সরীসৃপ
********
✍ শ্যামাপ্রসাদ সরকার
ধূ ধূ করা নদীর চর। গরমকালে বিশেষ জল থাকেনা। গরু বাছুর, মানুষজন পায়ে হেঁটেই পার হয়ে যায়। যেদিকে তাকাও শুধু সাদাটে বালির চরা। এক দিকটায় লোকে এসে মরা পুড়িয়ে যায়। ছোটলোকই সব, যাদের পয়সা নেই। ভদ্দরলোকেরা ম্যাটাডোর ভাড়া করে সদরঘাটের শ্মশানে মড়া নিয়ে যায়। সেখানে মিউনিসিপ্যালিটির ঘাটবাবু আছে একজন, মড়ার নামটি রেজিস্টিরি করে তবে তাকে চিতেয় তোলে।
বিদ্যূৎ এসেছে এখানে সবে বছর পাঁচেক হল। মোবাইলের টাওয়ার এখনো ধরে না। গরীবগুর্বো মানুষগুলো চরে তরমুজ আর কপির চাষ করে। মোবাইলের দরকারও তাদের তেমন হয়না। বারো তেরো কিলোমিটার পরে সদরঘাটের রাস্তায় গিয়ে অবশ্য টাওয়ার মেলে। সামন্তের ছোট ছেলেটা মোবাইলের দোকান করেছে একটা। সবই চীনে মাল, তাও হাটফেরৎ লোকে হাতে করে নাড়ে চাড়ে বেশী, কেনে কম।
চরের শ্মশান মতো জায়গাটাতে হঠাৎ একটা নতুন লোকের আমদানি হল। সাদা আলখাল্লা পড়া, দাড়িগোঁফ আছে, মাঝবয়সী। লোকটার জিভটা ওল্টানো।হাঁ করলে একটা বেগনে রঙের অন্ধকার মুখের মধ্যে জেগে থাকে। কথা টথা বলতে পারেনা। মাঝে মাঝে গাঁয়ের ভেতর ঢোকে। প্রথম প্রথম ছোট বাচ্চারা দেখে ঢিল মারতো, পরে তারাও আর গোলমাল করত না।লোকটাও অবশ্য তাদের কখনো তেড়ে যায়নি কখনো। এমনই তার নির্বিরোধী স্বভাব। একটা পা টেনে টেনে হাঁটত আর মাঝেমাঝে কারো কারো দরজায় এসে দাঁড়িয়ে থাকত। ঠিক তাদের বাড়িই বেছে বেছে যেত যেখানে কেউ না কেউ অসুস্থ। চাল আর আনাজের সিধে নিয়ে চলে যেত আর দোরগোড়ায় একখানা মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখে। অদ্ভূত ব্যাপার সেই ঘরের রোগবালাইটাও সাথে সাথে দূর হত। তবে নিজে থেকে রোগ সারাতে কেউ ডাকলে তখন কিন্তু যেত না। চরার ধারে ঝুপড়ির সামনে আগুন জ্বেলে বসে থাকত। আপনি খেয়াল হলে তবেই গাঁয়ের ভেতর যেত। দুটো কালো কুকুর ওকে সবসময় পাহারা দিত যেন। ওই চরের ধারের ঝোপড়াটায় বসে সে কি করে রোগবালাই এর খবর টবর জানতে পারত তা কেউ বলতে পারবে না। কিন্তু রোগ সারতো। কেউ কেউ বলত ও নাকি পশুপাখিদের ভাষা বুঝতে পারে, কেউ বলত ফেরারী আসামী পুলিশের ভয়ে লুকিয়ে আছে, আবার কেউ বলত সাধু,অবতার! তবে হিন্দু না মুসলমান তাও বোঝা যেত না। কোনও দিন ধ্যানজপ করতে বা মালার ছড়া হাতে তাকে কেউ ঘোরাতে দেখেনি। লোকটা শুধু আকাশের দিকে বা ধূ ধূ চরার দিকে একদৃষ্টে পাথর হয়ে চেয়ে থাকত।
যতীনের বৌ বাঁজা বলে শাশুড়ির কাছে দুবেলা গঞ্জনা শোনে। চারবচ্ছর বিয়ের পরও নাতির মুখ দেখতে পায়নি বলে বুড়ি শাশুড়ি দুবেলা তাকে গাল পাড়ে। যতীন নিজে সদরে কম্পাউন্ডারের কাজ করে। ভোরবেলা সাইকেল করে বেরিয়ে যায় রাত্তির করে ফেরে। এসব জায়গায় সেই আধা ডাক্তার। লোকে ওর কাছেই ওষুধ চেয়ে নিয়ে যায়। সেও বউকে অনেক ওষুধপত্তর খাইয়েছে তাও তার কোল ভরলো কই।
বেশ সন্ধ্যের দিকে পা টিপে টিপে যতীনের বউ চরের পানে লুকিয়ে আসে। যদি কোন ওষুধপালা পাওয়া যায় তবে জন্মের মতো বদনামটা ঘোচে।
উল্টোদিক করে পাথরের মত লোকটা বসে আছে। সামনে কাঠকুটোর খুচরো আগুন। যতীনের বউ গলায় আঁচল দিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। আঁচলে দশটা টাকাও প্রণামী সে এনেছে। লোকটার মুখে আগুনের ভাপ লেগে যেন জ্যোতি বেরোচ্ছে। নির্বিকার চোখে সে তাকিয়ে থাকে কোন শূন্যমার্গে। হঠাৎ লোকটার হাতের দিকে চোখ পড়ে যায়। একটা বড় কালো কুচকুচে গোখরো সাপ, আর তাকে পরম মমতায় লোকটা হাতে ধরে বসে আছে। পরম স্নেহে তার কুলোপানা চক্রতে হাত বোলাচ্ছে ঠিক নতুন বউএর বিনুনিতে হাত দিয়ে সোহাগ করার মত। দেখে যতীনের বউ এর গা’য়ে পদ্মকাঁটা ফোটে। অত মোটা তেল চকচকে সাপটার হিলহিলে দেহটা সামনে দেখে বুকের ভিতরটা ধরাস ধরাস করে ওঠে। ভয় নয়,মেরুদন্ডের নীচটায় কেমন যেন শিরশির করে। কি অদ্ভূত ভাবে সাপটাকে আদর করছে লোকটা। ওকেও যদি কখনো কেউ এইরকম …
সে বুঝতে পারে ওর উরুমূল সিক্ত হয়ে যাচ্ছে নিষ্পাপ রাগমোচনে। লোকটা কিন্তু কিছুই যেন টের পায়না।
যতীনের বউকে উপেক্ষা করে লোকটা ওই শীতলদেহী সরীসৃপটাকেই শুধু আদর করে চলে বিকারহীন ভাবে।
–~০০০XX০০০~–
![]()







