তোমাতে আমার ঠিকানা (পর্ব চতুর্থ)
বারিত বরণ
রিকশাটা থামে রামানন্দ কলেজের মূল গেটের সামনে।
সুচরিতা ধীরে নেমে পড়ে।
ব্যাগটা সামলে নেয়, চোখ তুলে দেখে—
“রামানন্দ কলেজ (স্থাপিত ১৯৪৮)”
একটা পুরনো বিল্ডিং, লাল ইট, উঁচু গেট, আর মাথার ওপর নীল আকাশ যেন বলে— “তুমি ঠিক জায়গায় এসেছো।”
কলেজ চত্বরের মধ্যে পা দিয়েই সুচির মনে হয়,
“এই আমি—ঘরের সীমা পেরিয়ে একটা স্বপ্নের ভিতর হাঁটছি।”
চারপাশে ছেলেমেয়েরা হাঁটছে কেউ গ্রুপে, কেউ একা।
কেউ ফোটো তুলছে, কেউ চোখে সানগ্লাস, কানে হেডফোন।
কিন্তু সুচি নিজেকে গুটিয়ে রাখে না,সে হাসিমুখে সোজা রেজিস্ট্রারের রুমের দিকে এগিয়ে যায়।
ভর্তি ফর্ম জমা দিচ্ছে, হঠাৎ পাশের এক মেয়ে বলে ওঠে—
“তোমার নাম সুচরিতা? তুমি ওই সেন জুয়েলার্সের মেয়ে?”
সুচি একটু থেমে মৃদু হেসে উত্তর দেয়
“হ্যাঁ। আমি সুচরিতা সেন। আমি ইতিহাস বিভাগে নতুন ছাত্রী। এখানে এটাই আমার পরিচয়।”
মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,
“তোমার মতো মেয়ে এই সাবজেক্টে! তোমার বাবার অগাধ টাকা, তুমি কেনো এই সাধারণ একটা কলেজে ভর্তি হলে?”
সুচি একটু মনে মনে রুষ্ট হলো, কিন্তু মুখে প্রকাশ করল না। আস্তে আস্তে বলল , বাবার অগাধ পয়সা আছে বলে কি আমার নিজের কোনো লক্ষ্য থাকতে পারে না।”
মেয়েটি একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল,
” না মানে বাকি সবাই তো চাকরির চিন্তায় সায়েন্স, কমার্স নিচ্ছে!”
সুচি বলল,
“চাকরি দরকার, কিন্তু তার চেয়েও বেশি দরকার নিজেকে বোঝা। ইতিহাস না থাকলে আমরা কে, সেটা জানতামই না।”
রেজিস্ট্রার মৃদু হেসে বলে উঠলেন,
“তোমার মতো ছাত্রীই তো কলেজের গর্ব হবে একদিন। এগিয়ে যাও মা, আমার আশীর্বাদ রইলো।”
সব কাজ সেরে সুচি হাঁটছে কলেজের বারান্দা দিয়ে।
দেওয়ালে টাঙানো স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ছবি, রবি ঠাকুরের কবিতা, আর একটা পুরনো ঘড়ি,
— সময় যেন এখানে শব্দহীন, কিন্তু অর্থপূর্ণ।
সামনের লনে বিরাট এক বকুল ফুলের গাছ।অনেক ছেলেমেয়ে সেখানে বসে নিজেদের মধ্যে হাসি ঠাট্টায় মত্ত। সুচি গাছের ছায়ায় দিয়ে একটু দাঁড়ায়।
মনে হয়—
“এটাই আমার জায়গা। এই মাটি, এই গন্ধ, এই আকাশ… এখানে আমি হারাতে চাই না, বরং গড়তে চাই নিজেকে।”
ঘণ্টা বাজল। ধুপধাপে ছেলেমেয়েরা ছুটছে ক্লাসরুমের দিকে।
ইতিহাস অনার্স, প্রথম বর্ষ, সেকশন A.,রুম নম্বর ১২, কলেজের পুরনো বিল্ডিং-এর দোতলায়।
সুচরিতা ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ে ক্লাসের মধ্যে । ক্লাসে ঢোকার আগে একবার থেমে দাঁড়ায়।
এক গভীর নিঃশ্বাস নেয়—”এই তো আমার জায়গা।”
সুচি মনে মনে বলল,
“এই কলেজ শুধু ক্লাসরুম না।
এটা একটা ল্যাবরেটরি, যেখানে আমি চিন্তা করবো, প্রশ্ন করবো, ব্যর্থ হবো, আবার উঠে দাঁড়াবো।
এখানে কেউ আমার পোশাক দেখবে না, কেউ আমার টাকা গোনাবে না—এখানে আমার চিন্তাভাবনা আমাকে চিনিয়ে দেবে।আমি রেডি, ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখতে।”
পুরনো ভবনের ক্লাসরুম, দেয়ালে চুন খসে পড়ছে, জানালায় সরু কাঠের পাল্লা, কিন্তু কোথাও এক রকমের নিজস্ব সৌন্দর্য আছে।
সামনের বেঞ্চগুলো ফাঁকা, পেছনে অনেকেই বসে সেলফি তুলছে, ফিসফাস করছে।
সুচি একটু ইতস্তত করেই সামনে একটা বেঞ্চে গিয়ে বসলো।
চোখে একাগ্রতা, খাতাটা খুলে রাখে। পাশে বসে আছে একটা মেয়ে, গায়ের রঙ একটু চাপা, চুলগুলো খোঁপা করা, চোখে বড় ফ্রেমের চশমা। পরনে ধুতি-কামিজ টাইপ পোশাক, কিন্তু একেবারেই ছিমছাম।
মেয়েটা সুচির দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলে,
“তুমি খুব সিরিয়াস মনে হয়!”
সুচি হেসে জবাব দেয়,
“না, শুধু একটু কৃতজ্ঞ। আজ এখানে বসতে পারছি বলেই কেমন যেন…ভেতরটা ভরে উঠছে।”
মেয়েটি নিজের পরিচয় দিল,
“আমি অনু। অনুমিতা সরকার। তুমি আমাকে অনু বলেই ডাকতে পারো। আর তুমি?”
সুচিও মৃদু হাসে,
“আমি সুচরিতা সেন… একটু টেনশন হচ্ছে বটে। এটা আমার প্রথম ক্লাস এখানে।”
অনু আবার হেসে বলে, “টেনশন? ইতিহাস নিয়ে পড়তে এলে তো সাহস নিয়েই এসেছো! এখানে সবাই একটু আলাদা ধরণের। কেউ কাব্য লেখে, কেউ সমাজ নিয়ে ভাবে—আর কেউ কেউ শুধু পাশ করতে চায়!”
সুচির মুখে একরাশ হাঁসি এসে পড়ে।
“আমি হয়তো দ্বিতীয় টাইপের … আমি চাই বুঝে পড়তে। সমাজ, মানুষ, ইতিহাস—সব যেন আমার চারপাশের বাস্তবতার সঙ্গে মিল খায়।”
অনু হঠাৎ করেই একটু চমকে ওঠে, চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে,
“তুমি কি সেই সেন জুয়েলার্সের…?”
তার কথা শেষ করতে না দিয়েই সুচি চোখ নামিয়ে শান্তভাবে বলে,
“হ্যাঁ, আমি সেই। কিন্তু আমি চাই মানুষ আমাকে আমার কাজের জন্য চিনুক, বাবার নাম বা দোকানের জন্য নয়।”
অনু থেমে যায় কিছুক্ষণ।
তারপর গম্ভীরভাবে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে,
“ঠিক বলেছো। আমি তোমার পাশে বসে গর্ব বোধ করছি, সুচরিতা। আশা করি আমরা ভালো বন্ধু হব।”
সুচি তাকিয়ে বলে,
“বন্ধুত্ব তো এমনিই শুরু হয়, তাই না? হঠাৎ এক ক্লাসে, এক বেঞ্চে…”
আর ঠিক তখনই ক্লাসে প্রবেশ করলেন অধ্যাপক,একজন পঞ্চাশোর্ধ্য গম্ভীর মুখের মানুষ, চোখে গোল ফ্রেমের চশমা।
তাঁর গলা ভারী, অথচ শান্ত।হাতে কয়েকটা বই। আর পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি ও নীল পাড়ের ধুতি।
“আমি প্রসেনজিৎ মুখার্জি। তোমাদের ইতিহাস অনার্সের ক্লাস আমি নেবো।
তবে শুধু বই না—আমি চাই তোমরা সময়কে বোঝো, সমাজকে দেখো, নিজের জীবনকে প্রশ্ন করো।”
তার প্রথম প্রশ্নেই ক্লাস চুপচাপ। অনেকগুলো উদগ্রীব চোখ একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি আবার বলতে থাকলেন
“ইতিহাস মানে কেবল রাজা-রানী নয়, ইতিহাস মানে তোমার চারপাশের প্রতিটি অন্যায়, প্রতিটি পরিবর্তনের নেপথ্য কাহিনি।
আচ্ছা তোমাদের মধ্যে কে বলতে পারো, তোমরা ইতিহাস পড়তে চাও কেন?”
