সান্তা এসেছিল
কাকলি ঘোষ
ভাঙা আয়নাটা মুখের সামনে ধরে শেষবারের মত নিজেকে দেখে নিল গণেশ। মুখের সাজ তো জব্বর হয়েছে।বাকিটা অবশ্য পুরো দেখতে পাচ্ছে না।যদিও দেখার কিছু নেই। বুঝতেই পারছে। দেখেছে তো ওই চার্চে। এবার শুধু ঝোলাটা কাঁধে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেই হল। বাইরের দিকে একবার চাইল ও। লোক জন নেই এখনও সেরকম। হালকা শিশির ছোঁয়া রাস্তা। রোদ ওঠেনি এখনো ভালো করে। রাস্তার দু পাশের বড় বড় গাছ গুলো কি সবুজ দেখাচ্ছে ! ওখানেই ওই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে ওকে দাঁড়াতে বলেছে ওরা। ঠিক আটটায়।
ঝুপড়ি থেকে বেরিয়ে এল গণেশ। একটু আগে আগেই গিয়ে দাঁড়াবে। দেরী হলে ওকে দেখতে না পেলে যদি ফিরে যায় ওরা ? অনেক কষ্টে জুটেছে কাজটা। কটা দিন কিছুই ছিল না হাতে। কলের জল ছাড়া আর পেটে পড়েও নি কিছু। ভাগ্যিসই কাল গেছিল পার্ক স্ট্রিটের দিকে। তাই তো কাজটা জুটল। তাও ওর বয়স এত কম বলে প্রথমে দিতেই চাইছিল না ওরা। শেষে ওর মুখ আর অনেকটা ঢ্যাঙা দেখে কি ভাবল কে জানে ? রাজি হয়ে গেল। কি একটা ক্লাব যেন — তাদেরই কিছু মুরুব্বী গোছের লোক। বুঝিয়ে দিল কাজটা। কিছুই না। সান্তাক্লজ সাজতে হবে। সাজও ওদের। ঝোলাও ওদের। ঝোলার মধ্যে যা যা থাকবে সেগুলোও ওরাই দেবে। শুধু সেজে গুজে রাস্তায় হাঁটা। ও একা নয়।ওর মত আরো দু চার জন আছে। সারা দিন ঘোরা। বাচ্চাদের বই, চকোলেট এসব দেওয়া, হাতে হাত মেলানো, মজা করা — একেবারে সকাল থেকে রাত্তির অব্দি। দুশো টাকা আর খাবার জন্য আরো একশো।যদিও চেনে না ওদের তবু রাজি হয়ে গেছে গণেশ।
তবে কাজটা ঠিক বোঝে নি। সান্তাক্লজ না কি বলছে সেটা কি ? খায় না মাথায় দেয় ? শেষে অন্যরা বুঝিয়ে দিল। ওরা কলকাতায় থাকে তো।আর ও সবে গ্রাম থেকে এসেছে ।মাত্র দু মাস আগে। এ শহরের সব কিছু বুঝে উঠতে এখনও ঢের দেরী। ওরা জানে টানে সব। সান্তাক্লজ নাকি একজন বুড়ো মানুষ। প্রত্যেকবার এই বড়দিনের সময় যীশু তাকে পাঠান তার আসার আগাম খবর দিতে। সান্তা আসে। বাচ্চাদের উপহার দেয়।তাদের সঙ্গ দেয়। সেই সান্তাক্লজই সাজতে হবে ওদের।
ঠিক ঠিক। এবার বুঝতে পেরেছে গণেশ। লাল টুপি সাদা দাড়ির বুড়ো। কাঁধে ঝোলা। এই সময় যখন চার্চটা সাজায় তখন ওই মূর্তিটাও থাকে। আচ্ছা। ওকে বলে সান্তা।
প্রত্যেকবার আসে ! শুধু বাচ্চাদের দেয় ? ওদের মত গরিবদের দেয় না ? ইস্ ! সত্যি দেখা পেলে কিছু চেয়ে নিত গণেশ। শুনে তো ওর অন্য সঙ্গীরা হেসে খুন। দূর! এ তো একটা ছেলে ভুলানো গল্প। সত্যিই কি আর আসে ? ওদের মত কয়েকজনকে সাজিয়ে অনুষ্ঠান জমজমাট করার জন্য আর বাচ্চাদের আনন্দ দেবার জন্য এসব করতে হয়। যে ক্লাবের হয়ে করে তাদেরও নাম হয়। শুনে চুপ করে গেছে ও। মন খারাপ হয়েছে এবার সত্যি সত্যি। সব বানানো গল্প ? আর চার্চের মধ্যে ওই যে মূর্তিটা ? যার মুখের দিকে তাকালে কেন কে জানে অকারণে চোখে জল এসে যায় ! সেটাও বানানো ?
