আরাকানে ভূতের ফাঁদ
বাসুদেব দাশ
তান্ত্রিক তারা শঙ্কর দত্ত বাড়ীতে আরাম কেদারায় শুয়ে একটু আয়েস করে বিড়ি টানছিল। হঠাৎ ডোর বেল বাজার আওয়াজ পেয়ে উঠে এসে দরজা খুলে দেখে হাবু আর গবু দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা আলুর চপের ঠোঙা। হাবু আর গবু ভিতরে ঢুকে সোফায় বসে। তারা শঙ্কর স্ত্রী মধুবালাকে ডাক দিয়ে তিন কাপ চা আর একটা বাটিতে করে মুড়ি দিতে বলে দেয়। চা মুড়ি খেতে খেতে তারা শঙ্কর বলে…আজ তোদের একটা ভয়ঙ্কর ভূতের গল্প বলবো। তবে শুনে ভয় পাস না যেন। ঠাকুর দার মুখে শোনা সেই গল্পটাই আজ বলবো তোদের। ঠাকুর দা এক বার আরাকানের রাখাইন প্রদেশে গিয়েছিল একটা বিশেষ কাজে। আমার ঠাকুর দা, কিরণ শঙ্কর দত্ত যে বাড়ীতে ছিলেন সেই বাড়ীর গ্রামের লোকেরা ভূতের আতঙ্কে দিন কাটাতো। বাড়ীর মালিক বিপদ ভঞ্জন বললেন… এক দিন আমার ছোট ছেলে নৃপেন বিকাল বেলা স্যারের কোচিং এ পড়তে গিয়েছিল। ফেরার পথে একটু দেরি হয়ে হয়েছিল। বাড়ী ফেরার পথে একটা বাঁশ ঝাড় পড়তো। তার কাছে একটা খবর স্থান ছিল। মগ দোস্যুরা যে মানুষ গুলোকে মেরে ফেলে রেখে যেত সেই লাশ গুলোকে এখানে কবর দিয়ে দেওয়া হতো। সন্ধ্যার পর যখন ও ঐ পথ দিয়ে হেঁটে হেঁটে ফিরছিল ও দেখতে পায় একটা থুরথুরে বৃদ্ধ লোক কবরের পাশে বসে আছে। অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় নৃপেন একটু ভয়ে ভয়ে পথ হাটঁছিল। বৃদ্ধ লোকটি নৃপেনকে কাছে ডাকে। নৃপেন এই লোকটিকে এর আগে কোন দিন দ্যাখেনি। তাই ও সাহস পাচ্ছিল না। তাও কাছে গিয়ে বৃদ্ধর পাশে দাঁড়ায়। কাছে যেতে বৃদ্ধ লোকটি বলে… তুমি
কি আমাকে ভয় পাচ্ছো ? নৃপেন….. হ্যাঁ, আমি আপনাকে চিনি না। বৃদ্ধ লোক… “তুমি আমাকে চিনবে কেমন করে আমি তো এখন আর এই গ্রামে থাকি না। অনেক আগে থাকতাম। ” নৃপেন…. “তুমি এখন কোথায় থাকো ? “বৃদ্ধ… “আমি আর কোথাও থাকি না। চলো আমি তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসি। তুমি তো বিপদ ভঞ্জনের ছেলে।” নৃপেন… “তুমি আমার বাবাকে চেনো ? “বৃদ্ধ… “বিলক্ষন চিনি। আমি এই গ্রামের সবাইকে চিনি। ” নৃপেন… “কেমন করে চেনো? ” বৃদ্ধ… ” নাম ধরে ধরে চিনি। ” নৃপেন… “নাম ধরে চেনো ? ” বৃদ্ধ… ” হ্যাঁ নাম ধরে চিনি। “এরপর থেকে নৃপেনের সঙ্গে বৃদ্ধর খাতির হয়ে যায়। রোজই নৃপেনের সঙ্গে বৃদ্ধর দেখা হতে থাকে। এই ভাবে চলার কয় এক দিন বাদে এক দিন নৃপেন পড়তে গিয়ে আর বাড়ী ফিরে আসেনি। তন্ন তন্ন করে খুঁজে নৃপেনকে পাওয়া যায় নি। নৃপেন