর। রাগ চন্ডাল। শাবলে করে আঘাত করে বসলো তারুর মাথায়। তারু লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।
অনন্ত যখন হাজির হল তখন সব শেষ। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন শেফালী। তার চোখ অপলক। চারিদিক ঢি ঢি পড়ে গেল তারুকে মেরে ফেলেছে অনন্তের বউ।
পুলিশের গাড়িতে তোলা হল শেফালীকে। অনন্ত কে দেখে শেফালী মুখ ঘুরিয়ে নিল। আর অনন্ত ফাঁকা ঘরে এসে দেখলে একটা হাহাকার। তখন সন্ধ্যা।রোয়াকে বসে অনন্ত দেখছিল মরাই এর কাছে মাচাটাতে ঝিঙেফুল। চকচক করছে আপন সৌন্দর্যে।মনে হল শেফালী তার সরল মুখখানা নিয়ে হাসছে।
সমাপ্ত
![]()






