অপহরণ (থ্রিলার)
বাসুদেব দাশ
কলকাতা শহরের একটা পুরানো স্যাতস্যাতে গলি, ৫ নং এ.কে.বড়াল লেন। ঠিকানা ধরে বাড়ীটা খুঁজে পেতে বেশি অসুবিধা হয় নি পুলিশের। বাড়ীর সামনে কর্পোরেশনের একটা টাইম কল। জল পড়ে পড়ে নর্দমা ছাপিয়ে রাস্তায় ওঠে এসেছে জল । ময়লা পঁচে ভ্যাপসা দুর্গন্ধ বের হচ্ছে । একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের প্লাস্টার খসে পড়া দোতালা বাড়ীর মেইন দরজাটা হাট করে খোলা। রাত দুটো বাজে। বাড়ীটার প্রত্যেকটা ঘরে যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে পুলিশ তল্লাশি চালিয়েছে। কিন্তু কোন জন মানুষের চিহ্ন পাওয়া যায় নি বাড়ীটার মধ্যে । বাড়ীটার ভিতরে কেউ নেই বলেই রিপোর্টে উল্লেখ করতে হয়েছে। জন মানব শূন্য,পুরোপুরি ফাঁকা পড়ে আছে দোতালা বাড়ীটা । যেন দম বন্ধ হয়ে পরে থাকা কোন একটা নিঝুম রহস্য পুরী। মনে হচ্ছে বহু কাল মানুষ বসবাস করে নি এই বাড়ীটাতে । যেন বাতাস ঢুকতে ভয় পাচ্ছে এই বাড়ীতে । মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়ের ব্যবধানে বাড়ীটার পরিবেশের এই পরিবর্তন। ঘরের পুরানো আসবাপ পত্র কিন্তু পরিবারের আর্থিক জৌলুসের সাক্ষী বহন করছে। হয়তো বর্তমানে পরিবারের কোন মেম্বারের অত্যাধিক ব্যয় বাহুল্যের কারণে আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটেছে। তাই বাড়ী ঘরের এই হতশ্রী ভাব। শুধু একটা লাল রঙের শাড়ি ঘরের এক তলার মেঝেতে পরে লোটাচ্ছে । শাড়িটাতে ছোপ ছোপ লাল রক্ত লেগে আছে।কাছে গিয়ে ভালো করে দেখে বোঝা গেল যে শাড়িটা লাল না, রক্তে ভিজে গিয়ে লাল হয়ে গেছে । এই বাড়ীর মেয়েটির নাম ‘শ্রুণিতা”। বয়স চব্বিশ পঁচিশ বছরের মত হবে। গতকাল রাতে বয় ফ্রেন্ড ‘সৌরকরের ‘সঙ্গে রেস্টুরেন্টে খেতে বেরিয়েছিল । তারপর আর বাড়ী ফিরে আসে নি । এই ভাবে রাতে বের হওয়াটা শ্রুণিতার প্রায় প্রতি দিনকারই অভ্যাস। থানায় জানানো হয়েছিল। শেষ রাতের দিকে পুলিশ আসে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য কেস স্টাডি করতে । পুলিশ অফিসার ইন্সপেক্টর ‘সাত্যকি রঞ্জন কালা ‘ এই কেসের তদন্ত অফিসার । পুলিশ ইন্সপেক্টর সাত্যকি রঞ্জন একটু বয়স্ক লোক,এই বছর পঞ্চাশের মত বয়স হবে। চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট প্রকাশ পাচ্ছে কিন্তু মাথা ভীষণ ঠান্ডা, দৃষ্টি স্থির ও সতর্ক । পুলিশ ইন্সপেক্টরের প্রথমে মনে হয়েছিল যে ও প্রেমিকের সঙ্গে কোথাও পালিয়ে গেছে। কিন্তু শাড়িটার দিকে চোখ যেতে মনে হলো না এটা নিছক কোন পালিয়ে যাবার ঘটনা না। এর পিছনে কিছু একটা রহস্য লুকিয়ে আছে। অন্তত বাড়ীর পরিবেশ তাই বলছে বলেই পুলিশের ধারণা । তদন্তের শুরুতে বাবার দেওয়া নাম্বারে মেয়েটির মোবাইল ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করে পুলিশ জানতে পারে যে শ্রুণিতাকে শেষ বারের মত দেখা গিয়েছিল শ্যামপুকুরের একটা সরু গলির মধ্যে একটা পুরানো বাড়ীর এক তলার একটা ঘরে । পুলিশ তৎপরতার সঙ্গে সেখান পৌঁছে যায়। কিন্ত সেখানে গিয়ে শ্রুণিতাকে খুঁজে পাওয়া যায় না । পুলিশ একটু ধন্দে পড়ে যায়। পুলিশ ডাকা ডাকি করায় ঐ বাড়ীর ভিতর থেকে বছর পঞ্চাশের বেশি বয়স্ক এক ভদ্র লোক বেরিয়ে আসেন । লোকটার চোখে কাল চশমা, ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেট। ঘন ঘন টান মারছে আর কুন্ডলি পাঁকিয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে বায়ু মন্ডলে । ওনার সিগারেট টানা মনে করিয়ে দেয় মহানায়ক উত্তম কুমারের কথা। পুলিশ লোকাটাকে পর পর কয়েক বার জিজ্ঞেস করে যে এখানে কোন যুবতী মেয়ে এসেছে কিনা ? ভদ্রলোক প্রথমে সন্ত্রস্ত হয়ে চুপ করে থাকেন কিছুক্ষন। তারপরে পুলিশের ভয় কাটিয়ে উঠে বলেন ,”হ্যাঁ একটু আগে একটি যুবতী মেয়ে এখানে এসেছিল আমার ছেলে সৌরকরের সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু ও এখন আর এখানে নেই। চলে গেছে অন্য কোথাও।” এরপর পুলিশ ভদ্রলোকের কাছে জানতে চায় যে ওনার ছেলে সৌরকর এখন কোথায় আছে ? ভদ্রলোক জানান যে ও এখন বাড়ী নেই আর কোথায় গেছে সেটা ওনাকে বলে যায় নি । ভদ্রলোকের কাছ থেকে ওনার ছেলের মোবাইল নাম্বার নিয়ে পুলিশ সৌরকরের সঙ্গে ওভার ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে। কিন্তু ওর মোবাইল এখন সুইচড অফ বলছে আর শ্রুণিতার ফোন তো তাড়াহুড়ো করে ফেলে গেছে সেটা এখন পুলিশের হাতে। পুলিশ ভেবে স্থির করতে পারে না যে সৌরকর এখন কোথায় থাকতে পারে ? বাড়ীতে নেই, মোবাইল সুইচড অফ। এই ঘটনা পুলিশের রাতের ঘুম হারাম করে দিচ্ছে। কি হতে পারে কেসটা!” কি হতে পারে কেসটা! ভাবতে ভাবতে এক দিন দু দিন করে তিন তিনটে তাজা দিন চলে যায় পুলিশের হাত থেকে। এই কেসের কোন কিনারা করতে পারা তো দূরের কথা এই কেসের কোন লক্ষণ বা মোটিভই ধরতে পারছে না পুলিশ।
পুলিশ ইন্সপেক্টর সাত্যকি রঞ্জন কালার মাথায় একটা ছবি বার বার ঘুরে ঘুরে আসে । শ্রুণিতার মোবাইল ফোনের লাস্ট মেসেজটা । “আমি ভয় পাচ্ছি সৌরকর, আমি ভয় পাচ্ছি। ওরা জানলে ওরা আমার বাবাকে মেরে ফেলবে। বাবা ছাড়া আমার তো আর কেউ নেই। মা আমকে ছেড়ে চলে গেছে । সেই থেকে আমার পরিবার বলতে আমি আর আমার বাবা।” পুলিশ ভেবে স্থির করতে পারে না যে এই “ওরা ” কারা ? ও কাদের ভয় পাচ্ছে ? কেসের চতুর্থ দিনে এসে পুলিশ একটা স্ট্রং ব্রেকথ্রু পায় । পুলিশ ভাবলো কেসের গতি পথ নিদৃষ্ট হয়ে গেছে এবার কেসের তদন্ত প্রক্রিয়ায় গতি আসবে। তর তর করে এগিয়ে যাবে কেসটা । শ্রুণিতার যে মোবাইলটা সৌরকরের বাবা পুলিশকে দিয়েছিল সেই মোবাইল থেকে ঐ ভয় পাওয়ার মেসেজ ছাড়া একটা ট্যাক্সির নাম্বারও পাওয়া গেছে । সম্ভবত যে ট্যাক্সিটাতে করে ও ঐ বাড়ী থেকে বেরিয়ে এসেছিল। পুলিশ মোটর ভেহিকল থেকে সেই ট্যাক্সির মালিকের নাম ও ঠিকানা জানতে পেরে যায় । এক দিন ভোর রাতে পুলিশ এসে হাজির হয় গাড়ির মালিকের বাড়ী। মালিককে থানায় ডেকে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। মালিকের কাছ থেকে গাড়ির ড্রাইভারের নাম ও তার মোবাইল ফোনের নাম্বার পেয়ে যায় পুলিশ। একটা আঁধার কার্ডের ফটো কপিও পেয়ে যায়। সেই আঁধার কার্ডে ড্রাইভারের নাম ও ঠিকানা আছে। মালিক মনোজ বেরা বলে, “কয় দিন ধরে ঐ ড্রাইভার গাড়ি চালাতে আসছে না। জ্বর হয়েছে বলে খবর পাঠিয়েছে । ” কলকাতা পুলিশ গাড়ির মালিকের কাছ থেকে ড্রাইভারের যে ফোন নাম্বার পেয়েছিল সেই নাম্বারে ফোন করে। কিন্তু ফোনটা লাগে না। আউট অফ নেট ওয়ার্ক এরিয়া বলে। পুলিশ ভাবে ড্রাইভারের আঁধার কার্ডের এড্রেস অনুযায়ী ওর বাড়ী গিয়ে ওকে ধরবে। কিন্তু সেই এড্রেস তো উত্তর প্রদেশের গাজী পুরের । ড্রাইভারের লোকাল এড্রেসটা জানার জন্য গাড়ির মালিককে ফোন করে। গাড়ির মালিক পুলিশকে নিয়ে ড্রাইভারের ঠেকে যায়। ঠেকে গিয়ে ওকে পায় না। পুলিশ একটু হতাশ হয়ে পরে । বুঝতে পারে না যে বিষয়টা কি হলো। অতঃপর পুলিশ ঠেকের মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে। মালিক বলে ওর জ্বর হয়েছে বলে ও ওর কাকাতো বোনের বাড়ী বেলগাছিয়া ওলাই চন্ডি রোডে গেছে। পুলিশ গাড়ি ঘুরিয়ে বেলগাছিয়া ওলাই চন্ডি রোডে যায়। সেখানে এসে বেলগাছিয়া থানার পুলিশের সাহায্যে ওর কাকাতো বোনের বাড়ী খুঁজে বের করে। এবার ড্রাইভার সাহেবের দেখা মেলে । পুলিশ, “তোর নাম কি ?” ড্রাইভার, “কেন স্যার ? আমি কি করেছি ?” পুলিশ, “সামান্য নাম জিজ্ঞেস করাতেই কেন, কি কিরেছি এই সব প্রশ্ন তুলছিস ? তাহলে এরপর কি করবি ? তোর এত ভয় কিসের ? তুই কি মানুষ খুন করেছিস ?” ধমক দিয়ে দেয় পুলিশ।” নাম বল। ” ড্রাইভার, ” স্যার আমি ঐ সব কিছু করিনি। স্যার আমার নাম রাঘভ যাদব । ” পুলিশ দেখে যে আঁধার কার্ডের নামের সাথে এই নাম মিলে গেছে। তার মানে ও যেটা বলছে সেটা সত্য বলছে । পুলিশ, “তুই কয় দিন আগে শ্যামপুকুরের একটা সরু গলি থেকে একটা মেয়েকে তোর গাড়িতে তুলেছিলি ? ” রাঘভ যাদব , হ্যাঁ স্যার। কিন্ত কেনো স্যার ? ” পুলিশ, “ওকে তুই কোথাও ড্রপ করেছিলি ? “রাঘভ যাদব , “বাগুইআটির কাছে হেলাবট তলার একটা ফাঁকা গোডাউনে। মেয়েটার হাতে একটা ব্যাগ ছিল । আর একটা ছেলে ছিল। মনে হয় ওর বয় ফ্রেন্ড । আমার মনে হচ্ছিলো ও খুব ভয় পেয়েছে । স্যার আমি ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে ম্যাডাম আপনার কি কোন সমস্যা হয়েছে ? ” মেয়েটি বললো, “না, কিছু না। ঠিক আছে।”
ইন্সপেক্টর সাত্যকি রঞ্জন কালা তার টিম নিয়ে রাতে রাঘভকে সঙ্গে নিয়ে হেলাবট তলার সেই গোডাউনে যান । ওখানে গিয়ে দেখেন গোডাউনের সাটার অর্ধেক তোলা । সাটার পুরোটা তুলে ভিতরে ঢুকে দেখেন ভিতরটা ভীষণ অন্ধকার। ইলেকট্রিকের সুইচ বোর্ড কোথায় আছে অন্ধকারে তা দেখা যাচ্ছে না। ভ্যাপসা গরম আর উৎকট গন্ধে ভরে আছে বিরাট বড় গুদাম ঘরটা । হাতের তিন ব্যাটারির টর্চের আলো গোডাউনের ভিতর পড়তেই ভিতরের দৃশ্য দেখে ইন্সপেক্টর ঘাবড়ে যান। বিকট ভোমরা গন্ধ আর ভিতরের দৃশ্য দেখে ওনি একটু অসুস্থ বোধ করেন। ওনার গা হাত পা অবস হয়ে আসে। মাথা ঘুরতে থাকে। টর্চটা হাত থেকে মেঝেতে পরে যায়। পাশে দাঁড়ানো সাব ইন্সপেক্টর, ইকবাল বুঝতে পেরে এগিয়ে এসে ওনাকে ধরে একটা চেয়ারে বসিয়ে দেন। সাব ইন্সপেক্টর, ইকবাল ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করে যে আপনি কে ? আর আপনি শ্রুণিতাকে নিয়ে এই গোডাউননে এসেছিলেন কেনো ? ” ছেলেটি, “আমি সৌরকর ওর বয় ফ্রেন্ড। এখানে না এলে ওর বাবা ওকে বিক্রি করে দিত। তাই বাঁচার জন্য ভয়ে এখানে পালিয়ে আসা । এখানে এসে অন্ধকারের মধ্যে শ্রুণিতা আর আমি ভয়ে ভয়ে ঘাপটি মেরে পরে থাকি চোখ কান নাগ সব বন্ধ করে । অন্ধকারের মধ্যে আমার একবার মনে হলো যে এই ঘরের একটা কোনে দুটো মানুষ শুয়ে আছে। তারা মরে আছে না কি বেঁচে আছে সেটা আমরা বুঝতে পারিনি। তখন ভয়ে পেয়ে আমরা এখান থেকে পালিয়ে যেতে যাবো এমন সময় ড্রাগ ৱ্যাকেটের লোকেরা এখানে এসে হাজির হয়। ওরা সংখ্যায় প্রায় পাঁচ ছয় জন হবে। কোন একটা সুত্র থেকে ওরা আমাদের এখানে আসার খবরটা পেয়ে যায়। তাই ওরা এখানে এসে হাজির হয়। ওরা এখানে এসেই শ্রুণিতাকে আক্রমণ করে। ওর শরীরের অনেক গুলো জায়গায় ওরা ভোজালি দিয়ে আঘাত করে। তাতে ও ভীষণ কাবু হয়ে পরে। আমি ওকে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম কিন্তু পারিনি ভিতরকার অজানা ভয়ে । আমার হাতে এমন কিছু ছিল না যে সেটা নিয়ে আমি ওদের বাঁধা দেবো । আমি ভয়ে কুঁকড়ে গিয়েছিলাম।” পুলিশ, আপনাকে ওরা কিছু বললো না কেনো ? আপনি কি ওদের পূর্বপরিচিত ? ” সৌরকর, “না আমি ওদের চিনি না। ” ইকবাল,বিরক্তিকর দৃষ্টি নিয়ে সৌরকরের দিকে তাকায়। মনে মনে ভাবে ডাল মে কুচ কালা হ্যায়। এর মধ্যে ইন্সপেক্টর সাত্যকি রঞ্জন কালা সুস্থ হয়ে ওঠেন। তিনি এবার পরিষ্কার সব কিছু দেখতে পাচ্ছেন এবং সব কিছু বুঝতে পারছেন। তিনি দেখেন ,শ্রুণিতা হাত পা