‘কালীর বেটা- রামপ্রসাদ’
– শ্যামাপ্রসাদ সরকার
অষ্টাদশ শতাব্দীর ধর্ম ও মাতৃরসে জারিত এক উল্লেখযোগ্য কাব্যধারা হল শাক্তপদাবলী! কিন্তু এটি কোনও কাব্য সৃষ্টির স্বয়ম্ভু সাধনার হঠাৎ উদ্ভূত ফল এই পদগুচ্ছ নয়। মাতৃকাসাধনার একটা উৎপত্তিস্থল বঙ্গসমাজের চারপাশেই তখন ছিল এমনকি তা আজও রয়ে গেছে। সেই উৎসস্থল কেবল সমকালীন বা পূর্বাপর কবিদের প্রেরণারস্থল নয় যা কবিকে প্রভাবিত করেছিল।
উৎসমূল কথাটি বললে যথার্থ হবে যে গঙ্গারিডি সভ্যতার সময় থেকেই নানাবিধ রূপে মাতৃকাসাধনের ধারাতেই পরবর্তীকালে স্নাত হয়েছে রামপ্রসাদের কালীকীর্তনের পদগুচ্ছ।
গঙ্গারিডি সভ্যতা ও পাণ্ডুরাজার ঢিবিতে পাওয়া মাতৃমূর্তিগুলি পরবর্তী তন্ত্রধর্মের বীজস্বরূপ যা বাঙালির প্রকৃতিপূজার অকৃত্রিম রূপ ও তার ক্রমান্বয়ে পরিবর্তনের যে ধারা লক্ষ্য করা যায় তার থেকে বাঙালির ধর্মের বিবর্তনের একটি রূপরেখা খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন নয়।
ফলতঃ প্রকৃতি বা আদিমাতৃকার সার্বভৌমত্ব এখানে প্রধান। এমনকি পুরুষতত্ত্ব তাঁর পদতলে অথবা শিশুরূপে তাঁর কোলে অবস্থিত। ইঙ্গিতটি স্পষ্ট এমনকি সাংখ্য বর্ণিত নির্বিকার নিষ্ক্রিয় পুরুষ একান্তভাবেই দেবীর শরণাগত। বলা চলে যে চর্যাপদ থেকে মঙ্গলকাব্যের উজান ধার বেয়ে আসা আসা বৈষ্ণব পদাবলীই ক্রমে চিরকাল শাক্ত পদাবলীর গতিপথটিকে নিয়ন্ত্রিত ও প্রভাবিত করেছে। কারণ আমাদের ইতিহাস বারংবার প্রমাণ করেছে কোন সৃজনই কখনও তার দেশ, কাল, সমাজব্যবস্থার ঊর্ধ্বে নয়।
অষ্টাদশ শতকে যখন একদিকে বর্গীর হাঙ্গামা তার সাথে ইসলামপন্থী শাসকদের ধর্মীয় মৌলবাদ বাঙালীর স্বধর্ম, প্রাণ এসব কিছুতেই একটা নিরাপত্তার অভাবে জর্জরিত ঠিক এরকমই এক জরাতুর কালে সাধক কবি রামপ্রসাদ এসেছিলেন তাঁর সাধনার অনুভূতিলব্ধ সুর ও ধ্বনি নিয়ে।
তাঁর বাণীতে ক্লান্ত, অবসন্ন বাঙালী-জীবন মায়ের রক্তচরণ কমলে বিপদ মুক্তির শরণাগতি খুঁজেছে।সন্তানের আতুর ব্যাকুলতা মায়ের প্রতি দুহাত বাড়ানো স্নেহ প্রার্থনা রামপ্রসাদের ভবঘুরে জীবনের মহত্তর সাফল্য। নিয়ত শ্রমে ও সেবায়, বৈরাগ্যে ও ব্যর্থতায়, প্রার্থনায় ও বার্ধক্যে, স্নেহবুভুক্ষার কম্পিত মুহূর্তে কিংবা ভক্তির আকণ্ঠ ক্রন্দনে নৈসর্গিক আবেগের বাণীরূপ রামপ্রসাদের পদাবলী।