কোথায় হারিয়ে যায়। কেউ নৃপেনকে ঝুঁজে পায় না। সারা গ্রামে রটে যায় খবরটা। গ্রামের মানুষ চিন্তিত হয়ে পড়ে। ভয়ে আতঙ্কে তাদের দিন কাটতে থাকে। বিপদ ভঞ্জনের মনে পড়ে যায় যে নৃপেনকে বৃদ্ধ লোকটি বলে ছিল যে সে কোথাও থাকে না। এর মানেটা কি ? তারপর থেকে কবরের কাছে বসে থাকা সেই বৃদ্ধ লোকটিরও কোন হদিস পায়নি কেউ । তাকে আর ওখানে বসে থাকতে দেখা যায় না। প্রায় মাস খানেক বাদে আর এক জন ছাত্র, বাবন ঐ বৃদ্ধ লোকটিকে কবরের পাশে বসে থাকতে দেখতে পায়। বৃদ্ধ লোকটি এই বাবনের সঙ্গেও আলাপ জমাতে চায়। বৃদ্ধ লোকটি এক দিন বাবনকে লজেন্স দেবে বলে ডেকে নিয়ে যায়। অনেক রাস্তা যাবার পর বাবনের মনে ভয় হয়। সে বলে “তুমি আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছ ? “বৃদ্ধ বলে “আর একটু গেলেই দোকান আছে সেই দোকান থেকে লজেন্স কিনে দেবো। ঐ দেখো দোকানটা দেখা যাচ্ছে। ” বাবন সামনের দিকে তাকিয়ে দেখে যে দোকান একটা আছে ঠিকই এবং সেই দোকানে কয়েক জনকে ঘুরে বেড়াতেও দেখা যাচ্ছে কিন্তু তাদের চোখ গুলো সব গোল গোল আগুনের গোলার মতন। মনে হচ্ছে এক্ষুনি ঐ গলা গুলো তীব্র বেগে ছুটে এসে আমার বুকে বিঁধে বুকটাকে ঝাঁজরা করে দেবে। আর বড় বড় কোদালের মতো সাদা সাদা দাঁত দেখা যাচ্ছে। এই রকম দাঁত সাধারণ মানুষের দেখা যায় না। বাবন বেশ ভয় পেয়ে যায়। শরীরের মধ্যে একটা কাঁপুনি অনুভব করে। শরীরের শিরায় শিরায় রক্ত প্রবাহের গতি যেন দ্রুত থেকে দ্রুততর হয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে দাঁতে দাঁত লেগে ঠক ঠক করে আওয়াজ হচ্ছে। বাবন সব বুঝতে পারছে কিন্তু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। ভয়ে ভয়ে বলে… “তোমার কাছে পয়সা আছে ? ” বৃদ্ধ… “আমাদের পয়সা লাগে না। ও সব তোমাদের লাগে। “বৃদ্ধর এই কথা শুনে বাবনের ভীমরি খেয়ে পড়ে যাবার জোগাড়। সে দৌড়ে পিছন দিকে চলে আসে। সে বাড়ী এসে বৃদ্ধর সব কথা বলে দেয় বাবা মাকে । বাড়ীর লোকেরা চিন্তায় পড়ে যায়। তাদের সন্দেহ হয় ঐ বৃদ্ধ লোকটির পরিচয় নিয়ে। সারা গ্রামের লোক জড় হয়ে কবরের কাছে ভিড় করলে ঐ বৃদ্ধ লোকটি ওখান থেকে উধাও হয়ে যায়। তাকে আর কোন দিন কবরের পাশে বসে থাকতে দেখা যায় নি । তখন গ্রামের সবার ধারণা হয় যে তাহলে ঐ বৃদ্ধ লোকটি নিশ্চয়ই কোন অশরীরী আত্মা। সেই নৃপেনকে ধরে নিয়ে গিয়ে ঘাড় মটকে মেরে ফেলেছে। মাস খানেক বাদে রমেন নামে একটি সাত আট বছরের ছেলে সন্ধ্যা বেলা সুবলের দোকানে গিয়েছিলে