মা গৃধঃ
শ্যামাপ্রসাদ সরকার
ঘনায়মান অন্ধকার আবৃত করে আছে এই বনস্থলীটির অভ্যন্তরভাগ। অতিনিকটে এক ক্ষীণ জলধারা প্রবাহিত হচ্ছে। তার সুমসৃণ ধারা কম্পিত হচ্ছে ঈষৎ প্রস্তরাবৃত ভূখন্ডের উপর প্রবাহিত হওয়ার সময়। এইটুকু স্থান পার হলেই স্রোতধারাটি যেন সুবহ ও তরঙ্গায়িত ভঙ্গিতে অনতিদূরের কোশল রাজ্যের দিকে চলে যাবে।অরণ্যটি বাহ্যিক দর্শনে মনোলোভা। তবে এর গূঢ় অভ্যন্তর শ্বাপদ পরিবেষ্টিত।
অরণ্যের প্রবেশমুখ রক্ষা করে দন্ডায়মান এক অতিপ্রাচীন শৈলশ্রেণী। বহুকাল ধরে শৈলশ্রেণীটি বনানীর দ্বাররক্ষক হিসাবে দন্ডায়মান। বেষ্টিত ঘনহরিৎ বনরাজির ঘনত্ব বহুযুগ ধরে ক্রমসঞ্চিত হয়ে দ্বারপালের গাম্ভীর্যটি বৃদ্ধি করে তুলেছে। হঠাৎ অশ্বক্ষুরধ্বনি আবহে গুঞ্জরিত হয়ে অবশেষে সুসজ্জিত অশ্বটিকে অনির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে ধাবিত হতে দেখা গেল।
বাহ্যত অশ্বটি বন্যপ্রজাতির নয়। নিকটস্থ মহাজনপদের মহাসামন্ত মান্যবর কুশধ্বজের অশ্ব এটি। প্রবীণ রাজ্যপাল কুশধ্বজ সম্প্রতি কোশল রাজের অনুগামী হয়ে মগধ বিজয়ের পথে সুনিপুণ দক্ষতায় সৈন্যসঞ্চালনায় ব্যস্ত।
তার এই প্রবাসবাসের আপাতত একপক্ষকাল অতিক্রান্ত। সম্প্রতি তার সুপুত্র রণধ্বজ পিতার অনুপস্থিতিতে অশ্বচালনায় প্রশিক্ষণে রত। সে বয়সে কিশোর, তার কোনও অসতর্কতা হেতু ‘তেজপাল’ নামক সুপ্রশিক্ষিত অশ্বটি নিয়ন্ত্রণের অভাবে বনাভিমুখে ছুটে চলেছে পৃষ্ঠদেশটি চালকের ভারমুক্তি ঘটিয়েই।
অরণ্যটি যে শ্বাপদসংকূল তা পূর্বেই বর্ণিত। এমতাবস্থায় কোনও সপটু চালকবিহীন অশ্বটি যে অচিরেই ব্যাঘ্রাদির সুখাদ্যে পরিণত হতে পারে তা প্রায় পূর্বনির্ধারিত বলা যেতে পারে।
একটি ভীমকায় কৃষ্ণাঙ্গ যুবা বল্গা আকর্ষণ করে অশ্বটির গতি রোধ করল। যুবকটির নাম রঙ্ক। ভীল জাতীয় নিষাদবংশের সে একমাত্র বংশপ্রদীপ। অল্পবয়সেই সে যুদ্ধনিপুণ ও অশ্বচালনা ও শিকারে পটু। বাল্যকাল থেকৃই পারিবারিক সহজতা তাকে বনেচর হিসাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে তুলেছে। আহার সন্ধানের জন্য শিকার তার নিত্যনৈমিত্তিক অভ্যাস। এইকাজে সে অরণ্যবিহারে রত থাকার সময় বল্গাহীন অশ্বটি আপাতত তার কব্জায়। অশ্বটির পৃষ্ঠে কোশল রাজের সীলমোহর অঙ্কিত দেখে সে স্থির করল অশ্বটিকে রাজমন্দুরায় ফিরিয়ে দেবে কয়েকটি স্বর্ণমন্ডিত নিষ্কের বিনিময়ে। অশ্বটির বল্গা একহাতে ধারণ করে সে নিকটবর্তী নদীটির দিকে বিশ্রামের জন্য অগ্রসর হল।