বাঁধা অবস্থায় একটা চেয়ারে বসে আছে তার মুখে টেপ আটা। চোখের দৃষ্টি নিশ্চল, পাতা পড়ছে না। চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। কোন রকম নড়াচরা নেই। পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার বয় ফ্রেন্ড সৌরকর অক্ষত কিন্তু বিমর্ষ চেহারা নিয়ে । চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। গোটা শরীরটা ঠক ঠক করে কাঁপছে। মাঝে মাঝে ভাঙা ভাঙা টুকরো টুকরো কণ্ঠস্বর কেঁপে কেঁপে বেরিয়ে আসছে গলা বেয়ে ঘর ঘর আওয়াজ তুলে । তদন্তকারী পুলিশ অফিসারের হঠাৎ মনে হলো যে চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়া বেঁচে থাকার একটা লক্ষণ হতে পারে। সৌরকর কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,” আমি ওকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম কিন্তু পারিনি। ওরা ওকে মেরে ফেললো । ওর পরণের শাড়ি সায়া ব্লাউজ সব রক্তে ভিজে যায়। যাবার সময় ওর শাড়িটা ওরা খুলে নিয়ে যায়। তারপর ওরা ওকে এই চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে রেখে পালিয়ে যায়। তার পরেই আপনারা এখানে এসে হাজির হন।” পুলিশ, ” ওরা কারা ? ” সৌরকর, “ওরা শ্রুণিতা যে ড্রাগ ৱ্যাকেটে জড়িয়ে পড়েছিল সেই ৱ্যাকেটের লোক । শ্রুণিতা এক সময় ড্রাগ ৱ্যাকেট থেকে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল। তারপর ওরা বলেছিল যে তাহলে ওরা শ্রুণিতাকে আর শ্রুণিতার বাবাকে মেরে ফেলবে। শ্রুণিতা বাবাকে খুব ভালোবাসতো। বাবার মৃত্যু ভয় ওকে খুব বিচলিত করে তুলেছিল।” পুলিশ,” কিন্ত শ্রুণিতার বাবা তো ওকে বিক্রি করে দিতে চেয়েছিল।” সৌরকর, “সেটা শ্রুণিতা জানতো না।” পুলিশ,”কিন্তু শ্রুণিতা যে ড্রাগ ৱ্যাকেটে জড়িয়ে পড়েছিল তার প্রমান কি আছে ? আর ড্রাগ ৱ্যাকেটের লোকেরা যে ওকে খুন করতে এসেছিল তারই বা প্রমান কোথায় ? “সৌরকর,”শ্রুণিতা যে কলেজে পড়তো সেই কলেজের আরও কয়েক জন স্টুডেন্ট ঐ ড্রাগ ৱ্যাকেটে জড়িয়ে পড়েছিল। ঐ কলেজের প্রায় সব স্টুডেন্টই জানতো এই ড্রাগের বিষয়টা। কয়েক জন প্রফেসরও জানতেন।”সৌরকর পুলিশকে তাদের কয়েক জনের কাছে এক এক করে নিয়ে যায়। পুলিশ সেই সব স্টুডেন্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং তাদের স্টেটমেন্ট রেকর্ড করে নেয়। প্রফেসরদের স্টেটমেন্টও রেকর্ড করা হয়। স্টুডেন্টদের এবং প্রফেসরদের স্টেটমেন্ট বিচার বিশ্লেষণ করে তার থেকে প্রমান পাওয়া যায় যে শ্রুণিতা ড্রাগ ৱ্যাকেটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল। এবার প্রমান করতে হবে যে ড্রাগ ৱ্যাকেটের লোকেরা ওকে খুন করতে এসেছিল কিনা ? টর্চ মেরে মেরে পুলিশ দেখে যে ঘরের মধ্যে ইলেকট্রিকের সুইচ বোর্ড আছে কিন্তু সুইচ অন করলে আলো জ্বলছে না। ইলেকট্রিক লাইনে কোন কানেকশন নেই। লাইনটা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা আছে। ইন্সপেক্টর সাত্যকি রঞ্জন কালা টর্চের জোরালো আলোতে দেখতে পান যে গুদাম ঘরের বিভিন্ন জাগায় কিছু জিনিস পত্তর ইতস্তত এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। ঘরের একটা কোনের দিকে টর্চের আলো পড়তে তিনি দেখতে পান যে সেখানে দুটো লাশ পরে আছে। একটু জোরে ধাক্কা দিতে দেখা গেলো যে একটা সামান্য নড়াচড়া করছে। আর একটার বেঁচে থাকার কোন লক্ষণ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না । ঐ লাশটাকে সনাক্ত করার জন্য স্থানীয় লোক ডাকা হয়। কিন্তু স্থানীয় লোকজন এসে লাশটা সনাক্ত করতে পারে না। অতঃপর পুলিশ শ্রুণিতার বাড়ী যে অঞ্চলে সেই অঞ্চল থেকে কয়েক জন লোককে ডেকে আনে লাশটা সনাক্ত করার জন্য। তারা এসে লাশটাকে শ্রুণিতার বাবার বলে দাবি করে আর যে লোকটা বেঁচে আছে সে ওর বাবার এক জন বন্ধু বলে পরিচয় দেয়। পুলিশ শ্রুণিতার বাবাকে পোস্টমর্টেম করতে সরকারি হাসপাতালে পাঠায় আর বাবার বন্ধুকে ট্রিটমেন্টের জন্য সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়। একটু সুস্থ হয়ে লোকটি বলে যে শ্রুণিতার বাবা বিপদের আশঙ্কা করে থানায় ফোন করে ছিল। উনি গোপন সূত্রে খবর পেয়েছিলেন যে ড্রাগ ৱ্যাকেটের লোকেরা ঐ গোডাউনে আসবে শ্রুণিতাকে আক্রমণ করতে। কিন্তু পুলিশ শ্রুণিতাদের বাড়ী আসতে অনেক দেরি করায় আমরা বেরিয়ে পরি। বেরিয়ে পরে শ্রুণিতাকে খুঁজতে আমরা ঐ গোডাউনে যাই। কারণ গোপন সূত্রের খবর অনুযায়ী উনি জানতে পেরেছিলেন যে শ্রুণিতা ওখানে আসবে। আমরা শ্রুণিতার আগে ঐ গোডাউনে পৌঁছে যাই। পৌঁছে গিয়ে আমরা পুলিশকে ঐ গোডাউনে ঠিকানা জানিয়ে দেই। শ্রুণিতা আসার আগেই ওরা আমাদের উপর আক্রমণ করে। তখন সৌরকর বলে, “আমি মেরে ফেলিনি ওদের । অন্ধকারের মধ্যে আমি বুঝতে পারিনি যে এর মধ্যে এক জন শ্রুণিতার বাবা আছেন।” পুলিশ সৌরকরকে খুনের দায়ে লক আপে ঢুকিয়ে দেয় । তদন্তের স্বার্থে সৌরকরকে থানার হেপাজতে কয়েক দিন রেখে দেওয়া হয়। শ্রুণিতা মুক্ত হয়ে যায় । টর্চের আলোতে দূরে থেকে দেখে সাত্যকি রঞ্জন বুঝতে পারছিলেন না যে শ্রুণিতা বেঁচে আছে না কি মরে গেছে। কিন্তু কাছে গিয়ে ভালো করে দেখেন যে চোখ দুটো খোলা কিন্তু নিশ্চল, চোখে আলো নেই। চোখ থেকে জল পড়াটা বেঁচে থাকার একটা লক্ষণ বলে ওনার বার বার মনে হতে থাকে। হাতের আঙুলের দিকে তাকিয়ে দেখতে পান যে একটা আঙুলে একটা আংটি আছে। সেই আংটিটা ওনার খুব চেনা। হঠাৎ করে তার হৃৎপিন্ডের মধ্যে আপনা আপনি সন্তান হারাবার একটা ব্যথা মোচড় দিয়ে ওঠে। তার শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা জলের স্রোত বইতে শুরু করে। তিনি আর সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি করে শ্রুণিতাকে নিয়ে এসে হাসপাতালে এডমিট করে দেন। ডাক্তার বাবুরা মেয়েটিকে পরীক্ষা করে বললেন যে ও মরে নি। গুরুতর আঘাত পেয়ে আধ মরা হয়ে পড়ে আছে । দেহে প্রাণ আছে। ক্ষীণ শ্বাস প্রশ্বাস চলছে। বাইরে থেকে বুঝতে পারা যায় না। সৌরকর যেহেতু ডাক্তার না তাই ও বুঝতে ভুল করেছে। মেয়েটি কোমায় আচ্ছন্ন তাই ওর কথা বলার শক্তি নেই। পুলিশ ইন্সপেক্টরের স্পষ্ট ভাবে বলেন যে ওকে বাঁচিয়ে তুলতে হবে। তার জন্য যত টাকা লাগে তিনি দেবেন ।
ইন্সপেক্টর সাত্যকি রঞ্জন কালা
এই মেয়েটার কেসটা নিয়ে ভেবে ভেবে অস্থির হয়ে পড়েন । কেসটা তাকে ভিতর থেকে এমন ভাবে নাড়া দিচ্ছে যা তিনি সহ্য করতে পারছেন না। দাবানলের মত হুঁ হুঁ করে তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে এই আগুনের তাপ । তিনি ভেবে পান না যে এই কেসটা তার মনকে এই ভাবে উথাল পাথাল করছে কেন। কেসটার সঙ্গে কি তার কোন নারীর সম্পর্ক আছে ? কিন্তু এই কেসটা সেটল করার কোন কূল কিনারা তিনি পান না। বাড়ীতে গিয়ে খেতে পারেন না, ঘুমাতে পারেন না। হাঁটতে চলতে শুতে বসতে সব সময় তার মাথায় এই মেয়েটার চিন্তা। বার বার সৌরকরের কয়েকটা কথা ওনার কানে বাজতে থাকে। সৌরকর, “আমি…আমি ওকে মারিনি, আমি ওকে লুকিয়ে রেখতে চেয়েছিলাম। ” তাহলে ঐ রক্ত মাখা শাড়িটা ? সৌরকর আসলে কে ? কি ওর পরিচয় ? এই সব অনেক চিন্তা ভাবনা পুলিশ ইন্সপেক্টর সাত্যকি রঞ্জন কালার মাথার মধ্যে ঘুঁরপাক খেতে থাকে। এই রহস্য ভেদ করার জন্য সাত্যকি রঞ্জন মাঝে মাঝে থানার লকআপে গিয়ে সৌরকরের সাথে কথা বলেন। সাত্যকি..”আচ্ছা সৌরকর তুমি বলছো যে শ্রুণিতার বাবা ওকে বিক্রি করে দিতে চেয়েছিল অথচ শ্রুণিতা ওর বাবাকে খুনিদের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিল। এটা কি করে হয়।” সৌরকর…” আসলে শ্রুণিতা ওর বাবাকে খুব ভালোবাসত। তাছাড়া শ্রুণিতা বিশ্বাস করতে পারতো না যে ওর বাবা তাকে বিক্রি করে দেবে। মোট কথা ও জানতো না যে ওর বাবা ওকে বিক্রি করে দিতে চায়। শ্রুণিতা খুব ছোট বেলায় ওর জন্ম দাতা বাবাকে হারায়। শ্রুণিতার মুখে শোনা। বাবার সঙ্গে হারিদ্বারে বেড়াতে গিয়ে ফেরার পথে ট্রেনের মধ্যে থেকে ও হারিয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকে ও আর বাবার দেখা পায় নি। সেই পাঁচ বছর ছয় বছর বয়সে। তারপর আস্তে আস্তে জন্ম দাতা বাবার কথা ভুলে গেছে। তখন থেকে ও এই পালক পিতার কাছে বড় হয়েছে। এখন ওর বয়স চব্বিশ পোঁচিস। ” সাত্যকি, ” ওর বাবা ওকে বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলেন কেনো ?” সৌরকর, ” এর একটা কারণ হতে পারে যে শ্রুণিতার বাবা জেনে গিয়েছিলেন যে শ্রুণিতা একটা ড্রাগ ৱ্যাকেটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।ওর উশৃঙ্খলা,বেহিসাবী জীবন যাপন এই বিষয় গুলো উনি মেনে নিতে পারেন নি। ওর খরচ সামলাতে গিয়ে বাবার দেওলিয়া হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা । তিনি মেয়েকে অনেক বুঝিয়েছিলেন কিন্তু কোন কাজ হয় নি । উল্টে মেয়ে বাবাকে বলতো যে তুমি সেকেলে তাই তুমি এ সব স্ট্যাটাস কিছু বুঝতে পারছো না । তাছাড়া আমি এখন অ্যাডাল্ট হয়ে গেছি আমার কিসে ভালো আর কিসে মন্দ সেটা আমি বুঝি সুতরাং তুমি আমার বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাবে না। মেয়েটি ভীষণ বেপরওয়া হয়ে উঠেছিল। মেয়ের এহেন আচরণে শ্রেয়াণ বাবু খুব বিরক্ত বোধ করতেন। অসহায় বোধ করতেন। আর একটা কারণ হতে পারে আট দশ বছর বয়স থেকে ত্রিশ পয়ত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত মেয়েদের বিদেশের একটা আইল্যান্ডে বিক্রি করে দেওয়া হয় । সেই আইল্যান্ডের নাম এপস্টিন আইল্যান্ড। প্রশান্ত মহাসাগরের এক কোনে ছিল এই নরক দ্বীপটি। ওটা কোন দ্বীপ নয় । ওটা একটা পাপের দুর্গ। চারি দিক সমুদ্রের নীল জলরাশি দিয়ে ঘেরা। তার মধ্যে সুস্বজ্জিত মনোরম ইমারত । এই দ্বীপে মেয়েদের বিক্রি করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের এক শ্রেণীর দালাল চক্র দেদার টাকা কামাচ্ছে। ঐ স্বর্ণপুরী দ্বীপটা তৈরি করেছিল জ্যাফ্ফড়ি এপস্টিন নামে এক জন আন্তর্জাতিক কুখ্যাত যৌন নৃপীড়ক । তার নামেই দ্বীপটার নাম। একশোটা বাচ্চা মেরের শরীর থেকে রক্ত নিয়ে এক বোতল এডিনো ক্রম তৈরি হয়। এক বোতল এডিনো ক্রমের দাম আঠারো হাজার কোটি টাকা। এই এডিনো ক্রম পান করে যৌবন ধরে রাখার জন্য। একশোটা মেয়ের জীবন নষ্ট হয়ে যায় এই এক বোতল এডিনো ক্রম তৈরি করতে। এটাই ছিল তার ব্যবসার কেন্দ্র বিন্দু। লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা কামাতো সে এই প্রমোদ পুরী থেকে। বলতে পারা যায় এখান থেকেই পুরো পৃথিবীটা পরিচালিত হতো। পৃথিবীর সব দেশের সব সরকারের চাবি কাঠি লুকানো থাকতো এখানে । এটাকে বলা যেতে পারে ক্ষমতার অন্ধকূপ। কোন দেশের কোন সরকারের পতন ঘটাতে হলে বা কোন দেশের কোন সরকারের প্রমোশন হলে সবই ঠিক হতো ওখানে বসে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র প্রধানরা তাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের উন্নতি করার জন্য বা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য জ্যাফরি এপস্টিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে সাহায্য চাইতেন। তখন জ্যাফরি এপস্টিন তাদের দেশেরর গুরুত্বপূর্ণ তত্ত জমা নিয়ে তাদেরকে সাহায্য করতেন। পরে সুযোগ মত এই সব গোপন তত্ত কাজে লাগিয়ে ঐ সব দেশকে বিপদে ফেলা হতো। এই সব কাজে জ্যাফরি এপস্টিনের লাগিয়ে ব ছিল সীমাহীন। আর একটা কথা, করোনা ভাইরাসের উৎপত্তিও হয়েছিল এখানে। জ্যাফরি এপস্টিনের ল্যাবরেটরিতে মহামারী করোনার ভাইরাস সৃষ্টি করা হয়েছিল পৃথিবীর লোক সংখ্যা কমানোর জন্য। পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশের রাষ্ট্র প্রধানরাই জানতো বিষয়টা। পৃথিবীর বর্তমান লোক সংখ্যা সাত বিলিয়ন থেকে কমিয়ে এক বিলিয়ন করার লক্ষ নিয়ে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল সারা বিশ্ব জুড়ে। এক দিকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয় মরছে অন্য দিকে করোনার ভাক্সসিন নিয়ে মরছে। মানুষের মৃত্যু মিছিল লেগে গিয়েছিল। মনে করা হয়েছিল যে ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর জন সংখ্যা ৯. ৬ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যাবে। আর মিথ্যা দোষ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল চায়নার উপর । যেহেতু করোনা ভাইরাসের প্রথম দেখা পাওয়া গিয়েছিল সেখানে।