চিনি কিনতে। চিনি কিনে বাড়ী ফেরার সময় তার সঙ্গে একটা চার পাঁচ বছরের ছেলের সাথে দেখা হয় রাস্তায়। ছেলেটি রমেনকে ডাকে। রমেন কাছে যেতেই সেই বাচ্চা ছেলেটা একটা বিকট দানবের মতো চেহারা ধরণ করে। রমেন কাঁপতে কাঁপতে পরে যায়। দানবাকৃতি লোকটা রমেনকে জাপ্টে ধরে বাঁশ ঝাড়ের মধ্যে মিলিয়ে যায়। আর কোন দিন রমেন বাড়ী ফিরে আসেনি। সারা গ্রাম তোলপাড় হয়ে যায় এই ঘটনায়। এরপর নকুল নামে একটা ছেলের সঙ্গে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে থাকে। নকুল রাস্তায় বের হলে দেখতে পেতো একটা কুকুর তার দিকে তাকিয়ে থাকে এক দৃষ্টে এবং সে এগিয়ে গেলে তার পিছন পিছন কুকুরটাও হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যেত। এক দিন ও এক প্যাকেট বিস্কুট কিনে কুকুরটাকে দিতে গেলে কুকুটা সঙ্গে সঙ্গে নেকড়ে হয়ে নকুলকে কামড়াতে আসে । কুকুরটা কি করে নেকড়ে হলো সেটা ভাবতে গিয়ে ভয় পেয়ে নকুল অবাক হয়ে হুঁশ হারিয়ে মাটিতে পড়ে যায়। তারপর নেকড়ে রূপী কুকুরটা পালিয়ে যায়। অনেকক্ষণ অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকে মাটিতে। গ্রামের একটা লোক ঐ রাস্তা দিয়ে আসতে গিয়ে নকুলকে ঐ অবস্থায় দেখতে পায় সে আরও কয়েক জনকে ডেকে নিয়ে এসে নকুলকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যায়। প্রায় এক মাস হাসপাতালে ভর্তি থেকে নকুল ভালো হয়ে বাড়ী ফিরে আসে। আরও কয়েক জন এই ভাবে হারিয়ে যায় গ্রাম থেকে। গ্রামের মানুষ বুঝতে পারে না যে কি করে এই সব হচ্ছে। এর কোন প্রতিকারও করতে পারে না। তারা শুধু হাহাকারই করতে থাকে।
এরপর অনেক দিন ধরে সব ঠিকঠাক চলতে থাকে। কোন গন্ডগোল নেই। কেউ আর গ্রাম থেকে হারিয়ে যায়নি। অর্পণ বেহারা নামে একটি যুবক নিয়মিত ভোর বেলা মাঠে যায় চাষের কাজ করতে। ও বাড়ী ফিরে আসলে ওর বাবা যায় মাঠে। ভোর বেলা অন্ধকার থাকতে থাকতে ও মাঠে যায়। তাড়াতাড়ি করে চাষের কাজ শেষ করে সকাল ন টার সময় বাড়ী ফিরে আসে। বাড়ীতে এসে স্নান করে খেয়ে দেয়ে কলেজে যায় পড়াশোনা করতে। কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে অর্পণ। ভোর বেলা যখন ও চাষের মাঠে যায় তখন প্রায় প্রতিদিনই ও একটি ষোলো সতেরো বছরের মেয়েকে দেখতে পায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে। মেয়েটি মুখে কিছু বলে না। শুধু তাকিয়ে থাকে নীরবে। বেশ কয়েক দিন একই ভাবে কেটে যায় নীরবতা নিয়ে। অর্পণও কিছু বুঝতে পারে না। অর্পণের মনের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। যত দিন যায় ততই অর্পণের মনে জটিল জটিল প্রশ্নের উদ্ভব হতে থাকে। একটা প্রশ্নেরও সে সমাধান খুঁজে পায় না সে। মাঝে মাঝে ভাবে কিছু একটা জিজ্ঞেস করে আবার ভাবে তাতে যদি ও রেগে যায়। রেগে গিয়ে যদি হুলুস্থূল কান্ড বাঁধিয়ে বসে
