।। একটি পবিত্র শিশির বিন্দু ।।
ডাঃ রঞ্জন কুমার দে
কিছুদিন আগে এমন একটা ঘটনার সম্মুখীন হলাম যে আজ কিছু কথা বলতে ইচ্ছা করছে। আজ জীবনের একটা জায়গায় পৌঁছে, জানিনা কতটা দূর পৌঁছাতে পেরেছি তবে যেটুকু পেরেছি সেটাও শুধুই আমার একার কৃতিত্ব নয় ।হয়তো অনেক কিছুই পাওয়া হয়েছে, কিন্তু এই পাওয়ার জন্য যেটুকু যোগ্যতা অর্জন করতে পেরেছি, তার পেছনে বহু মানুষের অবদান রয়ে গেছে, যাদের কে কখনো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার সুযোগ বা সদিচ্ছা কোনোটাই হয়তো হয়ে ওঠেনি। অনেক অনেক মুখ মনে পড়ে, আমার জীবনে যাদের অবদান অস্বীকার করার মত ধৃষ্টতা বা সাহস আমার নেই, মানুষ হয়ে যখন জন্মেছি তখন মানুষের প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়ে স্বার্থপরের মত যদি তাদের বেমালুম ভুলে যাই তো সেটা বিশ্বাস ঘাতকতার সামিল হবে। আমার পরিবার ছাড়াও যে মানুষ গুলো আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন বা আমার হাত টা ধরে এতটুকু পথ পার করে দিয়েছেন সেই মানুষ গুলোর প্রতি আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম রইলো, জানিনা সেই মানুষগুলোর পাশে আমিও কোনো দিন দাঁড়াতে পারবো কিনা ,তবে চেষ্টা করবো তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা টা প্রকাশ করতে…
তবে আজ এমন একজনের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা রইলো, যার জন্য এই কথাগুলো বললাম, সে বয়সে হয়তো অনেক অনেক ছোটো,কিন্তু তার মহানতা, সততা আমাকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে।না ছেলেটা আমার পূর্ব পরিচিত নয়, একদিনের আলাপ। আসল নাম টা নাহয় গোপন থাক, ধরে নিন তার নাম আকাশ, আসলে তার মনটাও যে আকাশেরই মতো বড়, মানবিকতার এক প্রাণবন্ত নিদর্শন সে।
এবার আসল ঘটনায় আসা যাক, কয়েকদিন আগের ঘটনা। পুজোর ঘন্টা বেজে গেছে, ছুটির আমেজ, আমার সেদিন OPD ছিল, সেখানেও পুজোর ছোঁয়া লেগেছে, তাই একটু ফাঁকাই ছিল। একটু তাড়াতাড়ি OPD শেষ করে বাড়ি ফিরছি। দুপুরের শিয়ালদহ স্টেশন টাও যেনো ছুটির মেজাজে কেমন যেনো নিস্তেজ। ট্রেনটাও অন্য দিনের থেকে অনেকটাই ফাঁকা, ধীরে সুস্থে একটা জায়গা নিয়ে বসলাম, আমি ছাড়া পুরো কামরায় আর জনা ছয়েক মাত্র, ট্রেন ছাড়তে তখনও দশ মিনিট বাকি।
একটি বাচ্চা ছেলে উঠলো, বছর আটেক কি দশ হবে, হাতে একটা প্যাকেট, ভালো করে দেখে বুঝলাম ওটার মধ্যে lozenge আছে। যেহেতু আমি কামরার মাঝামাঝি উঠেছি, তাই আরো তিনজনের কাছে ঘুরে সে আমার কাছে আসলো, তিনজনের কেউই lozenge নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলো না, মুখটা একটু ফেকাসে করে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো দুটো lozenge নেবে, আমি শুধু ওর নিষ্পাপ চোখ দুটো দেখছিলাম।
ওকে বললাম কিরে তুই পড়াশুনা করিস, বললো হ্যাঁ ক্লাস ফোরে পড়ি। আমি বললাম তাহলে lozenge কেনো বিক্রি করছিস, তোর বাবা কি করেন। জানিনা train টা ফাঁকা বলেই হোক বা হয়তো ভাবলো আমি lozenge কিনব, কিছু একটা ভেবে দাঁড়িয়ে পড়লো আমার পাশে। উত্তর দিলো বাবা মারা গেছেন। আর মা কোথায় তোর???
