বেসুরো ভৈঁরো
নবকুমার চক্রবর্ত্তী (নবু)
সেদিন পাড়ার মোড়ে জটলা দেখে ভাবলাম, বোধহয় দেশোদ্ধারের কোনো নতুন ফর্মুলা আবিষ্কৃত হয়েছে। কাছে গিয়ে দেখি, দেশোদ্ধার নয়, মানুষ-উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। গদাইবাবু—যার কণ্ঠস্বর শুনলে বসন্তের কোকিলও অকালে সন্ন্যাস নিতে চায়—তিনি আজ মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আকাশ বিদীর্ণ করে গাইছেন, “মানুষ মানুষের জন্য”। অথচ তার বাঁ হাতের কনুইটা পাশের এক রিকশাওয়ালার পাঁজরে এমনভাবে বিঁধে আছে যে, রিকশাওয়ালাটা তখন স্রেফ মানুষ হওয়ার অপরাধে ধুঁকছে।
নবু হিসেবে আমার চিরকালের বদঅভ্যেস হলো গোলমালের গোড়ায় একটু ঠান্ডা জল ঢালা। গদাইবাবুকে শুধোলাম, “হঠাৎ এই অবেলায় তানের তুফান কেন গদাই?”
গদাই বাবু এক মুহূর্তের জন্য সুর থামালেন। সেই বিরতি টুকু ছিল মরুদ্যানে এক ফোঁটা জলের মতো আরামদায়ক। তিনি করুণ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “নবুদা, আপনি কি পড়েননি? বিপদকালে গুনগুন করতে হয়। দেশের যা অবস্থা, চারদিকে যে বিষবাষ্প, তাতে গান ছাড়া তো আর বর্ম নেই। আমি তো আসলে আমার ‘বিপদ’ থেকে বাঁচার জন্য রিহার্সাল দিচ্ছি।”
আমি বুঝলাম, গদাইবাবু একা নন। আমাদের এই ‘গান-হীন’ দেশে এখন সুরের চেয়ে শোরগোল বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। আসলে যখন মগজের জানালাগুলো খিল দিয়ে বন্ধ থাকে, তখন মানুষ গলার শির ফুলিয়ে সেটা ঢাকতে চায়। আমাদের সমাজটাও এখন অনেকটা ওই ভাঙা হারমোনিয়ামের মতো—রিড টিপলে সুর বেরোয় না, শুধু ফুসফুস ফাটা বাতাসের ঘড়ঘড়ে আওয়াজ শোনা যায়। নিকোলো মেকিয়াভেলি বলেছিলেন, “সবাই দেখে তোমাকে কী মনে হচ্ছে, খুব কম লোকই অনুভব করে তুমি আসলে কী।” আমাদের সমাজটাও এখন সেই ‘মনে হওয়ার’ প্রতিযোগিতার মিছিলে যোগ দিয়েছে।
সুরের ছদ্মবেশে আসুরিক উল্লাস
আমাদের এই যুগে গানের মানে বদলে গেছে। আগে মানুষ গান গাইত আনন্দ ভাগ করে নিতে, আর এখন গান গায় পাশের বাড়ির মানুষের ঘুম ভাঙাতে। যে যত বিপদে পড়ে, সে তত জোরে চিৎকার করে। এটাকে অনেকটা ওই পকেটমারের ‘চোর চোর’ চিৎকারের সাথে তুলনা করা যায়; নিজের পকেটের শূন্যতা ঢাকার জন্য অন্যের দিকে আঙুল তুলে সশব্দে গান গাওয়াই এখনকার দস্তুর।
রাস্তায় বেরোলে দেখবেন, জঞ্জালের স্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে সুবেশধারী কেউ গান গাইছেন। ময়লার গন্ধে যখন নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসার জোগাড়, তখন তিনি সুর ধরলেন— “মলয় পবনে দোলে”। নবুর এই উপমাটা খাসা নয় কি? যে সমাজ দুর্নীতির নর্দমায় কণ্ঠ পর্যন্ত ডুবে আছে, সে যখন টিভির পর্দায় বসে নীতিবাক্যের সরগম ভাজে, তখন সেটাকে প্রহসন বললে প্রহসনকেও অপমান করা হয়!
আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনটা এখন একটা অদ্ভুত সার্কাস। মাইনে বাড়ছে না, আন্দোলন মিটছে না, বাজারের থলেটা দিন দিন হালকা হচ্ছে, অথচ আমরা ড্রয়িং রুমে বসে মিউজিক সিস্টেমের ভলিউম বাড়িয়ে দিচ্ছি—যেন বিটের দাপটে বাজারের ফর্দ আর বুকের ধড়পড়ানিটাকে ছাপিয়ে দেওয়া যায়। বিপদ দেখলে উটপাখি বালিতে মুখ গোঁজে, এটা তার ধর্ম; আর বাঙালি গোঁজে ইয়ারফোন। ওই যে কথায় আছে না, “গলা ছেড়ে গান গাও”—আমরা গাইছি বটে, কিন্তু সুরটা মনের নয়, সেটা স্রেফ একটা ‘ডিফেন্স মেকানিজম’।
আমি আমার স্ত্রীকে বারবার দেখেছি—কখনো যদি একটু খটামটি বা কোনো বিষয় নিয়ে কথার বেসাতি হলো, আর আমি যখন তাকে তিরস্কার করছি, তখন দেখি তিনি দিব্যি গুনগুন করে গান গাইছেন। আজীবন ভেবেও কূলকিনারা পেলাম না—এটা কি আমাকে ব্যঙ্গ করার জন্য, নাকি নিজের ভুল স্বীকার করার এক অদ্ভুত কৌশল? তার সুরের আড়ালে আমার যুক্তির তলোয়ার গুলো কেমন যেন ধারহীন ও ভোঁতা হয়ে যায়।
পচা গলা ও রাজনীতির বায়নাক্কা
রাজনীতির মঞ্চে গেলে তো আর কথাই নেই। সেখানে সুর আর অসুর যেন যমজ ভাই। জনৈক নেতা যখন জনসভায় দাঁড়িয়ে আর্তকণ্ঠে বলেন, “আমি তোমাদেরই লোক”, তখন আমার মনে হয় তিনি আসলে একটা দীর্ঘস্থায়ী ‘বেসুরো’ ভৈঁরো গাইছেন। তাঁর গানের প্রতিটি তান যেন একেকটি মিথ্যে প্রতিশ্রুতির আলপনা। মানুষ তালি দেয়। ভাবুন একবার, একটা গোটা জাতি বেসুরো গান শুনে হাততালি দিচ্ছে! এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে? জর্জ বার্নার্ড শ বলেছিলেন, “ভণ্ডামি হলো পাপের দেওয়া শ্রেষ্ঠ কর।” আমাদের নেতারা সেই কর মিটিয়েই হাততালির ফসল ঘরে তোলেন।
আসলে গান তো এখন আর শিল্পের পর্যায়ে নেই, ওটা এখন একটা ‘প্রোডাক্ট’। আর আমরা হলাম তার ভোক্তা। যখন দেখি সমাজের বড় বড় রুই-কাতলারা একেকটি কেলেঙ্কারিতে ধরা পড়ে শ্রীঘরে যাওয়ার আগে ভজন গাইতে শুরু করেন, কিংবা সরকারি তহবিলের দয়ায় নার্সিংহোমের শীততপ নিয়ন্ত্রিত শুভ্র বিছানায় নাক ডেকে ঘুমোচ্ছেন—তখন হাসি পায়। গান তখন আর আধ্যাত্মিক থাকে না, ওটা হয়ে দাঁড়ায় উকিলের ফি-র চেয়েও সস্তা একখণ্ড নেকড়া, যা দিয়ে পচা চরিত্রের দাগ মোছার চেষ্টা চলে।
উপমাটা হয়তো একটু কড়া হয়ে গেল। কিন্তু কী করব? মাখন দিয়ে তো আর মরচে ধরা তলোয়ার ধার দেওয়া যায় না। আমাদের বিবেক নামক যন্ত্রটিতে এখন মরচে ধরেছে, আর সেই মরচে ঢাকতে আমরা সবাই গায়ক সেজে বসে আছি। বিপদে পড়লে ভগবানকে ডাকার বদলে এখন আমরা ইউটিউবে ‘মোটিভেশনাল মিউজিক’ খুঁজি। মনে করি, সুরের ঐন্দ্রজালিক স্পর্শে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবের কাঠখড় যখন আগুনের শিখা হয়ে কপালে ছ্যাঁকা দেয়, তখন সেই গানের সুরটা স্রেফ আর্তনাদে পর্যবসিত হয়।