। তবে তো মান ইজ্জতের কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। গ্রামে টেকা দায় হয়ে যাবে। অযাচিত ভাবে কিছু জিজ্ঞেস করার জন্য সে নিজের মধ্যে সাহস সঞ্চয় করতে থাকে। এই ভাবে চলতে চলতে সাহস বাড়িয়ে সে এক দিন মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে… “তুমি কে ? “
মেয়েটি কোন উত্তর না দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। সে আবার বলে.. “তোমার নাম কি ? তুমি কোথায় থাকো ? ” তাও মেয়েটি কোন উত্তর দেয় না । রেগেও যায় নি। এতে অর্পণ খুব অবাক হয়ে যায়। মেয়েটিকে যেমনি সুন্দর দেখতে তেমনি তার স্নিগ্ধ চাহনি। চেহারার মধ্যে একটা নম্র ভদ্র ভাব লক্ষ করা যায়। মুখ মন্ডলের মধ্যে একটা শান্তির বার্তা প্রকাশ পায় । এরকম একটা মেয়েকে অর্পণ ভুলে থাকতেও পারছে না। ওকে নিয়ে নানা ভাবনা ভাবতে ওর খুব ভালো লাগে। মনের মধ্যে একটা সুখ অনুভব হয়। নিজের মনের আয়নায় মেয়েটার একটা প্রতিচ্ছবি সে দেখতে পায় সারাক্ষণ। কয়েকদিন পর এক দিন ভোর বেলা অর্পণ ঘর থেকে বের হয় মাঠে যাবার জন্য। সেদিন মেয়েটি রাস্তায় যেখানে প্রতি দিন দাঁড়িয়ে থাকতো সেখানে তাকে দেখতে পায় না অর্পণ। দেখতে না পেয়ে ওর খুব মন খারাপ হয়ে যায়। অর্পণ সারা রাস্তা ও আশেপাশের সব অঞ্চল তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়ায় কিন্তু মেয়েটাকে দেখতে পায় না। সেদিন মাঠের কাজ না করে মনে কষ্ট নিয়ে অর্পণ বাড়ী ফিরে আসে। মেয়েটির চিন্তা তার মনের মধ্যে উথাল পাথাল হতে থাকে। অনর্গল এক কথা বার বার ভাবতে ভাবতে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে অর্পণ। ঘুমের মধ্যে অর্পণ স্বপ্নে দেখে যে ঐ মেয়েটি ওকে নিয়ে একটা বিরাট বড় বাড়ীতে উঠেছে । বাড়ীটা রাজ প্রাসাদের মতো। ভিতরের বৈঠক খানায় সুদৃশ্য বিশাল একটা ঝাড় বাতি ঝুলছে তাতে রাজ বাড়ীর ঐতিহ্য বহন করছে। ঘরের দেওয়ালে সুন্দর সুন্দর কারুকার্য করা কাঠের আসবাব পত্র আছে যেগুলো সচরাচর সাধারণ মানুষের ঘরে দেখা যায় না। বাড়ী ভর্তি লোক হৈ চৈ করে আনন্দ করছে। কত রকমের ভালো ভালো সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। সে এক এলাহী ব্যাপার। হঠাৎ মা এসে খেতে ডাক দিতে ঘুমটা ভেঙে যায় তার সঙ্গে স্বপ্নটাও ভেঙে যায়।