এই জৌলুস পূর্ণ এপস্টিন আইল্যান্ডে নাবালিকা ও যুবতী মেয়েদের নিয়ে ফুর্তি করতো পৃথিবীর সেরা সেরা মানুষরা। যৌন কেলেঙ্কারির একটা চরম পর্যায় চলতো ওখানে। শোনা যায় ঐ সব নাবালিকাদের ধর্ষণ করার পর ওদের কেটে ওদের মাংস রান্না করে খেতো ঐ সব মানুষ রূপী জানোয়াররা । একটা মেশিনের মধ্যে একটা জীবিত মেয়েকে ঢুকিয়ে দিত আর তার মাংস পিচ্ পিচ্ হয়ে কেটে বেরিয়ে আসতো।বাচ্চা মেয়েদের আস্ত শরীরটা ফ্রাই করে খেতো ঐ সব নর খাদকরা। কিছু মেয়েকে গর্ভবতী করে তাদের গর্ভে ভ্রূণ জন্মানো হতো। তারপর মাংস কাটার দা দিয়ে সেই সব মেয়েদের পেট কেটে ভ্রূণটা বের করে এনে রোস্ট করে খেতো ঐ জানোয়ার গুলো। নানা রকম নারকীয় কান্ড কারখানা চলতো ওখানে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র প্রধানরা যেতো ওখানে ফুর্তি করতে। বিভিন্ন ফিল্ডের নামি দামি সেলিব্রেটিরাও ভিড় করতো তাদের বিকৃত যৌন লালসার চাহিদা মেটাবার জন্য। ” “সাত্যকি…”তুই এতো সব জানলে কেমন করে ? ” সৌরকর, ” আমার একটা পরিচয় আমি শ্রুণিতার বয় ফ্রেন্ড আমার আর একটা পরিচয় আমি পুলিশের এক জন ইনফরমার । ” সাত্যকি, “তোর চাল চলন দেখে আর কথা বার্তা শুনে আমার একটু ডাউট হয়েছিল যে তুই পুলিশের এক জন ইনফরমার আজ সেটা পরিষ্কার হলো। ” সৌরকর, “এর আগে আমি আমার পরিচয় কারোকে দেই নি। এই প্রথম আপনাকে দিলাম।” সাত্যকি, “কেনো ?” সৌরকর, ” বারণ আছে ।” সাত্যকি, “তাও তো পুরোটা দিলি না। ” সৌরকর, ” দেবো, একটু ধৈর্য্য ধরুন। “
শ্রুণিতার বাবার বন্ধু কিছুটা সুস্থ হয়েছে।পুরোপুরি সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ী ফিরে আসতে এখনো সময় লাগবে। শ্রুণিতার ট্রিটমেন্ট চলছে। ডাক্তার বাবুরা অক্লান্ত পরিশ্রম ও তাদের মেধা খাটিয়ে চেষ্টা করছেন ওকে সুস্থ করে তুলতে । সাত্যকি রঞ্জন মাঝে মাঝে হাসপাতালে নিয়ে দেখে আসেন আর খোঁজখবর নিয়ে আসেন। ওনি অনেক আশা করেন মেয়েটা যাতে সুস্থ হয়ে বাড়ী ফিরতে পারে । মাঝে মাঝে ওনি এই মেয়েটিকেই নিজের মেয়ে বলে ভেবে ফেলছেন । এই মেয়েটিকে আপন করে নেবার জন্য ওনার মন ছটফট করছে সারাক্ষণ। ওনি জানেন না এটা কি শুধুই একটা ভ্রম না কি এর পিছনে কিছু সত্যতা আছে। মেয়েটির আঙুলের আংটিটা ওনাকে এই রকম ভাবতে উৎসাহ যোগায়। মা মরা মেয়েটা সেই একটু খানি বয়স থেকে সে তার বাবার গায়ের সঙ্গে লেপ্টে থাকতো। বাবা যেমন মেয়েকে ভালোবাসতো মেয়েও তেমনি বাবাকে ভালোবাসতো। বাবা ছাড়া ও কিছু বুঝতো না। বাবা তার কাছে ছিল প্রাণ ভোমরা। সেই মেয়ে হারিয়ে গিয়ে মেয়ে যেমন পিতৃ শোকে হাহাকার করে দিন কাটাচ্ছে তেমনি বাবাও ভগ্ন হৃদয়ে ধুকতে ধুকতে বেঁচে আছেন বিষাদময় জীবন নিয়ে । এ যেন কোন অভিশাপের খাঁড়া ঝুলছে মাথার উপর। শ্রুণিতার আবছা আবছা মনে পরে যে তার বাবা পুলিশে চাকরি করে কিন্তু বাবার এই পরিচয়ের কথা সে কারোকে বলে নি এমন কি সৌরকরকেও না । সাত্যকি রঞ্জনকে সৌরকর চিনতো এক জন পুলিশ অফিসার হিসাবে কিন্তু শ্রুণিতার বাবার পরিচয়ে চিনতো কিনা সেটা শ্রুণিতা জানে না । সৌরকরও এ বিষয়ে শ্রুণিতাকে কিছু বলেনি কখনো । তবে সৌরকর এটা জানতো যে শ্রুণিতার পালক বাবা মা ছিলেন নিঃসন্তান। ওনাদের নিজেদের কোন সন্তান ছিল না। ওনারা ওকে কুড়িয়ে পেয়েছিল একটা রেল স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে। এই কেসের তদন্ত অফিসার সাত্যকি রঞ্জন কালার সামনে অনেক গুলো অপশন চলে আসে। এই কেসের রহস্য উদ্ঘাটন করতে হলে এই সব কটা অপশনের সমাধান তাকে করতে হবে । স্বাবাভিক ভাবেই তার দায়িত্ব এখন বহু গুণ বেড়ে গেছে। সত্যকি রঞ্জনের মনে হয় সৌরকরের বিষয়ে কিছু খোঁজখবর নেওয়া প্রয়োজন । তাই তিনি তার দুজন সাবোর্ডিনেড স্টাফকে সঙ্গে নিয়ে সৌরকরের পাড়ায় যান ইনকোয়ারি করার জন্য। সেই ইনকোয়ারি থেকে তিনি জানতে পারেন যে সৌরকর এক জন পুলিশের ইনফরমার। মোটামুটি ভালো চরিত্র। সেরকম অবৈধ কোন কাজ কর্মের সাথে যুক্ত থাকার রেকর্ড নেই ওর নামে । জানা যায় সৌরকরের বাবা মুসলিম আর মা হিন্দু। কিন্তু ভিন্ন ধর্মে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবার জন্য কোন পারিবারিক সমস্যা ছিল না ওদের পরিবারের মধ্যে। যে যার মত করে ধর্ম পালন করতে পারতেন এই পরিবারের সকলে। একে অপরের ধর্মের উপর সম্মান দেখাতেন। সৌরকরের বাবা আব্বাজ আলী এক জন আদর্শবাদী মানুষ। পাড়ায় খুব একটা মেলামেশা করতেন না। ওনার ছেলে সৌরকরও পাড়ায় মিশতো না । ওনি একটু একরোখা গোছের মানুষ। অন্যায়ের সাথে আপস করতে পারেন না। ওনার সম্মন্ধেও কোন অবৈধ কাজ কর্মের সাথে লিপ্ত থাকার কোন অভিযোগ পাওয়া যায় নি ওনার প্রতিবেশীদের কাছ থেকে। শ্রুণিতার বাবার বন্ধু আর একটু সুস্থ হবার পর এক দিন সাত্যকি রঞ্জন হাসপাতালে যান ওনার সাথে কথা বলতে। সাত্যকি, ” আমি ইন্সপেক্টর সাত্যকি রঞ্জন কালা। আমি শ্রুণিতা কেসের তদন্তকারী অফিসার। তদন্তের স্বার্থে আমি আপনার কাছে কয়েকটা বিষয়ে জানতে চাইবো। আশা করি আপনি আমাকে সাহায্য করবেন । আপনার নামটা বলুন প্লিজ ।” “আমার নাম নীলাঞ্জন ব্যাপারী।” সাত্যকি, “আপনি কি করেন ?” নীলাঞ্জন, “আমি একটা স্কুলে চাকরি করতাম। ল্যাবের টিচার ছিলাম। এখন রিটায়ার করে গেছি।” সাত্যকি, “আপনি এই কেসের সাথে জড়ালেন কিভাবে ? ” নীলাঞ্জন, ” সে অনেক কথা। আমার আজ আর ভয় ডর কিছু নেই। আজ আমি সব বলে দেবো। তারপর আমার কপালে যা আছে তা হবে। শ্রুণিতার বাবা শ্রেয়াণ আমার বিশেষ বন্ধু। দীর্ঘ কাল ধরে আমরা এক সঙ্গে আছি । ওনার মেয়ে শ্রুণিতা আধা হিন্দু আধা মুসলিম পরিবারের একটি ছেলেকে ভালোবেসেছে। ছেলেটি খুব ভালো। সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। শ্রুণিতা মাঝখানে একটা ড্রাগ ৱ্যাকেটের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল । শ্রুণিতার এই বিষয়টা ওর বাবা ও সৌরকরের বাবা আব্বাজ আলী কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। আব্বাজ আলী চাইতেন ওনার ছেলের সঙ্গে মেয়েটির মেলামেশা যেন বন্ধ হয়ে যায়। মেয়েটি যেন ওনার ছেলের জীবন থেকে দূরে সরে যায়। তিনি মাঝে মাঝে হুমকি দিতেন যে যদি শ্রুণিতা ওনার ছেলে সৌরকরকে ছেড়ে না যায় তবে তিনি শ্রুণিতা ও তার বাবাকে মার্ডার করিয়ে দেবেন। এর মধ্যে এক দিন আমরা খবর পাই যে ওনার ছেলে সৌরকর শ্রুণিতাকে নিয়ে বাগুইআটির কাছাকাছি হেলাবট তলা নামক একটা জায়গায় একটা গোডাউনে গেছে। ওনি কয়েক জন সুপারি কিলারকে নিয়ে গিয়ে ঐ গোডাউনের মধ্যে শ্রুণিতাকে মার্ডার করে দেবেন। এই খবর পেয়ে আমি আর শ্রেয়াণ সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পরি বাড়ী ঘর ফেলে রেখে । ঐ গোডাউনটা খুঁজে পেতে আমাদের বেশ সময় লেগে যায়। আমরা ওখানে গিয়ে দেখি শ্রুণিতা তখনো এসে পৌঁছায় নি । আমরা ওখানে যেতেই কয়েক জন লোক আমাদের উপর চড়াও হয়। আমাদেরকে লক্ষ করে এলোপাথারি ভোজালি চালাতে থাকে। ওরা সংখ্যায় পাঁচ ছয় জনের মত ছিল। ভোজালীর আঘাতে শ্রেয়াণ স্পট ডেড হয়ে যায়। আমি গুরুতর আহত হয়ে মরার মত পরে থাকি। গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বের করার মত শক্তি আমার শরীরে অবশিষ্ট ছিল না। ওরা ভেবে নেয় যে আমিও মরে গেছি। ওরা তখন ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। একটু বাদে শ্রুণিতা ও সৌরকর ওখানে এসে পৌঁছায়। ওরা আবার ফিরে এসে শ্রুণিতাকে আক্রমণ করে। শ্রুণিতা গুরুতর আঘাত পেয়ে নুইয়ে পড়লে ওরা পালিয়ে যায়। ” সাত্যকি, “ঠিক আছে। আজ এখানেই থাক। প্রয়োজন হলে আবার আসবো। ” নীলাঞ্জন, “ঠিক আছে স্যার। আমি আপনার সাথে আছি।” যখন যা প্রয়োজন হবে আমি সব বলে দেবো।
পরের দিন ইন্সপেক্টর সাত্যকি রঞ্জন কালা আব্বাজ আলীর সন্ধানে বের হয়ে শ্যামপুকুর অঞ্চলের সরু গলির ভিতর ওনার বাড়ীর সামনে গিয়ে পুলিশের গাড়িটা দাঁড় করান। বাড়ীতে কেউ আছে বলে বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে না। প্রত্যেকটা দরজায় গোদরেজর লক আছে কিন্তু সেই লক গুলো সব খোলা, দরজার পাল্লা গুলো সব হাট করে খোলা আছে । খোলা আছে ঘরের জানলা গুলোর পাল্লাও । বাইরে থেকে ঘরের ভিতর সব কিছু দেখা যাচ্ছে । বাড়ীর মেইন গেটের দরজায় একট লক আছে আর একটা হ্যাস বোল্ট আছে। এই দরজাটা লক করা আছে কিন্তু হ্যাস বোল্টে তালা আটকানো নেই । ঘরের ভিতর ঢুকতে গেলে এই মেইন গেটের লক খুলতে হবে । বার বার কয়েক বার ডোর বেল বাজানো হলো কিন্তু কেউ এক জন এসে দেখা করে কিছু বললো না। কেউ ঘরের ভিতরে আছে বলে মনে হচ্ছে না। অতঃপর পুলিশ বাইরের দিকে মেইন গেটের লকটা ভেঙে ভিতরে ঢুকে যায়। ভিতরে ঢুকে কথা বলার মত কারোকে খুঁজে পায় না পুলিশ। সারা বাড়ীতে এক জন মানুষও নেই। মানুষ বলতে তো দুজন আব্বাজ আলী আর ওনার মিসেস শুভ্রা আলী। আর ওনাদের একমাত্র ছেলে সৌরকর তো এখন পুলিশের হেপাজতে আছে। সবাই বাড়ী ছেড়ে কোথায় চলে গেছে ? দরজা জানলা বন্ধ করার ধরণ দেখে মনে হয় বাড়ীর কাছাকাছি কোথায়ও গেছে। কিন্তু সেটাই যে সঠিক সে কথা হলপ করে বলা মুশকিল আছে । কারণ পুলিশকে বিভ্রান্ত করার জন্যও এই পথ অনুসরণ করা হয়ে থাকতে পারে। শুধু বাড়ীটা পরে আছে একা ফাঁকা। ঘরের জিনিস পত্তর এস এটিস পরে আছে যেখানে যেটা থাকে। কোন রকম নড়াচড়া করার চিহ্ন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। মেইন গেটের হ্যাস বোল্টটা তালা দিয়ে আটকে রেখে পুলিশ ঐ বাড়ী থেকে বেরিয়ে আসে। পুলিশ আশেপাশের বাড়ীর লোকদের কাছে খোঁজ করে জানতে চায় যে আব্বাজ আলী ও ওনার মিসেস শুভ্রা কোথায় গেছে। প্রতিবেশীরা যদি কেউ কিছু সন্ধান দিতে পারেন । কিন্তু