ঘন্টার ধ্বনি
বাসুদেব দাশ
তৃণাঙ্কুর খুব ছোট বেলা থেকেই বেড়াতে ভালোবাসে। আসলে ওর মনটাই একটা ভ্রমণ পিপাসু মন । দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক মন্দির অনেক রাজ বাড়ী অনেক জমিদার বাড়ী দেখেছে ও । ওর বাবা মা ওকে নিয়ে পাহাড়,জঙ্গল,সমুদ্র, সমতল দেশের বহু জায়গায় ঘুরে বেরিয়েছে । নতুন নতুন জায়গা দেখে ওর যে কি আনন্দ হয় তা ভাষায় বলে বোঝানো যাবে না। বুদ্ধি যেমন আছে সাহসও তেমনি আছে। সেই ছোট্ট বয়স থেকে এক রকম ভাবেই চলছে । বি টেক পাশ করে আজ ও একটা আই টি ফার্মে চাকরি করছে। চল্লিশ হাজার টাকার মত মাইনে পায়। প্রফুল্ল কানন, ওর বাড়ী থেকে বেরিয়ে ভি আই পি রোড কেষ্ট পুর বাস স্ট্যান্ডে পায়ে হেঁটে আসতে দু তিন মিনিট সময় লাগে। কেষ্ট পুর থেকে বাস ধরে চিনার পার্ক যায়। ওখান থেকে অফিসের গাড়ি ওকে তুলে নেয়। ফেরার সময় একই ভাবে বাড়ী আসে। রিসেন্টলি ও বিয়ে করেছে “রাজমা ” নামে ওর ছোট বেলাকার এক বান্ধবীকে। স্কুল লাইফে ওরা একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়তো। রাজমাও ঘুরতে খুব ভালোবাসে। ছোট বেলায় ওরা বাবা মায়ের সঙ্গে ঘুরতো আর এখন ওরা সময় সুযোগ পেলেই হাসব্যান্ড ওয়াইফ বেরিয়ে পরে ছোট বড় বিভিন্ন রকম ট্যুরে। ডে ট্রু বা নাইট স্টে ট্যুর যখন যেমন হয়।
একবার ওরা দু দিনের মানে দু দিন এক রাতের ট্যুরে হুগলী জেলার ইটা-চুনা রাজ বাড়ী অর্থাৎ কুন্ডদের জমিদার বাড়ী দেখতে গিয়েছিল। এই ট্যুরটা ছোট হলেও এই ট্যুরটা ছিল ওদের জীবনের একটা বিশেষ উল্লেখ যোগ্য ট্যুর। এই ট্যুরটার একটা আলাদা বিশেষত্ব আছে। এই রাজবাড়ী কলকাতা থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে হুগলী জেলার পাণ্ডুয়া ব্লকে খান্যান গ্রামে,রেল স্টেশনের অতি সন্নিকটে একটি জায়গায় অবস্থিত। এই গ্রামটার আগের নাম ছিল বর্গী ডাঙ্গা। মহা রাষ্ট্র থেকে আসা একজন দুর্ধস্য বর্গী দোস্যু বাংলাকে ভালোবেসে দেশে ফিরে না গিয়ে তৎকালীন সময়ে ইট আর চুন-সুরকি দিয়ে এই বাড়ীটি নির্মাণ করেছিলেন । তাই এই বাড়ীটিকে বলা হয় ইটা চুনা রাজবাড়ী।সেই সময় মহারাষ্ট্র বা মারাঠা সাম্রাজ্য থেকে আসা বর্গিরা প্রায় দশ বছর টানা সন্ত্রাস চালিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম সীমান্তবর্তী অঞ্চল গুলোতে। ১৭৪১ সাল থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত বর্গিরা দাঙ্গাহাঙ্গামা চিলিয়ে গেছে । পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম সীমান্তবর্তী অংশের গ্রাম অঞ্চল গুলিতে বর্গিরা দল বেঁধে নিয়ম করে প্রতি বছর অতর্কিতে আক্রমণ করে লুট-পাট চালাতো । লুট-পাট করে টাকা পয়সা সোনা দানা ধন দৌলত যা যা পেতো সেই সব নিয়ে ওরা ওদের দেশে ফিরে যেতো। বর্গিদের দাঙ্গায় অনেক লোকের মৃত্য হয়েছে । অনেক বাড়ীতে দোতলার সমান উঁচু ইটের পাঁচিল দিয়ে ঘিরে দিয়েছিল এই