তোমাতে আমার ঠিকানা (একাদশপর্ব)
বারিদ বরণ
আজ ফাইনাল পরীক্ষার শেষ দিন।
সকাল থেকেই কলেজ চত্বরে অদ্ভুত এক পরিবেশ।
কেউ শেষ মুহূর্তে নোট দেখছে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে শেষবারের মতো প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করছে, কেউ আবার পরীক্ষার চাপের মধ্যে নীরব হয়ে বসে আছে।
কিন্তু অভির মনটা আজ অন্যরকম।
কলেজের গেট দিয়ে ঢোকার সময় তার মনে হচ্ছিল—
এই কয়েকটা বছর যেন চোখের পলকে কেটে গেল।
মাটির ঘর থেকে শুরু করে এই কলেজের ক্লাসরুম…
মাঝখানে কত লড়াই, কত রাত জেগে পড়া, কত অপমান, কত আশা।
আজ সেই পথের একটা বড় পরীক্ষা।
অভি বটগাছটার নিচে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়াল।
এই গাছটার সঙ্গে কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে,পড়াশোনা, সূচির সঙ্গে কথা,স্বপ্ন আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা।
আজ আর বই খুলল না সে।
শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
তার ভেতরে একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছে।
অন্যান্য পেপারগুলো ভালোই হয়েছে।কিন্তু আজকের পেপারটা—সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরীক্ষাটা তাকে ভালো দিতেই হবে।
শুধু নিজের জন্য নয়।
তার মনে পড়ে গেল বাবার মুখ,রোদে পুড়ে ভ্যান চালাতে চালাতে যার শরীরটা ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে।মায়ের মুখ, যিনি অন্যের জমিতে কাজ করে সংসার টিকিয়ে রেখেছেন।
তারপর মনে পড়ল বিমল সেনের সেই কথাগুলো,
“সুচির পাশে দাঁড়ানোর যোগ্যতা তোমার নেই।”
অভির চোখে হঠাৎ কঠিন একটা দৃঢ়তা নেমে এল।
আজ তাকে শুধু একটা পরীক্ষা দিতে হবে না, অনেক প্রশ্নের জবাবও দিতে হবে।নিজেকে, সমাজকে, আর সেই মানুষটাকেও, যিনি তাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।
পরীক্ষার হলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে অভি।
চারপাশে ছাত্রছাত্রীদের ভিড়, কেউ শেষ মুহূর্তে নোট উল্টে দেখছে, কেউ চুপচাপ নিজের মনে প্রশ্নগুলো সাজিয়ে নিচ্ছে।
অভির হাতে কলম আর অ্যাডমিট কার্ড।
তবু কয়েক সেকেন্ডের জন্য সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
হঠাৎই তার মনে পড়ে গেল সুচির মুখটা।
গত কয়েকটা মাস যেন চোখের সামনে ভেসে উঠল।
ইচ্ছে করলেই সে সূচির কাছে যেতে পারত,ওর সঙ্গে আগের মতো কথা বলতে পারত।কিন্তু সে নিজেই দূরত্ব তৈরি করেছে।
কারণ সে জানে,মেয়েটা তাকে কতটা ভালোবাসে।
মন্দিরের সেই দিনটা তার মনে এখনও স্পষ্ট।
মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে সূচি নিজের সিঁথিতে সিঁদুর ছুঁইয়ে বলেছিল,
“এরপর একমাত্র তুমিই এই সিঁথিতে সিঁদুর পরাবে, আর কেউ না।”
সেই মুহূর্তটা যেন অভির জীবনের ভেতরে এক অদৃশ্য প্রতিজ্ঞা হয়ে গেছে।তবু সে নিজেকে আটকে রেখেছে।
কারণ অভি মনে মনে একটা দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।
সে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছবে।নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করবে।
তারপর একদিন…
ঠিক একদিন সে নিজেই সূচির সামনে দাঁড়াবে।
কোনো দ্বিধা ছাড়া, কোনো সংকোচ ছাড়া।
সেদিন সে শুধু একজন দরিদ্র গ্রামের ছেলে থাকবে না—
সে হবে নিজের লড়াইয়ে জয়ী একজন মানুষ।
কলেজের ঘণ্টা বাজল।
হলের ভেতর থেকে ইনভিজিলেটর ডাকলেন,
“সবাই ভিতরে আসুন।”
অভি ধীরে চোখ বন্ধ করে একটা গভীর শ্বাস নিল।
তারপর মনে মনে বলল,
“আর একটু অপেক্ষা করো সূচি…
আমি ফিরব।”
ছাত্রছাত্রীরা ধীরে ধীরে পরীক্ষার হলে ঢুকতে শুরু করল।
অভি গভীর শ্বাস নিল।তারপর হলের দিকে এগিয়ে গেল।সে জানে আজকের এই কয়েক ঘণ্টা তার ভবিষ্যতের পথকে অনেকটাই নির্ধারণ করে দেবে।
সে মাথা উঁচু করে পরীক্ষার হলের ভেতরে ঢুকে গেল।