প্রতিবেশীরা বলেন যে না ওনারা কিছু জানেন না। তবে এলাকার সবারই ধারণা যে আব্বাজ আলী একজন ভালো মানুষ। যে কেউ ওনার কাছে সাহায্যের জন্য গেলে উনি তাকে সাধ্য মত সাহায্য করেন। আব্বাজ আলীকে নিয়ে পুলিশের মধ্যে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। নানা প্রশ্ন ঘুরপাঁক খাচ্ছে মাথার মধ্যে । একবার মনে হচ্ছে আব্বাজ আলী সত্যি সত্যিই একজন ভালো মানুষ আবার মনে হচ্ছে না তিনি ভয়ঙ্কর এক জন দুষ্কৃতী। এলাকার মানুষ হয়তো ওনাকে চিনতে ভুল করেছে। হয়তো আব্বাজ আলী এক জন গভীর জলের খেলোয়াড়। লোকাল মানুষ হয়তো ওনাকে চিনতে পারেনি বা ওনার আসল পরিচয়ের হদিস পায় নি কোন দিন । ওনাকে নিয়ে নানা রহস্য দানা বাঁধছে। কি করে যে এই রহস্যের কিনারা খুঁজে বের করতে পারা যাবে সেটাই এখন পুলিশের কাছে সব থেকে বড় প্রশ্ন। পুলিশ থানায় ফিরে এসে সৌরকরকে লক আপ থেকে বের করে আনে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য। সাত্যকি, “হ্যাঁরে সৌরকর তোর বাবা মা এখন কোথায় আছে তুই জানিস ?” সৌরকর, “স্যার এই মুহূর্তে আমার সঙ্গে আমার বাবা মায়ের কোন যোগাযোগ নেই। তাই আমি বলতে পারবো না যে ওনারা এখন কোথায় আছেন। আমার মোবাইলটাও তো আপনার কাছে রাখা আছে। ওনাদের সাথে আমার কোন রকম যোগাযোগ নেই। ” সাত্যকি, “তাহলে কে তোর বাবা মায়ের সন্ধান দিতে পারবে ?” সৌরকর, “স্যার জানি না। এই মুহূর্তে কারো নাম আমার মাথায় আসছে না । আর বাবা মা কোথায় গিয়ে বসে আছেন সেটা আমি এখানে বসে বলতে পারবো না।” সাত্যকি,” তোকে তোদের বাড়ী নিয়ে গেলে বলতে পারবি ? ” সৌরকর, ” না স্যার,বাবা মায়ের কথা না জানলে আমি কেমন করে বলবো। ” সাত্যকি, “এই নে তোর মোবাইল ফোন। তুই তোর বাবাকে বা মাকে ফোন লাগা। জিজ্ঞেস করে জান যে ওনারা এখন কোথায় আছেন। ” সৌরকর মায়ের ফোনে কল করে কিন্তু মায়ের ফোন নট রিচেবল বলছে। বিফল হয়ে সাত্যকি রঞ্জন সৌরকরকে আবার লক আপে ঢুকিযে দিয়ে হতাশ হয়ে কপালে হাত দিয়ে বসে পড়েন। টেবিলে মাথা ঠুকতে থাকেন। তিনি ভাবতে থাকেন এরপর কিভাবে এগোবেন। কেসটা তো আর ডিসমিস করে দেওয়া যাবে না। ফয়সাল্লা একটা করতেই হবে। অপরাধী যত গভীর জলেই থাকুক আর যত চতুরই হোক না কেনো তাকে পুলিশের জালে ধরা পড়তেই হবে। অপরাধ করলে শাস্তি পেতে হবে। এটাই সত্য।
সাত্যকি, ” মুষড়ে যাওয়া যাবে কিন্তু ভেঙে পড়া যাবে না কোন ভাবেই। তাহলে সাধারণ মানুষের আস্তা হারিয়ে যাবে পুলিশের উপর থেকে।” তিনি সাবইন্সপেক্টর ইকবালকে বললেন সৌরকরের কাছে থেকে ওর বাবার মোবাইল নাম্বার চেয়ে নিয়ে তার কল লিস্ট বের করে আনতে। ইকবাল দ্রুত আব্বাজ আলীর মোবাইলের কল লিস্ট বের করে নিয়ে আসে। সেই কল লিস্টে অনেক গুলো নাম্বার আছে যাদের সঙ্গে আব্বাজ আলী এই কয় দিনে বহু বার যোগাযোগ করেছেন। তবে একটা নাম্বারে বেশ কয়েক বার কথা বলেছেন তিনি । সেই নাম্বারটা ট্র্যাক করলে ট্রু কলারে নাম দেখাচ্ছে রাঘভ যাদব। সাত্যকি রঞ্জন বুঝতে পেরে যান যে এই নাম্বারটা সেই ট্যাক্সি ড্রাইভারের। যে ট্যাক্সি ড্রাইভার শ্রুণিতাদের ঐ গোডাউনে নিয়ে গিয়েছিল। সাত্যকি রঞ্জন কাস্টমার সেজে রাঘভ যাদবকে বুক করেন। পুলিশের টিমের লোকেরা সিভিল ড্রেসে রেডি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে । রাঘভ যাদব গাড়ি নিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের টিমের লোকেরা ঘিরে ফেলে ঝাঁপিয়ে পরে রাঘভ যাদবকে আটক করে । রাঘভ, “স্যার আমি কি করেছি যে আমাকে অ্যারেস্ট করলেন ? “সাত্যকি, “তুই আগে বল যে তুই কি করিস নি। সব ঠিকঠাক বলবি, না হলে ঐ যে যে ডান্ডাটা দেখছিস ওটা তোর পিঠের শিরদাঁড়া এমন ভাবে গুঁড়ো গুঁড়ো করে দেবে যে এক্সরে মেশিনও খুঁজে পাবে না তোর শিরদাঁড়ার গুঁড়ো গুলোর অস্তিত্ব ।” রাঘভ, “স্যার আমি কিছু করিনি। আমাকে ছেড়ে দিন প্লিজ। ” পুলিশ, আমরা কি বলেছি যে তুই কিছু করেছিস। তুই করিস নি তো ঠিক আছে। যে করেছে তার নামটা তুই বলে দে। ” রাঘভ, “স্যার আমি জানি না তো কি করে নাম বলবো। ” পুলিশ, “তাহলে তোর খবর আছে। ঐ যে ঐ ডান্ডাতাকে দেখতে পাচ্ছিস তো ? ” রাঘভ, “স্যার ওটা দিয়ে মারলে তো আমি মরে যাবো। ” পুলিশ, “তুই যদি অপরাধীকে বাঁচাতে চাস তো নিজে মরবি। তোর মৃত্যু কে আটকাবে ? ” রাঘভ, “স্যার আমি অপরাধীকে চিনি না তো বাঁচাবো কিভাবে ? পুলিশ, “তুই কি আমাদের সঙ্গে মস্করা করছিস ? আমরা কি তোর ইয়ারের দোস্ত ?” রাঘভ, ” স্যার আমি ঐ সব কিছু বলছি না। ” পুলিশ, “তুই আব্বাজ আলীকে চিনিস ? ” রাঘভ, “না স্যার। কে আব্বাজ আলী ?”পুলিশ,” তুই মনে হয় আকাশ থেকে পড়লি ? “এখনো সময় আছে। মনে করে সব বল দে । বলে দিলে তুই নিজের পায়ে হেঁটে বাড়ী যেতে পারবি। তুই দিনে কয় বার করে ফোনে কথা বলিস আব্বাজ আলীর সঙ্গে ? ” রাঘভ, “স্যার আব্বাজ আলীর ফোন নাম্বার আমার কাছে নেই। ” পুলিশ, তোর মোবাইল বের কর। দেখি আব্বাজ আলীর ফোন নাম্বার তোর মোবাইলে আছে কি নেই। হাবিলদার ওর পায়ে দড়ি বেঁধে উল্টো করে ঝোলা,না হলে ও সত্য কথা বলবে না ” রাঘভ, স্যার স্যার বলছি স্যার বলছি। ” পুলিশ, “ঠিক আছে বল। ” রাঘভ, ” আব্বাজ আলী আমার ভগ্নিপতি স্যার । কেন স্যার ও কি করেছে ? “পুলিশ “কি করেছে ? তুই মনে হচ্ছে কিছুই জানিস না ?” তুই কি ভাজা মাছ কিভাবে উল্টে খেতে হয় সেটাও জানিস না ? কত আর চালাকি করবি ? তুই কি আমাদের উদুরপুর খিদিরপুর ভাবিস ? তুই ধরা পরে গেছিস। বাঁচতে চাস তো আব্বাজ আলী কোথায় আছে বলে দে। নাহলে ফাঁসির হাত থেকে তোকে কেউ বাঁচাতে পারবে না। ” রাঘভ,” স্যার আমি কি করিছি আর আব্বাজ আলীই বা কি করেছে সেটাই তো জানিনা। ” পুলিশ, “শ্রেয়াণকে খুন করেছে কে ? নীলাঞ্জন আর শ্রুণিতাকে কে মার্ডার করেছে কে ? ” রাঘভ, ” স্যার মার্ডার ? পুলিশ, ” কেন ? তুই মনে হয় কিছুই জানিস না ? ধোঁওয়া তুলসী পাতা ? “আব্বাজ আলী এখন কোথায় আছে ?” রাঘভ, “স্যার ওরা কয় দিনের জন্য উ পি তে গেছে। জমিজমা নিয়ে গন্ডগোল হচ্ছে সেটা মিটমাট করতে।” পুলিশ, ” কি মনে হচ্ছে ?” রাঘভ, “মনে হচ্ছে আমি একটা বলীর পাঠা। আমাকে বলি দেবার জন্য ছুড়িতে সান দেওয়া হচ্ছে আর আমাকে বলা হচ্ছে সাজগোজ করতে । ” পুলিশ, “তোর মোবাইলটা দে আর উত্তর প্রদেশের ঠিকানা দে। তোর মোবাইলটা তোর কাছে থাকলে তুই সব খবর পাচার করে দিবি। “
থার্ড ডিগ্রি দিতেই পুলিশ রাঘভ যাদবের কাছ থেকে উত্তর প্রদেশের ঠিকানা পেয়ে যায়। আঁধার কার্ডের ফটো কপিও পেয়ে যায়।
কলকাতা পুলিশ টিম নিয়ে উত্তর প্রদেশের গাজীপুর যায় তল্লাশি চালাতে। হাতে সার্চ ওয়ারেন্ট আর গ্রেপ্তারি ওয়ারেন্ট আছে । গাজীপুর গিয়ে ওখানকার স্থানীয় থানায় যোগাযোগ করে। গাজীপুর পুলিশের সাহায্যে একটা প্ল্যান তৈরি করে। সেই প্ল্যান অনুযায়ী ভোর রাতে আব্বাজ আলীর গ্রামের বাড়ী তল্লাশি চালাবার জন্য ঘেরাও করে পুলিশ। কিন্তু আব্বাজ অলীকে ওখানে পায় না। ওর ভাই ফিরোজ আলী বলে বড় ভাই আজ সন্ধ্যা বেলা কলকাতা ফিরে গেছে। ট্রেনের নাম জেনে রেল পুলিশের সাহায্যে প্যাসাঞ্জের লিস্ট দেখে পুলিশ জানতে পেরে যায় যে আব্বাজ আলী ও ওনার স্ত্রী শুভ্রা আলী কোন কম্পার্টমেন্টে আছে। সিট্ নাম্বারও পেয়ে যায় । সেই অনুযায়ী রেলের টিটিইর (Travelling Ticket Examiner ) সাহায্য নিয়ে পুলিশ আব্বাজ আলীর কাছে পৌঁছে যায়। রাতের অন্ধকারে আব্বাজ আলী কম্বল মুড়ি দিয়ে নিশ্চিন্তে বিভোর হয়ে ঘুমাচ্ছিল। পুলিশ কাছে গিয়ে ডাক দিতে আব্বাজ আলী ধড়ফড় করে উঠে বসে। পুলিশ ইন্সপেক্টর সাত্যকি রঞ্জন কালাকে দেখে আব্বাজ আলী ভড়কে যায়। কাঁপতে থাকে ঠক ঠক করে। সাত্যকি রঞ্জন, “তাহলে পালিয়ে বাঁচতে পারলি না। ইউ আর আন্ডার আরেস্ট আব্বাজ আলী। অনেক দৌড় করিয়েছিস বাঁচাধন। চল এবার মামা বাড়ী চল। মামা বাড়ীর দুত ভাত খাবি আর আদর খাবি। দেখবি কি মজা।” আব্বাজ আলী, ” স্যার আমি এক জন সম্মানীয় ব্যক্তি। আপনারা আমার সঙ্গে এই ভাবে কথা বলতে পারেন না। ” পুলিশ, “তোকে ফুল চন্দন দিয়ে বরণ করতে হবে ? তুই যদি সম্মানীয় ব্যক্তি হস তবে খুনি সাম্রাজ্যর সম্রাট কে ?” আব্বাজ আলী,” আমি কোন অপরাধ করিনি স্যার। ” পুলিশ, “তুই থানায় চল তারপর দেখছি তুই অপরাধ করেছিস কি করিস নি।” পুলিশ ওকে নিয়ে থানায় এসে লক আপে ঢুকিয়ে দেয়। ও ওর পাশের লক আপে রাঘভকে দেখে ঘাবড়ে যায়। তখন আব্বাজী আলী বুঝে ফেলে যে ওর দেশের বাড়ীর ঠিকানা এই রাঘভই পুলিশকে দিয়েছে। আব্বাজ আলী তখনো জানে যে তার ছেলে সৌরকরও পুলিশ লক আপে আছে। ইন্সপেক্টর সাত্যকি রঞ্জনের মাথায় বার বার ঘুরে ঘুরে আসে,” লাল শাড়িটা, রক্তের দাগ সব মিথ্যা। না না নির্মম হলেও সত্য। ” আর তখনই ওনার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। দাঁত কিড়মিড় করে। হাতের আঙ্গুল মুষ্টি বদ্ধ হয়ে যায়। তখন তিনি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন যে সেই পাষণ্ড নর পিশাচকে তার উপযুক্ত শাস্তি দিতেই হবে। ওনার মাঝে মাঝে মনে হয় যে ওনি উর্দি পড়া শুধুই এক জন পুলিশ। এর বাইরে ওনার আর কোন পরিচয় নেই। ওনি সন্তানের জন্ম দিয়েছেন কিন্তু বাবা হয়ে উঠতে পারেন নি। বাবা হয়ে ওঠার জন্য ওনাকে মেয়ের এই অপরাধীকে কঠোর শাস্তি দিতেই হবে। বাবা হবার সাফল্য অর্জন করার জন্য ওনাকে এটা করতেই হবে। সঙ্গে সঙ্গে সাত্যকি রঞ্জন ছুটে যান পুলিশ লক আপে। হাবিলদারকে বলেন আব্বাজ আলীকে বার করে আনতে। সাত্যকি,”তুই শ্রেয়াণকে খুন করলি কেনো ? “আব্বাজ,” আমি শ্রেয়াণকে খুন করিনি। এটা আপনার ভুল ইনফরমেশন। ” সত্যিকি, “তাহলে ওকে কে খুন করেছে ? ” আব্বাজ, “সেটা আমি কি করে বলবো ? আপনি তদন্ত করে বার করুন। তবে আপনি শ্রেয়াণের স্ত্রী শানায়াকে জেরা করে দেখতে পারেন।” সাত্যকি,” তুই চিনিস শানায়াকে ? “আব্বাজ, ” চিনি না আবার! উনি এক জন এক নাম্বারের পার্ভার্টেড মহিলা।” সাত্যকি, ” তুই জানলি কি করে ? “আব্বাজ,” জানি, ও আর আমি একই কলেজে পড়তাম। ও আমার থেকে দু বছরের জুনিয়র ছিল । কলকাতায় একটা হোস্টেলে থেকে ও পড়াশোনা করতো। তখন থেকে ও আমার চেনা । তবে আমি ওর চারিত্রিক ত্রুটির জন্য ওকে এড়িয়ে চলতাম। শুনতাম বিয়ের আগে ও ৫০৫, পার্ক স্ট্রিটের একটা দশ তলা বিল্ডিং এর আট তলায় একটা রুমে এসকর্ট সার্ভিস নিতে যেতো। ওটা ছিল ওর নেশা। এমন কি বিয়ের পরেও ও ওটা চালিয়ে গেছে। এই নিয়ে শ্রেয়াণের সঙ্গে ওর মাঝে মাঝেই ঝগড়া অশান্তি হতো।” সাত্যকি, ” আমার তদন্তে তুই আসামি। ” আব্বাজ, ” এটা আপনার পুরোপুরি ভুল ” সাত্যকি, ” না ভুল না। ” সত্যকি, “তাহলে সত্যটা কি ?” আব্বাজ, “সত্যটা হলো আমি খুন কিরিনি ।”সাত্যকি,”তুই কি আমার সাথে ফাজলামো করছিস ?” আব্বাজ, “না আমি ঠিকঠাক বলছি। আপনারা অবশ্যই কোথাও ভুল করছেন।” সাত্যকি, “তুই যদি ঠিকঠাক না বলিস তোর আঙুলের নক উপরে নেবো। “আব্বাজ,”সেটা হবে চরম অন্যায়।” সাত্যকি, “তাহলে ঐ দিন সন্ধ্যার পর ঐ গোডাউনে তুই গিয়েছিলিস কেনো ?”আব্বাজ,”আমি তো ঐদিন ঐ গোডাউনে যাই নি।” সাত্যকি,” তবে কে গিয়েছিল ? “আব্বাজ, “ড্রাগ ৱ্যাকেটের লোকেরা যেতে পারে। সেটা আপনি আমার ছেলে সৌরকরকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারবেন স্যার। সাত্যকি, “আচ্ছা ঐ গোডাউনটার মালিক কে?” আব্বাজ, ” স্যার ওটা আমার নামে ভাড়া । ” সাত্যকি “ওখানে কি হয় ?” আব্বাজ, “স্যার ওখানে একটা টিভি, ফ্রিজ ও কম্পিউটারের শো রুম হবে। ” সাত্যকি, “হাবিলদার সৌরিকর কে নিয়ে আয়। ” হাবিলদার সৌরকরকে লক আপ থেকে বার করে নিয়ে আসে। সাত্যকি, “সৌরকর খুনের দিন ঐ গোডাউনে কে কে এসেছিল ? ” সৌরকর, “স্যার ঐ দিন এসেছিল ড্রাগ ৱ্যাকেটের লোকেরা।” সাত্যকি, “এ কথা তুই প্রমান করতে পারবি ? “সৌরকর, হ্যাঁ স্যার। ঐ গোডাউনের পাশে একটা C C ক্যামেরা আছে। C C TV র ঐ দিনের ফুটেজ দেখলেই বোঝা যাবে স্যার। ” এই C C ক্যামেরার কথা উঠতেই তদন্তের একটা শক্তি শালী দিক খুলে যায়। এবার তদন্তে গতি আসবে। ঝড়ের গতিতে এগোবে তদন্ত।