ওটা তো যীশুর মূর্তি ! ওটা কেন বানানো গল্প হবে ? সত্যিই তো উনি ছিলেন ! তাহলে ? নিজের মনে মনেই ওদের সাথে তর্ক জুড়েছে গণেশ।তবে সান্তাই বা বানানো কেন হবে ? যীশুই তো তাকে পাঠিয়ে দেন তার আসার খবর দিতে। বলুক গে ওরা। মনে মনে বিশ্বাস করে গণেশ সান্তা ঠিক আসেন। ভিড়ের মধ্যে কেউ তাকে চিনতে পারে না। হয়ত দেনও গরিবদের। ও জানে না। এরাও জানে না। কি ভালো হয় যদি সত্যিই ওর সঙ্গে দেখা হয় সান্তার ! তাহলে ও — এখানে এসেই থমকায় গণেশ। কি চাইবে ও ? ওর ছোটবেলায় হারিয়ে যাওয়া মাকে ? না এমন কোন কাজ যা করলে ও রোজ পেট ভরে খেতে পাবে? ভেবে ঠিক করতে পারে না গণেশ।আসলে ওর এই ষোল বছরের জীবনে এমন প্রশ্ন তো আর কখনো আসেনি। যখন গ্রামে ছিল মামা মামীর লাথি ঝ্যাটা ছাড়া আর কিছু জোটে নি। বাপটা ওর জন্মের পরই মরে গেছিল। বেদম নেশা করত নাকি। তার চেহারা কেমন জানেই না গণেশ। আর মা ওকে নিয়ে মামার বাড়ি এসে উঠেছিল বটে কিন্তু মামীর গঞ্জনায় সেখানে টেকার উপায় ছিল না। শেষে কে জানে কোথায় চলে গেল ওকে ফেলে রেখে। তো ? এর পর মামা মামীর লাথি জুটবে না তো আর কি জুটবে গণেশের কপালে ? এইখানেই অভিমান ওর।মা ওকে নিয়ে গেল না কেন ? মা কি জানত না ওকে ফেলে গেলে মামা মামী কত লাঞ্ছনা দেবে ? তবে সবজি পিসির কাছে শুনেছে গণেশ মা নাকি বলেছিল নিজেরই কোন ঠিকানা নেই — কোন নরকে পা বাড়াচ্ছি কে জানে – ছেলেটাকে নিয়ে গিয়ে আর কষ্ট দেব না। আমার আর কিছু না হোক গঙ্গার জল তো কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। তোমরা সবাই মিলে ছেলেটাকে মানুষ করে দিও। পুরুষ বাচ্চা যা হোক করে বড় হয়ে যাবে।
তো হয়েছেও । মামা মামীর লাথি ঝ্যাটা আর সবজি পিসির আদরে বড় তো হয়েছে। পিসি দুম করে মরে না গেলে গ্রাম ছেড়ে হয়ত আসতোই না গণেশ। ওর হয়ে বলার লোক শুধু ওই পিসিই তো ছিল। মুখের ওপর চোটপাট জবাব দিত মামীকে। আর গোপনে খাওয়াতোও ডেকে ঘরে নিয়ে।অথচ পিসি ওর রক্তের সম্পর্কে কেউই নয়। কিন্তু কপাল খারাপ যার তার সবই খারাপ । হঠাৎ দুদিনের জ্বরে সবজি পিসি মরে যাবে কে ভাবতে পেরেছে ? এরপর আর গ্রামে টিকতে পারল না গণেশ।