বাঙালীর অতি কাছের মাটির গন্ধমাখা জীবন প্রসাদী সুরের মধ্য দিয়ে আজকের আধুনিক সংস্কৃতির যুগেও অতি সহজে প্রবেশ করে আমাদের বাতায়ন পাশ দিয়ে। মর্মগ্রাহী হয়ে ওঠে সমর্পণের এইসব বিশেষ পদগুচ্ছ। আমরা দেখতে পাই অষ্টাদশ শতাব্দীতে শক্তিমানের হঠকারী শাসনে, অদৃষ্ট রাজার নামে রাজপুরুষের ঘৃণ্য অত্যাচারের ফলে নাগরিকতায় অনপুযুক্ত গ্রাম্য মানুষগুলি যখন বাধ্য হয়ে নগরের দিকে চালিত হল সেই অস্থির কালক্ষেপে জীবন ও জীবিকারক্ষার তাগিদেই সাবেককালের কুমারহট্ট বা হাবেলীশহর, কৃষ্ণনগর ও ডিহি কলকেতাকে ক্রমে অচ্ছেদ্যবন্ধনে বেঁধে ফেলল যেসব কারণে, তার অন্তত একটি কারণ অবশ্যই রামপ্রসাদ সেন স্বয়ং। নিষ্ঠুর দুর্ভাগ্য তাঁকে পুরুষানুক্রমে শুধু ভিষগাচার্যের পেশা থেকে উৎক্ষিপ্ত করে প্রবাসে মুহুরিগিরির বৈষয়িক জটিলতায় নিয়োজিত করেছে তাই নয় , বরং সেই বিষয়ান্তরিত জীবনের ব্যর্থতা তার স্বভাব-সংগত চিত্রকল্পেই আত্মপ্রকাশ ঘটেছে প্রসাদী পদে। এই সার্থক পুনর্যাপন তার পরিচিত সুরে আজও যেন আবেগঘন কন্ঠে আকাশ বাতাসে ভেসে ওঠে অনন্য সুরসঙ্গমের আবেশে,
“মন’রে কৃষিকাজ জানো না,/এমন মানব-জমিন রইল পতিত আবাদ করলে ফলত সোনা।”
যেন চিরন্তন সেই অকর্ষিত মানবজীবনকে আধ্যাত্মিকতারূপ কৃষিকর্মের দ্বারা শস্যসম্ভব করার পিছনে কৃষিকর্মের ব্যর্থতা জনিত আক্ষেপটি একান্তই জীবিকা বঞ্চনার নিষ্ফলতা থেকে প্রক্ষিত হয়েছে।
….
গৃহী অথচ সাধককবি হয় ওঠার পদে রামপ্রসাদ বড় সাবলীল। তাঁর আরাধ্যা ব্রহ্মময়ী শোণিতপিয়াসী ভয়ঙ্করী নন। প্রসাদের গানে বারংবার দৈবীঅবয়ব এসে ধরা দিয়েছে মাতা, কন্যা এমনকি প্রিয়ার রূপকল্পে। এসবের পাশাপাশি আগমনী ও বিজয়ার গানেও রামপ্রসাদের প্রতিভা বাৎসল্যরসের প্রকাশ ঘটিয়ে চলেছে নিরন্তর।
স্বমুখে যেন মা মেনকা কন্যাকে কাছে না পাওয়ার দুঃখে সিদ্ধান্ত করে বলে ওঠেন,
“এবার আমার উমা এলে আর উমা পাঠাব না/বলে বলবে লোকে মন্দ কারো কথা শুনব না।”
তৎকালীন বঙ্গজীবনে দীর্ঘ অদর্শনের পরে মাতা-কন্যার মিলন মুহুর্তটি বর্ণনায় রামপ্রসাদ অসাধারণ কবিত্বশক্তির পরিচয় দিয়ে বলে ওঠেন
“উমা কোলে বসাইয়া চারুমুখ নিরখিয়া/চুম্বে অরুণ অধর।”
আবার একইভাবে বিজয়ার দিনে উমাকে মহাকালের হাতে তুলে দিতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত মায়ের অবুঝ মন বলে ওঠে-
“তনয়া পরের ধন না বুঝিয়া বুঝে মন/হায় হায়, একি বিড়ম্বনা বিধাতার।”
জীবন যে এত সহজ অনাড়ম্বর অথচ মর্মস্পর্শী ভাষায়, ছন্দে, সুরে প্রকাশিত হতে পারে প্রসাদী গানের অবির্ভাব না হলে বাংলা সাহিত্য তা জানতেই পারত না।
