যদি কিছু মনে না করেন… তাহলে বলি……
*ডিজিটাল গুরু ও অ্যানালগ সন্ন্যাসী*
— নবকুমার চক্রবর্ত্তী (নবু)
আজকাল বাজারে আর এক নতুন প্রজাতির অবতারের আবির্ভাব ঘটেছে। এঁদের বলা যেতে পারে ‘সবজান্তা গাইড’। এঁরা নিজেরা হয়তো জীবনে কখনও একটা ভাঙা প্লাগও জুড়ে জোড়াতালি দিতে পারেননি, কিন্তু বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির জটিলতম গোলকধাঁধায় এঁদের অবাধ যাতায়াত।
আমাদের পাড়ার এক দাদা আছেন—ধরা যাক তাঁর নাম *সমীরবাবু*।
সমীরবাবু রিটায়ার করার পর থেকে সময় আর জ্ঞান, দুই-ই অকাতরে বিলিয়ে চলেছেন। বিশেষ করে পাড়ার তরুণ প্রজন্ম যদি কোনো নতুন গ্যাজেট বা সফ্টওয়্যার নিয়ে আলোচনা করে, সমীরবাবু সেখানে থাকবেনই। তাঁর উপস্থিতিটা অনেকটা চায়ের কাপে ভাসতে থাকা লবঙ্গর মতো—স্বাদ বাড়াক না বাড়াক, চোখে পড়বেই।
সেদিন পাড়ার মোড়ে চায়ের দোকানে বসে নিখিলেশ তার নতুন কেনা স্মার্টওয়াচটা দেখাচ্ছিল।
বলছিল, “বুঝলেন সমীরদা, এটাতে হার্ট রেট, স্লিপ ট্র্যাকিং সব দেখা যায়। একদম নিখুঁত!”
সমীরবাবু চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে, চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে, একবার তাকালেন ঘড়িটার দিকে। তারপর একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন,
— “আরে ধুর! এ তো স্রেফ ইল্যুশন। ওই যে ভেতরে একটা সবুজ আলো জ্বলছে না? ওটা আসলে অপটিক্যাল ইল্যুশন তৈরি করে তোমার ব্রেনকে বোকা বানাচ্ছে। এসব কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কারসাজি, বুঝলে? আসল হার্ট রেট জানতে গেলে বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলটা দিয়ে ডান হাতের কবজিটা চেপে ধরতে হয়। ওটাই হলো খাঁটি অ্যানালগ ট্র্যাকিং!”
নিখিলেশ আমতা আমতা করে বলল, “কিন্তু সমীরদা, এটা তো নামী কোম্পানির…”
সমীরবাবু তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই হাতটা তুললেন, যেন কোনো এক মহাবিশ্বের গোপন রহস্য ফাঁস করছেন,
— *”কোম্পানি তো ব্যবসা করতে বসেছে মশাই! এরা অবসোলেসেন্স থিওরি খাটায়। তুমি কি আর আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি বোঝো? সব মায়া!”*
কিন্তু আসল নাটকটা জমল সেদিন সন্ধ্যায়, যখন পাড়ার ক্লাবে ওয়াই-ফাই রাউটারটা কাজ করছিল না। কমবয়সী ছেলেরা ল্যাপটপ নিয়ে আইপি অ্যাড্রেস, ডিএনএস কী সব হিজিবিজি চেক করছে।
সমীরবাবু দূর থেকে দেখছিলেন। আর থাকতে না পেরে এগিয়ে এলেন। রাউটারটার দিকে গম্ভীর মুখে তাকিয়ে, দুবার সেটার গায়ে টোকা মারলেন। যেন কোনো অভিজ্ঞ কবিরাজ নাড়ি টিপে দেখছেন।
তারপর বললেন,
— *”আরে, তোমরা তো দেখছি ডিজিটাল মূর্খ! আসল রোগটা তো ধরেছ ইন্টারনেটের বাতাসের ডেনসিটিতে (ঘনত্ব)।”*
ছেলেরা হাঁ করে তাকিয়ে রইল। একজন সাহস করে জিজ্ঞেস করল, “মানে? ইন্টারনেটের আবার বাতাস কী?”
