রিপোর্ট
বারিদ বরণ
সেদিন সকাল থেকেই আকাশটা ভারী ছিল।
মৌ বারবার স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল। আজ স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষার রিপোর্ট দেওয়া হবে। অন্য সবার বাবা-মা আসবেন। ক্লাস টিচার আগেই বলেছিলেন,
“অভিভাবক ছাড়া রিপোর্ট দেওয়া হবে না।”
মৌ এর বুকের ভেতর কেমন একটা অজানা আনন্দ ছিল। সে এবার প্রথম হয়েছে। বাবার চোখে সেই গর্বটা দেখবে সে, এই স্বপ্নটাই কয়েক মাস ধরে তাকে রাত জাগিয়ে পড়তে শিখিয়েছে।
দুপুর গড়িয়ে গেল।
এক এক করে সব ছাত্রছাত্রী বাড়ি চলে গেল। স্কুলের মাঠটাও ফাঁকা হয়ে এল। মৌ স্কুলের গেটের দিকে তাকিয়ে রইল।
না… বাবা এলেন না আর।
মায়ের মুখ সে কোনোদিন দেখেনি। তাকে জন্ম দিয়েই মা পারি দিয়েছিলেন দূরের অজানা এক দেশে । বাবাই তার সব। তার গর্বের মুহূর্তে বাবাও যে পাশে নেই।
মা বলে ডুকরে কেঁদে উঠল মৌ।
ক্লাস টিচার কাছে এসে মাথায় হাত রাখলেন।
নরম গলায় বললেন,
“মৌ, কেঁদোনা মা , কাল নাহয় তোমার বাবাকে নিয়ে এসো।”
মৌ কিছু বলল না। শুধু মাথা নত করল।
সেদিন বাড়ি ফিরে সে প্রথমবার বাবার সঙ্গে কথা বলেনি।রাতে বাবা একটা ছোট্ট কাগজের প্যাকেটে দুটি গরম জিলিপি এনে বললেন,
“দেখ তো, তোর পছন্দের মিষ্টিটা এনেছি মা।”
মৌ মুখ ফিরিয়ে বলল,
“আমার জন্য সময় নেই, আবার জিলিপি আনতে সময় আছে?”
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে জিলিপিগুলো টেবিলে রেখে বাইরে বেরিয়ে গেলেন।
সেই রাতে মৌ শুনেছিল… উঠোনে বসে একজন মানুষ খুব আস্তে আস্তে কাঁদছিল।কিন্তু সে জানালা খুলে দেখেনি।
সময় কারও জন্য থেমে থাকে না।
মৌ পড়াশোনা শেষ করে বড় অফিসার হয়েছে। শহরে নিজের ফ্ল্যাট, গাড়ি, সম্মান—সবই পেয়েছে।
শুধু বাবা কিছুই পেলেন না।
তার চাকরি পাওয়ার কয়েক দিন পরেই এক বর্ষার রাতে মানুষটা চুপচাপ পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।
রুগ্ন শরীর, ফ্যাকাশে মুখে চিরনিদ্রায় শুয়ে থাকা মানুষ টাকে দেখে মৌ সেদিন প্রথম বার উপলব্ধি করেছিল, তার সবথেকে কাছের মানুষটা হারিয়ে গেলো। বাবার চিকিৎসা টাও ঠিক মত করাতে পারেনি মৌ।
বাবার মৃত্যুর কয়েক মাস পরে গ্রামের পুরোনো বাড়ি বিক্রি করার জন্য আলমারি খালি করছিল মৌ।
এক কোণে একটা পুরোনো টিনের বাক্স।তার ভেতরে কিছু হাসপাতালের কাগজ, কয়েকটা শুকনো প্রেসক্রিপশন, আর একটি ডায়েরি।
পাতাগুলো হলুদ হয়ে গেছে।
প্রথম পাতায় লেখা—
“মৌ বড় হলে যদি কোনোদিন এটা পড়ে…”
মৌর হাত কাঁপতে লাগল।
সে পড়তে শুরু করল।
“আজ কাজ পাইনি। পকেটে মাত্র তিরিশ টাকা। কাল মৌর স্কুলের ফি। তাই হাসপাতালে গিয়ে রক্ত দিলাম। শরীরটা খুব দুর্বল লাগছে। কিন্তু মেয়েটা যেন পড়তে পারে।”
আরেকটা পাতা…
“আজ মৌ এর রিপোর্ট দেওয়ার দিন। সকালে ঠিক বেরিয়েছিলাম। এমন সময় হাসপাতাল থেকে খবর এল—একজন রোগীর জন্য জরুরি রক্ত দরকার। ভাতা হিসেবে যে টাকা পাব, সেটা না পেলে মৌ এর বই কেনা হবে না। অনেক দেরি হয়ে গেল। স্কুলে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সবাই চলে গেছে। দূর থেকে দেখলাম, আমার মেয়েটা গেটে দাঁড়িয়ে আছে। কাছে যাওয়ার সাহস হলো না। ও রাগ করুক। একদিন বুঝবে।”
ডায়েরির পাতায় ছোট ছোট বাদামি দাগ।
কালির দাগ নয়।
চোখের জলের দাগ।
শেষের দিকের পাতাগুলো আরও কাঁপিয়ে দিল।
“আজ ডাক্তার বললেন, শরীর আর রক্ত দিতে দেবে না। ভালোই হয়েছে। মৌ এখন অনেক বড় হয়েছে। আর কয়েকটা মাস হয়তো… তারপর ও নিজের পায়ে দাঁড়াবে।
সবশেষ পাতায় মাত্র এক লাইন—
“যদি কোনোদিন আমার ওপর রাগ থাকে, এই ডায়েরিটা পড়ে আমাকে একবার ক্ষমা করে দিস, মা। আমি তোকে সময় দিতে পারিনি… কারণ আমি তোর ভবিষ্যৎ দিতে ব্যস্ত ছিলাম।”
ডায়েরিটা মৌ এর হাত থেকে মেঝেতে পড়ে গেল।
জীবনে প্রথমবার সে বুঝল—
যে মানুষটাকে সে অবহেলার অভিযোগ করেছিল, সেই মানুষটাই নিজের শরীরের রক্ত দিয়ে তার স্বপ্নের রং এঁকেছিলেন।
সেদিন সন্ধ্যায় মৌ বাবার ছবির পাশে বসে অনেকক্ষণ কাঁদল।তার হাতে ছিল সেই রিপোর্ট কার্ড।
যেটা বাবা কোনোদিন দেখতেই পারেননি।মাটির ওপর রিপোর্টটা রেখে সে ফিসফিস করে বলল,
“বাবা… আমি প্রথম হয়েছিলাম। কিন্তু মানুষ হতে এত দেরি কেন হলো?”
চারদিকে শুধু বাতাস বইছিল।
মনে হচ্ছিল, কোথাও থেকে একজন বাবা খুব শান্ত গলায় বলছেন—
এখন বুঝলি তো, মা… তুই সেদিন খাতায় প্রথম হয়েছিলি, আর আজ আমি তোর হৃদয়ে স্থান পেয়ে বাবা হিসাবে প্রথম হলাম ।”
—oooXXooo—
![]()







