আপন জন (একবিংশ পর্ব)
কাকলী ঘোষ
থাকুক এখন ক’ দিন। একটু ভাল মন্দ খাক। শরীরটা ফিরুক। তারপর ভাবনা চিন্তা করা যাবে। অসীমা কে বলতে হবে। তাড়াহুড়ো কিছু নেই। সবার আগে মেয়েটার বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। আর তার জন্য দরকার মুখের চওড়া হাসি আর মিষ্টি ব্যবহার। কাপড় চোপড়ের ও ব্যবস্থা করতে হবে। যা ছিরি পোশাকের ! ওই একটাই ভালো শাড়ি বোধ হয়। পায়ের জুতো টার অবস্থাও তথৈবচ। এক্ষুনি এক জোড়া শাড়ি ব্লাউজ শায়া আর জুতোর দরকার। নিজের বাড়িতে সাধারণত তোলে না ও। অসীমার কাছেই থাকার ব্যবস্থা করে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে হবে না। দোলা রয়েছে মাঝখানে। যদিও ওর রান্নার মেয়েটা কী যেন নামটা — হ্যাঁ হ্যাঁ — শিখা – ওর কাছে শুনেছে মেয়েটার কেউ নেই। বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে কলকাতায় কাজ করে বাঁচবে , খাবে বলে তবুও বলা কি যায় কোন গোলমাল হলে যদি এরাই দোলাকে ঝামেলায় ফেলে তখন দোলার সঙ্গে ওর সম্পর্কটা গোলমালের হয়ে যাবে। তাই এখন এখানেই থাক। পরে ধীরে সুস্থে ব্যবস্থা করবে। দোলাকে ও একটা কিছু বলতে হবে। সবই সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। যাক গে এখন আসল কাজটা করা যাক। কোন রকম সন্দেহের অবকাশ যেন না থাকে। মনের ভাব ঢেকে রেখে এক গাল হেসে হাত বাড়ায় অর্চনা,
“ আয়। পরে সব ঘুরে ঘুরে দেখিস। চল সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই।”
ঈষৎ শংকিত , ভীরু চোখে চায় রিন্টি। বাড়ির বাকি সকলে এই বৌদির মত হবে তো? এমনি হাসিখুশি ? এমনি ভালো ?
পায়ে পায়ে অর্চনার সঙ্গে ওপরে উঠে আসে ও। কী সুন্দর বাড়ি ! সাদা পাথরের মেঝে। চারদিক ঝকঝক করছে। কত ঘর ! কী সুন্দর কত রকমের আলো ! ওটা বুঝি বসার ঘর ? গদী আঁটা চেয়ার। ওরকম লম্বা লম্বা চেয়ার কেন ? কত গুলো পাখা লাগানো ! কী সুন্দর পর্দা ! কত বড় টেবিল ! ওখানে খায় নাকি ? কত জন খেতে পারে ? অনেক গুলো চেয়ার। কত ঘর চার পাশে। ওকে কোথায় থাকতে দেবে বৌদি ? নিজের ছেঁড়া হাওয়াই চটি , এরকম ম্যাড়ম্যাড়ে শাড়ি। কী রকম যেন লজ্জা করছিল ওর।
“ তুই এখানে বোস। আমি জামা কাপড় ছেড়ে আসছি।” দরজার পাশে রাখা একটা চেয়ার দেখিয়ে চলে যায় অর্চনা।
ভয়ে ভয়ে বসে রিন্টি। ওর হাতের পুঁটলিটা কোলের ওপর ই রাখে। এমন পরিষ্কার মেঝে। নিচে রাখতে সাহস হয় না। খুব বড় লোক এরা। এমন বাড়িতে কাজ করতে পারবে তো ও? কখনও এমন দেখে নি তো। শিখা বৌদি যে দুই বাড়িতে নিয়ে গেছিল তারাও বড় লোক। বিশেষ করে দোলা বৌদি তো বটেই। কিন্তু এরা মনে হয় তাদের থেকেও বেশি। দোতলার পাশ দিয়ে সিঁড়িটা আবার তিন তলার দিকে উঠে গেছে। কী সুন্দর কারুকার্য সিঁড়ির রেলিঙে ! দেখে মনে হচ্ছে কাঠের। তিন তলায় কী আছে ? আরো ঘর ? কত জন থাকে এ বাড়িতে ? সে যত জনই থাকুক। ও খুব মন দিয়ে কাজ করবে। সবার মন রেখে চলার চেষ্টা করবে। কাজ করতে কোন কষ্ট হয় না। কত ছোট্ট থেকেই তো কাজ করছে। আর কথাও বেশি বলবে না ও। পিসিমা বলে দিয়েছিল কারুর বাড়িতে কাজ করতে হলে মুখে মুখে কথা বলতে নেই। সে তারা যদি ভুল বলে তাও না।
“ চল গো মেয়ে। তোমার থাকার ঘর টা দেখিয়ে দি।”
আচমকা কার ডাকে সম্বিত ফিরে পায় রিন্টি।
একজন আধা বয়েসী মেয়েছেলে। ডাকছে ওকে। বেশ ভালো শাড়ি পরা। কেউ হয় এদের ? এ বাড়ির লোক ? দেখে মনে হয় না। মুখে বসন্তের দাগ। বেশ ভারী ভুরি চেহারা। হাতে একটা কাপড়ের ব্যাগ।
“ বৌদি –” অস্ফুটে এটুকু বলতেই হাসে মেয়েছেলেটা।
“ বৌদি বাথরুমে ঢুকেছে। সময় লাগবে। তোমার ঘর দেখিয়ে দিতে বলল। ওই সঙ্গে জামা কাপড় ও ছেড়ে নিতে বলেছে।”
আর কিছু না বলে উঠে দাঁড়ায় ও। ততক্ষণে চলতে শুরু করেছে মেয়েছেলেটা। সিঁড়ি দিয়ে আবার নিচে নেমে এল। লম্বা বারান্দার দু পাশে সারি সারি ঘর। তারই একটার তালা খুলে ভেতরে ঢুকল মেয়ে মানুষটা। পিছনে পিছনে রিন্টি।
“ এটায় তুমি থাকবে গো। আর এই নাও তোমার কাপড়, শায়া ব্লাউজ। সব ছেড়ে হাত পা ধুয়ে ওপরে এসো। তখন বৌদির সঙ্গে দেখা হবে। বুঝলে ? আমি গেলাম। দরজাটা বন্ধ করে দাও।”
ক্রমশ :
![]()