আবারও এক নিস্তব্ধতা, পেছন বেঞ্চে কেউ মুচকি হাসে, কেউ চোখ নামিয়ে ফেলে।
সুচি হাত তোলে।
“স্যার, আমি ইতিহাস পড়তে এসেছি…কারণ আমি চাই জেনেই বাঁচতে। আমি বুঝতে চাই, সমাজ কেন এমন বৈষম্যমূলক, কেন কিছু মানুষ সব কিছু পায় আর কিছু মানুষ আধখানা রুটি নিয়ে লড়াই করে।আমি ইতিহাস দিয়ে উত্তর খুঁজতে চাই—আর যদি পারি, নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে চাই।”
পুরো ক্লাস নিঃশব্দ।
স্যার তাকিয়ে থাকেন একটুক্ষণ, তারপর বলেন,
“তোমার নাম কি মা?”
“সূচরিতা সেন।”
“তুমি সঠিক পথেই এসেছো। ইতিহাস শুধু বইয়ে নেই, তোমার চোখেও আছে। চোখটা খোলা রেখো, সুচরিতা।”
ক্লাস শেষ করে সুচরিতা যখন করিডোর ধরে হেঁটে যাচ্ছে, তখন দর্শন বিভাগের সামনে একটা জটলা চোখে পড়ে।
৩-৪ জন ছাত্র দুটি মেয়ে আঁটোসাঁটো পোশাক, মাথায় জেল, ঠোঁটে ব্যঙ্গের হাসি—ঘিরে রেখেছে এক ছেলেকে। ছেলেটির পরনে ধুলোমলিন জামা ও একটি সস্তার প্যান্ট, জুতো জোড়ার এক পাশ ছেঁড়া, হাতে একটা পুরনো ব্যাগ। তার চোখে-মুখে গ্রামের সহজ-সরল ভাব, কিন্তু দু’চোখে যেন এক অনড় দীপ্তি।
হাজার বিদ্রুপেও ছেলেটির গলা শান্ত, তার উচ্চারণে কোনও কাঁপনি নেই কিন্তু আছে দৃঢ়তার ছাপ। তার ভদ্র মার্জিত কথার মধ্যে দিয়ে সে পরিষ্কার বুঝিয়ে দিল যে সে গরীব। গায়ে ব্র্যান্ডেড জামা নেই, হাতে স্মার্টওয়াচও নেই।কিন্তু সে ভর্তির মেধাতালিকায় যোগ্যতার নিরিখে এসেছে, টাকার জোড়ে নয়।সে হয়তো ওই বখাটে ছেলে মেয়ে গুলোর মতো শহুরে স্টাইলে কথা বলতে পারে না,
কিন্তু মাথা নিচুও করে না।
তার কথায় একটা স্পষ্ট বার্তা সে দিয়ে দিলো,
সে গরীব হয়েছে, কারণ জন্ম তার হাতে ছিল না।
কিন্তু মানুষ হয়ে উঠবে কিনা—তা তার হাতে।
আর সে সেটাই করতে এসেছে এখানে,নিজেকে হারিয়ে নয়, গড়ে তোলাই তার লক্ষ্য।
সুচরিতা সেই মুহূর্তে থেমে যায়।
তার চোখ ছেলেটির মুখে আটকে থাকে।অভিমানে নয়, আত্মবিশ্বাসে আলো ঝলমল করছে সেই মুখ।
সে দেখতে পায় সেই আগুন, যা কতদিন সে খুঁজছিল—একজন স্বপ্নবান অথচ বাস্তববাদী ছাত্র, যার জীবন সংগ্রামের মাটি ছুঁয়ে আছে।
সে মনে মনে বলে,
“এই ছেলেটির নাম আমি জানি না, কিন্তু এ আমার মতোই।
আমরা একই যুদ্ধের সৈনিক—দুই প্রান্ত থেকে এসেছি, কিন্তু লক্ষ্য একটাই,
নিজের পথ নিজেই বানাবো।”
ছেলেটি আস্তে আস্তে লম্বা করিডোরের শেষ প্রান্তে গিয়ে দাড়ায়, ধীরস্থির।
সুচিও আরও কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে ছেলেটির পাশে গিয়ে দাড়ায় সামান্য হাসি দিয়ে দেখে।
ছেলেটি তার দিকে তাকায়—কোনও কথা হয় না, কিন্তু চোখে চোখে এক আন্তঃসম্পর্ক তৈরি হয়।একটা সম্মান, একটা বোঝাপড়া।
“ভালো বললেন কিন্তু আপনি… সবসময় চুপ থাকা ঠিক না। আমি দেখছিলাম—ওরা খুব বাজে ব্যবহার করছিল আপনার সাথে।”
ছেলেটি উত্তর দেয়,
“চুপ থাকলে তো ভাববে, সত্যিই আমি নিচু… আসলে আমি জানি, আমি কে। সেটাই শেষ কথা।”
ছেলেটির প্রতি সুচির শ্রদ্ধা দ্বিগুণ বেড়ে যায়। সে নিজের পরিচয় দেয়।
ছেলেটিও তার নাম বলে ,
” আমার নাম অভি।”
সুচির বুকের মধ্যে হঠাৎ অদ্ভুত এক তাগিদ জন্ম নেয়। যেন বহুদিন ধরে যার খোঁজ সে করছিল, আজ তাকে পেয়েছে—এই ছেলেটির দারিদ্র্য নেই তার চোখে, আছে এক অদম্য আলো। অদ্ভুত এক ভালোলাগাতে সুচির মনটা ভরে উঠলো। অভির কাছে বিদায় নিয়ে সে পরবর্তী ক্লাসের দিকে এগিয়ে চললো। তবে মনটা পরে রইলো অভি নামক একটি ….
সন্ধ্যে ঘনিয়ে এসেছে।
বাড়ির পুরনো ছাদের টালির উপর ভেসে আসছে কাকের ডাকে মেশানো শীতল বাতাস।
বাড়ি ফিরেই সাদা সালোয়ারে ঘামটুকু মোছার ফুরসত না নিয়েই, সুচি সোজা হাঁটা দেয় ঠাম্মির ঘরের দিকে।সুচি ধীরে ধীরে সিঁড়ি ভেঙে উঠে এল ঠাকুমার ঘরে।
ঘরটা বরাবরের মতোই গন্ধে ভরা—চন্দনের ধূপ, পুরনো বইয়ের পাতার ঘ্রাণ, আর ঠাকুমার শরীরের একটুকরো শীতলতা।
ঠাকুমা বালিশে হেলান দিয়ে বসে আছেন, হাতে রবিশংকর বলের পুরনো বই। সুচিকে দেখে মুখে ঝিলমিল হাসি।
“ফিরলি মা? দিনটা কেমন গেল?”
সুচি এক নিঃশ্বাসে তার ব্যাগটা নামিয়ে ঠাকুমার পাশেই বসে পড়ল।
“ঠাম্মী, তুমি জানো? কলেজটা পুরনো, কিন্তু ভীষণ আপন মনে হল! প্রথম ক্লাসে বসতেই একটা মেয়ের সঙ্গে আলাপ হল—অনু, খুব ভদ্র, খুব আন্তরিক। আমরা একসাথে বসেছিলাম।”
ঠাকুমা মাথা নাড়লেন।
“ভালো বন্ধু পেলে পড়াশোনার আনন্দটা দ্বিগুণ হয়ে যায়, মা।”
সুচি চুপচাপ গিয়ে পাশের মোটা বালিশে হেলে পড়ে।চুপ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে জানালার বাইরে।
ঠাকুমা বই পড়া থামিয়ে সুচির দিকে তাকালেন,
“কি রে কি ভাবছিস এত??