পুলিশ ইন্সপেক্টর সাত্যকি রঞ্জন কিছু দিন পর আর একবার হাসপাতালে যান নীলাঞ্জন বাবুর কাছে বিবেকের তাড়নায়। সাত্যকি, “নীলাঞ্জন বাবু আপনি বিরক্ত হচ্ছেন না তো ? কিন্তু কি করবো বলুন তো ? এই কেসটার একটা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আমাকে এর তদন্ত প্রক্রিয়া চালিয়ে নিয়ে যেতেই হবে। আর এই তদন্তের স্বার্থে আমাকে বার বার আপনার কাছে আসতে হচ্ছে। “নীলাঞ্জন,”না স্যার এতে বিরক্ত হবার কিছু নেই। আমিও চাই এই কেসের অপরাধী ধরা পড়ুক এবং তার বিরল তম শাস্তি হউক। ” সাত্যকি, “আচ্ছা নীলাঞ্জন বাবু আপনার বন্ধু শ্রেয়াণ বাবু এই মেয়েটিকে পেলো কোথায় ? ” নীলাঞ্জন, ” শ্রেয়াণ ও ওর স্ত্রীর মুখে শোনা….শ্রেয়াণ এবং ওর স্ত্রী একবার হরিদ্বার বেড়াতে যাচ্ছিল। মাঝে একটা স্টেশনে ট্রেন পাঁচ মিনিট দাঁড়ায়। সেই সময় শ্রেয়াণ জল আনার জন্য প্ল্যাট ফর্মে নামে। তখন ও দেখে যে একটি ছোট্ট মেয়ে প্ল্যাট ফর্মে বসে কাঁদছে। ও স্টেশনে লোকেদের মুখে শুনলো যে এই মেয়েটি একটি হারানো মেয়ে। ট্রেনে এই মেয়েটিকে কোন একটা অপহরণ চক্র অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছিল হঠাৎ সামনে রেল পুলিশ পরে যাওয়ায় ওরা মেয়েটিকে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় নিরাপদে। তখন ও স্নেহ ভরে মেয়েটিকে কাছে টেনে নেয়। ট্রেনে ওর স্ত্রীর কাছে মেয়েটিকে নিয়ে যায়। ওর স্ত্রী মেয়েটিকে সস্নেহে আপন করে নেয়। ওরা থানার সাথে কথাবর্তা বলে আইন গত ভাবে মেয়েটিকে দত্তক নেয় । যেহেতু ওদের কোন সন্তান ছিল না তাই ওরা নিজের মেয়ের মত করে মেয়েটিকে লালন পালন করে। ওর নাম রাখে শ্রুণিতা। শ্রেয়াণের নামের সাথে মিলিয়ে। শ্রেয়াণ তখন বর্ধমানের একটা স্কুলে শিক্ষকতা করতো। মেয়েটি বর্ধমানেই ওদের কাছে বড় হতে থাকে। পরে মেয়েটি যখন উচ্চমাধ্যমিক স্তরে পড়াশুনা করে তখন ওরা কলকাতার ৫নং এ. কে. পাল লেনের এই বাড়ীটা কিনে এখানে এসে বসবাস করতে শুরু করে। মাঝে মাঝে কয় দিন এক সঙ্গে ছুটি পেলে বর্ধমানে দেশের বাড়ী যায় সময় কাটাতে ।” সাত্যকি, “আচ্ছা শ্রেয়াণ বাবুর সঙ্গে ওনার স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন ছিল ?” নীলাঞ্জন বাবু, ” প্রথম থেকে বহু বছর ওনাদের সম্পর্ক খুবই ভালো ছিল। কিন্তু শ্রুণিতা যখন কলেজে ভর্তি হয় তারপর থেকে ওদের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে । কলকাতায় আসার কিছু দিন পর থেকে শ্রেয়াণের স্ত্রী, শানায়া একটি পার্টির মহিলা সমতিতে যোগ দেয়। পার্টির লোকদের সাথে মেলামেশা শুরু করে। এটা শ্রেয়াণের পছন্দ ছিল না। শ্রেয়াণ বহু বার শানায়াকে বারণ করেছিল এই সব বন্ধ করার জন্য। কিন্তু তাতে কাজ হয় নি। আর একটা কথা আমি শ্রেয়াণের মুখে শুনে ছিলাম যে শানায়ার শারীরিক সক্ষমতা কমে গিয়েছিল। এই সব কারণে তিক্ততা বাড়তে বাড়তে এক সময় চরমে উঠে যায় । কারো প্রতি কারোর কোন রকম সহানুভূতি ছিল না। এই অবস্থায় এক ছাদের তলায় এক বিছানায় দুজন নির্বাক অপরিচিত নর নারীর মত শুয়ে থাকা ভীষণ বিরক্তি কর একটা বিষয় হয়ে যায় । তাই সমস্যা খুব বেড়ে যাওয়ায় ওরা মিউচুয়াল ডিভোর্স নিয়ে নেয়। ” সাত্যকি, ” শারীরিক সাক্ষমতার বিষয়টা ঠিক কি ?” নীলাঞ্জন, “সেটা ওনার ডাক্তার, গাইনোকোলোজিস্ট শিপ্রা ভট্টাচার্য বলতে পারবেন। ” সাত্যকি,” ডাক্তারের ফোন নাম্বার আছে আপনার কাছে
? ” নীলাঞ্জন, “না। তবে পঞ্জিকা ঘেটে পেয়ে যাবেন।”সাত্যকি,”এখন ওনি কোথায় আছেন ? ” নীলাঞ্জন, ” সঠিক জানি না তবে কোচবিহার চলে যেতে পারে শানায়ার বাপের বাড়ী ।” সাত্যকি রঞ্জন কালা বাড়ী গিয়ে পঞ্জিকা ঘেটে ডাক্তার শিপ্রা ভট্টাচাৰ্যর মোবাইল নাম্বার পেয়ে যান। ফোন করে নিজের পরিচয় দিয়ে এপয়েন্টমেন্ট করেন। নিদৃষ্ট দিনে নিদৃষ্ট টাইমে সাত্যকি ডাক্তার শিপ্রা ভট্টাচাৰ্যর চেম্বারে পৌঁছে যান। রিসিপশন রুমে বসে একটু অপেক্ষা করার পর সব পেসেন্ট চলে যায়। তারপর সাত্যকি রঞ্জন চেম্বারের দরজাটা সামান্য একটু ফাঁকা করে বলেন… “ম্যাডাম আসতে পারি ?” ডাক্তার শিপা ভট্টাচাৰ্য,” হ্যাঁ আসুন, বসুন । ” কি বিষয়ে কথা বলার জন্য আপনি আমার কাছে এসেছেন ? সাত্যকি,” মিসেস শানায়া আপনার পেসেন্ট। ওনার শারীরিক সমস্যার বিষয়ে কিছু কথা আপনার কাছে জানতে চাইছি।” শিপ্রা, “দেখুন কোন পেসেন্টের গোপন বিষয়ে কিছু জানানো অনৈতিক। এটা আমরা পারি না। পেশা গত কিছু বিধি নিষেধ আছে। তারপরও জানতে চাইলে ওয়ারেন্ট নিয়ে আসতে হয় । ” সাত্যকি,” কিন্তু ডাক্তার আমি তো মার্ডার কেসের ইনভেস্টিগেশন করতে এসেছি। ” শিপ্রা, “ঠিক আছে পুলিশকে তদন্তে সাহায্য করাও আমার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কি জানতে চান বলুন।”সাত্যকি, ” মিসেস শানায়া কোন শারীরিক সমস্যার ট্রিটমেন্ট করাতে আপনার কাছে এসেছিলেন ? ” শিপ্রা, “ওনার লিবিডো ছিল,মানে সেক্সচুয়াল ড্রাইভ কমে গিয়েছিল।” সাত্যকি, “আচ্ছা ম্যাডাম ওনাদের সন্তান না হবার কারণ কি ছিল ? আর ডেফিসিয়েন্সি কার দিক থেকে ছিল ? শিপ্রা,”ওনার হাসব্যান্ড মিস্টার শ্রেয়াণ প্রচুর স্মোকিং করতেন এবং উনি খুব স্ট্রেসে থাকতেন । প্রাইভেট টিউশন করতেন। প্রচুর ছাত্র ছাত্রী পড়ত ওনার কাছে।তাদের রেজাল্ট নিয়ে উনি সব সময় খুব চাপে থাকতেন। এই সব কারণে ওনার Azospermiya বা শুক্রাণুর সংখ্যা হ্রাস পেয়ে গিয়েছিল। শুক্রাণু গুলোর নড়াচড়া না Mobility ও কমে গিয়েছিল। তাই ওনাদের বাচ্চা আসতে পারেনি। ওনাদের এই একটাই দুঃখ ছিল। মিসেস শানায়ার কোন ডেফিসিয়েন্সি ছিল না। উনি নরমাল ছিলেন।” ইন্সপেক্টর সাত্যকি ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এসে একটা সিগারেট ধরায়। সিগারেটটায় একটা লম্বা টান মেরে এক রাশ ধোঁওয়া ছেড়ে গভীর ভাবে চিন্তায় ডুবে যায়। এক দিকে নিজের Azospermiya অন্য দিকে স্ত্রীর লিবিডো এই সবই প্রধান কারণ ছিল ওনাদের সেপারেশনের ? হতেও পারে। এই কারণে ডিভোর্স হয় না এটা জোর দিয়ে বলা মুশকিল। ইন্সপেক্টর সাত্যকি পা চালিয়ে ওখান থেকে থানায় চলে আসেন। কারণ C C T V র ফুটেজটা দেখতে হবে। এতো দিন পরে এই কেসটার তদন্ত নতুন মোর নিয়েছে। C C টিভির উপর ভরসা করে হয়তো খুঁজে পাওয়া যেতে পারে এই কেসের সমাধান সুত্র। সাত্যকি, “সাব ইন্সপেক্টর ইকবাল ঐ তারিখের C C ক্যামেরার ফুটেজটা নিয়ে আসুন তো দেখি। ” C C টিভির ফুটেজে অন্ধকারের মধ্যে কয়েক জন লোককে নড়াচড়া করতে দেখা যায়। জুম করলে ছবি গুলো একটু পরিষ্কার দেখায় কিন্তু ঐ লোক গুলোর মধ্যে আব্বাজ আলীকে দেখতে পাওয়া যায় না। এই লোক গুলোকে দেখা যাচ্ছে শ্রেয়াণ, তার বন্ধু নীলাঞ্জন ও মেয়ে শ্রুণিতাকে আঘাত করতে । ওদের হাতে ভোজালি। তাহলে আব্বাজ আলী কি সত্যিই নির্দোষ। তবে এই মার্ডার কেসে ওনার কোন ভূমিকা নেই সে কথা এখনই হলপ করে বলা যাবে না। ধৈর্য্য ধরে সতর্ক ভাবে আরও তদন্ত চালাতে হবে। এই কেসটা খুব সহজ কোন কেস না। আর সত্য তো সব সময় আড়ালেই থাকে। তাকে খুঁজে বার করা খুব জটিল কাজ। একটা একটা করে জট ছাড়িয়ে সত্যের কাছে পৌঁছাতে হয়। ইন্সপেক্টর সাত্যকির মনে পরে যায় যে মহাভারতে কৌরবদের পক্ষে যত জন রথী মহারথী যোগ দিয়েছিল তাদের প্রত্যেকের নিজের নিজের একটা স্বার্থ ছিল। কোন সামগ্রিক স্বার্থের প্রতি তাদের খুব বেশি আকর্ষণ ছিল না। যুদ্ধে কৌরবদেরকে জেতানোর থেকেও নিজেদের স্বার্থটাই তাদের কাছে বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কারো স্বার্থই অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি।এখানেও শ্রেয়াণদের কেসের সাথে যারা যুক্ত আছে তাদের প্রত্যেকেরই নিজিস্ব একটা স্বার্থ আছে । সেই স্বার্থের জন্যই হয়তো শ্রেয়াণদের উপর আঘাত করা হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কারো স্বার্থই সফল হবে না। সাত্যকি, ” এই লোক গুলো কারা ? তবে এরাই কি সেই ড্রাগ ৱ্যাকেটের লোক ?” এরাই খুন করেছে শ্রেয়াণকে ? এদের সন্ধান কি করে করা যাবে ? নিশ্চই সৌরকর বা আব্বাজ আলী কেউ এক জন এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে। হয়তো এই লোক গুলোকে দিয়ে আব্বাজ আলী শ্রেয়াণকে খুন করিয়েছে। এই লোক গুলোকে ধরার ফাঁদ পাততে হবে। সাত্যকি, “এই ড্রাগ ৱ্যাকেটের লোক গুলোর কাছে কি ভাবে পৌঁছানো যাবে ? ” সৌরকর, “স্যার ঐ কলেজের আশেপাশে ঘাপটি মেরে পরে থাকতে হবে কেয়কটা দিন । ওরা ঐ চত্বরেই ঘোরাঘুরি করে। ওখানে এসেই ছাত্রদের বধ করে। কয়েক দিন ঘাপটি মেরে পরে থাকলে এক দিন ঠিক দুটো একটা মাছ জালে আটকে যাবে। ব্যস তাকে ধরেই সবার সন্ধান পাওয়া যাবে। ” সাত্যকি, “তাহলে কাল থেকেই অপারেশন শুরু করতে হবে।” পুলিশ সিভিল ড্রেসে ঐ কলেজের আশেপাশে সতর্ক দৃষ্টি রেখে পড়ে থাকে কয় দিন । এক দিন যায়, দু দিন যায়, তিন দিনের পর চতুর্থ দিনে সৌরকরের ইশারায় একজনকে আটক করে পুলিশ। এক জনকে হাতে নাতে ড্রাগ সহ ধরে ফেলে পুলিশ। সৌরকর, “স্যার ও নতুন ছেলে। ওরা কাছ থেকে সব খবর পাওয়া যাবে না।” পুলিশ, “ওকে দিয়েই আমাদের কাজ উদ্ধার করতে হবে। “পুলিশ, “তোর নাম কি ?” ” স্যার আমার নাম শুখ রাম। ” পুলিশ, ” তুই কত দিন ধরে এই কাজ করছিস ? ” সুখ রাম,” স্যার তিন মাসের মত হবে। ” পুলিশ, “এই লাইনে এলি কেনো ? ” সুখ রাম, “স্যার কোন কাজ না পেয়ে শেষে এই লাইনে এসেছি। ” পুলিশ, “তোদের গ্যাংয়ে কত জন লোক আছে ? ” সুখ রাম, “স্যার আমি ঠিক জানি না। তবে ত্রিশ জনের মত হবে। ” বৈধ ভাবে রোজগার করার মত কাজ না পেয়ে দলে দলে সব এই লাইনে ভিড় করছে ইয়ং ছেলেরা। পুলিশ, “তোর তো বাঁচার রাস্তা নেই। তোর ফাঁসি হয়ে যাবে। “সুখ রাম,” স্যার “আমাকে ছেড়ে দিন। আমি বুঝতে পারিনি। আমি এই লাইনে থাকবো না। ” পুলিশ,”তোকে একটা কাজ করতে হবে। তাহলে তুই বাঁচতে পারবি। ” সুখ রাম, “কি কাজ স্যার ?” পুলিশ, “,তোদের গ্যাংয়ের সবার নাম এবং ডেরার ঠিকানা আমাদেরকে বলে দিতে হবে । এই সামান্য কাজ টুকু যদি তুই করতে পারিস তাহলে আমরা তোর শাস্তি অনেকটা কমিয়ে দিতে পারবো ।”সুখ রাম, “,স্যার সবার নাম তো আমি জানি না।” পুলিশ, “তোদের গ্যাং লিডার আর কয়েক জনের নাম বল। ” সুখ রাম,” স্যার আমাদের গ্যাং লিডার গনেশ পাইক। স্যার পাঁচ ছয় জনের নাম এই নিন। ” পুলিশ,” কি লিখেছিস… ন্যাড়া, ভ্যাবলা, হারু, রজ্জাব আর আরশাদ আলী। ” পুলিশ, “কাল তোকে নিয়ে আমরা তোদের ডেরায় যাবো। “সুখ রাম, “স্যার আমার টিমের লোকেরা আমাকে দেখতে পেলে মেরে ফেলবে। “পুলিশ, “আমরা আছি তোর কোন ভয় নেই। তোকে কেউ টাচ করতে পারবে না।” সুখ রাম ধরা পড়ার খবর ড্রাগ ৱ্যাকেটের সবার কাছে পৌঁছে যায় । তাই ওরা সবাই নিরাপদ দূরত্বে গা ঢাকা দিয়ে আছে। ওরা সতর্ক হয়ে গেছে এর মধ্যে আর কাজে বের হবে না।
