তোকে ক্ষমা করিনি
বারিদ বরণ
মেঘলাকে অর্কের মা প্রথম দিন থেকেই পছন্দ করতেন। পছন্দ বললে হয়তো কম বলা হবে—তিনি মেঘলাকে নিজের ছেলের ভবিষ্যৎ স্ত্রী হিসেবেই দেখতে শুরু করেছিলেন। অর্ক আর মেঘলার সম্পর্ক তখন প্রায় সাত বছরের। এই সাত বছরে মেঘলা কতবার যে এই বাড়িতে এসেছে, তার হিসেব কারও কাছে ছিল না। কখনও দুপুরে, কখনও সন্ধ্যায়। অর্কের মা মেঘলা এলেই রান্নাঘরে ঢুকে পড়তেন। মেঘলার পছন্দের ডালটা আলাদা করে রাখতেন, মাছের কাঁটা বেছে দিতেন, শীতকালে নিজের হাতে বোনা সোয়েটার দেখিয়ে বলতেন,
“তোর মাপটা ঠিক মনে আছে তো, এইবার তোকে একটা বানিয়ে দেবো।”
মেঘলা হাসত। মাঝে মাঝে বলত,
“মাসিমা, আপনি আমাকে এত আদর করেন কেন?” মা তখন খুব স্বাভাবিক গলায় বলতেন,
“কেন আবার? তুই তো আমার মেয়েই।”
অর্ক পাশ থেকে হাসত। সে জানত না, এই ছোট ছোট কথাগুলো তার মায়ের কাছে কতটা সত্যি হয়ে উঠেছে।
মেঘলার কাছে অবশ্য ব্যাপারটা এত গভীর ছিল না। সে অর্ককে ভালোবাসত, কিন্তু তার ভালোবাসার মধ্যে একটা সীমা ছিল। অর্কের সঙ্গে সংসার করার কথা ভাবলে তার সামনে ভেসে উঠত ছোট ফ্ল্যাট, অর্কের মধ্যবিত্ত চাকরি, মাসের শেষে হিসেব করে চলা, ছুটির দিনে বাড়িতে থাকা, মায়ের সঙ্গে বসে চা খাওয়া। আর অন্যদিকে তার নিজের কিছু স্বপ্ন ছিল—বড় শহরের দামি রেস্তোরাঁ, বিদেশ ভ্রমণ, সুন্দর বাড়ি, গাড়ি, সামাজিক পরিচিতি, এমন একজন মানুষ যার পাশে দাঁড়ালে লোকজন ঘুরে তাকাবে। অর্ককে সে কখনও ঘৃণা করেনি। বরং অর্ক ছিল ভালো ছেলে—বিশ্বাসী, নির্ভরযোগ্য, মায়ের প্রতি দায়িত্বশীল। কিন্তু মেঘলার কাছে ভালো মানুষ হওয়া আর ভালো জীবন দেওয়া এক জিনিস ছিল না।
অর্ক একদিন বলেছিল,
“আর কতদিন? এবার বাড়িতে কথা বলি?”
মেঘলা উত্তর দেয়নি। অর্ক আবার বলেছিল,
“মা তোকে অনেকদিন ধরেই নিজের বউ ভাবছে।” মেঘলা সেদিন জানলার বাইরে তাকিয়ে বলেছিল,
“সবকিছু কি এত সহজ?”
অর্ক ভেবেছিল, মেঘলা হয়তো বিয়ে নিয়ে ভয় পাচ্ছে। আসলে মেঘলা অন্য কিছু ভাবছিল।
সেই সময়েই হঠাৎ করেই মেঘলার জীবনে আসে সৌরভ। একটি বহুজাতিক সংস্থায় কাজ করে, শহরের অভিজাত মহলে ওঠাবসা, দামি গাড়ি, বিদেশে যাওয়া, পরিপাটি জীবন। প্রথমে মেঘলা নিজেকেই বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে এটা শুধু বন্ধুত্ব। কিন্তু ধীরে ধীরে সে বুঝে গেল, সৌরভের পাশে দাঁড়িয়ে যে জীবনটা সে দেখতে পাচ্ছে, অর্কের সঙ্গে সে জীবনটা পাবে না। অর্কের সঙ্গে তার সাত বছরের সম্পর্ক তখন তার কাছে ভালোবাসার স্মৃতি নয়, বরং একটা পুরনো অভ্যাস হয়ে উঠেছিল। আর অভ্যাস ভাঙতে মানুষের যতটা কষ্ট হয়, মেঘলার ততটা হয়নি।
এক সন্ধ্যায় অর্ক তাকে জিজ্ঞেস করেছিল,
“তুই কি অন্য কাউকে ভালোবাসিস?”
মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল,
“হ্যাঁ।”
অর্কের বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। সে শুধু বলেছিল,
“কতদিন?”
মেঘলা উত্তর দিয়েছিল, “এই তো কিছুদিন।”
“আমাকে বলিসনি কেন?”