“কই না তো।” সুচি ছোট্ট উত্তর দেয়।
ঠাকুমা মুচকি হেসে বললেন, “নিশ্চয় আজ কলেজে কিছু ঘটেছে?”
সুচি হেসে ফেলে,
“আর জানো, ক্লাস শেষ করে যখন বেরোচ্ছি, তখন এক ঘটনা ঘটল। একটা ছেলে, খুব সাধারণ পোশাকে, দেখেই বোঝা যায় সে শহরের নয়। ওকে কিছু ছেলে-মেয়ে অপমান করছিল। হয়তো ওদের চোখে ওর চেহারা আর জামাকাপড় ঠিক ছিল না। কিন্তু সেই ছেলের কী আত্মবিশ্বাস! কী স্পষ্ট ভাবে ও বলল—সে গরীব, কিন্তু যোগ্যতা আছে বলেই এসেছে। তার দারিদ্র্য লজ্জার নয়, বরং শক্তি।”
“বেঁচে থাকার মানে নতুন করে শিখিয়ে দিলো সে আমায়।”
ঠাকুমা মুখ নিচু করে শুনছিলেন।ঠাকুমা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।
“সুচি… তোর এই চোখটাই আলাদা।যেখানে অন্যরা দেখে ময়লা জামা, তুই সেখানে দেখিস দীপ্তি।
যেখানে অন্যরা হাসে, তুই সেখানে শ্রদ্ধা করিস।
তুই ঠিক পথেই হাঁটছিস মা।”
সুচি আবার বলতে শুরু করে,
“অভি বলেছে, দয়া চাই না,যোগ্যতায় দাঁড়াতে চাই।
কী গভীর কথা না ঠাম্মি?”
একটু থেমে বলে
“আমি তো এমন কথা এতোদিন বইয়ে পড়েছি, আজ প্রথম এক জীবন্ত বইয়ের সঙ্গে দেখা হলো।”
ঠাকুমার চোখ চিকচিক করে উঠল।
“এমন মানুষই তো দরকার, মা… যারা মাটি থেকে উঠে দাঁড়াতে জানে। আর যারা তাদের পাশে দাঁড়াতে জানে।”
সুচি মুখ নিচু করে বলে,
“আমি পাশে দাঁড়িয়েছিলাম… অন্তত চুপ থাকিনি। শেষে গিয়ে বললাম, ‘আপনি খুব ভালো বলেছিলেন’। ছেলেটার নাম অভি।”
ঠাকুমা ধীরে করে সুচির মাথায় হাত রাখলেন।
“তুই যেমনটা ভাবিস, তেমনি করিসও… এটাই আমার গর্ব। অনেক বড় জিনিস আছে দুনিয়ায়—শুধু টাকা নয়, শুধু নাম নয়। একটা অন্যের পাশে দাঁড়ানো—তার চেয়ে বড় মানুষ হওয়া যায় না।”
সুচি ঠাকুমার কোলের দিকে হেলে পড়ে বলল,
“তুমি জানো তো ঠাম্মী, আমি ঠিক এই কারণেই ইতিহাস পড়তে চাই। শুধু রাজাদের নাম জানব না, এমন ‘অভি’দের গল্প পড়ব, জানব… বুঝব এই সমাজটা কাদের নিয়ে তৈরি।”
ঠাকুমা মুগ্ধ চোখে চেয়ে রইলেন। যেন দেখছেন—এই মেয়েটিই একদিন এক নতুন আলো ছড়াবে, এক নতুন ভোরের দূত হবে।
বাইরে সন্ধ্যার আলো ফিকে হয়ে এসেছে।পাখিরা নীড়ে ফিরছে। আর ঘরের ভিতরে এক নতুন গল্পের বীজ রোপিত হচ্ছে…
একটি স্বপ্ন, একটি সাহসিকতা, আর দুটি হৃদয়ের সংলাপ দিয়ে।
ঠাকুমার ঘর থেকে বেরিয়ে সুচি নিজের ঘরে গিয়েই গা টা এলিয়ে দিলো , এক অদ্ভুত ভালো লাগা যেনো গ্রাস করেছে তাকে। আবার মনের মধ্যে অভি নামটাই ঘুরপাক খেতে থাকলো।
বেশভূষায় নয়, শহুরে ঢংয়ে নয়—
এই ছেলেটার ভেতরে ছিল একরকম আলো।যেটা সাজিয়ে দেখাতে হয় না, শুধু উপস্থিতিতেই ছড়িয়ে পড়ে।
সেই এক মুহূর্তেই সুচরিতা বুঝে গিয়েছিল, এই অভি আলাদা।তবে সে জানত না তখন, এই প্রথম দেখার অনুভব এতটা গভীরে গেঁথে যাবে।
তবু মনে মনে বলেছিল—
“এই ছেলেটা, হয়তো একদিন পুরো শহরকে শেখাবে…
ভদ্রতা মানে নরম হওয়া নয়—ভদ্রতা মানে শক্ত ভিতরে থাকা।
নিজেকে না হারিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচা।”
চিন্তার প্রবাহে, যেন নিজের সাথেই কথা বলছে সে,
“অভি যেভাবে নিজেকে সামলালো, যেভাবে নিজের অপমানের জবাবে কোনো রাগে নয়, বরং শিক্ষা দিয়ে জবাব দিল—সেটা আমি আগে কখনও দেখিনি।”
ওর চোখে ক্লান্তি আছে, কিন্তু সেই ক্লান্তির পেছনে একটা দায়িত্বের আলো আছে। যেটা একটা ছেলে তখনই পায়, যখন তার বাড়ির ঘরের চাল চুইয়ে জল পড়ে,তবু তার মা বলে– “তোর পড়াশোনার যেন ক্ষতি না হয়।”
“আমি বহু ছেলেকে দেখেছি যারা চিৎকার করে নিজের শ্রেষ্ঠতা প্রমাণ করতে চায়,আর এই ছেলে—একটা বাক্যে নিজের গভীরতা বুঝিয়ে দিল।আমার মনে হয়, অভির মতো মানুষের জন্যই আমাদের সমাজ এখনো বাঁচে।ওরা হেরে যায় না,
কারণ ওরা লড়াই করতে জানে—নিজেকে হারিয়ে না ফেলে।”
আমি জানি না কেন,
কিন্তু মনে হলো—এই ছেলেটা শুধু নিজের জন্য লড়ছে না,
তার পেছনে হয়তো একটা গরিব পরিবার, এক দম্পতির স্বপ্ন, একটা মাটির উঠোন,আর সবচেয়ে বড় কথা—একটা অসংখ্য আত্মত্যাগে গড়া ভবিষ্যৎ দাঁড়িয়ে আছে।”
অভির কথা ভাবতে ভাবতে একটু তন্দ্রা লেগে এসেছিল সুচির। মোবাইলের টুং টাং শব্দে সেটা কেটে গেলো। জানালা দিয়ে আলতো হাওয়া বইছে। কাজের মেয়েটা এসে চায়ের কাপ টা দিয়ে গেলো। সুচি একটু হেলান দিয়ে বসলো, গরম চায়ে এক চুমুক দিয়ে মোবাইল টা হাতে নিলো, ওহাটসঅ্যাপ, ফেসবুকে অসংখ্য ম্যাসেজের ভিড়।
ফেসবুক খুলতেই নিউজফিডে একের পর এক ছবি—কেউ নতুন সেলফি পোস্ট করছে ‘feeling cute’, কেউ অর্ধনগ্ন পোশাকে ক্যাপশনে লিখছে — “Bold is beautiful”,
আর নিচে অসংখ্য ‘লাভ রিঅ্যাক্ট’, অশালীন কমেন্ট—সব দেখে হঠাৎ মুখটা ভার হয়ে যায় সুচির। সব ভালোলাগা টা নিমেষে উধাও হয়ে গেলো।
“এ কোন প্রতিযোগিতা?কে বেশি শরীর দেখাবে? কে বেশি নিজেকে জাহির করবে? কে কতটা শরীরকে পণ্যে পরিণত করতে পারবে?আমি বুঝি না—এই শরীরটাই কি সব? আমি তো আমার স্বপ্ন, আমার চিন্তা, আমার অধ্যবসায়ের ছবি কোথাও দেখি না এখানে।
এই যে মেয়েগুলো, যারা নিজেদের শরীরের চামড়া দিয়ে সমাজের চোখ ভরাতে চায়—তারা জানে না, একদিন এই চোখ রঙ বদলাবে, আর তারা নিঃস্ব হয়ে যাবে।
কিন্তু আমি হবো না ওদের মতো।
আমি নিজেকে গড়বো—যেন আমার আত্মা নিয়ে কেউ পোস্ট করতে চায়, না যে আমি কী পরে ছবি তুললাম। আমি হবো এক অন্যরকম নারী—যার সম্মান শরীর থেকে নয়, মন থেকে জন্ম নেবে। তার কর্মের মধ্যে দিয়েই সে তার সম্মান আদায় করে নেবে।”
সুচি মনে মনে বলতে থাকে,
“আমি মুখ নয়, মেরুদণ্ড তুলে ধরবো।আমি শরীর নয়, স্বপ্ন জাহির করবো।আমি ক্যামেরার জন্য সাজবো না, আমি পৃথিবীর জন্য তৈরি হবো।”
রাতের খাওয়া শেষ হয়েছে।
বাড়ির লোকজন যে যার ঘরে।
ঘড়িতে তখন সাড়ে দশটা। কিন্তু সুচির মনে তখনও আলোড়ন।
সে চুপচাপ উঠে মায়ের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
কাঠের দরজায় নক না করেই ঢুকে পড়ল।
মা তখন একটা পাতলা উলের চাদর গায়ে দিয়ে বই পড়ছিলেন—লাল আলোয় তার মুখটা শান্ত, ক্লান্ত, কিন্তু কোমল।
সুচি হঠাৎ বলল,
“মা, একটু আসো তো আমার ঘরে।
“কেন রে কি হয়েছে?”