তবে নির্জনাচারী সাধক কবি রামপ্রসাদ শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠেছেন তাঁর সাধনাশ্রয়ী শাক্তপদগুলোর জন্য। এই পদগুলির রামপ্রসাদ একজন মরমী তন্ত্রসাধক। সাধারণ তন্ত্র সাধনায় সুকোমল হৃদয়বৃত্তি নেই; আছে কঠোর তপস্যা তীব্র কৃচ্ছ্রতা।
সেখানে রামপ্রসাদ এই সকল তান্ত্রিক আচরাদির মধ্যেও, যে মা ব্রহ্মাণ্ডের পালয়িত্রী, এই সমগ্র বিশ্ব যাঁর চরণোৎক্ষিপ্ত ধূলিকণার ভগ্নাংশ, সেই অনির্বচনীয় শক্তিকে সন্তানের অসীম করুণায় আপনার ভগ্ন গৃহভিত্তির সংলগ্ন বেড়া বাঁধার কাজে নিয়োগ করেছেন, উন্মার্গগামী হয়ে পরমাত্মরূপিণী আদিভূতা সনাতনীকে পারিবারিক পরিমণ্ডলের মধ্যে সংস্থাপিত করেছেন। এসব কবির মৌলিকতার স্বাক্ষরবাহী।
রামপ্রসাদ জগজ্জননীর চরণে কেবল সাধনার জবাপুষ্প অর্পণ করেননি বরং বেদনার রসে বাৎসল্যের তর্পণ করেছেন। মায়ের প্রতি রামপ্রসাদের অভিযোগ তাই বাহ্যিক। তার অন্তর্নিহিত মাতৃনির্ভরতাই পদগুলির সবচেয়ে বড় কথা। জীবনে দুঃখের অভিজ্ঞতা লাভ করে তাই তিনি বলেছেন-
“মা নিম খাওয়ালে চিনি বলে কথায় করে ছলো/ওমা মিঠার লোভে তিতো মুখে সারাদিনটা গেল।”
ভাগ্যের চলনে যে গ্রাম্য পদকর্তাটি কৃষ্ণনগরাধীশ রাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায় ও সাবেক কলকাতার অন্যতম ধনী দুর্গাচরণ মিত্রের বদান্যতায় ক্রমে কবি-রঞ্জনী মুগ্ধতার চরম বিকাশ ঘটাতে পারবেন তা বোধহয় নিহিত ছিল কালসন্দর্ভের অনায়াস চলনে। উপমা হিসেবে কলুর তৈলনিষ্কাষণ যন্ত্রের চারপাশে অন্ধ বলদের রাত্রিদিন চক্রাবর্তনের ব্যবহার তথা প্রাণধারণের গ্লানি রামপ্রসাদের পদে সাধারণভাবে প্রকাশিত হয়েছে উচ্চতর ভাবাবেশে।
“ভবের গাছে বেঁধে দিয়ে মা, পাক দিতেছ অবিরত/ তুমি কি দোষে করিলে আমায়, ছ’টা কলুর অনুগত।”
আজীবন মাতৃচরণের প্রতি তাঁর পূর্ণ আস্থা আছে। অন্ধবৎ জীবনযাপনের যান্ত্রিক তাড়না ছেড়ে তাঁর একটিমাত্র আকাঙ্খা যার পদাশ্রয়ে স্থান নেওয়া তা যেন অচিরেই প্রতিটি জগতবাসীর সম্যক কামনার সমভাবাপন্য হয়ে ওঠে!
“একবার খুলে দে মা চোখের ঠুলি/দেখি শ্রীপদ মনের মতো।”
যেন সংসার জ্বালায় অশ্রুপাত শেষ করে, মাতৃনামের পুলকে গলদশ্রু হয়ে তাই কবি গেয়ে ওঠেন,
“রামপ্রসাদ বলে, ভবের খেলায়, যা হবার তাই হলো/ এখন সন্ধ্যাবেলায়, কোলের ছেলে, ঘরে নিয়ে চলো।”
…..