সমীরবাবু অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বললেন,
— *”আরে মশাই, ওয়াই-ফাই তো তরঙ্গের মাধ্যমে আসে, নাকি? তা এই যে বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে, বাতাসের আর্দ্রতা বেড়ে গেছে, তরঙ্গগুলো তো ভারী হয়ে নিচে পড়ে যাচ্ছে! রাউটারটাকে একটু উঁচুতে, ওই আলমারির মাথায় তোলো, আর ডানাগুলোকে ঠিক পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণে ঘুরিয়ে দাও। দেখবে সিগন্যাল ডনডনিয়ে ছুটবে।”*
ছেলেরা অগত্যা তা-ই করল। কাকতালীয়ভাবে ঠিক তখনই ওদিক থেকে ইন্টারনেট প্রোভাইডার লাইনটা ঠিক করে দিল আর আলো দপ করে জ্বলে উঠল।
সমীরবাবু তখন বিশ্বজয়ের হাসি হেসে বললেন,
— *”দেখলে তো? এটাকে বলে প্র্যাক্টিকাল ফিজিক্স। তোমরা তো শুধু ওই স্ক্রিনের দিকে চেয়ে কোডিংই শিখলে, প্রকৃতির কোডিংটা আর বুঝলে না!”*
আমি এক কোণে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, ধন্য এই যুক্তি আর ধন্য এই আত্মবিশ্বাস! ইন্টারনেটের তরঙ্গও যে বর্ষাকালের বাতাসে ভিজে সর্দি-কাশিতে ভুগতে পারে, এই তত্ত্ব একমাত্র আমাদের দেশের এই ‘নৈমিত্তিক বৈজ্ঞানিকদের’ মাথা থেকেই বেরোতে পারে।
পরদিন সকালে দেখা গেল, সমীরবাবু নিজের ভাঙা চশমার ডাঁটিটা একটা কালো ইলেকট্রিক টেপ দিয়ে জড়িয়ে পরছেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “সমীরদা, চশমাটা দোকানে দিয়ে এলেই তো হতো?”
তিনি আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন আমি পরমার্থিক কোনো ভুল কথা বলে ফেলেছি। হেসে বললেন,
— *”তুমি বুঝবে না নবু। দোকানে দিলে ওরা নতুন ফ্রেম গছাত। আমি এই কালো টেপটা দিয়ে আসলে ফ্রেমের স্ট্রেস-ডিস্ট্রিবিউশনটা ব্যালেন্স করলাম। এটা হলো মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বেসিক সূত্র!”*
আমি আর কথা বাড়ালাম না। মনে মনে ভাবলাম, এই পৃথিবীতে তথ্যের চেয়েও অনেক সময় ব্যাখ্যার জোর বেশি খাটে। কারণ, যিনি ভুলটাকেও তত্ত্বের মোড়কে এমনভাবে পরিবেশন করতে পারেন যে ল্যাবরেটরির সায়েন্টিস্টও ল্যাদ খেয়ে বসে পড়েন, তাঁর সামনে যুক্তি তো কোন ছার!
—
### *নবুদার খেরো খাতা থেকে*
*কিছু মানুষ জ্ঞান আহরণ করেন না, জ্ঞানের একটা আবহাওয়া তৈরি করেন। আর সেই আবহাওয়ায় যুক্তির চেয়ে গাম্ভীর্যের ছাতাটাই বেশি কাজে আসে।*
*ব্যঙ্গটা কোনো সমীরবাবুর বিরুদ্ধে নয়; আমাদের ভেতরের সেই প্রবণতার বিরুদ্ধে, যেখানে আমরা না-জানা কথাটাকে সহজভাবে স্বীকার করার চেয়ে, একটা মনগড়া থিওরি খাড়া করে নিজেদের শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে বেশি ভালোবাসি।*
—oooXXooo—
![]()