কারণ আজ শুধু একটা পরীক্ষা নয়—তার ভবিষ্যতের পথের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শুরু হতে চলেছে।
শেষ ঘণ্টাটা বাজতেই হলের ভেতর যেন একসাথে অনেকগুলো চাপা নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো।ছাত্রছাত্রীরা ধীরে ধীরে কলম নামিয়ে দিল।
অভিও শেষ উত্তরটা লিখে খাতা বন্ধ করল।কয়েক মুহূর্ত সে স্থির হয়ে বসে রইল।মনে হলো বুকের ভেতর জমে থাকা একটা দীর্ঘ চাপ যেন হালকা হয়ে গেল।
পরীক্ষাটা ভালোই হয়েছে।
গত কয়েক মাসের পরিশ্রম, রাত জাগা, টিউশন পড়িয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া—সবকিছুর একটা মূল্য যেন আজ মিলেছে।
ইনভিজিলেটর খাতা সংগ্রহ করতে লাগলেন।
অভি খাতা জমা দিয়ে ধীরে ধীরে হলের বাইরে বেরিয়ে এল।করিডোরে তখন এক অদ্ভুত উত্তেজনা।কেউ প্রশ্ন মিলিয়ে দেখছে, কেউ স্বস্তির হাসি হাসছে, কেউ আবার ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা পরিকল্পনা করছে।
কিন্তু অভির মনে তখন অন্যরকম একটা দ্বিধা।
সে জানে,পাশের হলেই পরীক্ষা দিচ্ছিল সূচি।
এই মুহূর্তে নিশ্চয়ই ওর পরীক্ষাও শেষ হয়ে গেছে।
তার পা অজান্তেই একটু ধীর হয়ে গেল।
সে কি একবার অপেক্ষা করবে?
একবার যদি দেখা হয়…
কতদিন হলো ঠিক করে কথা হয়নি।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার মনে পড়ল নিজের সেই প্রতিজ্ঞা।
সে নিজেকেই কথা দিয়েছে,লক্ষ্যে পৌঁছনোর আগে সে সূচির সামনে দাঁড়াবে না।তার বুকের ভেতর হালকা টান অনুভব হলো।
একদিকে দেখা করার ইচ্ছে,অন্যদিকে নিজের তৈরি করা সেই কঠিন নিয়ম।করিডোরের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে সে একবার পাশের হলটার দিকে তাকাল।ঠিক তখনই ভেতর থেকে ছাত্রছাত্রীরা বেরোতে শুরু করল।অভির বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে ধকধক করতে লাগল।
ভিড়ের মধ্যে কি সূচিও আছে?
এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো—আর একবার… শুধু একবার দেখা করলে ক্ষতি কি?
কিন্তু পরের মুহূর্তেই সে নিজের মুখ ঘুরিয়ে নিল।
ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে হাঁটা দিল।তার মুখে আবার সেই চেনা দৃঢ়তা ফিরে এসেছে।
সে জানে, এই অপেক্ষাটা হয়তো দীর্ঘ।কিন্তু যেদিন সে সত্যিই নিজের লক্ষ্যে পৌঁছবে,সেদিনই সে সূচির সামনে দাঁড়াবে।
আজ নয়।
তবু সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে অভি একবার মনে মনে বলল,
“তুমি ভালো থেকো সূচি…”
“এই অভি… অভি!”
চেনা গলার ডাকে অভি হঠাৎ থেমে গেল।
সে একটু অন্যমনস্ক হয়েই সিঁড়ি দিয়ে নামছিল।তাই প্রথমে ঠিক বুঝতেই পারেনি কে ডাকছে।
পেছন ফিরে তাকাতেই দেখল,শুভদা দাঁড়িয়ে আছে।
হালকা হাঁপাচ্ছে, যেন তাড়াহুড়ো করে এসেছে।
অভি একটু অবাক হয়ে গেল।
“শুভদা! তুমি এখানে?”
সে দ্রুত কয়েক পা এগিয়ে এল।
“তোমাকে তো খেয়ালই করিনি…”
শুভদা গম্ভীর হেসে বলল,
“খেয়াল করবি কী করে? নিজের চিন্তায় এমন ডুবে ছিলি!”
অভি একটু লজ্জা পেল।
“না… মানে… পরীক্ষা নিয়ে একটু ভাবছিলাম।”
শুভদা তার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তার চোখে যেন আজ অন্যরকম একটা ভাব।
“পরীক্ষা কেমন হলো?”
অভি মাথা নাড়ল।
“মোটামুটি ভালোই হয়েছে।”
“মোটামুটি না… ভালোই হয়েছে, তাই তো?”
অভি একটু হেসে ফেলল।
তারপর হঠাৎ প্রশ্ন করল—
“কিন্তু তুমি এখানে এলে কেন?”
শুভদা এবার একটু গম্ভীর হলো।
সে চারপাশে একবার তাকাল, যেন ঠিক শব্দ খুঁজছে।
তারপর ধীরে বলল—
“তোকে খুঁজতেই এসেছি।”
অভি অবাক হয়ে গেল।
“আমাকে?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
শুভদা একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
কয়েক মুহূর্ত কেউ কথা বলল না।
অভির মনে হঠাৎ অকারণ একটা অশান্তি জন্ম নিতে লাগল।
“শুভদা… কি হয়েছে বলবে?”