শেষে একদিন মামার বাক্স থেকে কটা টাকা চুরি করে সোজা ট্রেনে চেপে বসল। কলকাতায় এলে একটা ব্যবস্থা হবে এটা গ্রামে সবার মুখেই শুনত। কিন্তু কই ? সেই একই । যেদিন কাজ জোটে পেটে পড়ে —- না হলে কলের জল। ওই ঝুপড়িটাও কি পেত ? একদিন শীতে হি হি করতে করতে ঝুপড়িটার গা ঘেঁসেই শুয়েছিল। ভেতর থেকে একটা আওয়াজ কানে আসতে সরে যেতে গিয়েও পারেনি। মনে হচ্ছিল কেউ যেন কাতরাচ্ছে। একটুক্ষণ দেখে আর না পেরে ভেতরে ঢুকে গেছিল। ওমা ! থুরথুরে বুড়ো একটা। চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে আসছে। ওকে দেখে জল এর দিকে ইশারা করেছে। দিয়েছে গণেশ। কি জানি কেন বুড়োটা ওকে ঘরে থাকতে বলল। থেকে গেল গণেশ। ওর তো আর যাবার জায়গাও ছিল না । বাইরে তখন অনেক কনকনে ঠান্ডা। সপ্তাহ খানেক পর বুড়োটা মরে যেতে ঝুপড়িটা পেয়ে গেল ও। সঙ্গে বাকী সব কিছু। সব মানে ওই কটা বাসন কোসন, ছেঁড়া জামা কাপড় , একটা গোটা কম্বল, আর একটা ভাঙ্গা আয়না। কে জানে বুড়োটা কোথা থেকে কুড়িয়ে এনেছিল। ভাগ্যিস জায়গাটা পেল নইলে এই শীতে ওই ফুটপাতেই শুয়ে থাকতে হোত। আরও অন্যদের মত। কটা দিন শুয়ে দেখেছে তো ও। কি যে কষ্ট ! তাইতো একটা কথা মনে মনে ভেবে রেখেছে ও। ওর ঝোলা থেকে যখন কেক বিস্কুট এগুলো দেবে ও তখন একটু বেছে বেছে দেবে। যারা আজকের দিনে গাড়ি চড়ে দামী দামী পোশাক পরে বেড়াতে বেরোয় তাদের না দিয়ে ওই যারা ওর মত ফুটপাতে থাকে, ঝুপড়িতে ঘুমোয়, পারলে তাদের দেবে । তাতে কি ক্লাবের লোকেরা কিছু মনে করবে ? বুঝতে পারলে মানা করবে ? দেখা যাক। একটু কায়দা করে দিতে হবে তবে। তবু চেষ্টা করবে গণেশ। যদি সান্তার দয়ায় —–
কিন্তু এখনও কেউ এলো না তো ! ভেতরটা ছটফট করে উঠল ওর। বাকিদেরও তো এখানেই দাঁড়াতে বলেছিল। ও ছাড়া আর কেউ আসে নি কেন তবে?ওহ ! এক ঝলক হাওয়া হঠাৎ কাঁপিয়ে দিয়ে যায় ওকে। ঠান্ডাটা আজকে বেশ জব্বর পড়েছে। গায়ের মোটা জোব্বাটা না থাকলে কাঁপতে হোত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। আস্তে আস্তে লোক বাড়ছে রাস্তায়। বেশির ভাগ জনই চার্চের দিকে চলেছে। একটু পরেই ওই বিশাল মাঠটা ভরে যাবে লোকে লোকে। হয়ত এই লোক জমায়েত হবার জন্যই অপেক্ষা করছে। সত্যিই তো ! লোক জন বাচ্চা কাচ্চা না থাকলে সান্তা সেজে ওরা করবেই বা কি? এরকম কাজ গণেশের কাছে এই প্রথম। বেশ একটা মজা হচ্ছে ভেতরে ভেতরে। আনন্দও। কোনদিন তো কাউকে কিছু দিতে পারেনি। উল্টে হাত পেতেই এসেছে চিরকাল। এবার প্রথম ও কিছু দেবে অন্যদের। হোক না সে অন্যের জিনিস। জিনিসে কি আর লেখা থাকে কে দিচ্ছে ? বেশ মজাদার কিন্তু এই সান্তা সাজা !
