।। ফুলটুসি ।।
✍🏻 অনিমেষ
[ শেষ পর্ব ]
( পূর্ব প্রকাশিতের পর ) ….. জমিদারদের জমিদারি আর নেই, বেশিরভাগই ভগ্নদশা। তবু তার মধ্যেই সন্মান বাঁচাতে যেটুকু পারেন করেন। ফুলির পটুয়া বাপ বেঁচে থাকতে সেই নাকি গাঁয়ের পূজোর প্রতিমা গড়তো। সে মারা যাওয়ার পর পাকাপাকি মন্দির গড়ে শহর থেকে প্রতিমা এনে পূজো করছেন বাবুরা। ফুলি উঠোনে পৌঁছে দেখে কালো কালো ছোট্ট মাথায় ভরে আছে, তার মানে বাকিরা সবাই পৌঁছে গেছে। ওই তো পারুল, শ্যামলীদেরও দেখা যাচ্ছে। বাড়ির বারান্দায় বুড়ো বাবু, বুড়িমা, ওনাদের ছেলে প্রদীপকাকু দাঁড়িয়ে। কাকু শহরে থাকে, প্রতি পূজোতে গাঁয়ে আসে, ছেলেমেয়েদের খুব ভালোবাসেন। কিন্তু পাশে উটি কে ?? ওই যে ওই সুন্দরপানা দিদিমণি ?? ওমা, কি সুন্দর দেখতে, ঠিক যেন দুগ্গা মা নেমে এসেছেন ভূঁয়ে। অমন সুন্দর এই গাঁয়ে ফুলি আর কাউকে দেখেনি। আচ্ছা, তার মা কি অমন দেখতে ছিল ? কি জানি, সে তো ফুলিকে জন্ম দিয়েই চলে গেছে। ফুলি দেখে সেই দিদিমণি উঠোনে নেমে সবার হাতে হাতে কি যেন তুলে দিচ্ছে। দেখতে দেখতে তার পালা এলো। ও মা গো, কি কান্ড !!! ….. এ তো মা দুগ্গার দেওয়া রঙিন কাগজ মোড়া সেই জিনিস !!! …… ফুলি বড় বড় চোখ করে তাকায়। দিদিমণি হেসে বলেন, ” দেখছো কি মেয়ে, খুলে দেখো এর এর মধ্যে তোমার জন্য কি রয়েছে, তোমার বন্ধুরা সব্বাই পেয়েছে “। সুন্দরপানা দিদিমণির কথাগুলো ভারি মিষ্টি, কি যেন জাদু আছে। ফুলি রঙিন কাগজ ছিঁড়ে ফেলে, ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে নতুন জামা, রঙিন বই, খাতা, পেন্সিল। প্রদীপ কাকুর মুখে ফুলি শুনতে পায় এ গাঁয়ে স্কুল ছিল না, তাই লেখাপড়ার পাট নেই। যারা পারে তারা এই ফুলডুঙরি গ্রাম পেরিয়ে অনেকটা পথ হেঁটে দূরের আর একটি গ্রামে গিয়ে লেখাপড়া করে। কিন্তু বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে সেটা পারে না, তাই মূর্খ। সেই জন্য বুড়ো জমিদার বাবুর প্রচেষ্টায় পূজোর পর থেকে গাঁয়ের দুর্গা মন্দিরের পাশে বটতলায় পাঠশালা বসবে এবং সুযোগ মতো তা আরও বড় হবে। সেই জন্যই শহর থেকে নতুন জামাকাপড় আর বইখাতা এনেছেন কাকু। নতুন জামা পরে বইখাতা নিয়ে সবাই পড়তে যাবে। কাকুর শহরের বন্ধু এই নতুন দিদিমণি তাদের পড়াবেন।
ফুলি ভেবে পায়না স্বপ্ন না সত্যি, এমন উপহার তাকে কেউ কখনো দেয়নি। কাকুকে প্রশ্ন করে, ” আমরা তাইলে সত্যি সত্যি নেকাপড়া শিকবো কাকু ? ” ফুলির মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে হেসে কাকু উত্তর দিলেন ” হ্যাঁ রে, পূজো এসে গেল, এই কদিন ছুটি, তারপর দিদিমণি তোদের রোজ নিয়ম করে পড়াবেন ” । ফুলটুসির দু চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। দিদিমণির মুখের দিকে চেয়ে মা দুগ্গার উদ্দেশ্যে দু হাত কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম করে সন্ধ্যার আঁধারে মংলু, হাসেম, পিটারদের সঙ্গে বাড়ির দিকে বেরিয়ে পড়ে। অনেক দূরে কোথাও থেকে বোধহয় ঢাকের আওয়াজ আসছে। বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়ে জোনাকি পোকার আলোয় পথ চলতে চলতে কানে আসে গাঁয়ে দুর্গা মন্দিরে পুরোহিত মশাই আরতি করছেন, মুসলমান পাড়ার মসজিদে করিম চাচা আজান দিচ্ছে, খ্রিস্টান পাড়ার গির্জায় পাদ্রীমশাই ঘণ্টা বাজিয়ে আরাধনা করছেন। মায়ের বোধনের দিন এগিয়ে এলো। ফুলির মাথার ওপর তারায় ভরা আকাশ আর সরু একফালি চাঁদ। তার মধ্যে কোনটা তার বাবা মা সে জানে না। তবু ঠাম্মার মুখে শুনেছে ওরা আকাশেই আছে। জল ভরা চোখে অজানা তারা দুটির উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলে, ” বাবা, মা, তোমরা শুনতে পাচ্ছো ? তোমাদের ফুলটুসি নেকাপড়া শিকবে গো, নতুন জামা পরবে, বড় হবে “। ফুলির হাত পরম যত্নে ধরে রাখে মংলু, হাসেম, পিটার।
—০০০:: সমাপ্ত ::০০০—
![]()