বর্গিদের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য। এক বার এই দেশে লুট-পাট করতে এসে এক বর্গি সরদার দেশে ফিরে যান নি । হুগলী জেলার খান্যান অঞ্চলে গিয়ে তিনি বসতি স্থাপন করেছিলেন । তিনি এখানে থেকে স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন । এই বর্গিরা এখানে ইট আর চুনের ব্যবসা শুরু করেছিল। ইট আর চুনের ব্যবসা থেকে ওরা প্রচুর পরিমান লাভ করেছিল সেই সময় । সেই লাভের টাকা দিয়ে ওরা কুড়ি বিঘা জমি কিনে এই বিরাট বড় রাজ বাড়ীটি তৈরি করে । এরপর ওদের খরচা এতো বেড়ে যায় যে এই ব্যবসার লাভের টাকায় সেই খরচা ওরা চালাতে পারছিলো না। তখন ওরা আয়-রোজগার বাড়াবার জন্য বর্ধমানের রাজাদের কাছ থেকে জমিদারি কিনতে চেয়ে অনুরোধ জানায় । বর্ধমানের রাজারা দেখলো যে এই বর্গিদের জমিদারি দিলে খাজনাটা আদায় হবে ভালো । ওরা মার দাঙ্গা করে, জোর জবরদস্তি করে খাজনা আদায় করে ছাড়বে। তাই তারা এই ইটা-চুনার বর্গিদের জমিদারি দিয়ে দেয়। সেই থেকে ওরা এখানকার জমিদারি পেয়ে যায়। এই বর্গিদের পদবি ছিল কুন্দন। পরবর্তী কালে কুন্দন থেকে কুন্ডু হয়ে যায় ওদের পদবি। এই বর্গি রাজাদের যেমন ছিল বিশাল রাজ বাড়ী তেমনি প্রকৃতির মধ্যে গাছ পালায় ঘেরা একটা বিস্ময়কর শিব মন্দির ছিল ওদের। শোনা যায় যে বর্গি রাজাদের মধ্যে এক জন বিজয় কৃষ্ণ কুন্ডু চাকরি সূত্রে বিহারে থাকতেন ,উনি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকরি করতেন। এক বার জঙ্গলে ঘুরতে গিয়ে উনি অতি প্রাচীন একটা দেবতার বিগ্রহ পেয়েছিলেন জঙ্গলের মধ্যে । সেই মূর্তিটা এনে বিজয় কৃষ্ণ এই জমিদার বাড়ীর শিব মন্দিরে স্থাপন করেছিলেন । এই বিগ্রহটি দেখতে অদ্ভুত ধরণের । জটাধারী, গোঁফওয়ালা কোন এক যোগী পুরুষ যেন বসে আছেন। এই ধরণের শিব মূর্তি আর কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। শোনা যায় যে এই মূর্তির তখন প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা যায় নি। কয়েক বার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছিল কিন্তু প্রতি বারই কোন না কোন বিগ্ন ঘটায় সেই সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল । এই শিব মূর্তির পূজা পর্যন্ত চালু করা যায় নি, না না দৈব দুর্বিপাঁকে পরে। যে যে এই দেবতার পূজা দিতে চেষ্টা করেছে সে সে না না ক্ষয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তারপর থেকে আর কেউ এই দেবতার প্রাণ প্রতিষ্ঠা বা পূজা দেবার সাহস পায় নি । পুরা কালে এই বিগ্রহের পূজা দেবার এক মাত্র অধিকার ছিল পরলোক গত বাসিন্দারা । উনি তখন পূজা পেতেন ভূত প্রেত ও অপোদেবতাদের কাছ থেকে। সেই দেবতাকে পূজা দেওয়ার সাধ্য সাধারণ মানুষের পক্ষে ছিল অসম্ভব। সন্ধ্যা বেলা ঢং ঢং করে মন্দিরের ঘন্টা বেজে চলে। তখন শত শত ছায়া শরীর বেরিয়ে আসে মহাকালের গর্ভ থেকে ওঁনাকে পূজা দেবার জন্য। বিদ্যুতের সাদা আলোর ঝলকানি সন্ধ্যার অন্ধকারকে