না না, কিছু হয়েছে এমন কিছু নয়… কিন্তু তোমার সঙ্গে কিছু কথা বলতে ইচ্ছে করছে।”
মা একটু অবাক হলেও হেসে উঠলেন,
“তুই তো সাধারণত এত রাতে কথা বলতে ডাকিস না… কী হয়েছে রে?”
সুচি মায়ের হাত ধরে টেনে নিয়ে এল নিজের ঘরে।বালিশে ঠেস দিয়ে বসিয়ে দিয়ে নিজের পাশে গিয়ে বসল।
একবার তার হাত চেপে ধরল। তারপর ফিসফিস করে বলতে লাগল তার আজকের অভিজ্ঞতা , যেন শুধু মা-ই শুনতে পায়।
দারুণ এক আবেগঘন মুহূর্ত, সুচি তার সমস্ত অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছে সেই মানুষটির সঙ্গে, যিনি সারাজীবন সংসারের নিঃশব্দ ছায়ায় থেকেছেন, ভালোবেসেছেন, কিন্তু নিজের অভিমত কখনও জোরে বলেননি—সেই মা।এ যেনো মা-মেয়ের এক অন্যরকম বন্ধন, সেই সম্পর্ক যেখানে শব্দের চেয়ে স্পর্শ বেশি গভীর, এবং চুপচাপ ভালোবাসার ব্যাখ্যা মেলে চোখে চোখে।
মা এক দৃষ্টিতে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন।
সুচি কাঁধে মাথা রাখে, কাঁপা গলায় বলে,
“মা… তুমি তো জানো, আমি বাবার সোনার দোকানে বসে থাকা মেয়ে না।আমি মানুষ গড়ার স্বপ্ন দেখি।আজ অভিকে দেখে সেই স্বপ্নটা আবার জেগে উঠল।
আর মা, আজ আমি একটা কথা বলছি,
সুচি চোখ ভিজিয়ে বলে,
“তুমি আমায় আগলে রেখেছো, মা। আজ আমি লড়তে পারছি, কারণ তুমি নীরবে আমাকে সাহস জুগিয়েছো।এইটুকুই বলতে চেয়েছিলাম। এখন ঘুম আসবে।”
মা মুচকি হেসে বললেন,
“পাগল মেয়ে একটা। তোর মুখে এই কথা শুনে, আমারও যেন ঘুম এসে গেল এবার…”
“আর রাত করিস না মা, এবার ঘুমিয়ে পর।”
মালবিকা উঠে পড়লেন, ডিম লাইট টা জ্বালিয়ে দিয়ে ,ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে এক নীরব শক্তি ও অভ্যন্তরীণ অহংকারের এক অদ্ভুত আত্মতৃপ্তি নিয়ে এগিয়ে চললেন নিজের ঘরের দিকে।
সুযোগ পেলে আর একটু বসে থাকতেন, কিন্তু সুচি ঘুমোবে—ভবিষ্যতের লড়াইয়ের জন্য বিশ্রাম দরকার।
মেয়ের ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে ফিরলেন মালবিকা।ঘরের বাতাসে শীতলতা, অথচ মনের ভেতর যেন উষ্ণ একটা ঢেউ বয়ে যায়।ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলের খোঁপা আলগা করেন।চুলের ফাঁকে ঝরে পড়ে কয়েকটা পাকা রুপালি রেখা।নিজের চোখে তাকান কিছুক্ষণ।
কোনোদিন সাজগোজ করা সেই অর্থে ভালো লাগেনি, তবু আজ যেন মুখটা নিজের কাছেই একটু আলোর মতো উজ্জ্বল মনে হয়।
মনে মনে বলতে থাকেন,
“সুচি… তুই ঠিক সেই মেয়ে, যে হওয়ার স্বপ্ন আমি দেখেছিলাম—যা হতে পারিনি, যা হতে সাহস পাইনি।কিন্তু তোকে দেখে মনে হচ্ছে… আমি ব্যর্থ হইনি।”
এটা তিনি কারো কাছে কোনোদিনও বলেন নি। আজ
শুধু নিজের বুকের গভীরে একটা অদ্ভুত আত্মতৃপ্তি অনুভব করেন।
মা হিসেবে মালবিকা সেন তার জীবনের অনেক স্বপ্নকেই চুপচাপ মুড়ে রেখেছেন সংসারের ছেঁড়া পাটির ভাঁজে।কিন্তু আজ, মেয়ের কণ্ঠে যে সাহস, স্বপ্ন আর মানবিকতার কথা শুনলেন—সেই মুহূর্তে যেন বুঝলেন, তাঁর নিজের না বলা জীবনের প্রতিফলনই সুচরিতা।
মাথাটা চুপচাপ বালিশে রাখেন। বিমল বাবু ওপাশ ফিরে শুয়ে আছেন,এতক্ষণে হয়তো ঘুমে কাদা। সারাক্ষণ সোনা রুপো ,হিরে জহরত নিয়ে হিসাব কষা মানুষটা এই মায়ের আবেগ টা কোনোদিনও বোঝেননি।
ঘরের আলো নিভিয়ে দিলেন মালবিকা।
কিন্তু তাঁর চোখে যেন এক নীরব আলো জ্বলতে থাকে—
এক মায়ের গর্ব আর এক নারীর শান্ত জয়।
বিকেলের পড়ন্ত আলো, রাস্তার পাশের গাছগুলোকে সোনালি করে তুলেছে।
কলেজ শেষে সুচি ধীরে হাঁটছে। বইয়ের ব্যাগটা কাঁধে, মাথায় হাজারটা চিন্তা—আজ বস্তিতে পড়াতে যেতে হবে, ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে গুলো অপেক্ষা করছে তার জন্য। হয়তো গিয়ে দেখবে পেটের খাবার টাও জোটেনি তাদের, তবু অধির আগ্রহে প্রতীক্ষা করছে ,তাদের প্রিয় দিদিমণির পথ চেয়ে বসে আছে সবাই।
রাস্তার ধার দিয়ে হাঁটছে সুচি,ঠিক তখনই…
ফুটপাথের পাশের একটা পুরনো কড়ই গাছের নিচে চোখ পড়ল।
সেই ছেলেটি।
অভি।
হলুদ পাতা ঝরা গাছের ছায়ায় বসে আছে।একটা মোটা পুরনো বই কোলে—মনে হয় দর্শনের কোনো কনসেপ্ট বুঝছে গভীর মনোযোগে।
চোখের ওপর ভ্রু কুঁচকে গেছে, ঠোঁট নড়ছে আস্তে আস্তে, যেন নিজের মনেই অনুবাদ করছে।
সুচির পা থেমে যায় এক মুহূর্ত।
ইচ্ছে হয় এগিয়ে গিয়ে একটা কথা বলে।
জিজ্ঞেস করে,
“তুমি কোন বইটা পড়ছো?”