শুভদা এবার ধীরে বলল,
“একটা খারাপ খবর নিয়ে ছুটে এসেছি…
কিন্তু পরীক্ষা চলছিল বলে এতক্ষণ বলতে পারিনি। অপেক্ষা করছিলাম।”
অভির বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
“কি কথা?”
শুভদা খুব নিচু গলায় বলল,
“ গত পরশু মাস্টার মশায় ফোন করেছিলেন।
তোর বাবার….. স্ট্রোক হয়েছে।”
কথাটা যেন হাওয়ার মধ্যে থেমে রইল।
অভি কয়েক সেকেন্ড বুঝতেই পারল না।
“কি বলছ তুমি দাদা?”
তার গলাটা শুকিয়ে গেল।
শুভদা এবার ধীরে ধীরে বলল,
“পরশু দুপুরে হঠাৎ করে ওনার শরীরটা খারাপ হয়ে যায়। ভ্যান চালাতে চালাতেই নাকি মাথা ঘুরে পড়ে যান।”
অভির বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
“এখন… এখন কোথায় বাবা?”
“গ্রামের লোকজনই প্রথমে নিয়ে যায় বিষ্ণুপুর হাসপাতালে… ভর্তি করা হয়েছে।”
অভির চোখে আতঙ্ক ফুটে উঠল।
শুভদা একটু থেমে আবার বলল,
“অবস্থা বিশেষ ভালো নয় অভি… শরীরের এক পাশ একেবারে নড়ছে না। ডাক্তাররা বলছেন স্ট্রোকটা বেশ জোরেই হয়েছে।”
কথাগুলো শুনে অভি যেন এক মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল।
তার মাথার ভেতর হঠাৎ ঝড়ের মতো ঘুরে উঠল বাবার মুখ,রোদে পুড়ে যাওয়া চামড়া,ক্লান্ত শরীর নিয়ে ভ্যান টেনে বাড়ি ফেরা মানুষটা।
সে কাঁপা গলায় বলল,
“আমাকে জানানো হয়নি কেন?”
শুভদা শান্ত গলায় বলল,
“তোর পরীক্ষা ছিল অভি।তোর মা বার বার বলে দিয়েছেন পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোকে কিছু জানানো যাবে না।”
অভি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।একটা অদ্ভুত অপরাধবোধ যেন তার বুকের ভেতর চেপে বসেছে।
সে ফিসফিস করে বলল,
“বাবা হাসপাতালে… আর আমি এখানে পরীক্ষা দিচ্ছি…”
শুভদা তার কাঁধে হাত রাখল।
“এই জন্যই তো বলা হয়নি তোকে।তুই যদি জানতিস, পরীক্ষা দিতে পারতিস?”
অভি কোনো উত্তর দিল না।
শুভদা এবার দৃঢ় গলায় বলল,
“চল, দেরি করলে চলবে না।”
অভি তাকাল।
“এখনই বাঁকুড়া যেতে হবে। বাসস্ট্যান্ডে চল।এই সময় একটা বাস পাওয়া যাবে।”
অভি আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না।
তার বুকের ভেতর এখন একটাই শব্দ বাজছে,
“বাবা…”
দুজনেই দ্রুত কলেজ গেট পেরিয়ে রাস্তায় নেমে গেল।
সারা রাস্তা অভি একটাও কথা বলেনি।বাসের জানলার পাশে বসে ছিল সে।চোখ বাইরে, কিন্তু কিছুই যেন দেখছিল না।রাস্তার ধুলো, মাঠ, ছোট ছোট বাজার, সন্ধ্যার দিকে ফেরা মানুষ—সবকিছু ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল।
শুভদাও চুপ ছিল।
মাঝে মাঝে শুধু অভির দিকে তাকিয়েছে।কিন্তু কোনো কথা বলেনি।এই নীরবতার মধ্যে শব্দের আর প্রয়োজন ছিল না।
বাস এগিয়ে চলছিল।আকাশের রং ধীরে ধীরে বদলাচ্ছিল।বিকেলের আলো নরম হয়ে আসছিল।
সূর্য তখন পশ্চিমে হেলে পড়েছে।
ওরা যখন গ্রামে পৌঁছাল,সন্ধ্যা নামার ঠিক আগের সেই অদ্ভুত আলো চারদিকে ছড়িয়ে আছে।না পুরো দিন, না পুরো রাত।আলোটা আস্তে আস্তে যেন হারিয়ে যাচ্ছে।
অভি দ্রুত নেমে হাঁটতে শুরু করল।
মাটির রাস্তা, চেনা বাঁশঝাড়, পুকুরপাড়,সবকিছু আজ অচেনা লাগছিল।তার বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়ছিল।
দূর থেকেই সে দেখতে পেল—
তাদের বাড়ির সামনে একটা ছোট জটলা।কয়েকজন গ্রামের মানুষ চুপচাপ দাঁড়িয়ে।
কারও মুখে কথা নেই।
অভির পা হঠাৎ থেমে গেল।তার বুকের ভেতর যেন কিছু একটা ভেঙে পড়ল।
ধীরে ধীরে সে এগিয়ে গেল।
তারপর…
দাওয়ার সামনে সাদা কাপড়ে মোড়া একটা শরীর।
বাবা।
ফিরে এসেছেন।
কিন্তু এভাবে।
অভির চোখ স্থির হয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড সে যেন কিছুই বুঝতে পারল না।
তারপর খুব ধীরে হাঁটু কেঁপে উঠল।দাওয়ার একপাশে মাটিতে বসে আছেন তার মা।বাবার মাথার কাছে।
চোখদুটো শুকিয়ে গেছে।এত কেঁদেছেন যে আর জল নেই।শুধু ফাঁকা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছেন সামনে।
যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না,যে মানুষটা প্রতিদিন ভ্যান নিয়ে বেরোত,সন্ধ্যায় ঘামে ভেজা শরীরে ফিরত,
সে আজ একদম নিশ্চুপ।