ঝোলাটা কাঁধে টেনে তুলে নিতে গিয়েই একটু টান অনুভব করল গণেশ। কি হল ? কিসে আটকালো আবার ! মুখ ফিরিয়ে তাকাতেই চমকে গেল ও। দুটো ছোট ছোট বাচ্চা। বছর ছয় কি সাত হবে। ওর ঝোলা ধরে টানছে। ছেঁড়া ধুলধুলি জামা। মাথার চুল গুলোও শনের নুড়ি পাকানো।শীতে কাঁপছে। ইশারায় খাবার চাইছে।
ইস্ ! আহা রে ! কোত্থেকে দেবে গণেশ? নিজের কাছে তো একটা ফুটো কড়িও নেই। আর ঝোলাও তো খালি। বাচ্চাগুলো যে ওর সাজ দেখেই এসেছে সে তো বোঝাই যাচ্ছে । কিন্তু কি করে বোঝায় যে থলেই শুধু আছে তার ভেতরের জিনিস এখনও হাতে পায় নি ও। দিশেহারার মত এদিক ওদিক তাকাতেই ওর মতো আর একজনকে দেখতে পেল ও। সেই লাল জোব্বা আর কাঁধে থলে। ওর দলেরই কেউ বোধ হয়। হাত নেড়ে ডাকলো ও। চোখ তুলে তাকালো লোকটা। কিন্তু ওর দিকে না। ওর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চা দুটোর দিকে। হাতছানি দিয়ে ডাকও দিল ওদেরকে। আর কি আশ্চর্য ! অবাক হয়ে দেখল গণেশ ওর ঝোলা ফাঁকা নয়। ওই তো — ওই তো মুঠো ভরে তুলে আনছে কেক, বিস্কুট, লজেন্স ! বাহ্ রে ! ও কি করে পেয়ে গেল ! গণেশ তো এখনও —
ভাবতে ভাবতেই পেছনে কাদের যেন আওয়াজ । ও।ওই তো সবাই এসে পড়েছে। ওর দলের সকলে। কালকের ওই নেতা গোছের লোকটা। গাড়ি থেকে বস্তা করে নামাচ্ছে কি সব ! ওহ ! এগুলোই ভরে দেবে ওদের ঝোলায়। পায়ে পায়ে সেদিকেই হেঁটে যায় গণেশ।ওকেও ভরে নিতে হবে ঝোলা। কিন্তু ঐদিকে যে ছিল – একটু আগেই বাচ্চা গুলোকে খাবার দিচ্ছিল –—সে কোথায় গেল ? কোন দিকে ? ও কি তবে গণেশের দলের নয় ? চারদিকে চোখ চালিয়ে দূরে অনেকটা দূরে লাল জোব্বা টাকে কুয়াশায় মিলিয়ে যেতে দেখল গণেশ।
“ কি হল ? চলে এসো “
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল গণেশ সবাই ঝোলা ভরে নিয়ে রওয়ানা দিয়েছে।ডাকছে ওকে। এবার যেতে হবে ওকেও। শহরের ভীড়ে মিশে যেতে হবে। চলতে চলতে মুখ ফিরিয়ে বাচ্চা দুটোকে আবার দেখল গণেশ। মহানন্দে রাস্তার ধারেই বসে পড়েছে ওরা। কোলের ওপর বিছিয়ে নিয়েছে খাবার গুলো। হাসি ঝলকাচ্ছে উপোষী মুখে। সুখের হাসি। উদর তৃপ্তির হাসি। সেদিকে চেয়ে চেয়েই হঠাৎই বিদ্যুৎ চমকের মত সত্যিটা মাথায় খেলে গেল ওর।স্পষ্ট বুঝতে পারল গণেশ। সান্তা এসেছিল। সান্তা আসে।
সেদিনও এসেছিল যেদিন ও নিজে ওই কনকনে ঠান্ডা থেকে ঝুপড়ির মধ্যে আশ্রয় পেয়েছিল। আজও এসেছে। ওইখানে। ওই বাচ্চা দুটোর মধুর তৃপ্ত হাসিতে। এসেছে চুপি চুপি। নিঃশব্দে।
–~০০০XX০০০~–
![]()