মা তো আছে, কিন্তু মায়ের তো খুব জ্বর, বিছানা থেকে উঠতেই পারছে না, তাই আমি এখন বিক্রি করছি।
এবার আমার শিড়দারা দিয়ে এক অজানা অনুভূতি চলে গেলো, নিজের অজান্তেই শিড়দারা টা সোজা করে বসলাম। মা অসুস্থ তাই ওইটুকু একটা বাচ্চা দুজনের ভাতের জোগাড় করতে বেরিয়েছে….না হাত পেতে নয়, হাত সাফাই করেও নয়, মাথা নত করেও নয়… সেই মুহূর্তে বুঝতে পারলাম না যে শিড়দারা টা কার বেশি সোজা, আমার না ওর।
অনেকে হয়তো এই বিতর্ক টা তৈরী করবেন যে child labour তো বেআইনি কাজ। একদম ঠিক বলেছেন, কিন্তু কি পরিস্থিতি তে ওই টুকু এক নিষ্পাপ বাচ্চা আজ রাস্তায় নেমেছে তার প্রতিকার করার সদিচ্ছা বা ক্ষমতা আমাদের নেই। আজ ওর এই কাজের জন্যই হয়তো দুটো মানুষের পেটে কিছু জুটছে। একটু যেনো আনমনা হয়ে পড়েছিলাম…. মা সুস্থ হলেই আবার মাই lozenge বেঁচবে।ওর কথাতে যেনো আমার সম্বিত ফিরলো। বললাম তোর বাড়ি কোথায়… বললো দমদম।
আমি বললাম মা ডাক্তার দেখিয়েছে। ও বললো,মা বলেছে এমনিই সেরে যাবে, ওই মায়ের ভিতরের আর্তনাদ টা বুঝতে পারলাম,ডাক্তার দেখানো বা ওষুধ কেনার টাকাটা জোগাড় করাও যে তার পক্ষে সম্ভব নয়।হঠাৎ করেই কি মনে হতে জিজ্ঞাসা করলাম যে তোদের ফোন আছে??? না নেই কিন্তু পাশের ঘরের দাদা টার আছে… কালবিলম্ব না করে সাথে সাথে একটা কাগজে আমার নম্বর টা লিখে দিয়ে বললাম, কালকে আমাকে phone করে মাকে নিয়ে চলে আসবি হাসপাতালে। তোর মায়ের সব ওষুধের ব্যবস্থা আমি করে দেব…অবাক হয়ে তাকিয়ে কাগজ টা পকেটে রেখে শুধু ঘাড়টা নারলো।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম তোর lozenge কত করে রে, এইবার মুখটা হাসিতে ভরে উঠলো। দু টাকা করে দাম, নেবে তুমি?????আমি একটা একশো টাকা ওর হাতে দিয়ে বললাম ,বলত কটা lozenge হবে… সাথে সাথে উত্তর পঞ্চাশ টাই তুমি নেবে।আমি বললাম, আমাকে lozenge দিতে হবেনা, তুই এই lozenge গুলো নিয়ে তোর মত সব বাচ্চাদের দিয়ে দিবি, কিরে পারবি তো???