ছিঁড়ে করে খন্ড খন্ড করে দেয়। তথাপি মন্দিরের মধ্যে যে মন্ত্র উচ্চারণ হয় সেটা শুনতে পাওয়া যায়। কিন্তু কে বা কারা ওঁনাকে পূজা দিচ্ছে তা দেখা যায় না। ওঁনাকে ঘিরে অভেদ্য দেওয়াল সৃষ্টি করে দাঁড়িয়ে থাকে এই সব আশরীরা। মন্দিরের পাশে পুরানো বিরাট বড় বট গাছটার ঝুলন্ত শিকড়গুলো যেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অন্ধকারকে আহ্বান করে। তারপর রাত হয়ে অন্ধকার বেড়ে গেলে সবাই মিলিয়ে যায় কুন্ডলি পাকানো কালো ধোঁয়ার মধ্যে। যে ধোঁয়া নির্গত হতো মন্দিরের মধ্যে থেকে। সেই ধোঁয়া কুন্ডলি পাঁকিয়ে উপরে উঠতে উঠতে ব্যাঘ্র ছাল পরিহিত জটাজোট ধারী বাবা মহাদেবের আঁকার নেয়। পূজা শেষ হয়ে গেলে সব ভ্যানিস হয়ে যায়। তারপর মন্দিরের দরজা আপনা থেকে বন্ধ হয়ে যায়। এটাকে সব মানুষ কোন অলৌকিক শক্তি বলে মনে করে। ওঁনাকে হয়তো ভুল জায়গায় এনে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল আর সেই কারণেই হয়তো উনি খুব রুষ্ট ছিলেন এই রাজ বংশের উপর ।সেই থেকে এই গাছ পালায় ঘেরা মন্দিরে এই মূর্তি পরে আছে। ধারণা করা হয়েছিল যে সেই মূর্তিটা ছিল বেশ কয়েক শো বছরের পুরানো। মূর্তিটা কোন কোন ধাতু দিয়ে তৈরি সেটাও জানা যায় নি। সেই মূর্তির প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য আর বাণিজ্যক বা আর্থিক মূল্য কত হতে পারে তা সেই সময় নির্ধারণ করা সম্ভব হয় নি। তাছাড়া জমিদার বিজয় কৃষ্ণ কুন্ডুর এই সব বিষয়ে খুব একটা আগ্রহ ছিল না। মূর্তিটা দেখে মনে হয় ভাগবান শিব বা দেবাদিদেব মহাদেবের মূর্তি। এই কুন্ডু জমিদারদের প্রথম প্রজন্মের জমিদাররা আদোতে শৈব বা শিবের উপাসক ছিলেন কিন্তু এই শিব বিগ্রহের কোপে পরে এদের যে ভয়াবহ পরিণতি হয়েছিল সেটা মনে রেখে তারপর থেকে এই রাজ বংশের পরবর্তী প্রজন্ম বৈষ্ণব মতের বিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল।মন্দিরে নারায়ণ বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা রয়েছে, শ্রীধর জিউ রুপে ।এই কুন্ডু জমিদার বংশের লোকেরা বৈষ্ণব ধর্মের সব নিয়ম কানুন অনুসরণ করতো। যেহেতু তারা শিব বা শৈব মতের অনুসারী ছিলেন না তাই তারা এই মূর্তি নিয়ে খুব একটা চিন্তা ভাবনা করেন নি। তাছাড়া ঠাকুর দালান, নাট মন্দির ছিল। প্রশস্ত ঠাকুরদালনের দু ধারে কারুকার্য খাচিত বাতিস্তম্ব রাখা আছে। মন্দিরের অসাধারণ কারুকার্য প্রসংসার দাবি রাখে । নাট মন্দিরে দূর্গা পূজা হতো। দূর্গা পূজার সময় নাচ গান হতো। আর একটা বিরাট বড় পুকুর ছিল। সেখানে ফিসিং এর ব্যবস্থা ছিল আর ছিল বোটিংয়ের ব্যবস্থা সেই আমলে। বর্তমানে বাড়ীর অন্দর মহলের ঘর গুলোর কত গুলি মহিলাদের সম্পর্কের নামে নাম করা হয়েছে । যেমন বড় মার ঘর, ছোট মার ঘর ছোট পিসির ঘর গিন্নি মার ঘর ইত্যাদি। আবার পুরুষ মহলের ঘর গুলিও বাবার ঘর ছোট কাকার ঘর ইত্যাদি নামে নাম করণ করা হয়েছে । বাহির মহলে মাঠ হাউসের ঘর গুলো সব বিভিন্ন ফুল গাছের নামে নাম করণ করা হয়েছে। যেমন মাধবীলতা, অপরাজিতা, কাঞ্চন লতা ইত্যাদি। ঘর গুলো সব ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মিশেলে চমৎকার করে তৈরি করা হয়েছে। ঘরের আসবাব পত্র গুলো অত্যন্ত অভিজাত ও উচ্চ রুচির পরিচয় বহন করে।