শ্রুণিতার ট্রিটমেন্ট চলছে কিন্তু কোন পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে না। আদেও মেয়েটা ফিরবে কিনা কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। সাত্যকি বাবু বিবেকের দংশনে পরে গেছেন। তাই যত দিন মেয়েটা ট্রিটমেন্টে একটু সারা না দিচ্ছে তত দিন সাত্যকি বাবুকে বিবেকের তাড়নায় দৌড়ে বেড়াতে হবে । হঠাৎ করে সৌরকরের ঐ কথাটা, “আমি ওকে আড়াল করে রাখতে চেয়েছিলাম কিন্তু ওরা এসে পড়লো, আমি ওকে বাঁচাতে পারিনি,”মনে পড়ায় সাত্যকি বাবুর মাথা ঘুরে গেলো। তাহলে কি সবই মিথ্যা ? না না সব মিথ্যা না । ওরা কারা তাদেরকে তো খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তি দিতেই হবে। না হলে তো সাত্যকি বাবুর মন শান্ত হবে না। ওনার স্পষ্ট বক্তব্য এই নৃশংস হত্যার পিছনে যারা লুকিয়ে আছে আইনের আওতায় এনে তাদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এর মধ্যে শ্রেয়াণের পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট এসেছে পুলিশের কাছে। শুধু ভোজালি ব্যবহার করা হয় নি। বিষও প্রয়োগ করা হয়েছিল। ভিসেরা রিপোর্ট তো তাই বলছে। শ্রুণিতার ঠোঁটেও একই বিষের প্রমান পাওয়া গেছে। ওর ঠোঁট যেহেতু শুকিয়ে ছিল তাই বিষ থুতুর সঙ্গে মিশে পেটের ভিতর যেতে পারেনি। না হলে ওরও মৃত্যু নিশ্চিত ছিল। আর্সেনিক ট্রাই অক্সাইড বা অজৈব আর্সেনিক, যার প্রতিক Ss আর পারমাণবিক সংখ্যা 33 ব্যবহার করা হয়েছে । এই আর্সেনিক হলো প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত একটি অত্যন্ত বিষাক্ত ধূসর-সাদা উপধাতু বা অর্ধধাতু। এটি একটি অত্যন্ত বিষাক্ত অজৈব যৌগ, সাদা বা বর্ণহীন স্ফটিকাকার গুঁড়ো হিসাবে পাওয়া যায়। এটি চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিশেষ করে এক্কিউট প্রমাইলোসাইটিক লিউকোমিয়া ( APL ) নামক এক ধরণের ব্লাড ক্যান্সারের চিকিৎসায় শিরা পথে নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় ব্যবহার হয়। সতর্কতা : এটি শুধুমাত্র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কঠোর তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে।এই বিষ ক্রিয়ায়ই মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু কথা হলো এই বিষ ওরা পেলো কোথায়। ওদের কারো সঙ্গে কি তাহলে স্কুল বা কলেজের ল্যাবরেটরিতে কাজ করে এমন কারো সঙ্গে যোগাযোগ আছে ? স্কুল বা কলেজের সাথে যোগাযোগের আগে ঐ ন্যাড়া ভ্যাবলা আরশাদদের খুঁজে বের করতে হবে। তারপর ওদের থ্রু দিয়ে স্কুল কলেজের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। তার আগে শানায়ার সঙ্গে ওভার ফোনে কথা বলা দরকার। প্রয়োজন হলে ওকে কলকাতায় ডেকে এনে ইন্টারগেট করতে হবে। শ্রেয়াণের মোবাইল ঘেটে শানায়ার নাম্বার পাওয়া গেছে। সেই নাম্বারে কল করে দেখা যাক রেজাল্ট কি হয়। সাত্যকি, “সাব ইন্সপেক্টর ইকবাল এই নাম্বারে কল করুন তো। বলবেন থানা থেকে বলছি।”ইকবাল ঐ নাম্বারে ডায়াল করে।” ওপার থেকে এক ভদ্র মহিলার কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। ইকবাল, “আপনি শানায়া বলছেন ?
ভদ্র মহিলা,”হ্যাঁ বলছি , কিন্তু আপনি ? ” ইকবাল, “আমি কলকাতার একটা থানা থেকে সাব ইন্সপেক্টর ইকবাল বলছি।” সঙ্গে সঙ্গে শানায়ার গলার স্বরটা নরম হয়ে যায়। সেটা বয়স জনিত বা সম্পর্কের জটিলতার কারণে না কি পুলিশের কল বলে তা ঠিক বোঝা গেলো না। শানায়া, “কলকাতার থানা থেকে আমার কাছে কেনো ? ” ইকবাল, “আপনার প্রাক্তন স্বামী শ্রেয়াণ মার্ডার হয়েছে। তার তদন্ত চলছে। সেই কারণে আপনার কাছে কিছু জানার আছে। আশা করি তদন্তের স্বার্থে আপনি সহযোগিতা করবেন।” শানায়া, “কি খবর জানতে চান বলুন।” ইকবাল,” শ্রেয়াণ মার্ডার হয়ে গেছে শুনেছেন ? ” শানায়া, ” না এই প্রথম আপনার কাছে শুনলাম। ” ইকবাল, আপনার কেমন লাগছে ? ” কথাটা শুনে শানায়া একটু থমকে গেলেন তারপর বললেন, ” যে কোন মৃত্যুই বেদনার। তাই খারাপ লাগছে। ” ইকবাল, “কেমন মানুষ ছিলেন শ্রেয়াণ ? শানায়া,” ভালো, ভালো মানুষ ছিলেন।” ইকবাল, “তাহলে সেপারেশন নিলেন কেনো ?” শানায়া, “সে অন্য কথা। ” ইকবাল,” আপনি এক দিন কলকাতায় আসতে পারবেন ? ” শানায়া, “না, কলকাতায় আমার থাকার জায়গা নেই। তাছাড়া আর মায়া বাড়াতে চাই না।” ইকবাল, ” তাহলে আমরাই যাবো আপনার কাছে। ” তুফান এক্সপ্রেসে করে ইন্সপেক্টর সাত্যকি রঞ্জন কালা দু জন অ্যাসিস্ট্যান্টকে নিয়ে কোচবিহার রওনা দিলেন । এড্রেস খুঁজে বাড়ীর দরজায় কড়া নাড়েন সাত্যকি রঞ্জন কালা। দরজা খুলে পুলিশকে সামনাসামনি দেখে মুহূর্তে শানায়ার মুখটা রক্ত শূন্য হয়ে যায়। মনে হলো ভয় পেয়ে গেছেন। শানায়া, “আসুন ইন্সপেক্টর ভিতরে এসে বসুন।” সত্যকি, “আপনার বেশি সময় আমরা নষ্ট করবো না । আপনি সেপারেশন নিলেন কেনো ?” শানায়া, ” এক সময় আমার মনে হয়েছিল যে আমি ওঁর জন্য পারফেক্ট নই তাই আমি ছেড়ে চলে এসেছিলাম। এমন কি আমি খোরপোষও দাবি কিরিনি। ” আপনি লিবিডোর পেসেন্ট।” শানায়া অত্যন্ত রেগে যান। বলেন,” কি সব আপত্তিকর কথা বার্তা বলছেন। আপনারা এই সব কথা বলতে পারেন না এক জন ভদ্রমহিলাকে। ” সাত্যকি, “দেখুন আমি মার্ডার কেসের তদন্ত করতে এসেছি। আমাকে বিষয় গুলো পরিষ্কার করে জানতে হবে। ” শানায়া,” ঠিক আছে বলুন।” সাত্যকি, “সেই কারণেই কি আপনাদের সেপারেশন হয়ে যায় ? ” শানায়া, “দেখুন আমাদের সেপারেশনের মেইন কারণ পার্টি গত। সাত্যকি,” আচ্ছা আপনি কি শ্রেয়াণ বাবুর বন্ধু নীলাঞ্জন বাবুকে চেনেন ?” শানায়া একটা ঢোক গিলে,” হ্যাঁ চিনি তো কি হয়েছে ? ” শানায়ার উত্তর দেবার ভঙ্গিমায় কেমন একটা তিক্ততা ছিল বলে মনে হলো সাত্যকির । উত্তরটা দিয়েই শানায়া চোখটা নামিয়ে নেন। মুখটা শুকিয়ে যায়। তাকে বেশ বিমর্ষ দেখায়। তবে কি এর ভিতর কোন রহস্য লুকিয়ে আছে ? থাকতেও পারে। এমন কি প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়েও খুন করাতে পারেন মিসেস শানায়া । তবে কি নীলাঞ্জন বাবুর বিষয়ে একটু সাবধান হবার দরকার আছে ? সাত্যকি, ” মেয়ে কেমন আছে জানতে চাইবেন না ?” শানায়া, “ওখানকার কোন বিষয় নিয়ে আমি আর চিন্তা বাড়াতে চাই না। প্লিজ আমাকে যেতে দিন। আমি আসছি। ভবিষ্যতে আমাকে আর ডাকবেন না। ” শানায়া ওঠে চলে যায়। এতঃপর ইন্সপেক্টর সত্যকি ওনার বাড়ী থেকে বেরিয়ে কোচবিহার স্টেশনে চলে আসেন ট্রেন ধরার জন্য। ট্রেন স্টেশনে আসতে বেশ কয়েক ঘন্টা দেরি থাকায় সাত্যকি তার অ্যাসিস্ট্যান্টদের নিয়ে স্টেশনে যাবার পথে সাগর দীঘি, রাজবাড়ী, মদন মোহন মন্দির দেখে নেন। ট্রেনে করে কলকাতা আসার পথে ট্রেনের মধ্যে এক জনের সাথে আলাপ হয় সাত্যকির । নাম বলেন গণেশ পাইক। যেহেতু সাত্যকি সাদা পোষাকে ছিল তাই গনেশ ওকে চিনে উঠতে পারেনি। সঙ্গে সঙ্গে সাত্যকির মনে স্ট্রাইক করে যে সুখ রাম বলেছিল যে ওদের গ্যাং লিডারের নাম গনেশ পাইক। সাত্যকি ওকে বলে যে আমিও কলকাতায় একটা ড্রাগ ৱ্যাকেটের সঙ্গে যুক্ত আছি । গল্পের ছলে সাত্যকি ওর কাছ থেকে জেনে নেয় যে কোন কোন অঞ্চলে ওরা সাধারণত কাজ করে আর কোথায় ওরা থাকে। এক দিন ওদের ভাড়া বাড়ীতে গিয়ে দেখা করে আসবে বলেও কথা হয়। কলকাতা এসে ট্রেন থেকে নামার সময় সাত্যকি বলে, ” ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট । ঘুঘু দেখেছো কিন্তু ঘুঘুর ফাঁদ দেখোনি বাঁচাধন। তুমি ড্রাগ ৱ্যাকেটের গ্যাং লিডার আর আমি পুলিশ ইন্সপেক্টর সাত্যকি রঞ্জন কালা। “কোচবিহার গিয়ে উপরি পাওনা হলো গ্যাং লিডার গনেশ পাইককে গ্রেপ্তার করা। গনেশ পাইককে থানার লক আপে আটকে রাখা হয়। ইন্সপেক্টর সাত্যকি তিন জন অ্যাসিস্ট্যান্ট ও এক ভ্যান পুলিশ নিয়ে গনেশ পাইকের কথা মত ওদের ভাড়া বাড়ীর ডেরায় হানা দেয় গভীর রাতে। ডেরা থেকে তিন জনকে গ্রেপ্তার করা হয় । ডেরার লোকেরা জানতে পারে নি যে গনেশ পাইক ধরা পরে গেছে এবং পুলিশ ওর কাছ থেকে ওদের ডেরার ঠিকানা জেনে গেছে। রাঘভ যাদব ও আব্বাজ আলীকে শর্ত সাপেক্ষে জামিন দেওয়া হয়। বলে দেওয়া হয় যে যে কোন সময় ডাকলে থানায় এসে হাজিরা দিতে হবে। থানার পারমিশন ছাড়া যেন স্টেশন লিভ না করে। ইন্সপেক্টর সাত্যকি সাব ইন্সপেক্টর ইকবালকে ডেকে কড়া নির্দেশ দেন ড্রাগ ৱ্যাকেটের লোকদেরকে এমন মার মারতে হবে যাতে ওরা সব স্বীকার করতে বাধ্য হয় ।
যতক্ষণ সব স্বীকার না করবে ততক্ষণ ডান্ডা চলবে। গনেশ পাইক সহ সব কটা সকরেদকে পিছ মোরা করে হাত পা বাঁধা হয়। সাব ইন্সপেক্টর ইকবাল, “গনেশ তুই কত দিন ধরে এই কাজ করছিস ? ” “স্যার চার পাঁচ বছর হবে। “ইকবাল, “এর আগে তুই কি করতিস ?” “স্যার আমার একটা ইট বালি সিমেন্ট সাপ্লায়ের দোকান ছিল। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ফলে বর্তমান শাসক দলের লোকেরা আমার দোকান পাট ভেঙে দেয়। আমি ওদের হাতে পায়ে ধরে ছিলাম কিন্তু ওরা আমাকে ছাড়েনি। তারপর আমি কিছু দিন বেকার ছিলাম। অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু কাজ পাইনি। ঘরে বৌ, বাচ্চা, মা বাবা আছে। এতো গুলো পেট চালাতে পারছিলাম না। শেষে বাধ্য হয়ে এই লাইনে নেমে পড়ি। জানতাম এই কাজ অবৈধ কিন্তু কিছু করার ছিল না। বাঁচার তাগিদে সব কাজই আমার কাছে ন্যায় সংগত মনে হয়েছিল। পেটে যার ভাত নেই তার কাছে ন্যায় অন্যায় বলে কিছু থাকে না।” ইকবাল,” তুই কত দূর পড়াশোনা করেছিস ? ” “স্যার আমি বি এ পাশ করেছি। “
ইকবাল, “তাও একটা কাজ জোটাতে পারলি না? ” “না স্যার,পারলে আর এই কাজে
যোগ দিতাম না।” ইকবালের মনের মধ্যে দেশের প্রতি রাজ্যের প্রতি একরাস ঘৃণা বোধ সজাগ হয়ে জেগে ওঠে। সে ধিক্কার জানায় প্রচলিত এই ব্যবস্থাকে । সে আর জেরা করতে পারে না। বিষাদময় মন নিয়ে জেরা করার উৎসাহ সে হারিয়ে ফেলে। গম্ভীর হয়ে বসে থাকে । এক জন এক জন করে সব কজনকে সে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে কিন্তু সবারই একটাই কথা ভদ্র ভাবে বাঁচার কোন পথ না পেয়ে এই অন্যায় পথ বেছে নেওয়া। এই সব কথা শুনে থার্ড ডিগ্রি প্রয়োগ করার কথা মনে আসেনি।