কেমন একটা অবিশ্বাসের চোখে আমাকে দেখে বললো তুমি একটাও নেবে না, আমি বললাম না, আমাকে দিতে হবেনা, তুই সবাই কে ভাগ করে দিস…… কিছু একটা ভেবে বললো, আচ্ছা ঠিক আছে, এরপর লালগোলা লোকালে অনেক বাচ্চা থাকে, আমি দিয়ে দেবোক্ষণ। তুমি শুধু একটা lozenge অন্তত নাও। কথাটার মধ্যে কোথাও একটা সততা ছিল যেনো, আমি শুধু একটা lozenge নিয়ে নিলাম।
ততক্ষণে ট্রেন ছাড়ার টাইম হয়ে গেছে, সে আর দাঁড়ালো না, ততক্ষণে ওই কামরায় আরও অনেকেই এসে গেছে, তাই বাকিদের কাছে গিয়ে সে কামরার শেষ gate টা দিয়ে নেমে যেতে যেতেও আরো কয়েক বার আমাকে দেখে নিলো।আমার উদ্দেশ্য ছিল ওকে কিছু টাকা দেওয়ার, কিন্তু ওকে সরাসরি টাকা দিলে নাও নিতে পারে ভেবে lozenge এর কথা বললাম, হতে পারে অনেক ছোটো, তাও তার আত্ম মর্যাদাকে আঘাত করতে চাইনি আমি।
না ছেলেটি পরের দিন আমাকে ফোন আর করেনি, আমিও ভুলে গিয়েছিলাম, অভয়ার ঘটনায় যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে আজ আমরা চলেছি তাতে এমনিতেই খুব puzzled হয়ে আছি, তাই ছেলেটির কথা আর মাথায় ছিলোনা… কিন্তু সে আমাকে ভুলে যায়নি।
গত পরশু সকালে হঠাৎ করেই একটা unknown নাম্বার থেকে ফোন এসে ঘুম টা ভেঙে গেলো, না ফোন টা receive করতে পারিনি। কিন্তু কিছুক্ষন পরেই একই নাম্বার থেকে আবার ফোন, একটা বাচ্চা ছেলের গলা…কাকু আমার মা ঠিক হয়ে গেছে, হঠাৎ করে বুঝে উঠতে পারিনি কে বলছে… তাই জিজ্ঞাসা করলাম কে বলছো বাবা??? ওপার থেকে উত্তর এলো ওই যে আমাকে ট্রেনে ফোন নম্বর দিয়েছিলে। এবার আমার মাথায় light টা জ্বলে উঠলো, উত্তরে বললাম মা এখন ঠিক আছে তো?? ও বললো হ্যাঁ ….
আমি বললাম পড়াশুনা করছিস তো বাবা?? হ্যাঁ করছি তো, মা বলেছে আমাকে অনেক বড় হতে হবে, আর একটা কথা তোমাকে জিজ্ঞাসা করতে বলেছে। আমি কিছু বলার আগেই সে বললো, তুমি যে সেদিন পঞ্চাশ টা lozenge এর টাকা দিয়েছিলে, তার মধ্যে এখনও কুড়িটা আমি কাউকে দিতে পারিনি, তাই মা বললেন ওই টাকা টা তোমাকে দিয়ে দিতে….আমি জানিনা এর উত্তর টা কি দেবো…এই একটা কথাই আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, এই ছোটো ছেলেটার দারিদ্র তার সততা কে নষ্ট করতে পারেনি। উল্টে আমার মত সভ্য সমাজের প্রতিনিধি কে একটা যোগ্য জবাব যেনো সে দিতে পেরেছে।
চোখের কোনা টা একটু জ্বলে উঠলো যেনো, মনে মনে বললাম হায় ভগবান, এই টুকু হতোদরিদ্র ছোট্ট একটা বাচ্চার সততা,শিক্ষা আমার বিশ্বাসের ভিতটাকে নাড়িয়ে দিলো, শুধু একটা কথাই বললাম, ওই টাকা টা আমাকে আর দিতে হবে না, তুই বরং তোর যাকে যাকে ইচ্ছা হবে তাদের ওই lozenge খাইয়ে দিস বাবা… আর যদি কখনো কোনো দরকার পড়ে তো আমাকে ফোন করিস……
শ্রী শ্রী ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও মা সারদার কৃপায় এই ছোট্ট ছেলেটি একদিন সততার প্রদীপ হয়ে জ্বলবে এই কামনা করি। আমার মত তথাকথিত সভ্য সমাজের এক স্বঘোষিত সভ্য মানুষ কে আজ এই ছেলেটি শিখিয়ে দিলো সততা কাকে বলে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে গেলেও যে কতো বড় মনের মানুষ হতে হয় তা আজ নতুন করে শিখলাম। শিখলাম নিজেকে মানুষ বলে পরিচয় দিতে গেলে, আগে নিজের বিশ্বাস যোগ্যতা কিভাবে প্রমাণ করতে হয়।
আকাশ তুমি অনেক বড় মানুষ হও, অনেক অমানুষ কে মনুষ্যত্বের পথ দেখাও শুধু এই কামনা করি।
—oooXXooo—
![]()








খুব সুন্দর উপস্থাপনা। আপনার গল্প বলার শৈলী আমাকে মুগ্ধ করেছে। – নবু।