হৃদয়হীনা
শ্যামাপ্রসাদ সরকার
এতটাও নিস্পৃহ হতে পারে কোন মানুষ ! আই সি সিউর বেডে শুয়ে শুয়ে ভাবছিল দীপ্ত। মোটামুটি জানাশোনা, আত্মীয়স্বজন যাদের আসা সম্ভব,গত সাতদিনে অন্ততঃ একবার এসে তারা দেখে গেছে নয় ফোন করেছে। আজকালকার নার্সিংহোমগুলো ফোন রাখতে দেয়। কিন্তু হাতে চ্যানেলের সূচবিদ্ধ অবস্থায় ফোনটা নাড়াচাড়া করাটা মোটেই খুব সহজ নয়।
অ্যাটাকটা মেজর নয় তেমন। তবে চল্লিশের দোরগোড়ায় এসে এতকালের অনিয়মের শোধ তুলছে শরীর। মেডিক্যাল ইনসিওরেন্সের সাপোর্টটা না থাকলে সাতদিনের অঙ্কটা মেটাতে পকেটে চাপ হয়ে যেত।হাসপাতালের বিছানায় মনটা দ্রব হয়ে থাকে। দুটি চোখ একবার অন্ততঃ সমৃদ্ধাকে খুঁজেছিল। মন থেকে চাইছিল, যতই মিউচুয়াল ডিভোর্সের প্রসিকিউশন চলছে এখন তবু আই সি সিউ র কাঁচে একবার ওই কাজল লাগানো চোখ দুটো দেখতে পাবে। বোকার মত অপেক্ষা করেছিল সাতটা দিন রোজ। টুকরো স্মৃতিরা ভীড় করে আসে অলস মাথার ভিতরে। নার্স এসে হাতের চ্যানেলটা খুঁচিয়ে দিয়ে ঘুমের ইঞ্জেকশনটা পুশ করে যেতেই নিস্তেজ শরীরটা এলিয়ে গেল বিছানায়।
নার্সিংহোম থেকে সুদক্ষিণার ফোনটা একরকম অপ্রত্যাশিতই ছিল। দীপ্তর কোনও খবরেই ইন্টারেস্ট নেই আর। বিয়ের পাঁচ বছর পরেও যে ফ্যামিলি মধ্যযুগীয় লোকেদের মত দিনরাত বাচ্চা কেন হল না এ নিয়ে নোংরা মন্তব্য করে, সেখানে আসল সম্পর্কটাই ভিত্তিহীন হয়ে যায়। ওদের বাড়ির সবাই ধরেই নিল যে অতি আধুনিকা সমৃদ্ধা তার আই টি কেরিয়ার মসৃণ রাখতে বাচ্চাকাচ্চার ঝামেলায় যেতে চায়না ! কেউ দীপ্তর ব্যাপারে কোনও প্রশ্ন তুলল না। দীপ্তও তো তার কর্পোরেট চাকরীতে ব্যস্ত। মাসে কুড়িদিন হিল্লী দিল্লী করে বেড়াচ্ছে আর সমৃদ্ধার রাত করে বাড়ি ফেরা আর রবিবারও অফিস করতে যাওয়াটাই লোকে বড় করে দেখল। প্রথমবার কনসিভ্ করার পর যখন মিসক্যারেজটা হল তখন জানতে পারল তার ওভারিতে অনেকগুলো সিস্ট। এ অবস্থায় মা হতে চাওয়াটা রিস্কি। এত গুলো ওষুধ খেতে হত রোজ। দীপ্তর কথায় সব চেপে থাকতে হয়েছিল এতদিন ! আর পারা গেল না শেষ পর্যন্ত। বাচ্চা বাচ্চা করে পাগল করে দিচ্ছিল দীপ্তর মা। ঠারেঠোরে যা এতদিন আত্মীয়স্বজনদের সামনে গুজগুজ ফুসফুস করে চলত একদিন তাই রাতের খাওয়ার টেবিলে বিশ্রীভাবে সামনে এসে গেল। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল সমৃদ্ধাও। পরদিন সকাল সকাল বাপের বাড়ি ফিরে এসেছিল। দীপ্ত কোনও বাধা দেয়নি, ফেরৎ নিতেও আসেনি। পরিবর্তে এসেছিল ডিভোর্সের ড্রাফট টা ক্লজগুলো পড়ে দেখার জন্য।
সুদক্ষিণা সমৃদ্ধার কলেজের বান্ধবী ওই নার্সিংহোমের ফ্রন্টঅফিসে বসে। দীপ্তর এ্যাটাকটার কথা ওই জানায়। প্রথমটায় শুনে ইনডিফারেন্ট একটা ফিলিং হচ্ছিল। আসলে একবছর ওরা এখন আলাদা থাকে। শেষ দেখা হয়েছিল ডিভোর্স ফাইল করার দিন। সেই সব আগুন ঝরানো দিনগুলো স্তিমিত হয়ে গেলে আর কিছুই পরে থাকেনা কয়েকটা অভ্যেসের মুহূর্তগুলো ছাড়া।
আজ বড় দীপ্তর কাছে গিয়ে বসতে ইচ্ছে করছে। কখনো কখনো শর্তহীন হয়ে যায় সম্পর্কগুলো। একটা দূর্লঙ্ঘ্য দূরত্ব, সেটা মনেরই সেটাকে কাটিয়ে ওঠা যায়না সহজে। তবু একটি বার মনে হয় দীপ্তকে হাতের নাগালে ছুঁতে পারলে ভালই হত। ভিতরে ভিতরে সমৃদ্ধা পুড়তে থাকে। আক্ষেপ হয়, একটু নির্জন কান্নাও আজ আর অবশিষ্ট নেই তার একলা একলা ভেজার জন্য।
আজ দীপ্ত ছাড়া পাচ্ছে। ভাই শমিত আর বন্ধু পুলক এসেছে নিয়ে যেতে। শরীরটা দূর্বল, উঠে দাঁড়াতে গেলে মাথা ঘুরছে। গাড়িতে উঠে ক্যাবের জানলাটা খুলতে বলল ও। কতদিন পর একটু আকাশ দেখতে পাচ্ছে আজ। হাল্কা মেঘ করেছে। রোদ নেই। বাইপাস দিয়ে গাড়িটা যাচ্ছে দ্রুতই। জানলা দিয়ে মেঘের সারি দেখতে দেখতে মনটা ভালো হয়ে গেল। এই কাজল কালো মেঘে দেখতে পেল সেই দুটি চোখের তাৎক্ষণিকী সাড়া, গত সাত দিনে যার প্রত্যাশায় আসলে ও বেঁচে আছে।
—oooXXooo—
![]()