কয়েক দিন বাদে মন খারাপ নিয়ে অর্পণ ভোর বেলা মাঠে যাওয়ার জন্য বের হয়। চাষবাস তো করতেই হবে। না হলে খাওয়া পড়া সব বন্ধ হয়ে যাবে। বাড়ী থেকে কিছুটা এগোনোর পর অর্পণ দেখতে পায় যে মেয়েটি চোখে জল নিয়ে রাস্তায় ঠিক আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। অর্পণের ধরে প্রাণ আসে ওকে দেখে। তার ফ্যাকাশে মুখটা জ্বল জ্বল করে ওঠে। চিলতে এক ফালি চাঁদের মতো তার দুই ঠোঁটের মাঝ খানে হাঁসির রেখা ফুটে ওঠে। অর্পণ কাছে যেতেই মেয়েটি বলে.. “আমার খুব শরীর খারাপ হয়েছিল তাই আসতে পারি নি। তুমি আমার খোঁজ করনি কেন ? “অর্পণ… “আমি তোমায় অনেক খুঁজিছি কিন্তু কোথাও পাই নি । আর তছাড়া তুমি তো তোমার বাড়ীর ঠিকানা আমাকে বলে যাও নি । তাই তো আমি তোমার বাড়ী যেতে পারিনি। যাক তুমি এখন কেমন আছো ? ” মেয়েটি…” এখন ঠিক আছি। ” অর্পণ… “ডাক্তার দেখিয়েছো ? “মেয়েটি… “আমাদের ডাক্তার দেখাতে লাগে না। ” অর্পণ…”সে কি ? তবে সারে কি করে ? ” মেয়েটি মাঝে মাঝে এমন সব কথা বার্তা বলে যা শুনে অর্পণের সব তালগোল পাকিয়ে যায়। আচৈতন্য হয়ে পড়ার মত অবস্থা হয়।
মেয়েটি… আমার তো বাড়ী নেই তাই কি করে তোমাকে বাড়ীর ঠিকানা বলবো। ” অর্পণ… “তোমার নাম তো বলো। ” মেয়েটি… “আমার নাম সুতৃষ্ণা। ” অর্পণ…”আচ্ছা সুতৃষ্ণা তুমি কোন ক্লাসে পড়ো? ” সুতৃষ্ণা… “আমি পড়ি না। অনেক দিন আগে আমি পড়া ছেড়ে দিয়েছি। সেই যে দিন ওরা আমাকে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে মেরে ফেলেছিলো সে দিন থেকে আমার পড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ” অর্পণ… “সে কি ? তোমাকে কারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল ? সুতৃষ্ণা…. মগরা। অর্পণ… ওরা ভীষণ খারাপ লোক। সুতৃষ্ণা….খুব খারাপ ওরা। অর্পণ….তাহলে তুমি এখন আসছো কেমন করে ? ” সুতৃষ্ণা… আমার খুব বাঁচতে ইচ্ছে করতো ভালোবাসতে ইচ্ছে করতো। তাই তো আমি তোমাকে দেখার জন্য রোজ রোজ এখানে এসে দাঁড়িয়ে থাকি। সেই ইচ্ছেটা পূরণ করার আশা নিয়ে। আমি যেখানে থাকি সেখানে এক দিন তোমাকে নিয়ে যাবো।” তুমি যাবে তো ? ” অর্পণ…” হ্যাঁ যাবো। তুমি আমাকে যেখানে নিয়ে যাবে আমি সেখানেই যাবো। আমি তোমার জন্য সব কিছু করতে পারি। ” সুতৃষ্ণা… “বাহ্ শুনে খুব ভালো লাগলো। মনে জোর বাড়লো।” অর্পণ…. “আমার তোমাকে একদম কাছ ছাড়া করতে ইচ্ছা করে না। ” সুতৃষ্ণা… “তুমি কি আমাকে ভালোবাসো ? “অর্পণ… “খুব।” সুতৃষ্ণা… ” আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি। ” এক দিন অর্পণ যখন জড়িয়ে ধরেছিলো সুতৃষ্ণাকে তখন সুতৃষ্ণার মনের মধ্যে মানবীয় চৈতন্য গুলো জেগে ওঠার চেষ্টা করছিলো। তার ছাপ ওর চোখে মুখে ফুটে উঠেছিল। এরপর সুতৃষ্ণা প্রতি দিন নিয়ম করে রাজ ভোগ,পান্তুয়া, ক্ষীরের চপ নিয়ে আসতে থাকে অর্পণের জন্য। অর্পণ… “তুমি এত পয়সা পাও কোথায় যে প্রতি দিন খাবার কিনে আনো ? ” সুতৃষ্ণা… ” আমার পয়সা লাগে না। ও সব তোমাদের লাগে। ” সুতৃষ্ণার এই সব কথার মানে বুঝতে পারে না অর্পণ। অদ্ভুত লাগে ওর। কিন্তু ও সুতৃষ্ণাকে ছেড়ে থাকতে পারে না। সুতৃষ্ণার সাথে এক দিন দেখা না হলে ওর সব কিছু উলোট পালোট হয়ে যায়। এক সময় অর্পণের বাড়ীর লোকেরা জেনে যায় ওদের সম্পর্কের বিষয়টা। তখন ওকে সবাই মিলে পই পই করে বারণ করে সুতৃষ্ণার সাথে মিশতে। এও বলে যে এই মেলামেশার পরিনাম খুব ভয়ঙ্কর দিকে যাবে। এর মূল্য দিতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিতে হবে। কালচারাল লেভেলটাও দেখা দরকার আছে। আমাদের কালচারের সঙ্গে ওদের কালচার মিশ খাবে না। ওদের জীবন বোধ আর আমাদের জীবন বোধ এক হবে না। তাই এই সম্পর্ক সুখের হবার আশা খুব কম। অর্পণ তার বাবা মাকে বলে…. তোমরা সব আগ বাড়িয়ে ভাবছো। বিষয়টা যেন গাছে কাঁঠাল গোপে তেল এর মতো। মা,… কেনো ? তুই তো মেয়েটাকে ভালোবাসিস। অর্পণ… কিন্তু মেয়েটার বিষয়টাও তো বুঝতে হবে। জানি না ওর কি চিন্তা ভাবনা। তোমরা আগের থেকে এতসব ভাবতে যেও না।
ভালোবাসা আর পাগলামো কি সমার্থক কথা ? কারো কারো ক্ষেত্রে মনে হয় দুটো কথা একই অর্থ বহন করে । পাগলামো না থাকলে মনে হয় ভালোবাসাকে ঠিক ভাবে অনুভব করা যায় না। অর্পণ যা করছে সেটা পাগলামো ছাড়া আর কিছুই না। ও জানে না ওর এই ভালোবাসার পরিনাম কি। জানতে চাও না। প্রাণ ভোরে শুধু ভালোবাসার ঘ্রান নিয়ে নিজে খুশি থাকতে চায়।
অর্পণ….সুতৃষ্ণা তুই কি তোর বাড়ীতে বলেছিস আমাদের কথা ?
সুতৃষ্ণা…. না সে ভাবে বলা হয়নি। বলতে ভয় করছে। জানি না সবাই কিভাবে নেবে ? আমার ভাই বাবাকেও মেরে ফেলেছে ওরা।
অর্পণ….. ওরা কারা ?
সুতৃষ্ণা…. আরাকানের মগরা। যারা মগ জল দস্যু নামে সামধিক পরিচিত। সেই সময় এই মগরা ত্রাসের সৃষ্টি করে তুলেছিল মানুষের মনে।
অর্পণ…সেই মগ দস্যুদের কথা যদি তুই জানিস একটু বল তো শুনি। সুতৃষ্ণা…
শোন তবে সেই ভয়ঙ্কর মগদের কথা..