মায়ের চুল এলোমেলো, শাড়ির আঁচল মাটিতে লুটিয়ে আছে।
তিনি অভিকে দেখলেন।একবার শুধু তাকালেন।
তারপর ঠোঁট কাঁপল।
“অভি…”
শব্দটা বেরোতেই তার গলার ভেতর জমে থাকা কান্না ভেঙে পড়ল।
অভি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না।দৌড়ে বাবার কাছে গিয়ে বসে পড়ল।
কাঁপা হাতে সাদা কাপড়ের ওপর হাত রাখল।
ঠাণ্ডা।
নিঃশব্দ।
তার বুকের ভেতর জমে থাকা সব শক্তি, সব জেদ, সব লড়াই—হঠাৎ যেন এক মুহূর্তে ভেঙে গেল।
সে মাথা নিচু করে বাবার বুকে মুখ রেখে ফিসফিস করে বলল—
“আমি এসে গেছি বাবা…”
কিন্তু কোনো উত্তর এল না।
অভি আর নিজেকে সামলাতে পারল না।এক ঝটকায় সে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাবার বুকের উপর।
“বাবা…!”
শব্দটা যেন বুক ফেটে বেরিয়ে এলো।সাদা কাপড়ে মোড়া সেই নিশ্চুপ শরীরটাকে দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সে।
তার কাঁধ কাঁপছে।
এতদিনের জমে থাকা শক্ত মানুষটা যেন এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ল।
“একবার… একবার চোখ খোলো বাবা…”
কাঁপা গলায় বলতে লাগল সে।
“আমি চলে এসেছি… দেখো… আমি এসেছি…”
তার মুখ বাবার বুকে গিয়ে ঠেকল।কিন্তু সেখানে আর কোনো উষ্ণতা নেই।কোনো স্পন্দন নেই।
শুধু ঠাণ্ডা, নিস্তব্ধতা।
চারপাশের মানুষগুলো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে।
কেউ এগিয়ে এল না।এই শোকের মুহূর্তে কারও কোনো ভাষা নেই।অভি বাবার শরীর আঁকড়ে ধরে কাঁদছিল।
যে মানুষটা সারাজীবন নিজের কষ্ট চাপা রেখে সংসার চালিয়েছে,নিজে না খেয়ে ছেলেকে পড়িয়েছে,
স্বপ্ন দেখেছে, ছেলে একদিন বড় মানুষ হবে—সেই মানুষটা আজ আর নেই।
অভির চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল,ভোরবেলায় ভ্যান নিয়ে বেরোনো বাবা,বর্ষার দিনে ভিজে কাপড়ে বাড়ি ফেরা,রাতে খাওয়ার সময় ক্লান্ত মুখে বলা,
“পড়াশোনা ছাড়বি না রে অভি…”
অভি হাউহাউ করে কেঁদে উঠল।
“আমি তোমাকে কিছুই দিতে পারলাম না বাবা…”
তার গলাটা ভেঙে যাচ্ছিল।
“তুমি শুধু কষ্টই করলে…”
মাটিতে বসে থাকা মা তখন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না।তিনি ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে অভির মাথায় রাখলেন।তার চোখে আর জল নেই,শুধু অসীম শূন্যতা।
সন্ধ্যার আলো তখন পুরোপুরি ফিকে হয়ে এসেছে।
আকাশে অন্ধকার নেমে যাচ্ছে।
আর সেই অন্ধকারের মধ্যে একটা ছোট্ট মাটির বাড়ির সামনে একটা ছেলে তার বাবার নিথর শরীর জড়িয়ে ধরে ভেঙে পড়ছে—
জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতার সামনে।
শ্রাদ্ধের কাজ শেষ হতে কয়েকটা দিন কেটে গেল।গ্রামের নিয়ম মেনে যা যা করার—সবই হয়েছে।
মাস্টারমশাই প্রায় প্রতিদিন এসেছেন, সবকিছু তদারকি করেছেন।কখনো বাজার করেছেন, কখনো পুরোহিতের ব্যবস্থা করেছেন।
শুভদাও এক মুহূর্তের জন্য অভিকে একা ছাড়েনি।
সবাই যেন নিজের মতো করে দায়িত্ব নিয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবু বাড়িটার ভেতর এখন এক অদ্ভুত শূন্যতা।যে উঠোনে সন্ধ্যাবেলা বাবা ভ্যান ঠেলে ঢুকতেন,সেখানে এখন নিস্তব্ধতা।দাওয়ার কোণে বাবার পুরোনো গামছাটা এখনও ঝুলছে।
কেউ সরায়নি।
মাঝে মাঝে বাতাসে সেটা একটু দুলে ওঠে,আর অভির বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে।
শ্রাদ্ধের দিন যত লোকজন ছিল,সব ধীরে ধীরে চলে গেছে।
এখন বাড়িটা আবার শান্ত।
খুব বেশি শান্ত।
অভি অনেক সময় চুপ করে বসে থাকে।
মায়ের মুখের দিকে ঠিক করে তাকাতেও পারে না।
মা যেন কয়েকদিনেই অনেক বুড়িয়ে গেছেন।
চোখের নিচে গভীর কালি,কথা কমে গেছে।
তিনি চুপচাপ রান্নাঘরে বসে থাকেন,কখনো উঠোনে।
মাঝে মাঝে অভি দেখে—মা ফাঁকা চোখে দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন।যেন এখনও অপেক্ষা করছেন, কেউ ভ্যান ঠেলে বাড়ি ফিরবে।
অভির বুকের ভেতর তখন অপরাধবোধ জমে ওঠে।
এই বাড়িতে এখন শুধু সে আর মা।
আর সেই সত্যিটা তাকে ভিতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে।
তার লড়াইটা এখন আরও কঠিন হয়ে গেছে।
কলেজ শেষ হয়েছে।
ফল বেরোবে।
তারপর?
সে কি শহরে যাবে?
চাকরির প্রস্তুতি নেবে?
ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার স্বপ্নটার পেছনে দৌড়াবে?
কিন্তু মাকে একা রেখে?
এই মাটির বাড়িতে?
মা এখন একা ঘুমোতে পারেন না।রাতে মাঝেমধ্যে উঠে বসেন।অভি জানে—
সে চলে গেলে এই বাড়িটা আরও ফাঁকা হয়ে যাবে।
তার মাথার ভেতর যেন হাজারটা প্রশ্ন একসাথে ঘুরছে।
রাতে খাটে শুয়ে সে ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।
ঘুম আসে না।তার মনে হয় ভবিষ্যৎটা যেন ধীরে ধীরে কালো অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে।যে পথটা এতদিন পরিষ্কার ছিল,আজ সেটা কুয়াশার মধ্যে হারিয়ে গেছে।
স্বপ্ন আছে।
কিন্তু সেই স্বপ্নের কাছে পৌঁছনোর রাস্তা যেন হঠাৎ খুব দূরে সরে গেছে।
একদিকে দায়িত্ব,অন্যদিকে স্বপ্ন।
দু’হাত বাড়িয়েও সে যেন কোনো দিকই পুরোপুরি ধরতে পারছে না।
বাইরে রাত গভীর হয়।দূরে কোথাও কুকুর ডাকে।
অভি চোখ বন্ধ করে।কিন্তু অন্ধকারের মধ্যেও
সে শুধু একটাই জিনিস দেখতে পায়—একটা দীর্ঘ, একা, কঠিন পথ।
বাবার মৃত্যুর পর কেটে গেছে কয়েকটা নিঃশব্দ দিন।
বাড়িটার প্রতিটি কোণে এখন স্মৃতি।দাওয়ার পাশে রাখা ভাঙা চেয়ার,বাবার পুরোনো গামছা,ভ্যানের মরচে ধরা হ্যান্ডেল—সবকিছু যেন অভিকে থামিয়ে রাখছে।
তবু সে বুঝতে পারছিল, এভাবে বেশিদিন থাকা যাবে না।
দিনের পর দিন শুধু শোক আঁকড়ে ধরে থাকলে
জীবন এগোয় না।
সেদিন সন্ধ্যায় অভি মাস্টারমশাইয়ের বাড়িতে গেল।
সাথে শুভদা।
পুরোনো টিনের চালা, সামনে তুলসী গাছ।
মাস্টারমশাই উঠোনে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন।
অভিকে দেখে চশমাটা খুলে বললেন,
“এসেছিস?”
অভি চুপচাপ বসে পড়ল।
কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।
তারপর খুব ধীরে বলল,
“আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি মাস্টারমশাই।”
“কি সিদ্ধান্ত?”
অভি মাথা নিচু করল।
“আমি গ্রাম ছেড়ে চলে যাব।”
মাস্টারমশাই স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন।
“কোথায়?”
“কলকাতা।”
হাওয়া একটু দুলে উঠল।
মাস্টারমশাই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“ভেবে বলছিস?”
