ধনী হৃদয়
ডাঃ রঞ্জন কুমার দে (বারিদ বরণ)
রাত তখন প্রায় সাড়ে বারোটা।
জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের বারান্দায় হালকা ঠান্ডা হাওয়া বইছে।
এক কোণে মেঝেতে শুয়ে আছে এক বৃদ্ধ ভিখারি।
সন্ধ্যায় রাস্তার ধারে অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে দেখে দু’জন পথচারী তাকে তুলে এখানে রেখে গেছে।
নাম-ধাম কেউ জানে না।
রেজিস্টারে লেখা হয়েছে—
“অজ্ঞাত পরিচয় বৃদ্ধ।”
ডিউটির ডাক্তার স্যালাইন লাগিয়ে দিয়েছেন।
নার্সরা জানে—এই মানুষটার জন্য আর কিছু করার নেই।শরীরটা অনেকদিনের অভুক্তি আর অবহেলায় ভেঙে পড়েছে।
বারান্দার অন্য পাশে তখন হুলস্থুল।
এক ধনী ব্যবসায়ীকে অ্যাম্বুলেন্সে করে আনা হয়েছে।
ভেতরের কেবিনে তখন আরেক রকম ব্যস্ততা। বিছানার চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন আত্মীয়—কারও হাতে দামী ফোন, কেউ টাকার হিসেব করছে, কেউ ডাক্তারকে চাপ দিচ্ছে,
“যা লাগে করুন, টাকা কোনো সমস্যা নয়… ওকে বাঁচাতেই হবে।”
সেই কোলাহলের মাঝেই বৃদ্ধ ভিখারির শ্বাস ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছিল।
ডিউটি নার্সটা কাছে যেতেই বৃদ্ধ কষ্ট করে বলল, “মা… একটু শুনবে?”
নার্স ঝুঁকে পড়ল।
বৃদ্ধ কাঁপা হাতে নিজের গায়ের ছেঁড়া কম্বলটা খুলে দিল।
“মা… এটা তুমি নিয়ে যাও।”
নার্স অবাক হয়ে বলল,
“এটা তো আপনার একমাত্র জিনিস!”
বৃদ্ধ দুর্বল চোখে দরজার দিকে তাকাল।
“বাইরে গেটের কাছে একটা ছেলেকে দেখলাম…
অনেকক্ষণ ধরে কাঁপছে। আমারই মতো মনে হলো,
হয়তো ওর প্রয়োজন এটা।”
তারপর খুব আস্তে বলল,
“আমি তো আর বেশিক্ষণ থাকব না…কম্বলটা ওকে দিয়ে দিও মা।ঠান্ডা যেন না লাগে ।”
কি সরল, সাধাসিধে,অকপট স্বীকারোক্তি। তার জন্য নেই কোনো ব্যস্ততা, তার আসন্ন মৃত্যুতেও কারোর কিছুই যায় আসে না।
ওদিকে সেই ধনী রোগীকে নিয়ে সবাই খুব ব্যস্ত, খুব উদ্বিগ্ন। কিন্তু সেই উদ্বেগের বৃত্তটা ঘুরে ফিরে শুধু এক মানুষকে ঘিরেই। দরজার ঠিক বাইরেই যে শীতের রাতে কেউ কম্বলের অভাবে কাঁপছে, সেই পৃথিবীটা যেন তাদের চোখেই পড়ে না। সম্ভবত অর্থ মানুষকে অনেক কিছু শেখায়, কিন্তু অন্যের কষ্ট দেখতে শেখায় না।
এদিকে কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধের বুকের ওঠানামা থেমে গেল।
ডিউটি নার্স এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে কম্বল টা তুলে নিলেন। এক বৃদ্ধ ভিখিরির নিঃশব্দ মৃত্যু আজ তাকে যেনো অনেক কিছু শিক্ষা দিয়ে গেলো।
ডিউটি শেষ করে, বাইরে গেটের পাশে একটা কাঁপতে থাকা ছেলের গায়ে চুপচাপ সেই পুরোনো কম্বল জড়িয়ে দিলেন সেই নার্স।
ছেলেটা জিজ্ঞেস করল,
“কে দিল?”
নার্স কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“একজন মানুষ…।”
যার কোনো সহায় সম্বল, কিছুই ছিল না। কিন্তু যার হৃদয়টা এই হাসপাতালের সবচেয়ে ধনী মানুষের চেয়েও বড় ছিল।
হাসপাতালের ভেতরে তখন চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি।
টাকা দিয়ে যারা সেই ধনী রোগীর প্রাণ কিনতে চেয়েছিল, কিছুক্ষণ আগেও ছিল প্রচ্ছন্ন হুমকি। সেই প্রাণটা বাঁচাতে না পারার অপরাধে এখন হাসপাতালে চলছে মহাতাণ্ডব।
—-oooXXooo—-
![]()