বা হয়তো বলে,
“তোমার উত্তরগুলো আমাকে নাড়া দেয়, জানো?”
কিন্তু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আবার মনে পড়ে যায়—আজ বস্তির ক্লাস।ওর অপেক্ষাতে বসে আছে কিছু চোখ—যাদের জন্য সুচি তার এই জীবনযাত্রা বেছে নিয়েছে। একদিকে অভির প্রতি আগ্রহ, অন্যদিকে দায়িত্ববোধের দোলাচলে থেমে যায় সুচির পা।
সে একটু দূরে দাঁড়িয়ে অভির দিকে তাকিয়ে থাকে কয়েক মুহূর্ত।তারপর এক চিলতে হাসি ফেলে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
এগিয়ে চলে বস্তির দিকে।
বস্তির কাছাকাছি এসে মোড় ঘুরতেই অদ্ভুত শব্দ কানে এল সুচির। চিৎকার, কান্না, হট্টগোল।
বস্তির গলির সামনে ভিড় জমে গেছে।
দূর থেকে দেখেই বোঝা গেল — কিছুর একটা অশুভ ছায়া নামছে।
পাঁচ-ছয়টা বাইক, কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে।মাথায় কালো সানগ্লাস, হাতে মোটা সোনার চেন পরা একজন মস্তান—চিৎকার করছে,
“সাত দিনের মধ্যে এখান থেকে সবাই গায়েব হয়ে যাও! এ জায়গায় কমপ্লেক্স উঠবে! আর যদি এখানে কারও পা দেখি… বুঝে নিও!”
তার পেছনে দাঁড়িয়ে ত্রিশ-চল্লিশজন ছেলে, কারও হাতে রড, কারও মুখে লাল রুমাল বাঁধা।
বস্তির প্রান্তে মেয়েরা কাঁদছে, ছেলেরা আতঙ্কে ছুটোছুটি করছে, কেউ কেউ প্রতিবাদ করতে চাইছে—কিন্তু গলার স্বরেই যেন গুলি আটকে যাচ্ছে।
সুচি কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার চোখ একপলকে আটকে গেল সুট পরা এক লোকের দিকে—
চিনে ফেলল!
সেদিন বাবার ড্রয়িং রুমে সে লোক এসেছিল।ব্যবসা, জমি, নির্মাণ, বড় প্রকল্প—এই সব কথাই বলছিল।
তখন সে ভেবেছিল এটা শুধু কাগজে কলমে প্ল্যান। কিন্তু আজ দেখছে সেটা একটা কোল্ড ব্লাডেড বাস্তবতা।
সুচির মুখ সাদা হয়ে গেল। কিন্তু পা পিছিয়ে এল না।
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। বস্তির প্রবেশ মুখে দাঁড়িয়ে জোর গলায় বলে,
“এই জায়গায় তো লোকজন থাকে, মানুষ থাকে। তাদের মাথার ছাদ, রান্নাঘর, বইয়ের খাতার নিচে ঘুমানো বাচ্চা থাকে। আপনারা কীভাবে মানুষকে গাছের মত উপড়ে ফেলতে পারেন?”
মস্তান হেসে বলে,
“তুই আবার কে রে? সিনেমার সংলাপ দিচ্ছিস?”
সুচি একটু সামনে এগিয়ে আসে।
“আমি সেই মানুষ, যে বোঝে অন্যের কান্নার শব্দ। আপনি হয়তো জানেন না, এই বস্তিতে একেকটা ঘরের ভেতর আছে স্বপ্ন।আর আমি দাঁড়িয়ে আছি সেই স্বপ্নের পাশে।”
পাশ থেকে একজন বলে উঠল,
” ওস্তাদ এটাতো সেন বাবুর মেয়েটা।”
মস্তান এবার গলার রগ ফুলিয়ে বলে,
“তুই বুঝি সেন সাহেবের মেয়ে? আরে ওনার সাথেই তো চুক্তি হচ্ছে! এই জমি বিক্রি হবেই ! তুই হঠাৎ কে রে বাধা দিতে এসেছিস?”
সুচির পায়ের নিচে মাটি যেন নড়ে যায়।
“আমার বাবা…! না… আমি বিশ্বাস করি না উনি এর সঙ্গে জড়িত।আর যদি থাকেন, আমি তার বিরুদ্ধেই দাঁড়াব। মানুষের জন্য লড়ব।
ততক্ষণে কয়েকজন সাহসী ছেলে পাশে এসে দাঁড়ায়।
অনেক মেয়ে ও বাচ্চার চোখে নতুন আলো জ্বলে।
এক বৃদ্ধ মহিলা সুচিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“মা, তুই আমাদের হয়ে কথা বললি… আমাদের ঘর ফেরাবে?”
সুচি তাদের হাত ধরে শক্তভাবে বলে,
“আমরা লড়ব। যত দূর যাওয়া লাগে, যাব। এই অন্যায় মেনে নেব না।এই জমি কেবল জমি নয়—এটা জীবনের শেষ আশ্রয়।”
সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে, সুচি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না।সোজা বাবার স্টাডিরুমে গিয়ে বলে,
“বাবা, এই লোকটা—এই লোকটা কি তোমার কোনো প্রকল্পে জড়িত?সে বলছে, তুমি জমি বিক্রির চুক্তি করেছো। তুমি কি জানো, ওই জমিতে মানুষ থাকে? মানুষ, বাবা।”
সুচি উত্তেজনায় চিৎকার করে ওঠে।
“কাগজে জমি হলেও বাস্তবে সেটা কারও মাথার ছাদ।”
সেন সাহেব চেয়ারে বসে এক মুহূর্ত চুপ থাকেন।তারপর চোখে চশমা নামিয়ে বলেন,
“সুচি, আমি একটা কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছি… সেই কোম্পানি কয়েকটি জমি নিয়ে কাজ করছে।কাগজে দেখেছি – ‘অপ্রয়োজনীয় সরকারি জমি’।
কিন্তু সেখানেই যে ওই বস্তি আছে, সেটা আমাকে কেউ বলেনি।”
সুচির চোখ ভরে ওঠে।
“তাহলে তুমি জানো না? তুমি জানো না, বাবা?”
সেন সাহেব একটু চুপ করে বলেন,
“আমি কখনও চাইনি কারও ক্ষতি হোক, সুচি। আমি এত বছর ব্যবসা করেছি কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনোদিনও অসৎ পথ অবলম্বন করিনি। আমি বিষয়টা খতিয়ে দেখব।”
“আমি কথা দিচ্ছি আমি যতটা পারি বিষয়টা থামানোর চেষ্টা করব।”
সুচি কাঁদতে কাঁদতে বলে, “আমার জীবন তো তুমি চেয়েছিলে সোনার খাঁচায় বন্দি করতে…
এখন আমি সেই খাঁচার তালা ভেঙে… অন্যের জন্য লড়ব।তুমি পাশে দাঁড়াতে চাও তো ভালো, না চাইলে একাই লড়ব।”
সেন সাহেব তাকিয়ে থাকেন স্তব্ধ হয়ে।প্রথমবার বুঝতে পারেন, তার মেয়ের চোখে আগুন জ্বলে উঠেছে—যে আগুন সমাজকে আলো দেখাতে পারে।
সুচি দৌড়ে রান্নাঘরে চলে যায়, কাঁদতে কাঁদতে মাকে জড়িয়ে ধরে।
সব খুলে বলে মাকে—বস্তিতে গিয়ে দেখা, মস্তানের হুমকি, তার প্রতিবাদ, সেই স্যুট পরা লোকটি, আর সেই ভয়, শঙ্কা, অথচ ভেতর থেকে আসা সাহস।
মা পুরোটা শুনে একবারও বাধা দেন না। শুধু মেয়ের মাথায় বারবার হাত বুলিয়ে যান। মেয়েকে একটু শান্ত করার চেষ্টা করেন।
” তোর বাবার সাথে আমি পঁচিশ বছর সংসার করছি রে মা।মানুষ টা আর যাই হোক, কোনোদিনও কারোর ক্ষতি করেননি।”
মুখ চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে সে ফিসফিস করে বলে—
“সবাই ভাবে আমি সেন সাহেবের মেয়ে…অথচ তাদের চোখে এখন সেন মানে ছাদ ভেঙে ফেলা…
আমি ওদের কী বলব মা? আমি কীভাবে বিশ্বাস করব, বাবা এর মধ্যে নেই?”
মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে মালবিকা শুধু বলেন,
“তোর চোখে আমি আগুন দেখি না, আমি জলও দেখি না…আমি দেখি একটা নদী—যা বয়ে চলেছে সত্যের দিকে।
বাবা হয়তো সবটা জানে না…
কিন্তু তুই জানিস, তোর ভিতরের আলো নিভে গেলে আর কেউ জ্বালাতে পারবে না।
এই লড়াই তোর একার না। আমি আছি।”
সুচি মায়ের কোলের দিকে ঝুঁকে পড়ে। চোখের জলে ভিজে যায় মালবিকার আঁচল।
মালবিকা বলেন,
“তোর বাবার কাছে আমরা যাব…তুই যাবি সত্য নিয়ে, আমি যাব নীরব শক্তি নিয়ে।
তুই ভাঙিস না মা… কারণ তোর সাথে আমি আছি।”
সুচি চুপ করে থাকে। চোখ বন্ধ করে শুধু মায়ের বুকের শব্দ শুনতে থাকে—একটা নরম শান্তির স্পন্দন।
কিন্তু মনের মধ্যে এক আত্মদাংশনে ভুগতে থাকে,
যে বুড়ি মায়ের হাতে সে শাড়ি তুলে দিয়েছিল,আর যে বাচ্চার হাতে পুরনো রং পেন্সিল—আজ সেই চোখে ছিল ভয়, ছিল এক বাঁচার আকুতি।
আরও খারাপ লাগছে এই ভেবে, যাঁর হাতের লেখা হয়তো এসব নথিতে সই হয়ে আছে—সেই ব্যক্তি হয়তো তাঁর নিজের বাবা, সেন জুয়েলার্সের মালিক বিমল সেন।
পরের দিন। সকালটা যেন আরও একটু বেশি ধোঁয়াশা নিয়ে এসেছে সুচির জীবনে।
কলেজে ঢুকে ক্লাস করলেও মনটা বিক্ষিপ্ত।
তৃতীয় পিরিয়ড অফ। ক্যাম্পাস একটু ফাঁকা, সূর্য মাথার উপরে, বাতাসে একটুও ঠান্ডা নেই।
সুচি নিজের ভাবনার ভার মাথায় নিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল ক্যান্টিনের দিকে। হঠাৎ করেই চোখে পড়ল—
ছায়ায় বসে থাকা সেই পরিচিত মুখটা—
একটা গাছের তলায় বসে বই পড়ছে সেই ছেলেটা — অভি।
চোখ, মুখ, ভঙ্গি—সব কিছুতেই একটা নীরব, অসম্ভব মনোযোগ।চারপাশের কোলাহল যেন ওর ধারে কাছেও নেই।
সুচির হঠাৎ খুব ইচ্ছা হল কথা বলার।কিন্তু কী বলবে?
অন্যদিন শুধু পাশ কাটিয়ে গেছে, আজ যেন সাহস হল একটু বেশি।
সুচি একটু দ্বিধা নিয়ে এগিয়ে গেল।সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
অভি একটু চমকে তাকাল—চোখে শান্ত বিস্ময়।
সুচি বলল,
“এখানে একা একা পড়ছেন? চারপাশে এত হইচই… কিছুই শুনতে পান না?”
অভি হালকা হাসি দিয়ে বলল,
“সব আওয়াজ দরকারি নয়।শুনলে মন ঘেঁটে যায়।”
সুচি বসে পড়ে পাশের বেঞ্চে,
“আপনারএই ভাবনাগুলো খুব অন্যরকম। আগের দিন যে কথাগুলো বললেন… আমার মনের ভেতর ঘুরছে এখনও।”
অভি নজর সরিয়ে বলল,
“বেশি ভাবলে মন ভার হয়।
সুচি সাহস করে বলল,
“মাফ করবেন… আপনি কি সব সময় এখানে একাই বসে পড়েন?”
অভি শান্ত স্বরে বলল,
“হ্যাঁ… একা থাকতে ভালো লাগে আমার।এই ছায়াটুকু আমার নিজস্ব হয়ে গেছে। তাছাড়া আমি এখনো এই পরিবেশের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারিনি।”
সুচি হেসে বলল,
“আপনার ‘নিজস্ব ছায়া’? শুনতে খুব কবিতার মতো লাগছে।”
অভি হালকা হাসে,
“আপনি যদি শব্দগুলোকে মন দিয়ে শোনেন, অনেক কথাই কবিতা হয়ে ওঠে।”
আপনি কি সব সময় এত গম্ভীর থাকেন?”
অভি চোখ সরিয়ে নিলো,
“গম্ভীর না, আসলে… ব্যস্ত থাকি ভাবনায়।শব্দ দিয়ে যে পৃথিবী গড়ি, সেটা ভাঙলে অনেক শব্দ ব্যথা পায়।”
সুচি মুগ্ধ হয়,
“আপনার সঙ্গে কথা বললে মনে হয়, আমি যেন নিজের ভেতরকার নীরব শব্দগুলো শুনতে পাচ্ছি।”
অভি এবার তাকাল সরাসরি সুচির চোখে।নীরব চোখে বিস্ময়।এই মেয়ে অন্যদের মতো নয়।
“সবাই কি শব্দ খোঁজে নাআপনি কি খুঁজছেন কিছু?”