অভি মাথা নাড়ল।
“এখানে আর কিছু নেই।এই ভিটেটুকু ছাড়া আমাদের কিছুই নেই।বাবার স্বপ্নটাও এখানে থেমে যাবে।”
মাস্টারমশাই অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
“কষ্ট হবে।”
“খুব কষ্ট হবে।”
“শহর মানুষকে সহজে জায়গা দেয় না।”
অভি শান্ত গলায় বলল,
“জানি।”
“তবু যেতে হবে।”
মাস্টারমশাই তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।তার চোখে গর্ব আর উদ্বেগ একসাথে।
“তুই পারবি।কারণ তুই হার মানার ছেলে না।”
শুভদা সব শুনে চুপ করে রইল কিছুক্ষণ।
তারপর সোজা হয়ে বসে বলল,
“ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিস।”
অভি তাকাল।
শুভদা দৃঢ় গলায় বলল,
“লড়াই তোকে করতেই হবে।এই গ্রামে বসে থাকলে তুই শুধু স্মৃতির মধ্যে আটকে যাবি।”
সে একটু থেমে আবার বলল,
“কলকাতায় চল।”
“মাকে নিয়ে।”
“একটা ছোট ঘরের ব্যবস্থা ঠিক করে ফেলব।”
“শুরুতে কষ্ট হবে।কিন্তু তোর মতো ছেলের জন্য শহরে পথ তৈরি হবেই।”
অভি চুপ করে শুনছিল।
তার বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত ভার আর সাহস একসাথে কাজ করছিল।
মাস্টারমশাই ধীরে বললেন,
“তোর বাবার স্বপ্নটা এখন তোর হাতে।”
“পালিয়ে যাস না।”
অভি মাথা তুলল।
তার চোখে আজ অনেকদিন পর আবার একটা দৃঢ়তা ফুটে উঠল।বাইরে রাত নেমে এসেছে।
উঠোনে বসে তিনজনে অনেকক্ষণ কথা হলো।
দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ।আর সেই ছোট্ট গ্রামের উঠোনে বসেঅভি প্রথমবার স্পষ্ট বুঝল,তার জীবন এখন নতুন অধ্যায়ে ঢুকতে চলেছে।
একটা অধ্যায়,যেখানে তাকে আবার নতুন করে একাই লড়তে হবে।
সেদিন রাতটা অদ্ভুত নীরব ছিল। বাড়ী ফিরে অভি দেখলো মা তুলসীতলার সামনে বসে আছেন। ছোট্ট প্রদীপের কাঁপতে থাকা আলোয় মায়ের মুখটা আরও ক্লান্ত, আরও বয়স্ক মনে হচ্ছিল।
অভি অনেকক্ষণ মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।কীভাবে কথাটা শুরু করবে, বুঝতে পারছিল না।শেষ পর্যন্ত ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে মায়ের পাশে মাটিতে বসল।
মা মুখ তুললেন না।
“কিছু বলবি?”
অভি একটু চুপ করে থেকে বলল,
“মা… তোমার সঙ্গে একটা কথা ছিল।”
“বল।”
“আমরা কলকাতায় চলে যাব।”
মায়ের হাতটা থেমে গেল।কয়েক মুহূর্ত তিনি কোনো কথা বললেন না। এমএলতারপর খুব ধীরে বললেন,
“কলকাতায়?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
অভি মাটির দিকে তাকিয়ে বলল,
“এখানে থেকে আমি কী করব মা? বাবার যা ছিল, এই ভিটেটুকু ছাড়া আর কিছুই তো নেই। আমি যদি এখানেই থেকে যাই, তাহলে বাবার যে স্বপ্ন ছিল… সেটা পূরণ করব কী করে?”
মা এবার ছেলের দিকে তাকালেন।
চোখে কোনো রাগ নেই। শুধু গভীর ক্লান্তি।
“তুই চলে যাবি?”
“আমরা চলে যাব।”
“আমরা?”
“হ্যাঁ মা। তোমাকে একা রেখে কোথাও যাব না।”
মা মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন।
“না রে।”
অভি অবাক হলো।
“কেন?”
মা ধীরে ধীরে উঠোনটার দিকে তাকালেন।
“এই বাড়িটা ছেড়ে আমি কোথায় যাব বল তো?”
অভি চুপ।
মা হাত দিয়ে তুলসীতলার দিকে দেখালেন।
“ওইখানে তোর বাবা কত বছর প্রদীপ জ্বেলেছে জানিস?”
অভি তাকিয়ে রইল।
“এই উঠোনেই তোকে প্রথম হাঁটতে দেখেছিল। মনে আছে? তুই পড়ে গিয়ে হাঁটু ছড়িয়ে কাঁদছিলি। তোর বাবা তোকে কোলে নিয়ে সারাগ্রাম ঘুরে বেড়িয়েছিল।”
মায়ের গলা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠল।
“এই ঘরেই তো তোর বাবার সঙ্গে আমার কত বছর কেটে গেল। অভাব ছিল, কষ্ট ছিল… কিন্তু মানুষটা ছিল।”
তিনি একটু থামলেন।
“এখন মানুষটাই নেই। এই বাড়িটুকুও যদি ছেড়ে দিই… তাহলে আমার কাছে কী থাকবে বল?”
অভি মায়ের দিকে তাকাতে পারছিল না।
মা আবার বললেন,
“তুই জানিস না রে… এই দেয়ালগুলোও আমার সঙ্গে কথা বলে।সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হয়, এই বুঝি তোর বাবা দরজাটা খুলে বাইরে বেরোবে। সন্ধ্যায় মনে হয়, এই বুঝি ভ্যানের শব্দটা শুনতে পাব।”
মায়ের চোখে এবার জল জমল।
“আমি যদি কলকাতায় চলে যাই, তাহলে তো আর কিছুই থাকবে না।”
অভি আস্তে করে মায়ের হাতটা ধরল।
“মা…”
“না অভি।”
মা এবার দৃঢ় গলায় বললেন,
“তুই তোর বাবার স্বপ্ন পূরণ কর। তুই বড় হ। তুই যে মানুষ হতে চাস, হ। কিন্তু আমাকে এই বাড়ি থেকে নিয়ে যাস না।”
অভির বুকটা কেঁপে উঠল।
“তোমাকে একা রেখে আমি কীভাবে যাব?”