এতক্ষণে সে একটি গোধিকা ও একটি ময়ূর সে শিকার করেছে। পল্লীতে ফিরে সে স্থির করেছে এই দুটি জীবের মাংস অগ্নিসংস্কার করে আজকের মত আহার করবে। ডোম্বীজাতীয় এক বিশেষ পানীয় সহযোগে আজকের নৈশাহারটি বর্ণময় হওয়ার সাথে দশটি স্বর্ণনিষ্কের সম্ভাবনায় সে আনন্দিত হয়ে অশ্বটির বল্গাকে একটি বৃক্ষের শাখার সাথে বেঁধে সে জলপানের উদ্দেশ্যে নদীবক্ষের দিকে অগ্রসর হল।
কিছুক্ষণ পর জলপান করে উঠে আসার সময় সে শুনতে পেল এক সান্দ্র মনুষ্যকন্ঠ। কন্ঠস্বরের উদগাতাটি প্রথমে সহজেই দৃষ্টিগোচর হলনা। বরং তার কন্ঠে শ্রুত হতে লাগল একটি সাহায্যভিক্ষার ধ্বনি। শব্দ অনুসরণ করে অগ্রসর হতেই সে দেখতে পেল এক পিঙ্গল বর্ণের যুবাকে। একাকী বনমধ্যে এই যুবাটি একাকী কি করছে? এটাই তার মনে প্রশ্নের উদ্রেক ঘটাল।
চীরপরিহিত হলেও যুবকটিকে সদ্বংশজাত বলেই মনে হল। আয়তাক্ষ নয়নদুটি ভাবালু ও একই সাথে কিছুর অণ্বেষণে স্পৃহ। সে তার হস্তধৃত পেটিকা থেকে একটি রসাল ফল যুবকটিকে ভক্ষণের উদ্দেশ্যে প্রদান করল। সে নিশ্চিত যে এই বিদেশী যুবাটি অভুক্ত।
ক্লান্তনেত্র যুবকটি এই অযাচিত দানের বিনিময়ে স্মিত হেসে বলল, ‘ হে নিষাদপুত্র! আমি অশক্ত বটে তবে কেবল আহারের প্রয়োজনে আপনাকে স্মরণ করিনি। আমি বনমধ্যে পথভ্রষ্ট হয়েছি মাত্র। আমাকে কোশল রাজ্যের দিকটি নির্দিষ্ট করে দিলে উপকৃত হব। ‘
রঙ্ক অতি বিস্মিত হয়ে যুবাটির পরিচয় জ্ঞাতার্থে সচেষ্ট হল। পিঙ্গলবর্ণী আয়তচক্ষু পুনরায় তাকে স্মিত হাস্যে বলল, ” আমি একজন অনুসন্ধানকারী মাত্র। মনুষ্যজীবনের মূল লক্ষ্যটির প্রসঙ্গে কিছু ধারণা আমার জন্মালেও এখনও তা করায়ত্ত হয়নি। এমনকি ইহলোকে অবস্থানকালে কি কি করণীয় হলে একজন মানুষ অচিরেই পরমার্থকেও অনুভব করতে সক্ষম হবে সেই সত্য অণ্বেষণের পথে আমি যাত্রা করেছি। লিচ্ছবি রাজ্যে আমার পিতামাতা, পত্নী ও একমাত্র শিশু পুত্র জীবিত থাকলেও আমি আমার সামান্য জীবন এই অণ্বেষণের কাজে ব্যয় করব বলে সংসারের সংশ্রব ত্যাগ করতে সচেষ্ট হয়েছি। হে দয়াবান এখন আমাকে পথনির্দেশ দিলে অত্যন্ত বাধিত হব !