নীরবতার গান ও শেষ দীর্ঘশ্বাস
ছোটবেলায় দাদু বলতেন, “গান হলো মনের আয়না।” এখন আয়নার দিকে তাকালে ভয় লাগে। কারণ আয়নায় কোনো প্রতিচ্ছবি নেই, আছে শুধু একরাশ ধোঁয়া। আমরা সবাই ভ্রাম্যমাণ গায়ক। কেউ অফিসের ফাইলের তলায় গান চাপা দিই, কেউ আবার সংসারের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে বিড়বিড় করি। শিয়ালদহ লাইনের ট্রেনের নিত্যযাত্রীদের দেখবেন—তাঁরা ট্রেনের দেয়াল বা বাসের সিট বাজিয়ে গলা ছেড়ে গান গাইছেন। এঁরা কিন্তু ভিক্ষা করছেন না, একে আমরা বলি ‘টাইম পাস’। আসলে ওটা টাইম পাস নয়, ওটা হলো প্রতিদিনের পেষণ থেকে একটু অক্সিজেন শুষে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা।
গদাইবাবুর কথায় ফিরে আসি। গদাই সেদিন চিৎকার করে গান গেয়েছিলেন কারণ তাঁর বাড়িতে ইলেকট্রিক বিল এসেছে তিন মাসের বকেয়া সমেত। অন্ধকারের ভয়ে তিনি সুরের আলো জ্বালানোর চেষ্টা করছিলেন। এটাই আমাদের বর্তমানের প্রতীকী চিত্র। আমরা অন্ধকারে ভয় পাই, কিন্তু আলো জ্বালানোর সাহস নেই। তাই অন্ধকারেই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করি, যাতে নিজের হৃৎপিণ্ড বন্ধ হওয়ার আওয়াজটা নিজের কানে না পৌঁছায়।
গান-হীন এই দেশে প্রাণটাও এখন স্রেফ টিকে থাকার একটা যান্ত্রিক প্রক্রিয়া। হৃদয়হীন মানুষের ভিড়ে যখন কেউ ‘গলা ছেড়ে’ গান গায়, তখন বুঝবেন সে আসলে বড় একা। তার সেই গান কাউকে শোনানোর জন্য নয়, বরং নিজেকে এটা বোঝানোর জন্য যে— “আমি এখনো বেঁচে আছি”।
লেখাটা হাসতে হাসতেই শেষ করা যেত। কিন্তু নবু তো একটু খিটখিটে মানুষ, তাই হাসির শেষে একটা অস্বস্তির গিঁট দিয়ে দিলাম।
আজ রাতে যখন নিজের শোয়ার ঘরে একা শুয়ে থাকবেন, তখন একবার নিজের প্রিয় গানটা মনে মনে গাওয়ার চেষ্টা করবেন তো? দেখবেন, কলিগুলো ঠিক মনে পড়ছে না; সুরটা কোথাও একটা আটকে যাচ্ছে। কেন জানেন? কারণ গান গাওয়ার জন্য যেটুকু ‘প্রাণ’ প্রয়োজন, সেটুকু আমরা অনেক আগেই কিস্তিতে বিক্রি করে দিয়েছি।
আমাদের দেশটা এখন একটা বিশাল বড় মিউজিক রিয়েলিটি শো। বিচারকরা সবাই অন্ধ, আর গায়করা সবাই বোবা। শুধু ব্যাকগ্রাউন্ডে একটা যান্ত্রিক ট্র্যাক বেজেই চলেছে। আমরা ভাবছি খুব ভালো গান চলছে, আসলে ওটা আমাদেরই অস্তিত্বের শেষ ঘড়ঘড়ানি।
হাসছেন? হাসুন। হাসির চেয়ে বড় ওষুধ আর কী আছে বলুন? তবে হাসতে হাসতে যখন হঠাৎ বুকের বাঁ পাশটা চিনচিন করে উঠবে, তখন একবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গলার দিকে তাকালে দেখবেন—সেখানে গানের সুর নয়, একটা শক্ত ফাঁসির দড়ি আলতো করে জায়গা করে নিচ্ছে।
আমরা সবাই গাইছি বটে, তবে সেটা কোনো বন্দনাগীতি নয়—সেটা আসলে আমাদের নিজেদেরই সৎকারের শেষ বিদ্রূপ।
সমাপ্ত
![]()