সুচি চোখ নামিয়ে বলে,
“হয়তো… নিজেকে।অথবা… কেউ একজন, যে বুঝবে কিছু না বলেও।”
একটু নীরবতা নামল।
পেছনে ক্যান্টিনের হাসির শব্দ, সামনের ছায়ায় এক টুকরো শান্তি।
অভি নরম স্বরে বলল,
“আপনি চাইলে… এই ছায়াটা আপনারও হতে পারে।
ভাগ করে নিতে আমার আপত্তি নেই।”
সুচির চোখে একচিলতে হাসি,
“তাহলে আমি বসে পড়লাম… আজ থেকে এই ছায়ায় জায়গা আমারও।আপনাকে বিরক্ত না করলেও মাঝে মাঝে গল্প করব।”
অভি বলল,
“বিরক্ত নয়…কিছু কিছু মানুষের আগমন শব্দ করে না, কিন্তু ছায়া ফেলে যায়।
আপনি ঠিক সেই রকম।”
তারপর দু’জনের মধ্যে নীরবতা। একটা অদ্ভুত আরামদায়ক নীরবতা।
হঠাৎ সুচরিতা জিজ্ঞেস করল, একটু কৌতূহলী কণ্ঠে,
“যদি কিছু মনে না করেন তো আপনার কথা বলবেন? আপনি কোথা থেকে এসেছেন? শুনতে কৌতূহল হচ্ছে।”
অভি একটু হেসে বলল,
“আমি অভি। বাঁকুড়ার জয়পুরের পাশে এক ছোট্ট গ্রাম কিনঝাকুরা থেকে এসেছি। ওখানে দ্বারকেশ্বর নদী বয়। আমাদের বাড়িটা নদীর ধারে,মাটির ঘর। বাবা ভ্যান চালান, মা অন্যের জমিতে কাজ করেন। খুব কষ্টে বড় হয়েছি। আমি যেদিন কলকাতায় এলাম তার ঠিক আগেই মুসল বর্ষায় মাথার ছাদটাই প্রায় ভেঙে পড়ল। ”
সুচরিতার মুখে বিস্ময়ের ছায়া।
অভি যেন নিজের অতীত নিয়ে লজ্জিত নয়, বরং গর্বিত ভঙ্গিতে বলে চলে,
“ সমস্ত দারিদ্র, সমস্ত অসহায়তা ,সমস্ত না পাওয়ার যন্ত্রণার উত্তর দেওয়ার পন্থা হিসাবে তুলে নিয়েছিলাম বই, সব যন্ত্রণার সাথে লড়ে পড়াশোনায় মন দিয়েছিলাম। উচ্চমাধ্যমিকে আর্টস নিয়ে জেলার মধ্যে সবচেয়ে ভালো রেজাল্ট করেছি। তখনই হেডমাস্টার মশাই এগিয়ে এলেন। শুধু শিক্ষক নন, তিনি যেন বাবার মতো পাশে দাঁড়ালেন। গ্রামের মানুষজনও সাহায্য করেছে। তাদের সবার স্বপ্ন আমার চোখে। অনেক ত্যাগ আর ভালোবাসার জোরে আজ আমি এখানে।আমি দর্শন নিয়ে পড়ছি। স্বপ্ন দেখি, জেলাশাসক হবো—ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট।”
সমাজে যে অবিচার দেখি, সেগুলো বদলাতে চাই।”
সুচরিতা বিস্ময়ে চেয়ে থাকে।
সে একটু থেমে দম নিয়ে বলে,
“আমি ওই অসহায় মানুষগুলোকে দেখে বড় হয়েছি, যারা দিনের পর দিন না খেয়ে থাকে, যাদের দিকে কেউ ফিরেও তাকায় না। যাদের জীবনে অবিচার শুধু নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি চাই, তাদের জীবনে ন্যায়বিচার ফিরিয়ে দিতে। সমাজের এই ঘুণ ধরে যাওয়া কাঠামোটাকে ভেঙে গড়তে চাই নতুন করে।”
সুচরিতা চুপ করে শুনছিল। তার চোখে অভির জন্য এক অন্যরকম সম্মান জমে উঠেছে।
মনে মনে বলে,
“তোমার চোখে কোনো অহংকার নেই… অথচ, তোমার ভিতরটা কী বিশাল।”
তার চোখে এক অন্য আলো। শ্রদ্ধার, উপলব্ধি।
সে ধীরে বলে,
“তোমার মধ্যে এত গভীরতা, এত লক্ষ্য… তুমি সত্যিই আলাদা। নিজের গল্পটা এমন গর্ব নিয়ে বললে, শুনে মনে হচ্ছে—এই দেশ এখনো ভালো মানুষের স্বপ্নেই বাঁচে।”
অভি হেসে বলে,
“স্বপ্নটা আমার একার নয়, যারা পথ দেখিয়েছে, যারা পাশে থেকেছে, যাদের জন্য আমি কিছু করতে চাই—সবার স্বপ্ন এটা।”
সুচরিতা চুপ করে থাকে। একটু লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলে। সে তার অজান্তেই অভিকে তুমি বলে ফেলেছে। তবে তার হৃদয়ের গভীরে এক আশ্চর্য আলো জ্বলে ওঠে—এ এক অন্যরকম অনুভব। যে ছেলেটাকে কিছুক্ষণ আগেও শুধু শান্ত স্বভাবের বলে মনে হয়েছিল, এখন তার ভিতরে সে এক অগ্নিশিখা দেখতে পায়—যা আলো দেবে অনেকের পথকে।
অভির কণ্ঠে কোনো আক্ষেপ ছিল না, ছিল না দরদ বা দয়া দাবি করা কিছুই—ছিল এক অসম্ভব শান্ত আত্মবিশ্বাস।একজন মাটির মানুষ কীভাবে নিজেকে হারায় না, বরং সমস্ত প্রতিকূলতা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে অন্যদের চোখে চোখ রেখে কথা বলে—সেই ছবিটা যেন অভির প্রতিটি বাক্যে ফুটে উঠছিল।
সুচরিতা আর কিছু বলে না। তার চোখে অভি আর একজন ‘ছেলে’ নয়, হয়ে ওঠে এক অন্তর্দর্শী সাহসী মানুষ—যার স্বপ্ন কাঁদতে জানে, জেগে থাকতে জানে, আর সমাজকে বদলে দিতে চায় নিঃশব্দ শক্তিতে।
কিছুক্ষণের নিরবতা। এদিকে দুপুরের পড়ন্ত আলোয় এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা,গাছের ছায়াটা আরেকটু দীর্ঘ হয়েছে।
সুচি আজ একটু বেশিক্ষণ বসে আছে অভির পাশে। আজ আর কোনো ক্লাস করতে ইচ্ছা করছে না।
এবার সুচি সুচি নীরবতা ভেঙে মুখ খোলে,
“আপনার সঙ্গে এতক্ষণ বসে আছি, অথচ নিজের পরিচয় টাই তো দেওয়া হয়নিতো…
“আমার নাম সুচরিতা সেন।”
অভি হালকা হাসে,
” হ্যাঁ জানি তো,এই যে সেদিন বললেন ।”
সুচি হেসে বলে,
“আমার বাবা বিমল সেন।”
একটা নিরবতা পড়ে। অভি চোখ সরিয়ে আকাশের দিকে তাকায়, যেন কিছু বুঝে নিয়েছে।
সুচি নিজের কথায় ফিরে আসে,
“বাবা বড় শিল্পপতি। সেন জুয়েলার্সের মালিক।অর্থ, প্রতিপত্তি, গাড়ি, আলিশান বাড়ি—সবই আছে।
কিন্তু জানেন, আমার ভেতরটা যেন এসবের কোনো কিছুতেই ভরে না।আমি ছোটবেলা থেকেই ভাবতাম—আমি কে? আমি কী হতে চাই?”
অভি এবার সরাসরি তাকায় তার দিকে,সুচির চোখে কোন গ্লানি নেই, আছে গভীর সংকল্প।
সুচি চোখ নামিয়ে বলে,
“অনেকে ভাবে, আমরা যারা বড়লোক ঘরে জন্মাই, তারা বুঝি সব পেয়ে যাই।
কিন্তু আমি পেয়েছি শুধু নিয়ম আর দায়িত্বের বেড়াজাল।
যেটা পাইনি, সেটা হলো নিজেকে গড়ার স্বাধীনতা।
তাই একদিন বাবাকে স্পষ্ট বলেছিলাম—আমি নিজের পছন্দে পড়ব, নিজের পথ তৈরি করব।”
অভি নরম গলায় বলে,
“আপনার মধ্যে এই যে সাহস আমি সত্যিই সম্মান করি।”
সুচি হালকা হাসে,
“সাহস তো আপনার মধ্যেও কম নেই অভি।আপনি যে জায়গা থেকে এসেছেন, যে বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজের স্বপ্ন আঁকছেন—তা অনেক বেশি কঠিন।আমার ঐশ্বর্যের চেয়ে আপনার আত্মমর্যাদা অনেক বড়।
অভি বলে,
এই যে আমি দর্শন পড়ি, কারণ আমি মানুষ চিনতে চাই। মানুষ কীভাবে মানুষ হয়ে ওঠে—তার উত্তর খুঁজি।তবে ‘উচ্চতর শিক্ষা’ আমার কাছে কখনোই সাফল্যের সিঁড়ি নয়—এটা আমার লড়াইয়ের হাতিয়ার।”
সুচি কিছুক্ষণ নীরব থাকে, তারপর বলে,
“তাই হয়তো আমি আজ এখানে, এই ছায়ায়, আপনার পাশে বসে আছি।আমি শুধু আপনার সঙ্গে আলাপ করতে চেয়েছি, কিছু শিখতে চেয়েছি।”
অভি চোখ নামিয়ে বলে,
“শিখতে তো আমাকেও হবে… আপনি জানেন সমাজের ভেতরটা, আমি জানি সমাজের নিচের স্তর।আপনার ঐশ্বর্য আর আমার অভাব—দুটো মিলেই হয়তো তৈরি হবে নতুন কিছু।”
সুচির চোখে এক চিলতে হাসি,
“হয়তো… একসাথে আমরা দুই প্রান্তের মানুষ, কিন্তু লক্ষ্য যদি এক হয়… তাহলে পথও এক হতে পারে।”
এই মুহূর্তে সুচির মধ্যে এক নতুন সংকল্প জন্ম নিচ্ছে—
সে আর শুধু শ্রোতা হয়ে থাকতে চায় না, সে চায় অভিকে শহরের মুখোশের পেছনের রুক্ষ সত্যটা দেখাতে।সেই সত্য, যা অভির মতো মাটির ছেলের কাছে স্বপ্নের শহরকে ভেঙে চুরমার করে দিতে পারে…
তবু, সেই ভাঙার মধ্যেও জন্ম নিতে পারে নতুন স্বপ্ন, নতুন সংগ্রাম।
কলেজের বারান্দা ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে আসছে। আলো নরম হতে শুরু করেছে।
সুচি একটু চুপ করে ছিল। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
“চলুন, আজ আমি আপনাকে কিছু দেখাতে চাই।”
অভি (চমকে ওঠে):
“কোথায়?”