মা অনেক্ষণ চুপ করে থাকেন, ছেলের হাতটা শক্ত করে ধরে বললেন,
“ঠিক আছে তুই একা যাবি না। আমিও যাব।”
“কিন্তু…”
“তবে এই বাড়িটা ফেলে নয়।”
তিনি ধীরে ধীরে চারদিকে তাকালেন।
“তালা দিয়ে যাব। বাড়িটা থাকবে। তোর বাবার জিনিসগুলো থাকবে। তুলসীতলা থাকবে।”
“আমরা মাঝে মাঝে ফিরে আসব।”
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল।
তারপর মা খুব আস্তে বললেন,
“তোর বাবা তোকে নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিল, সেটা এই বাড়ির চেয়ে বড়।”
অভি মায়ের দিকে তাকাল।
“তাই তুই যদি মনে করিস কলকাতায় গেলে তোর পথ খুলবে… তাহলে যাব।”
একটু থেমে তাঁর গলা কেঁপে উঠল।
“কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস,যেদিন খুব ক্লান্ত হয়ে যাবি, যেদিন মনে হবে আর পারছিস না… তখন এই বাড়িটার কথা মনে করিস।”
“তোর বাবা এখানেই বসে বলত—‘আমার ছেলে একদিন অনেক বড় হবে।’”
মায়ের হাতটা তখনও অভির হাতে।অভি মাথা নিচু করে সেই হাতের ওপর নিজের কপাল রাখল।
কোনো কথা বলল না।
শুধু মনে মনে বাবাকে বলল,
“আমি যাচ্ছি বাবা।তোমার স্বপ্নটা নিয়ে যাচ্ছি।
একদিন ফিরব… খালি হাতে নয়।”
পরের কয়েকটা দিন খুব দ্রুত কেটে গেল।
মনে হলো, এতদিন যে বাড়িটাকে ঘিরে তাদের পুরো জীবনটা দাঁড়িয়ে ছিল, সেটাই যেন এখন ধীরে ধীরে একটা স্মৃতিতে পরিণত হচ্ছে।
শুভদাই কলকাতায় একটা ছোট্ট ঘরের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। খুব বড় কিছু নয়—একটা ছোট ঘর, সঙ্গে সামান্য রান্নার জায়গা আর একটা সরু বারান্দা। শহরের এক পুরোনো পাড়ায়, যেখানে ভাড়াটা তুলনামূলক কম।
শুভদা বলেছিল,
“শুরু করার জন্য যথেষ্ট হবে। তোরা আপাতত এখানে থাক। বাকি ব্যবস্থা আমি দেখে নেব।”
অভি শুধু বলেছিল,
“বেশিদিন আপনার সাহায্য নেব না শুভদা।”
ওপাশ থেকে শুভদা হেসে বলেছিল,
“দাদার কাছে সাহায্য নিতে লজ্জা লাগে বুঝি।”
তারপর একটু থেমে বলেছিল,
“মনে রাখিস, সাহায্য নেওয়া আর কারও ওপর নির্ভর করে থাকা এক জিনিস নয়। দাঁড়িয়ে ওঠার সময় কাউকে পাশে পাওয়া লজ্জার নয়।”
অভি আর কিছু বলেনি।
কলকাতায় যাওয়ার দিন ঠিক হয়ে গেল।
কিন্তু যাওয়ার আগের দুদিন অভি যেন ইচ্ছে করেই বাড়িটার প্রতিটি কোণ একটু একটু করে দেখে নিচ্ছিল।
ঘরে ঢুকে অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।খাটের একপাশে এখনও বাবার পুরোনো বালিশটা পড়ে আছে।
আলমারির ওপর ভাঁজ করে রাখা একটা পুরোনো গামছা।দেয়ালের পেরেকে ঝোলানো সেই পুরোনো শার্টটা—যেটা বাবা ভ্যান চালাতে যাওয়ার সময় পরতেন।
অভি হাত বাড়িয়ে শার্টটা নামিয়ে নিল।
মুখের কাছে নিয়ে এল।একটা মৃদু গন্ধ এখনও যেন লেগে আছে।
তার চোখ জ্বালা করে উঠল।
“এটা নিয়ে যাব মা?”