প্রায়ান্ধকার অরণ্যানীর আবহে এই কথালাপটি ভারী বিস্ময়কররূপে রঙ্ককে ভাবিত করল। একজন সচ্ছল ও সদবংশীয় যুবা হয়ত সমবয়সী, তবুও কি অবলীলায় সর্বসুখ পরিত্যাগ করে অরণ্যবনানীর পথে আদিষ্ট হয়েছেন এক অন্য জাগতিক অণ্বেষণকল্পে।
সে নিজে একজন সাধারণ মনুষ্যসন্তান। ভাবজগতে বিচরণে অপটু। নিত্যদিনের জীবিকাঅর্জন তার একমাত্র কাম্য। তবুও সে বিহ্বলের মত বিদেশি পিঙ্গলদেহী যুবকটিকে সযত্নে ‘তেজপালে’র পৃষ্ঠে আরোহণ করতে সাহায্য করে কোশল অভিমুখে অশ্বচালনা করল।
যাত্রাপথে যুবকটি নিশ্চুপে তার ভাবোন্মেষের সন্ধানে সংযতচিত্ত থাকল। ক্রমে অরণ্যমেখলার আবরণ সরে কোশল নগরী দৃশ্যমান হতে সে এবার রঙ্কপালকে অশ্বের গতি নিবৃত্ত করতে অনুরোধ করল।
সহযাত্রী যুবাটির একান্ত ইচ্ছা সাধারণ্যে এক ভিক্ষুকের ন্যায় তার নগরে প্রবেশ করা। সম্প্রতি সে একটি কথার সারবত্তা খুঁজে পেয়েছে তা হল অনিয়ন্ত্রিত মন আসলে মানুষকে বিভ্রান্তিতে ফেলে। তাই মনকে প্রশিক্ষিত করতে পারলে চিন্তাগুলোও সবার নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
এই অদ্ভূত কথাগুলি আপনমনে উচ্চারণ করতে করতে সে ধীরপদে কোশল অভিমুখে অশ্বপৃষ্ঠ পরিত্যাগ করে অবশেষে পদব্রজে অগ্রসর হল ।
কোশল রাজ্য এখন অনতিদূরেই।
পূর্বপরিকল্পনানুযায়ী রাজমন্দুরায় অশ্বটিকে ফিরিয়ে দেওয়ার পথে রঙ্কপালের পেটিকা স্বর্ণ নিষ্ক দ্বারা লাঞ্ছিত হল বটে তবে তার মনোজগতেও এক আশ্চর্য আলোড়ন উঠল। আজ আগের অরণ্যবনানীর অন্দরে সে যে এক অলৌকিক পিঙ্গলদেহী আয়তচক্ষু যুবকের সাথে পরিচিত হল যার মুখে উচ্চারিত হচ্ছিল , ‘ মা গৃধঃ ! তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা মা গৃধঃ কস্য স্বিদ্ধনম্ ‘ !
এ যেন এক অলৌকিক সম্ভাষণ। সে নিজে দেবভাষা সম্পর্কে অবহিত নয়। তবুও যুবকটির বাচনে যে আন্তরিকতার ছোঁয়া পেল সেটা সে কোনওদিন বিস্মৃত হতে পারবে না।
সে নিশ্চিত যে কালাকালের সাগরে পুনরায় একদিন তার মিলিত হবে। তার মত সাধারণ নিষাদজীবি মানুষকে দেখতে পেয়ে পূর্বপরিচয়ের কথাটি নিশ্চয় অস্বীকার করবে না এই তদ্ভাবাপন্ন দেবকল্প যুবাপুরুষটি। প্রশান্ত হৃদয়ে রঙ্কপাল অনুভব করল যে একটি ছুটন্ত অশ্বের পৃষ্ঠে কোশল অভিমুখে সহযাত্রার বিনিময়ে আসলে লাভ করেছেএক আশ্চর্য মুখনিঃসৃত মন্ত্র, ‘মা গৃধঃ!’
শতসহস্র স্বর্ণ নিষ্কও এই মহাদানের কাছে অনর্থক।
—oooXXooo—

![]()