বৈষ্ণবীয় গানে প্রেমভক্তির যে ধারা তা কখন যেন বাৎসল্য রসের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে উগ্র তপস্যা আর মন্ত্রতন্ত্রের আয়োজন থেকে মানুষের মনকে মুক্তি দিয়ে জীবনের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। রামপ্রসাদের কোমল মৃত্তিকাগন্ধী এই গানগুলিতে সর্বদাই সেই একই ধারার অনুরণন।
রামপ্রসাদের কবিভাষা সাদামাটা কথায় তাঁর পদে অভিব্যক্তি লাভ করেছে। আদ্যাশক্তি শ্যামার সঙ্গে তাঁর সর্বদা মা-ছেলের সম্পর্ক। বস্তুত রামপ্রসাদের রচিত পদগুলির সবটাতেই আছে অষ্টাদশ শতাব্দীর হতাশা আচ্ছন্ন গরীব মানুষের বড় সান্ত্বনার স্থল যা বাস্তব দুঃখের একমাত্র প্রতিষেধক। রামপ্রসাদের ক্রন্দনের তীব্রতায় অসহায়তার উৎকণ্ঠ বিলাপ, কেবল নিশ্চিন্ত উদাসীন মাতাকে বিচলিত করে তাঁর অবশ্যপ্রদায়ী কৃপালাভের জন্য।
‘কালীর বেটা’ রামপ্রসাদ তাঁর অধ্যাত্ম সাধনার বাস্তবতা ও কাব্যরসের ত্রিবেণী রচনা করে ভক্তিরসাশ্রিত গীতিসাহিত্যকে সার্থকতার পথে উত্তীর্ণ করে দিয়েছেন। অথচ তাঁর কাব্যের ছন্দ মধ্যযুগের বিলম্বিত তানপ্রধান ছেড়ে বাংলা ভাষার নিজস্ব স্বরবৃত্তে প্রকাশিত।যেন রামপ্রসাদ নিজেই অষ্টাদশ শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে অনাগতকালের সমুদ্র-কল্লোল শুনতে পেয়েছেন বলে দেবতা ও মানুষের সঙ্গে ব্যক্তিতান্ত্রিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছেন।
“মা আমায় ঘুরাবি কত”!
এটাই তো বাংলা গীতিকবিতার এখানে প্রথম অস্ফুট ঊষারাগ! মধ্যযুগের ঝঞ্ঝাবর্তের দিনগুলিতে তাই আমরা পাই এই প্রথম কবিকণ্ঠ যা এক সম্প্রদায় নিরপেক্ষ নিঃসঙ্গ ব্যক্তিত্বকে দেবতার সামনে নিয়ে এল। যেখানে লোকায়ত মানবতাবাদ অন্তরের স্বতঃস্ফূর্ত গোত্রহীন ভক্তির নতুন সুর, নতুন কবিভাষার জন্ম দিয়েছে। প্রসাদী সঙ্গীতে বাংলা সাহিত্য যে আধুনিক যুগের অঙ্কুরোদ্গম।
নিয়ত দারিদ্র ও প্রাক্ পলাশী’র রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে যে অস্থিরতা, বিষয়বিকার ও গার্হ্যস্থ বেদনা আছে তার মধ্যে নিমজ্জিত থেকেও সতত সূর্যমুখীর মত হৃদয়ের অতন্দ্র সাধনাকে যে ঊর্ধ্বচারী করে রাখা যায় তাই যেন প্রসাদী ফুলের মত জেগে আছে কালান্তরের পালাবদলে।
অন্যদিকে তাঁর পরম মিত্র ও মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ভারতচন্দ্রের মত তিনিও জীবনের সকল লাঞ্ছনা-বেদনার মধ্যেও আদতে একজন প্রেমের কবি। যদিও সেই ঐহিক প্রেমাচরণ অচিরেই অভয়পদের প্রতি সব জাগতিক চাঞ্চল্যকে এনে যে সমর্পণ করা যায় বলে তা গৃহী সংসারী ও রিপু- আসক্ত সব মানুষের অনুসরণযোগ্য।
তাই রামপ্রসাদের কবিরূপে জনপ্রিয়তা ও তাঁর ‘কালীর বেটা’ পরিচয়টি কবিসত্তার সাথে তাঁর সাধক সত্তাটির প্রতিস্পর্ধী হয়ে জেগে থাকে বলে আমরা আজও তদ্ভাবে বলতে পারি,
‘ধন্য হে কবিরঞ্জন! ধন্য তোমার ঐশী সাধনা! ‘
—oooXXooo—
![]()