আব্বাজ আলীকে আবার থানায় ডাক করা হয়। সাত্যকি, “আচ্ছা আব্বাজ সাহেব আপনি কি করে জানলেন যে মিসেস শানায়া এসকর্ট সার্ভিস নিতে পার্ক স্ট্রিট যেতেন। আপনার সঙ্গে কি ওনার ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল ? আব্বাজ আলী, “আমি তো আগেই বলেছি স্যার যে ওর চরিত্র ভালো ছিল না তাই আমি ওকে এড়িয়ে চলতাম। সেখানে ভালোবাসার সম্পর্ক তো দূরের কথা কোন সম্পর্কই ছিল না। ” সাত্যকি, “আপনার এই কথার প্রমান কোথায় ? ” আব্বাজ, “আপনি ঠিকানা নিয়ে পার্ক স্ট্রিট চলে যান প্রমান পেয়ে যাবেন। “ইন্সপেক্টর সত্যকি এক দিন দু জন অ্যাসিস্ট্যান্ট নিয়ে ৫০৫ পার্ক স্ট্রিট চলে যান। গিয়ে দেখেন কয়েক জন ছেলে মেয়ে কানে কেউবেকল লাগিয়ে বসে আছে। সাত্যকি, ” এখানকার ইনচার্জ কে আছেন ?” এক জন মধ্য বয়স্ক লোক উঠে আসেন। লোকটি, “আপনি কে ? আর আপনার কি চাই ? ” “আমি পুলিশ ইন্সপেক্টর সাত্যকি রঞ্জন কালা। আমি একটা মার্ডার কেসের ইনভেস্টিগেশন করতে এসেছি।” আমি নকুর চাড্ডা, এই অফিসের মালিক। আমি কি ভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি ? ” সাত্যকি, “এখানে কি কাজ হয় ? ” নকুর, “এটা একটা বি পি ও। “সাত্যকি, আর এসকর্ট সার্ভিস কোথায় হয় ? ” নকুর, “ঐ সব এখানে হয় না।”সাত্যকি,” আমি সব খবর নিয়ে এসেছি। মিথ্যা কথা বললে এই সেন্টারটা বন্ধ করে দেবো। ” নকুর, “আপনার কি খবর দরকার বলুন। আমি চেষ্টা করবো যথাযত উত্তর দেবার।” সাত্যকি, ” শানায়া নামে কোন ভদ্র মহিলা কি এখানে এসকর্ট সার্ভিস নিতে আসতো ? ” নকুর এসকর্ট সার্ভিসের রেকর্ড ঘেটে বলে ” হ্যাঁ স্যার এই নাম আমাদের রেজিস্টারে রেকর্ড আছে । প্রায় কুড়ি বছরের আগের রেকর্ডে এই নামটা দেখতে পেলাম । এরপর যদি আরও কিছু পাই আমি অবশ্যই আপনাকে জানাবো । ” সাত্যকি, “এসকর্ড সার্ভিস নিতে এসে যদি কোন মহিলা প্রেগন্যান্ট হয়ে যায় তখন আপনারা কি ব্যবস্থা নেন ? ” নকুর,” না স্যার সেই রকম সম্ভাবনা একদম নেই। আমাদের ছেলেরা স্ট্রং প্রটেকশন নিয়ে সার্ভিস দিয়ে থাকে। “সাত্যকি আবার আব্বাজকে ডেকে আনেন। ” সাত্যকি, ” আপনার কাকে সন্দেহ হয় ?” আব্বাজ আলী, ” আমি কারোকেই সন্দেহ করি না । তবে আমার মনে হয় ঐ ড্রাগ ৱ্যাকেটের লোকেরা কিম্বা মিসেস শানায়ার এই বিষয়ে হাত থাকতে পারে। আর সেটা তো আমি এর আগেই বলেছি। আপনি ওদেরকে জেরা করুন ওদের কাছ থেকে কোন একটা ক্লু পেলেও পেয়ে যেতে পারেন। যেটা আপনার তদন্তের কাজে সাহায্য করবে ।” আব্বাজ আলীর সঙ্গে চোখাচখি হতেই সাত্যকির চোখ দুটো বড় বড় হয়ে যায়। মনের মধ্যে দুশ্চিন্তার ঝড় বয়ে যেতে থাকে। সাত্যকি, “আপনি বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছেন। এর রহস্যটা কি একটু বলুন তো আব্বাজ সাহেব। ” আব্বাজ, “দেখুন আমি চেয়েছিলাম যে ঐ মেয়েটি আমার ছেলের জীবন থেকে নিজে নিজে সরে যাক তাতে আমার ছেলেটা সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারবে। সেটা হচ্ছিলো না। তাই আমি কোন সুপারি কিলারকে দিয়ে ওদের মার্ডার করিয়ে দেবার প্ল্যানও করেছিলাম। কিন্তু সেটা আমাকে করতে হলো না। তার আগেই কেউ একজন ওদের মেরে দিয়েছে। এতেই আমি ভীষণ খুশি। যেই খুন করুক না কেনো আমি তাকে আশীর্বাদ করেছি। খুনিকে বাঁচাবার জন্য মেয়েটির রক্তে ভেজা শাড়িটা আমি নিয়ে গিয়ে ওদের বাড়ীতে রেখে এসেছিলাম পুলিশকে বিভ্রান্ত করার জন্য। ” সাত্যকি, “খুনিকে বাঁচিয়ে আপনার লাভ কি ?” আব্বাজ, ” আমার কোন লাভ নেই। এই কাজ আমি উল্লাসে করেছিলাম আবেগ তাড়িত হয়ে । তবে এখন আমি আপনার সঙ্গে আছি খুনিকে ধরার তদন্ত প্রক্রিয়াকে সাহায্য করার জন্য। আমার যেটুকু যা বলার ছিল আমি তা বললাম এবার আপনি যা বোঝার বুঝবেন আর যা করার তা করবেন।” সাত্যকি বিরক্ত উপেক্ষা করে আব্বাজ আলীর দিকে এক বার তাকায় আর ভাবে এটা আব্বাজের কোন খেলা সেটা জানতে একটা রহস্যের জাল ছিড়তে হবে আর তার জন্য আরও কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে হবে । আবার মনে হয় আব্বাজ আলীর মাথায় কোন গন্ডগোল নেই তো ? এক বার ওনার স্ত্রী শুভ্রা দেবীর সঙ্গে কথা বলা দরকার। শাড়ির বিষয়টা যা বলছে সেটা হয়তো সত্য হতে পারে। সবাই রাতে বেশ শান্তিতে ঘুমাচ্ছে কিন্তু ঘুমাতে পারেছে না শুধু ইন্সপেক্টর সাত্যকি রঞ্জন কালা। মাঝে মাঝে হতাশায় ঘিরে গেলে ওনাকে। তখন ওনার মনে হয় এই কেসের সফলতা হয়তো অধরাই থেকে যাবে। ওনার চিন্তা ভাবনার কেন্দ্র বিন্দুতে এখন আব্বাজ আলী। ওনার স্ত্রী শুভ্রা দেবী ইন্সপেক্টর সাত্যকির সামনে এসে একটু অপ্রতিভ হয়ে পরেন। তিনি আপাত নিরহ কণ্ঠে জানালেন যে ওনার স্বামীর আর্থারাইটস এবং অষ্টিও আর্থরাইটিস আছে তার জন্য ওনার পেশিতে এবং পিঠে ব্যথা হয়। তাই উনি নিয়মিত মেফেনামিক আসিড ট্যাবলেট সেবন করেন। এই ট্যাবলেট খেয়ে ওনার পেট ব্যথা,পেট খারাপ লেগেই আছে, মাথা ঘোড়া, বমিবমি ভাব, গ্যাস অম্বল সব সময়ের সঙ্গী হয়ে গেছে। উল্টো পাল্টা কথা বলে। সুতরাং ওনার সব কথাকে গুরুত্ব সহকারে বিচার করলে ভুল হয়ে যাবে । ডাক্তার বাবুর প্রেসক্রিপশন সঙ্গে করে নিয়ে এসে ইন্সপেক্টর বাবুকে দেখিয়ে দিয়েছেন শুভ্রা দেবী। এই কথা গুলো বলার সময় শুভ্রা দেবীর সঙ্গে চোখাচখি হতেই বিনয়ের সঙ্গে চোখ নামিয়ে নেন ইন্সপেক্টর সাত্যকি। একটা অলস নিস্তব্ধতা নেমে আস দুজনের মুখ মন্ডলে। ভাবেন ওনার স্ত্রীর কথাই হয়তো ঠিক। কেসটা সমাধান করা ভীষণ দুরহ ব্যাপার হয়ে যাওয়ায় ইন্সপেক্টর সাত্যকির মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। তার মনের কষ্ট ডাল পালা ছড়িয়ে বিরাট আকার ধারণ করে চলেছে।
নীলাঞ্জন ব্যাপারী সুস্থ হলে হাসপাতাল থেকে তাকে ডিসচার্জ করে দেওয়া হয় । ছুটি পেয়ে তিনি বাড়ী ফিরে আসার পরিবর্তে বনগাঁ চলে যান খুড়তুতো বোনের বাড়ী। বাড়ীতে ওনার দেখাশুনা করার কেউ নেই বলে তিনি বাড়ী ফিরে যাবার সাহস পান নি। উপায় অন্তর না পেয়ে তিনি খুড়তুতো বোনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বোন তাকে বনগাঁ চলে আসার পরামর্শ দেয় । বোনের পরামর্শ মত তিনি বনগাঁ চলে যান। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠে বনগাঁ স্টেশনে নেমে টোটোতে করে দশ মিনিট গেলেই তরঙ্গহাঁটি বোনের বাড়ী। ভগ্নিপতির মুদিখানার ব্যবসা। বোনেরও দাদা বলতে এই এক জনই। তার নিজের কোন সহদর ভাই নেই। বোনের একটা দশ বারো বছরের মেয়ে আছে। সে তো মামা বলতে অজ্ঞান। মামাকে পেয়ে তার আর কিছু চাই না। সব সময় সে মামার সঙ্গে আছে।মামার কাছে থ্রিলার গল্প শুনে সে খুব মজা পেয়ে গেছে। তাই সে মামাকে সারা জীবনের জন্য এখানে রেখে দিতে চায়। মামা ভাগ্নির আবদার ফেলতে না পেরে বলে ঠিক আছে আমি তাহলে ওখানকার বাড়ী ঘর সব বিক্রি করে এখানে চলে আসবো। ওখানে একা একা থাকতে আমার ভালোও লাগবে না। তাছাড়া ওখানকার পরিবেশ এখন ভীষণ গোলমেলে হয়ে গেছে। রাজনৈতিক সামাজিক অরিবেশ খুব অস্থির হয়ে থাকে সব সময়। খুন খারাপি মারদাঙ্গা লেগেই আছে সব সময় । রাজ নীতির আশ্রয়ে গুন্ডা বদমাইশির চরম অব্যবস্থা । হাসপাতাল থেকে ছুটি নিয়ে বোনের বাড়ী যাবার এক সপ্তাহ বাদে ইন্সপেক্টর সাত্যকি হাসপাতালে গিয়ে দেখেন নীলাঞ্জন বাবু বেডে নেই। সেই বেডে অন্য এক জন পেসেন্ট শুয়ে আছেন । সাত্যকি বাবু হাসপাতালের রিসেপশনে দেখা করলে সেখান থেকে উনি জানতে পারেন যে নীলাঞ্জন ব্যাপারী সুস্থ হয়ে যাওয়ায় ওনাকে ডিসচার্জ করে দেওয়া হয়েছে। ইন্সপেক্টর সাত্যকি রঞ্জন তখন বলেন যে ওনাকে ডিসচার্জ করার আগে থানায় জানানোর কথা ছিল। সেই সময়ের ডিউটি ইনচার্জ বলেন যে উনি যে ডাক্তার বাবুর আন্ডারে ভর্তি ছিলেন সেই ডাক্তার বাবুর এই হাসপাতাল থেকে ট্রান্সফার হয়ে যাবার অর্ডার এসে গিয়েছিল তাই তিনি নীলাঞ্জন বাবুকে ডিসচার্জ করে দিয়ে তিনিও ট্রান্সফার নিয়ে অন্য হাসপাতালে চলে যান। তখন ইন্সপেক্টর সাত্যকি নীলাঞ্জন বাবুর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন । নীলাঞ্জন বাবু বলেন যে তিনি বনগাঁ বোনের বাড়ী আছেন । এক সপ্তাহ বাদে বাড়ী ফিরবেন। ইন্সপেক্টর সাত্যকি তাকে বলেন যে বাড়ী ফিরে থানায় ফোন করে যোগাযোগ করতে। নীলাঞ্জন বাবু বাড়ী ফিরে আসার প্রায় পনেরো দিন বাদে পুলিশ ইন্সপেক্টর সাত্যকি নীলাঞ্জন বাবুর সাথে কথা বলতে চান। নীলাঞ্জন বাবু থানায় গিয়ে দেখা করবেন বলে জানিয়ে দেন। কারণ বাড়ীতে পুলিশ আসলে তার সামাজিক সম্মান নিয়ে প্রতিবেশীদের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি হতে পারে।এক দিন সকাল এগারোটার সময় নীলাঞ্জন বাবু তার ভগ্নিপতিকে সঙ্গে নিয়ে থানায় হাজির হন। ইন্সপেক্টর সাত্যকি নীলাঞ্জন বাবুকে জিজ্ঞেস করেন যে ” উনি কে ?” নীলাঞ্জন বাবু, “উনি আমার ভগ্নিপতি। আমার বোনের কড়া নির্দেশ আছে যে অসুস্থ দাদাকে একা কোথাও পাঠানো যাবে না। তাই ও এসেছে আমার সঙ্গে।” সাত্যকি, ওনার নামটা কি জানতে পারি প্লিজ। ” ভগ্নিপতি, ” স্যার আমার নাম মদন লাল কল।” “আচ্ছা নীলাঞ্জন বাবু আপনার পরিবারে আর কে কে আছেন ?” নীলাঞ্জন,” আমার পরিবারে আমি একা। বাবা মা মারা যাবার পর আমি পুরোপুরি একা হয়ে গেছি। “সাত্যকি, “কত দিন আগে আপনার বাবা মা ইহলোক ত্যাগ করে পরলোকে চলে গেছেন ?” নীলাঞ্জন,”আমি যখন উচ্চমাধ্যমিক পড়ি তখন এক দিন একটা এক্সিডেন্টে বাবা মা স্পট ডেড হয়ে যান। বাবা মা একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে বাড়ী ফিরছিলেন ছোট জাগুলিয়া থেকে। বারাসাতের কলোনি মোড়ের কাছে এসে হঠাৎ সামনের দিক থেকে একটা লরি এসে সজোরে ধাক্কা মারে ওনাদের ট্যাক্সিটাকে । ওনাদের ট্যাক্সিটা লরির তলায় চাপা পড়ে পিষ্ট হয়ে যায়। পুরো গাড়িটা দুমড়ে মুষড়ে যায়। ট্যাক্সির ড্রাইভার এবং আমার