মা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।তিনি মাথা নাড়লেন।
“নিয়ে চল।”
অভি শার্টটা খুব যত্ন করে ভাঁজ করে নিজের ব্যাগে রেখে দিল।তারপর ঘরের এক কোণে রাখা বাবার পুরোনো লোহার বাক্সটা খুলল।
ভেতরে কিছু পুরোনো কাগজ, কয়েকটা রসিদ, একটা ভাঙা ঘড়ি আর অভির ছোটবেলার কিছু খাতা।একটা খাতা হাতে নিয়ে অভি হঠাৎ থেমে গেল।
প্রথম পাতায় বাবার হাতের লেখায়,
“অভির পড়ার খরচ।”
তার নিচে একের পর এক হিসাব।কোথায় কত টাকা খরচ হয়েছে।
অভি অনেকক্ষণ সেই পাতাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর খাতাটা বুকের কাছে চেপে ধরল।
বাবা চলে গেছেন।কিন্তু তাঁর হিসাবের খাতায় ছেলের ভবিষ্যতের জন্য করা প্রতিটি ত্যাগ এখনও জীবন্ত।
ভ্যানটা এখনও উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে।মরচে ধরতে শুরু করেছে।অভি গিয়ে ভ্যানটার হাতলে হাত রাখল।
চোখ বন্ধ করতেই মনে হলো বাবা যেন বলছেন,
“পড়াশোনা করিস… থামিস না।”
অভি ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে নিল।
“আমি থামব না বাবা।”
তারপর তুলসীতলার সামনে এসে দাঁড়াল।মা তখন প্রদীপ জ্বালাচ্ছেন।
অভি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।এই তুলসীতলাটাও থাকবে।
এই উঠোন থাকবে।বাবার ভ্যানটাও থাকবে।
শুধু মানুষটা থাকবে না।
পরদিন ভোরে বাড়ির দরজায় তালা পড়ল।মা শেষবারের মতো ঘরের ভেতর তাকিয়ে রইলেন।তার চোখে জল ছিল, কিন্তু এবার তিনি কাঁদলেন না।অভি দরজায় তালা লাগিয়ে চাবিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর চাবিটা মায়ের হাতে দিয়ে বলল,
“এটা তুমি রাখো।”
মা চাবিটা আঁচলের কোণে বেঁধে নিলেন।
“ফিরবি তো?”
অভি মায়ের দিকে তাকাল।
“অবশ্যই।”
কিন্তু সে জানত না, কবে।
বাস ছাড়ার আগে অভি আর একবার পেছনে তাকাল।
ছোট্ট বাড়িটা ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল।
তুলসীতলা দেখা গেল।
তারপর উঠোন।
তারপর বাবার ভ্যানটা।সবশেষে বাড়িটাও চোখের আড়াল হয়ে গেল।
মা জানলার পাশে বসে ছিলেন।অভি কিছু বলছিল না।
কিন্তু তার বুকের ভেতর তখন আরেকটা বিদায় চলছিল।
সুচি।
গত কয়েকদিনে সে অনেকবার ভেবেছে,কলকাতায় গিয়ে কি সে একবার কি সূচির সঙ্গে দেখা করবে?
একবার কি বলবে, তার উপর দিয়ে এই কদিন কি ঝড় বয়ে গেছে।
তারপরই নিজের সিদ্ধান্তটা মনে পড়েছে।
না।
সে সূচিকে জানাবে না।
কারণ সূচি তাকে ভালোবাসে—এটা সে জানে।আর সেই ভালোবাসাই হয়তো তাকে দুর্বল করে দেবে।সে আবার নিজেই তার কাছে ফিরে আসবে।
আর অভি জানে, সে যদি একবার সূচির চোখের দিকে তাকায়, তাহলে হয়তো নিজের তৈরি করা দূরত্বটা আর ধরে রাখতে পারবে না।
তাই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এবার তাকে সত্যিই অদৃশ্য হয়ে যেতে হবে।কোনো বিদায় নয়।কোনো প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি নয়।কোনো যোগাযোগ নয়।শুধু দূর থেকে খবর থাকলে থাকবে।
সে নিজের পথ নিজেই হাঁটবে।
সে শুধু মনে মনে বলল,
“আমি কলকাতায় যাচ্ছি। মাকে নিয়ে নতুন করে শুরু করব। ভালো থেকো।”
জানলার বাইরে তখন শহরের আলো দেখা যাচ্ছে।
অভি চোখ বন্ধ করল।তার আবার মনে পড়ল মন্দিরের সেই সন্ধ্যা।
সূচির সিঁথিতে ছোঁয়া সেই সিঁদুর।আর তার কণ্ঠের সেই দৃঢ়তা,
“এরপর একমাত্র তুমিই এই সিঁথিতে সিঁদুর পরাবে।”
অভির বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।সে খুব আস্তে চোখ খুলল।
তারপর নিজের মনে বলল,
“আমি তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছি না সূচি।
আমি শুধু তোমার কাছে আসার পথটা বদলে দিচ্ছি।”
একদিন সে ফিরবেই।
যেদিন নিজের নামের পাশে এমন একটা পরিচয় দাঁড় করাতে পারবে, যার সামনে বিমল সেনের সেই প্রশ্নের আর কোনো মূল্য থাকবে না।
“যোগ্যতা নেই?”
অভির চোখে আবার সেই পুরোনো দৃঢ়তা ফিরে এল।
“তাহলে যোগ্যতা অর্জন করেই ফিরব।”
বাস তখন কলকাতার দিকে ছুটে চলেছে।পেছনে পড়ে রইল একটা ছোট্ট বাড়ি,একজন মৃত বাবার স্মৃতি,
একজন মায়ের অশ্রুসিক্ত অতীত—
আর সামনে শুরু হলো অভির জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়।
—oooXXooo—
![]()