সুচি নরম অথচ দৃঢ় গলায় বলে,
“এই শহরটা যেমন বাইরে থেকে ঝকঝকে, ভিতরে ততটাই নোংরা।শুধু দারিদ্র নয়… আছে অবিচার, স্বার্থ, ক্ষমতার খেলা।
আপনি বাইরে থেকে দেখেছেন, আমি ভিতর থেকে।
চলুন আজ আপনি আমার চোখ দিয়ে শহরটাকে দেখুন।”
অভির চোখে এক মুহূর্ত বিস্ময়, স্থির চোখে সূচির দিকে তাকায় সে ,তারপর ধীরে মাথা নাড়ে সম্মতিতে।
অভিও উঠে পড়ে, দুজনে কলেজের গেটের সামনে এসে দাঁড়ায় । একটা ফাঁকা রিকশা পেয়ে সুচি উঠে বসে,
“চলে আসুন।”
অভি ইতস্তত করতে থাকে। সুচি বুঝে যায় অভির মনে কি চলছে।
” একটা সাদ্যচেনা,সম্পর্কহীন মেয়ের সাথে এক রিকশায় উঠবেন কিনা ভাবছেন তো?”
অভি চমকে ওঠে।
” আচ্ছা আমাদের না হয় একটা সম্পর্ক তৈরি করা যাক, মনুষ্যত্বের সম্পর্ক।”
সুচির কথাগুলোতে এতটাই আন্তরিকতা ছিল যে অভি আর না বলতে পারে না।
সুচির চেনা শহরের অপরিচিত রাস্তাগুলো দিয়ে তারা এগিয়ে চলেছে।অভি একটু ঘাবড়ে গেছে, কারণ এই শহরের এই অন্ধকার দিকটা তার অজানা।
সুচি কিন্তু সম্পূর্ণ স্থির।
অভি একটু ধাতস্থ হয়ে বলে,
“আপনি তো বললেন, আপনি ঐশ্বর্যের মধ্যে বড় হয়েছেন…
এইসব জানেন কীভাবে?”
সুচি চোখ সরিয়ে নেয়,
“জানি… কারণ আমি শুধু মদের গ্লাসের ঝলক দেখি না,
আমি জানি সেগুলো তৈরি হয় কতগুলো হাতের ঘামে, যাদের কেউ দেখে না।
আর জানেন… আমি নিজের চোখে দেখেছি কতটা নির্মম ভাবে উচ্ছেদ হয় মানুষ,
কীভাবে একটা জমি দখল হয়ে যায়, আর তার জায়গায় উঠে দাঁড়ায় একটা শপিং মল।”
অভি স্তব্ধ।
সুচির চোখে অদ্ভুত তেজ,
“এই শহরের রূপ দেখে আপনি যদি মুগ্ধ হন, তবে তার ভিতরের নৃশংসতা দেখে আপনাকে রাগ করতে হবে।
আসুন, আপনাকে আজ সেই রূপটাই দেখাই।”
কথা বলতে বলতে ওর পৌঁছে গেছে তাদের গন্তব্যে,রিক্সা থেমে যায় বস্তির সামনে ভাঙা চায়ের দোকানের পাশে। ছোট ছোট ঘর, প্লাস্টিকের চাল, কাদা, শুকনো জামা ঝোলানো দড়ি,আর তার পাশ কাটিয়ে ওরা এগিয়ে চলে
সামনের বেড়ার গায়ে একটা উচ্ছেদ নোটিস—লাল কালিতে লেখা ‘WARNING’
সুচি চোখ সরিয়ে নেয়,
“এই জায়গাটা… নাকি প্রজেক্ট এরিয়া, বড় বড় কমপ্লেক্স হবে, শপিং মল হবে। আমার বাবাও নাকি সেই প্রজেক্টের অংশীদার।
কিছুদিনের মধ্যে পুরোটা মাটিতে মিশে যাবে।
কেউ কিছু করতে পারবে না।
আমি পারব না… আপনি?”
অভির চোখে বিস্ময় আর রাগ একসাথে। সে কিছু বলে না।
সুচি নরম গলায় বলে,
“এই শহরের আসল চেহারাটা আপনি জানেন, কিন্তু এখানে তার আরেক রূপ আছে—
যেটা মুছে ফেলা হচ্ছে, চাপা দেওয়া হচ্ছে।আপনি যদি সমাজ বদলাতে চান… তাহলে আপনাকে এটা দেখতেই হতো।”
অভি কিছু না বলে সামনে তাকিয়ে থাকে। তার চোখ দুটো গম্ভীর।
পেছনে সূর্য ডুবে যাচ্ছে…
আলো আর ছায়ার এই দ্বন্দ্ব যেন ওদের মাঝের বাস্তবকে প্রতিফলিত করছে।
সুচি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে অভির পাশে।
এই মুহূর্তে, দুটি ভিন্ন পথের মানুষ, একই সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে।
সূর্য তখন প্রায় অস্তমিত। হালকা রঙ ছড়িয়ে পড়ছে আকাশে।
বস্তির এক কোণে দাঁড়িয়ে অভি চুপচাপ তাকিয়ে আছে সামনের দিকটায়—
যেখানে উচ্ছেদের চিহ্ন স্পষ্ট,
যেখানে মানুষের জীবন নিতান্তই অপ্রয়োজনীয় বলে গণ্য।
অভি নিচু গলায় বলে,
“এইখানে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে… যেন কেউ আমার বুকের ওপর দিয়ে হাঁটছে।
শুধু গরিব বলেই কি ওদের স্বপ্ন দেখার অধিকার নেই?”
একটু থেমে বলে,
“আপনার বাবার কথা শুনে কিছু মনে করিনি… কারণ আমি জানি, ক্ষমতার মানুষদের কীভাবে তৈরি করা হয়।
কিন্তু আপনি—আপনি নিজে দাঁড়িয়ে আছেন এর বিরুদ্ধে।
এটাই আপনাকে আলাদা করে।”
সুচি চোখ নামিয়ে নেয়,
“কিন্তু আমি তো কিছু করতে পারছি না…”
অভি চোখ তুলে, সরাসরি সুচির চোখে চোখ রাখে,
“আপনি তো করেছেন… আপনি আমাকে এখানে এনেছেন।
আপনি শহরের এই দিকটা আমার সামনে তুলে ধরেছেন।
আমার ভাবনার সাথে আজ বাস্তবের মিল হলো।
এটাই তো শুরু…”
অভি এবার কিছুটা দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
“আমি আপনাকে একটা কথা দিতে পারি।
আজ যাদের চোখে ভয় দেখেছি, কাল আমি তাদের চোখে সাহস ফিরিয়ে দেব।
আমি একা ছিলাম, আজ থেকে নই।আপনি আমার পাশে আছেন।”
সুচির চোখে জল। অভি চেয়ে থাকে তার দিকে—কোনো প্রেম নয়, কোনো আহ্লাদ নয়—
শুধু একটা গভীর বন্ধনের জন্ম, যে বন্ধন গড়ে উঠছে সত্য, প্রতিবাদ আর মানবিকতার বোধ থেকে।
অভি নীচু স্বরে বলে,
“এই শহরকে বদলাতে হবে ।নিজের মতো করে… ভিতর থেকে।”
—oooXXooo—
![]()







