বিশেষ প্রতিবেদন: ২০২৬ সালের শেষভাগে এসে এক অভূতপূর্ব মহাসংকটের মুখে দাঁড়িয়ে মানবজাতি। খাদ্য, সার এবং জ্বালানির আন্তর্জাতিক জোগান শৃঙ্খল (Global Supply Chain) একের পর এক মারাত্মক ধাক্কা খাওয়ার ফলে বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা আজ খাদের কিনারে। সম্প্রতি ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর বৈশ্বিক মঞ্চে এক কড়া সতর্কবার্তা জারি করে জানিয়েছেন যে, আগামী মাসগুলোতে এবং বিশেষভাবে চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে বিশ্ব এক ভয়াবহ খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হতে পারে।
ইউক্রেন-রাশিয়া দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তাপ, লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা এবং বিশ্বজুড়ে সারের চড়া দাম—এই সমস্ত কারণ একসঙ্গে মিলে এক অপ্রতিরোধ্য ‘পারফেক্ট স্টর্ম’ বা বিধ্বংসী সংকট তৈরি করেছে।
কেন ডিসেম্বর থেকেই তৈরি হচ্ছে এই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি?
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক বাণিজ্য শৃঙ্খল যে সংকটে পড়েছে, তার প্রকৃত মাশুল বিশ্বের সাধারণ মানুষকে গুণতে হবে চলতি বছরের শেষ চার মাসে:
-
সার সংকটের বিলম্বিত প্রতিক্রিয়া (Fertilizer Shock Lag): কৃষিকাজে সার ব্যবহারের মাস কয়েকের মধ্যে ফসল উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের প্রভাব দৃশ্যমান হয়। চলতি বছরে হরমুজ প্রণালী ও রাশিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের কারণে সারের দাম ৮০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলস্বরূপ রবি ও পরবর্তী মৌসুমে ফসল উৎপাদন বিপুল পরিমাণ কমে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে, যা ডিসেম্বরে বাজারে প্রভাব ফেলবে।
-
লোহিত সাগর ও বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে ধস: লোহিত সাগর এবং উপসাগরীয় সমুদ্রপথে সামরিক অস্থিরতার কারণে পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে অতিরিক্ত হাজার হাজার মাইল ঘুরে যাতায়াত করতে হচ্ছে। ফলে শিপিং কস্ট বা পরিবহন খরচ এবং বীমা মাশুল কয়েক গুণ বেড়ে গিয়ে খাদ্যদ্রব্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে।
-
জ্বালানি সংকট ও খাদ্যের পরিবহন ব্যয়: ইউক্রেন এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের জেরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিতিশীলতা দেখা দেওয়ায় সার কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয় আকাশছোঁয়া হয়ে উঠেছে।
পরিসংখ্যানে বৈশ্বিক খাদ্য সংকট
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (World Food Programme – WFP) এবং বিশ্বব্যাংকের হালনাগাদ সমীক্ষা অনুযায়ী পরিস্থিতি কতটা আশঙ্কাজনক:
ইউক্রেন যুদ্ধ ও কৃষ্ণসাগরীয় শস্য চুক্তি ভঙ্গ
ইউক্রেন ও রাশিয়া বিশ্ববাজারের প্রায় ৩০% গম ও বার্লি সরবরাহ করে থাকে। যুদ্ধ পরিস্থিতি তীব্র হওয়ায় কৃষ্ণসাগর দিয়ে খাদ্যশস্য রফতানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের মিশর, তিউনিসিয়ার মতো দেশগুলোতে রুটি ও খাদ্যসামগ্রীর দাম রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে।
সার সরবরাহ বন্ধে শ্রীলঙ্কার অতীতের শিক্ষা এবং বর্তমান বৈশ্বিক পুনরাবৃত্তি
কয়েক বছর আগে শ্রীলঙ্কায় হঠাৎ সার সংকট কৃষি উৎপাদনে ধস নামিয়েছিল। ২০২৬ সালে বৈশ্বিক স্তরে কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক সার সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ফলে একই ধরনের বিপর্যয় এবার বিশ্বব্যাপী বড় বড় খাদ্য উৎপাদক দেশে ছড়িয়ে পড়ার জোরালো আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ভারতের প্রস্তুতি ও বৈশ্বিক অবস্থান
ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, বিশ্ব রাজনীতিতে কেবল অস্ত্র বা যুদ্ধ নয়, খাদ্য ও শক্তি নিরাপত্তাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার কুপ্রভাব পড়ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। ভারত নিজের অভ্যন্তরীণ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাসমতি চাল ব্যতীত অন্যান্য চাল রফতানিতে নির্দিষ্ট শুল্ক ও কড়াকড়ি বজায় রেখেছে এবং দেশীয় কৃষকদের সার ভর্তুকি দিয়ে রক্ষা করার চেষ্টা করছে। তবে বৈশ্বিক খাদ্য শৃঙ্খল ভেঙে পড়লে মূল্যস্ফীতির আঁচ পুরোপুরি এড়ানো ভারতের মতো বিশাল জনসংখ্যার দেশের পক্ষেও কঠিন চ্যালেঞ্জ হবে।
সমাধানের পথ কী?
-
আন্তর্জাতিক কূটনীতি: লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যে বাণিজ্যিক রুটগুলোকে নিরাপদ রাখা।
-
সার ও বিকল্প শক্তি সরবরাহ সহজ করা: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে কৃষিপণ্য ও সারকে ভূ-রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা।
-
স্থানীয় কৃষি জোড়দারকরণ: আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে প্রতিটি দেশকে নিজস্ব খাদ্যশস্য মজুত ব্যবস্থা মজবুত করা।
#বিশ্বখাদ্যসংকট #এসজয়শঙ্কর #ভূরাজনীতি #খাদ্যনিরাপত্তা #অর্থনৈতিকসংকট #আন্তর্জাতিকসংবাদ #স্কিলবাংলা #ভারতেরবিদেশনীতি
#GlobalFoodCrisis #SJaishankar #Geopolitics #FoodSecurity #FertilizerShortage #SupplyChainCrisis #WorldEconomy #DecemberCrisis2026 #SkillBangla
![]()