সেই সময় মায়ানমার বা আরাকানের রাখাইন প্রদেশে দুটো ধর্মের মানুষ বসবাস করতো। এক বৌদ্ধ আর দুই মুসলমান। বৌদ্ধধর্ম অবলম্বীদের বলা হতো মগ আর মুসলমান ধর্ম অবলম্বীদের বলা হত রোহিঙ্গা। তবে রোহিঙ্গাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার হিন্দুও ছিল। এই মগ কথাটা মগদ থেকে না মঙ্গল বা মঙ্গ থেকে এসেছে সেটা নিয়ে বিভিন্ন মতো আছে। তবে এই কথাটা যে অর্থে ব্যবহার হয় সেটা আমরা প্রায় সবাই জানি। মগ ও রোহিঙ্গা এই দুটো সম্প্রদায়ের মানুষই ইতিহাসে দুর্ধর্ষ দস্যু হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছিল ।” এদের দাঙ্গার ইতিহাস কে না জানে। ভয়ানক দাঙ্গা বাজ ছিল এই মগ জল দস্যুরা । এরা এক সময় ত্রাস হয়ে উঠেছিল বাংলার মানুষের কাছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের কক্স বাজার অঞ্চল জুড়ে। তোরা মগের মুল্লুক প্রবাদটা শুনেছিস কিন্তু এর পিছনের বিরাট নির্মম ইতিহাসটা জানিস না ” গবু… ” না, জানি না। ” আজ থেকে চারশো পাঁচশো বছর আগের কথা। তখন আরাকানে মগদের রাজত্ব ছিল। মগ কথার অর্থ হলো যেখানে কোন শাসন ব্যবস্থা নেই। চরম অব্যবস্থা, যা ইচ্ছে তাই করা যায় বা বিশ্রীঙ্খল অবস্থা। মুল্লুক কথাটা আরবি থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো স্থান বা জায়গা। চার পাঁচ শো বছর আগে আরাকান ও বাংলার যে অঞ্চল জুড়ে এই মগ জল দিস্যুরা দৌড়ত্ব চালাতো সেই অঞ্চলে কোন শাসন ব্যবস্থা ছিল না। পুরোপুরী অরাজক অবস্থা চলতো। সেই জন্য মগের মুল্লুক প্রবাদটা প্রষিদ্ধ লাভ করেছিল। লুটপাট অপহরণ চালাতো এই মগ জল দশ্যরা। আরাকানের মগরা পর্তুগীজ জলদস্যুদের সাথে মিলিত হয়ে বাংলা জুড়ে মারধর লুটপাট চালাচ্ছিল প্রবল ভাবে। লুটপাট করে বাড়ী ঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিত। অঞ্চলের পর অঞ্চল পুরে ছাই হয়ে যেত। হঠাৎ হঠাৎ ছোট ছোট নৌকো নিয়ে জল পথে বঙ্গপোসাগরে উপকূলবর্তী গ্রাম জুড়ে তাণ্ডপ চালাতো। আক্রমণ চালিয়ে লুটপাট করতো, অপহারণ করতো বাড়ী ঘর পুড়িয়ে দিত এই মগ দোস্যুরা। মগ দোস্যুদের উপদ্রপে ভেঙে পড়েছিল বাঙলার শাসন ব্যবস্থা। দিল্লির নবাব তখন শাহজান। তখন বাংলার সুবেদার ছিলেন শায়েস্তা খাঁ। শাজাহানের নির্দেশে ১৬৬৬ সালে শায়েস্তা খাঁ এই জল দোস্যুদের শায়েস্তা করে দিয়েছিলেন। সেই থেকে শায়েস্তা করার প্রবাদটার প্রচলন শুরু হয়। এদের দৌড়াত্ব নির্মূল হয় ইংরেজ আমলে। মগরা বাংলা দেশের একটি উপজাতি। মগদের প্রধান বসতি অঞ্চল গড়ে উঠেছিল বাংলাদেশের বান্দরবন জেলায়। আরাকানে বসবাসকারি সব মানুষই যে মগ ছিল এমনটা ঠিক না। মগ বর্ণমালার নাম ঝাঁ। এরা আরাকানি ভাষার কথ্য রূপ ও শঙ্কর ভাষার ব্যবহার করে। এছাড়া চীনা ও বর্মী ভাষার সাথেও মিলে রয়েছে।
অর্পণ…. তোর গা টা এতো ঠান্ডা কেনো রে ?
সুতৃষ্ণা…. আসলে আমার শরীরে রক্ত নেই তো তাই।
অর্পণ…. রক্ত নেই মানে কি ?
সুতৃষ্ণা…. নেই মানে নেই।
অর্পণ এই কথার কিছুই মানে করতে পারলো না। শুধু শুনলো আর অবাক হলো।
সুতৃষ্ণা…. ওকি তুই কাঁদছিস কেন ?