বাবা মা তিন জন এক সঙ্গে মারা যান।” এক রাস বিষন্ন নিস্তব্ধতা নেমে আসে ইন্সপেক্টর সাত্যকির চোখে মুখে। সাত্যকি,” মাপ করবেন। আমি না জেনে আপনাকে কষ্ট দিয়ে ফেললাম।” বিরক্তি উপেক্ষা করে সাত্যকি বললেন, “এরপর আপনার পড়াশোনার কি হলো ? ” নীলাঞ্জন, ” আমি আর্থিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকি। যেটুকু বিদ্যা অর্জন করেছিলাম তা দিয়ে ছাত্র পড়িয়ে যা রোজগার হতো তা দিয়ে অতি কষ্টে নিজের খাওয়া দাওয়া ও পড়াশোনা চালিয়ে নিয়ে গেছি। আমি কেমিস্ট্রিতে অনার্স নিয়ে বি এস সি পাশ করে পড়াশোনা বন্ধ করে দেই দারিদ্রের শাসনে পড়ে ।” আরশাদ আলী আর ভ্যাবলাকে আলাদা আলাদা বসিয়ে কিছুক্ষণ জেরা করে পুলিশ। ভ্যাবলা, “স্যার আমি কিছু করিনি l” পুলিশ, “তুই করিস নি তো কে করেছে ? স্যার আমি জানি না । স্যার আমি দেখিনি। “পুলিশ,” দেখ তোর ছবি কিন্তু C C ক্যামেরায় উঠে গেছে। সুতরাং অস্বীকার করার কোন জায়গা নেই। ভালোয় ভালোয় স্বীকার করে ফ্যাল। নাহলে তোর ফাঁসি কেউ আটকাতে পারবে না । ” “স্যার সব আরশাদ আলী জানে।” পুলিশ, “আরশাদ তুই জানিস কে খুন করেছে শ্রেয়াণ বাবুকে।” স্যার আমি কিছু জানি না। আমি কিছু বলতে পারবো না। “পুলিশ,”তবে কে বলতে পারবে সেটা তো তুই বলে দে । তোর ছবি কিন্তু C C কেমেরায় দেখা যাচ্ছে। এবার আর চুপ করে থেকে বাঁচতে পারবি না। ” তারপর দুজনকে এক সঙ্গে বসিয়ে জেরা করে। পায়ে দড়ি বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে পাছায় সপা সপ ডান্ডা মারায় ওরা মুখ খোলে । ওরা বলে যে ওরা ঐ গোডাউনে এসেছিল নীলাঞ্জন বাবুর কথা মত। শ্রুণিতাকে ধরে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলার ভয় দেখাতে কিন্তু ওখানে এসে ওরা দেখে যে নীলাঞ্জন বাবু এবং আরও পাঁচ ছয় জন লোক ওখানে দাঁড়িয়ে আছে। নীলাঞ্জন বাবু তখন টাকা মিটিয়ে দেয় এবং ওদেরকে চলে যেতে বলে। ওরা টাকা নিয়ে ওখান থেকে চলে যায় । ওরা বলে যে কাজটা যেই করুক সে সুপারি নিয়েই করেছে। কিন্তু সুপারি কে দিয়েছে সেটা এখনো জানা বাকি আছে। এবার কি একটু আলোর রেখা অন্ধকার ভেদ করে বেরিয়ে আসবে ? পুলিশ ভাবছে।সাত্যকি রঞ্জন হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারেন যে শ্রুণিতা ট্রিটমেন্টে সামান্য হলেও একটু সারা দিয়েছে বলে ডাক্তার বাবুদের মনে হয়েছে । মেয়ের হাতের আঙুলের আংটিটার উপর চোখ পড়তেই ওনার চোখ জ্বল জ্বল করে ওঠে। মুহূর্তে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ওনার সারা শরীরে । মনে হয় থমকে যাওয়া সময়টা যেন হঠাৎ কোন জাদু বলে সচল হয়ে গেলো । দাপুটে ইন্সপেক্টর সাত্যকি রঞ্জন লো প্রোফাইল জীবন কাটাচ্ছিলেন এত দিন । এখন মনে হয় উজ্জ্বল কোন আলোর রেখা দেখতে পেয়েছেন তিনি। তিনি বাড়ী গিয়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজে আংটিটার বিল বার করেন । কালের ভারে চাপা পরে পি সি চন্দ্র শো রুমের বিলটা লাল রং পাল্টে হলদেটে হয়ে গেছে। অক্ষর গুলো ক্ষয়েষ্ণু অবস্থায় চলে গেলেও পাঠের যোগ্যতা হারায় নি। পড়া যাচ্ছে। তিনি এই প্রমান্য দলিলটা গুছিয়ে রেখে দিলেন প্রমান পত্র হিসাবে দাখিল করার জন্য । মেয়ে হারিয়ে যাবার বিজ্ঞপ্তি খবরের কাগজে দেবার সময় পি সি চন্দ্র থেকে কেনা আংটিটা মেয়ের আঙুলে আছে বলে তিনি উল্লেখ করেছিলেন । সেই দিনের সেই খবরের কাগজটা তিনি সযত্নে নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। শ্রুণিতার পালক বাবা যে মার্ডার হয়ে গেছেন সেটা শ্রুণিতা জানে না। বাবার খুন হবার বিষয়টা শ্রুণিতাকে এখন বেশ কিছু দিন জানানো যাবে না। খোঁজ করলে বলতে হবে দিল্লির AIMS এ ওনার ট্রিটমেন্ট চলছে। শ্রুণিতার বাড়ীতে তো এখন আর কেউ নেই। শুধু বাড়ীটা পরে আছে ফাঁকা। সুতরাং ঐ বাড়ীতে শ্রুণিতা একা থাকতে পারবে না। সুতরাং আদালতে প্রমান দিয়ে শ্রুণিতাকে সাত্যকি নিজের মেয়ে বলে দাবি করবেন এবং নিজের কাছে রাখার আর্জি জানাবেন বলে স্থির করে রেখেছেন ।
থানা থেকে বের হয়ে মদন লাল ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে “দাদা আপনি মার্ডার কেসে ফেঁসে যাবেন না তো ? আপনার যাবোজ্জীবন জেল হয়ে যাবে না তো ?” ” না না আমি ফেঁসে যাবো কেনো ? আমি কি খুন করিছি নাকি ? কে কি জন্যে খুন করেছে সেটা আমি কিভাবে জানবো ? ” মদন লাল, “দাদা, বিনা মেঘেও তো বজ্রপাত হয়।” নীলাঞ্জন বাবু ভগ্নিপতির কথা শুনে না ভাঙলেও মচকে যান। মনে মনে ভাবেন বাঘে ছুঁলে আঠেরো ঘা আর পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা। ভাগ্য বিড়ম্বনায় দৈবদূরবীপাকে কোন শাস্তির খাঁড়া কার উপর কখন এসে পরে সেটাও তো বলা মুশকিল । সুতরাং মনের আকাশে ঘন কালো মেঘ তো একটু জমতেই পারে। কথায় বলে ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।এই সব ভাবনা ভাবতে গিয়ে নীলাঞ্জন বাবুর মুখটা অপ্রতিভ হয়ে পরে। সাত্যকি, নীলাঞ্জন বাবু আগামীকাল একবার থানায় দেখা করবেন। ইন্সপেক্টর সাত্যকি, “আচ্ছা নীলাঞ্জন বাবু আপনি এক জন গভমেন্ট স্পনসর্ড স্কুলের টিচার হয়ে আইবুড়ো রয়ে গেলেন কেন ? স্ত্রী প্রতি পালনের মত আর্থিক সামর্থ তো আপনার ছিল। “নীলাঞ্জন বাবু,” আসলে মা বাবা চলে যাবার পর আমাকে বিয়ে দেবার মত গার্জিয়ান কেউ ছিল না । আর আমিও খুব একটা গরজ করিনি। আমি প্রেম ভালোবাসায় বিশ্বাস করি না। তাই আমার বিয়ে করা হয়ে ওঠেনি। “সাত্যকি, “আচ্ছা শ্রেয়াণ বাবুর স্ত্রী শানয়া দেবী কেমন মানুষ ছিলেন ? ” নীলাঞ্জন, “সে প্রশ্ন আমাকে কেন ?” সাত্যকি,” না সেরকম কিছু না,আসলে আপনি যেহেতু ঐ পরিবারের ঘনিষ্ঠ মহলের এক জন তাই আপনি ঐ পরিবারের সকলের সম্মন্ধেই কিছু না কিছু জানবেন এটাই স্বাভাবিক । তাই জিজ্ঞেস করা।” নীলাঞ্জন, “ভালো, ভালো মানুষ ছিলেন শানায়া দেবী । ” সাত্যকি, “ওনার শারীরিক ডিমান্ড কি একটু বাড়াবাড়ি পর্যায়ের ছিল? “নীলাঞ্জন, “মাপ করবেন,সে সব বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না। আমি ঐ সব খোঁজখবর রাখতাম না। আমি মৃত অতীতকে নিয়ে টানাহেঁচড়া করতে চাই না। ” ইন্সপেক্টর সাত্যকি বিরক্তি উপেক্ষা করে বলেন, “এবাউট ফর্টি ফাইভ ইয়ার্স, চল্লিশ-পয়তাল্লিশ বছর বয়সের পর থেকে উনি নাকি লিবিডো সমস্যায় ভুগছিলেন? ” নীলাঞ্জন, “ঐ সব প্রশ্ন করে আমাকে লজ্জা দেবেন না প্লিজ। ” ভিতরে কালবৈশাখী আছড়ে পড়লেও উপরটা স্বাভাবিক রাখার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন নীলাঞ্জন বাবু। সাত্যকি নীলাঞ্জন বাবুকে ছেড়ে দিয়ে ভ্যাবলা ও আরশাদ আলীকে নিয়ে পড়েন । আজ ওদের মুখ দিয়ে খুনের সুপারি যে দিয়েছে তার নাম বার করতেই হবে। আজ যদি সুপারি যে দিয়েছে তার নাম না বলিস তবে তোর শরীরে হাড়ের সংখ্যা দুশো ছয় খানা থেকে বেড়ে পাঁচ শো খানা হয়ে যাবে। আরশাদ আলী মুখ দিয়ে কোন কথা বার করে না। দুই হাঁটুর মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে চুপ করে বসে থাকে । হাবিলদার আরশাদ আলীকে বেঁধে ঝুলা তো আর ঐ ডান্ডাটায় তেল মালিশ কর। সপা সপ কয়েক ঘা পড়তেই আরশাদ আলী, “স্যার বলছি স্যার বলছি। “সাত্যকি, “হ্যাঁ বল। সব সত্য কথা বললে তুই পায়ে হেঁটে বাড়ী যেতে পারবি।” আরশাদ আলী, ” স্যার নীলাঞ্জন ব্যাপারী। ” সঙ্গে সঙ্গে ইন্সপেক্টর সাত্যকি রঞ্জন কালা ড্রাইভারকে বলেন গাড়ি স্টার্ট দিতে। পাঁচ জন পুলিশকে নিয়ে পৌঁছে যান নীলাঞ্জন ব্যাপারীর বাড়ী। সাত্যকি, “তোর খেল খতম। ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট। ” নীলাঞ্জন, “স্যার আমি কিছু করি নি। আমাকে ছেড়ে দিন। আপনারা আমাকে এই ভাবে অ্যারেস্ট করতে পারেন না। আমি নির্দোষ। “সাত্যকি,”তুই স্বীকার করবি না কি পিছ মোরা করে বেঁধে ঝুলাবো ? এই দেখ ঐ মোটা দড়িটা দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে ঐ মোটা লাঠিটা দিয়ে পিটিয়ে তোর পাছার মাংস তোর শরীর থেকে আলাদা করে দেব। সেটা তুই চাস না কি সব সত্য কথা স্বীকার করবি ? ঐ দেখ ভ্যাবলা আর আরশাদ আলীর কি হাল হয়েছে । ওরা আর কোন দিন বসতে পারবে না। ওদেরকে সারা জীবন দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। ওরা তোর নাম বলে দিয়েছে। তুই টাকা দিয়ে ভাড়া করে খুনি নিয়ে এসে খুন করেছিস শ্রেয়াণ বাবুকে । “
নীলাঞ্জন ব্যাপারী, ” সমস্যার বীজ বপন হয়েছিল সেই কলেজ লাইফে । স্যার আমি আর শানায়া এক কলেজে এক ক্লাসে পড়তাম। ও আমার ক্লাস মেট। আমাদের মধ্যে প্রথমে বন্ধুত্ব হয়। পরে বন্ধুত্ব থেকে প্রেম তারপর প্রেম থেকে ভালোবাসা হয়। আমার থ্রু দিয়ে শানায়ার সাথে শ্রেয়াণের পরিচয় হয়। শানায়া ওর সঙ্গে ওর বাড়ী যাতায়াত করতে শুরু করে। যেহেতু আমার মা বাবা কেউ ছিল না আমি বাড়ীতে একা থাকি তাই ও আমার বাড়ী আসতে পারতো না। এই অবস্থায় শ্রেয়াণের মা শানায়াকে দেখে পছন্দ করে এবং ছেলের বৌ করে ঘরে আনার প্রস্তাব দেয়। ঐ প্রস্তাবে শানায়া কোন রূপ আপত্তি করে নি তবে কোচবিহারে ওর মা বাবাকে বিষয়টা জানাতে বলে । শ্রেয়াণের মা কোচবিহার যায় ওর মা বাবাকে বিয়েতে রাজি করাবার জন্য । শানায়ার মা বাবা রাজি হয়ে যায় বিয়ে দিতে। শ্রেয়াণের সাথে শানায়ার বিয়ে হয়ে যায়। শ্রেয়াণ কিন্ত জানতো যে আমি শানায়াকে ভালোবাসি তবুও ও চুপ করে থেকে এই বিয়েটা করে ফেললো। আমার বিষয়টা বন্ধু হিসাবে ও এক বারের জন্যও ভাবলো না। এরপর আমি আর প্রেমের পথে যেতে সাহস পাই নি। প্রেমের প্রতি আমার একটা বিদ্বেষ এসে গিয়েছিল । আমার যেহেতু গার্জিয়ান কেউ ছিল না তাই সম্মন্ধ দেখে আমার আর বিয়ে করা হয় নি। আমার লাইফটা ও নষ্ট করে দিল। আমি সে দিন চুপচাপ সব মেনে নিয়েছিলাম। আর মেনে না নিয়ে আমার কোন উপায়ও ছিল না। তবে মনে মনে আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে এর প্রতিশোধ এক দিন আমি নেবো। এটাই সেই প্রতিশোধ। তারপর থেকে আমি সুযোগ খুঁজতে থাকি। আমি শ্রেয়াণের সাথে বন্ধুত্বের অভিনয় করে বন্ধুত্ব আগলে রেখেছিলাম এতো গুলো বছর ধরে শুধু এই দিনটার জন্য । যাতে ও কিছু বুঝতে না পারে। বেইমানি শানায়াও করেছে। ওরা দুই জন্যই বিশ্বাস ঘাতক। বিশ্বাস ঘাতকের উপযুক্ত শাস্তি আমি দিতে পেরেছি। এটাই আমার মানসিক শান্তি। বিচারে আমার যাই হোক না কেনো সেই কষ্টটা আমার পঁচে যাওয়া দুর্গন্ধময় অতীতের থেকে বেশি হতে পারবে না। ওর পালিত মেয়ে শ্রুণিতাকে আমি মেরে ফেলতে চাইনি। পরিবার গত কারণে শ্রুণিতা বেপথে চলে গেছে। ও একটা ড্রাগ ৱ্যাকেটের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল। একটা সময় পরে ৱ্যাকেটের জালে আটকে পরে বেরিয়ে আসার জন্য হাঁসফাঁস করছিলো। এখানে ওখানে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলো। সেই ড্রাগ ৱ্যাকেটের লোকেরা ওকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছিল । আমি সেই ড্রাগ ৱ্যাকেটের লোকেদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আমার প্রতিশোধ নেবার ব্যবস্থাটা পাঁকা করি ফেলি । আমি আরশাদ আলী আর ভ্যাবলার সঙ্গে কথা বলে একটা মার্ডার গ্যাংয়ের সন্ধান পাই। সেই গ্যাং থেকে দুজন লোক হিমু আর ঘোতনকে সুপারি দিয়ে ভাড়া করে আনি। ওরা প্রফেশনাল মার্ডারার। ওরা এসে দক্ষ শিকারীর মত নিখুঁত ভাবে কাজটা করে চলে যায়। তার জন্য বুদ্ধি করে ওদের সবাইকে এক জায়গায় আমি জর করি যাতে এক বারে কাজটা শেষ হয়ে যায়। এই কাজে আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছিলো শানায়া । আমার সঙ্গে শানায়ার বিয়ে না হওয়ার জন্য পরবর্তী কালে শানায়া খুব আপসোস হয় এবং সেই রাগ গিয়ে পরে শ্রেয়াণের উপর। তাই শানায়াও আমার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল । ওর কলকাতায় আসা যাওয়ার টিকিট আমি কেটে দিয়েছিলাম। এই যে আমার মোবাইলের গ্যালারিতে এখনো ওর টিকিট আছে। আমার বাড়ীতেই দু দিন ছিল ও । কথা হয়েছিল এই সব ঝামেলা মিটে গেলে বৃদ্ধ বয়সটা আমরা এক সঙ্গে কাটাবো। আব্বাজ আলীর রাগ ছিল শ্রুণিতার উপর। যেহেতু শ্রুণিতা ড্রাগ ৱ্যাকেটে জড়িয়ে পড়েছিল। কিন্ত ও শ্রুণিতাকে মেরে ফেলতে চায় নি। আমিও চাই নি। মার্ডারারা ভুল করে শ্রুণিতাকে স্টাফড করে ফেলেছে। আমার কথা মত আব্বাজ আলী শ্রুণিতার রক্ত মাখা শাড়ি ওদের বাড়ী রেখে এসেছিলো। কেসের মোড় ঘুরিয়ে দেবার জন্য।
—-oooXXooo—-
![]()