ঐ জঙ্গল ঘেরা মন্দিরে গিয়ে দড়ি ধরে টান দিয়ে মন্দিরের ঘন্টা বাজাবার চেস্টা করেছিল তৃণাঙ্কুর। সঙ্গে সঙ্গে কোন এক অজানা অদৃশ্য শক্তি এমন ভাবে ওকে ধাক্কা মারে যে ও দশ বার হাত দূরে এসে ছিটকে মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। ও কিছুক্ষন বেহুঁশ হয়ে পড়েছিল।লোক জন দৌড়ে এসে ওকে তুলে বসিয়ে চোখে মুখে জলের ঝাপ্টা মেরে সুস্থ করে । কেন এরকম হলো তার কিছুই ও বলতে পারছিলো না। তবে ওর মাথার মধ্যে ঘুঁরপাক খাচ্ছিল, তাঁর শ্মশান চারি অনুচোর গণ ছাড়া কেউ তাঁর উপাসনা করতে পারবে না। এর আগেও যারা যারা তাঁর পূজা করার চেষ্টা করেছে তাদের সবারই এই রকম মর্মান্তিক অবস্থা হয়েছিল। বহু মানুষের অকাল মৃত্যু হয়েছে। এরপর ওরা আর ঐ রাজবাড়ীতে থাকে নি। তখনই ওলা গাড়ি বুক করে কল্যাণী এক্সপ্রেস ওয়ে ধরে বাড়ী চলে আসে। বাড়ী এসে ও রোজকার মত পূজা করে কিন্তু আগের মতো করে ঘন্টা বাজাতে পারে না। ও ঘন্টা বাজালে একটা বিকট শব্দ হয় । শত সহস্র কণ্ঠ এক সঙ্গে সমস্বরে চিৎকার করে ওঠে। সেই চিৎকারে আকাশ বাতাস কেঁপে ওঠে। মনে হয় ভূমি কম্প শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু ঐ ঘন্টাই যখন আর সবাই বাজায় তখন স্বাভাবিক শব্দ হয়। এর কারণ কিছুই ওরা উদ্ধার করতে পারে না। তৃনাঙ্কুরের শরীরটা সব সময় ভারি ভারি লাগে। অল্প সময় কাজ করলেই ওর দম লেগে যায়। ওর মনে হয় যে ওর মাথার অর্ধেক অংশ কোন কাজ করছে না। মাথার যেই দিকটা কাজ করছে না বলে ওর মনে হয় সেই দিকটা পাথরের মত শক্ত। ওকে এক জন ভালো নিউরোলোজিস্ট এর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তার বাবু ওকে ভালো করে এক্সামিন করে বলেন যে আচমকা ভয় পেয়ে ওর মাথার ঐ অংশের সেল গুলো ড্যামেজ হয়ে গেছে। যেটা আর আগের মত কাজ করতে পারবে না। প্রেসার কম নিয়ে ওকে চলতে হবে। এরপর ওরা আর কোথাও বেড়াতে যায় নি।
উপনিষদ বলে, তিনি একক এবং অদ্বিতীয় , ওঁনার কোন মূর্তি নেই । সৃষ্টির পর উঁনি হাজার হাজার বছর একা একা ঘুরে বেড়িয়েছেন। ওঁনার কোন উপাসক ছিল না। তারপর একাকীত্ব মোচন করতে উঁনি দ্বিখন্ডিত হন। তাঁর থেকে একজন নারীর সৃষ্টি হয়। তারপর দুজনে মিলে ওনাদের প্রয়োজন মত সন্তান সৃষ্টি করেন। মানুষ আসে। সমাজ গড়ে ওঠে। বহু সহস্র বছর পর ওঁনার উপাসক তৈরি হয়। প্রথমে উপাসক হিসাবে ওঁনার সঙ্গে জোটে ভূত প্রেত ডাকিনী যোগিনী। তাঁর বহু বছর পর মানুষ ওঁনার উপাসক হয়। অনেকে বলে এটা কোন অলৌকিক ঘটনা হবে। অলৌকিক বললে সেটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। মানতেই হয়।
—oooXXooo—
![]()