অর্পণ….. জানি না।
ভালোবাসার যে কত রকম রং আছে সে সব জানে না সুতৃষ্ণা। ভালোবাসার মানুষের ছোঁয়া পাবার আগেই যে সে হারিয়ে গিয়েছিল জীবন থেকে।
সুতৃষ্ণা….তোর মা বাবা আমাকে অবহেলা করবে না তো ? অর্পণ…. না। আমার মা বাবা খুব ভালো মানুষ। আমি এক দিন তোকে আমাদের বাড়ী নিয়ে যাবো।
সুতৃষ্ণা…. তুই এক দিন আমার আস্তানায় এসে দ্যাখ মানিয়ে নিতে পারিস কিনা। তারপর না হয় আমি তোর বাড়ী যাবো।
অর্পণ মনে মনে ভাবে হয়তো তাঁদের এই প্রেম কোন দিন পরিণতি নাও পেতে পারে তবুও মন তো মানে না। সত্যিকারের ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়। কথা মতো অর্পণ এক দিন সুতৃষ্ণাদের আস্তানায় যাবে বলে সুতৃষ্ণার সাথে বের হয়। কিছু দূর যাবার পর রাস্তায় একটা জায়গায় একটা গণ কবর পরে। মগ দস্যুরা মানুষ মেরে এই কবরে কবর দিয়ে দিত। সেখানে এসে সুতৃষ্ণা মিলিয়ে যায়। অর্পণ সুতৃষ্ণাকে খুঁজে পায়না। উদভ্রান্তের মত এদিক ওদিক দৌড়া দৌড়ি করতে থাকে। চিৎকার করে ওর নাম ধরে ডাকাডাকি করতে থাকে। হঠাৎ দেখে কত গুলো অদ্ভুত টাইপের লোক ওকে ঘিরে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বিকৃত টাইপের হাত পা চোখ মুখ ওদের। ওদের এক জন বলে সুতৃষ্ণা তো বলে কেউ নেই এখানে। সে চলে গেছে। তুমি যাবে তার কাছে ? অর্পণ… হ্যাঁ আমি যাবো সুতৃষ্ণার কাছে। ঐ অদ্ভুত লোক গুলো… ঠিক আছে চোখ বোজো। অর্পণ চোখ বোজে। ওদের মধ্যে থেকে একটা লোক অর্পণের চোখে মুখে তিন বার ফুঁ দেয়। অর্পণ বেহুঁশ হয়ে যায়। তারপর লোকগুলো অর্পণকে কবরের মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়ে যায়। ভিতরে ঢুকে অর্পণ দেখে যে এটা যেন স্বর্গ থেকেও দুন্দর। এতো সুন্দর সুস্বাজ্জিত ইমারত সে এর আগে কখনো দেখে নি। এর উপর দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ। সাদা টাইপের ধোঁয়া ধোঁয়া পেজা তুলোর মতো মেঘ উড়ে বেড়াচ্ছে। হাত বাড়িয়ে দিলে হাত ভিজে যাচ্ছে। হঠাৎ দেখে তার সামনে সুতৃষ্ণা ফুল হাতে নিয়ে তার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। সুতৃষ্ণাকে দেখে অর্পণ ধরে প্রাণ ফিরে পায়। সে খুশিতে চিৎকার করতে থাকে । আনন্দে তার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসে। অর্পণ… “তুমি কোথায় চলে গিয়ে ছিলে ? ” সুতৃষ্ণা… “তোমার জন্য ফুল আনতে। “অর্পণ… “আমাকে ফেলে আর কোথাও যাবে না তো ?” সুতৃষ্ণা…. “না আর কোথাও আমি যাবো না। তুমি পারছো তো মানিয়ে নিতে ?” অর্পণ… “হ্যাঁ, ভীষণ সুন্দর জায়গা। “সফল হলো সুতৃষ্ণার ভালোবাসার স্বপ্ন।
অর্পণ তার বাবা মাকে ভুলে গেছে এখানে এসে। তার মন থেকে বাবা মায়ের চ্যাপ্টারটা ডিলিট হয়ে গেছে অলৌকিক ভাবে। ওদিকে তার বাবা মা তাকে খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে গেছে। অনেক খোঁজা খুঁজি করে অর্পণকে আর কোত্থাও পেলো না। অর্পণও হারিয়ে গেলো অজানার দেশে।
সমাপ্ত
![]()