মেঘলা এবার অর্কের দিকে তাকিয়েছিল। তার চোখে অপরাধবোধের চেয়ে বিরক্তিই বেশি ছিল।
“কারণ জানতাম, তুমি এটা মেনে নিতে পারবে না।” অর্ক হেসেছিল। সেই হাসিতে কান্না ছিল।
“তুই কি আমাকে ছেড়ে চলে যাবি?”
মেঘলা বলেছিল, “হ্যাঁ।”
এত সহজ একটা শব্দ যে একটা মানুষের সাত বছরের জীবনকে ভেঙে দিতে পারে, অর্ক সেদিন প্রথম বুঝেছিল। সে অনেক অনুরোধ করেছিল। বলেছিল,
“আমি সব বদলে দেব।”
মেঘলা বলেছিল,
“তোমার সবকিছু বদলানোর দরকার নেই। আমি শুধু আমার জীবনটা অন্যরকম চাই।”
অর্ক শেষবার বলেছিল, “আমাদের ভালোবাসাটা?” মেঘলা খুব শান্তভাবে বলেছিল,
“সব ভালোবাসা বিয়ে পর্যন্ত যায় না, অর্ক।”
সেই কথাটা অর্কের মনে অনেকদিন কাঁটার মতো ছিল। কিন্তু সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার কষ্টের থেকেও বড় আঘাত তখনও তার জন্য অপেক্ষা করছিল। অর্কের মা কিছুই জানতেন না। অর্ক মাকে বলতে পারছিল না।
একদিন মেঘলা নিজেই ফোন করল।
“মাসিমা, আপনার সঙ্গে একটু কথা ছিল।”
মা স্বাভাবিক গলায় বলেছিলেন,
“কী হয়েছে রে? অর্ক কিছু বলেছে?”
মেঘলা বলেছিল,
“না। আমি একটা কথা বলতে ফোন করেছি। অর্ককে আপনি আর আমাকে নিয়ে কিছু বলবেন না।”
মা কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন।
“কেন রে ?”
মেঘলা বলেছিল, “আমাদের বিয়ে হবে না।”
মায়ের গলাটা কেঁপে উঠেছিল।
“কেন? তোদের মধ্যে কিছু হয়েছে?”
মেঘলা তখন নিজের সিদ্ধান্তটাকে সহজ করার জন্য এমন একটা কাজ করেছিল, যার পরিণতি সে হয়তো সেদিন কল্পনাও করেনি। সে বলেছিল,
“অর্ক আমাকে ছাড়তে চাইছে না। কিন্তু সত্যিটা হল, ও নিজেও আর এই সম্পর্কটা চায় না। শুধু আপনাকে কষ্ট দিতে পারবে না বলে আমাকে ধরে রেখেছে।”
মা কিছুক্ষণ কোনও কথা বলেননি। তারপর খুব আস্তে জিজ্ঞেস করেছিলেন,
“অর্ক তোকে এটা বলেছে?”
মেঘলা বলেছিল,
“হ্যাঁ।”
কথাটা মিথ্যে ছিল। অর্ক কোনওদিন এমন কথা বলেনি। কিন্তু মেঘলা তখন নিজের নতুন জীবনের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, আর পুরনো জীবনের শেষ দরজাটা বন্ধ করতে তার এই মিথ্যেটুকু প্রয়োজন মনে হয়েছিল। মা বলেছিলেন,
“তুই কি অন্য কাউকে বিয়ে করবি?”
মেঘলা বলেছিল, “হ্যাঁ।”
“তাহলে অর্ককে বলবি না কেন?”
মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল,
“ওকে আপনি বুঝিয়ে বলবেন। আমি চাই না ও আমাকে নিয়ে আর কোনও ঝামেলা করুক।”
“ এসব তুই কি বলছিস মেঘলা?”
মেঘলার শেষ কথা ছিল,
“জীবন আবেগ দিয়ে চলেনা মাসিমা।”
তারপর ফোনটা কেটে দিয়েছিল। মেঘলা জানত না, ফোনের ওপাশে একজন মা বসে নিজের সাত বছরের বিশ্বাসকে এক মুহূর্তে ভেঙে পড়তে দেখছেন।
মা অর্ককে ফোন করেননি। অপেক্ষা করেছিলেন। সন্ধ্যায় অর্ক বাড়ি ফিরলে মা তাকে চা দিয়েছিলেন। অর্ক মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝেছিল কিছু একটা হয়েছে।
“কী হয়েছে মা?”
মা শুধু বলেছিলেন,
“তুই কি আমাকে কোনওদিন কিছু বলতে চেয়েছিলি?”
অর্ক অবাক হয়ে বলেছিল,
“কী?”
মা উত্তর দেননি। কিছুক্ষণ পর খুব আস্তে বলেছিলেন, “আমি কি তোর জীবনে কোনওদিন বোঝা হয়ে গেছি?”
অর্ক যেন কথাটার অর্থই বুঝতে পারেনি।
“এসব কী বলছ মা?”
মা চোখ নামিয়ে বলেছিলেন,
“কিছু না।”
সেদিন রাতেই খাওয়ার পর হঠাৎ মায়ের বুকে তীব্র ব্যথা শুরু হয়। অর্ক তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পথেই তাঁর অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে যায়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে পৌঁছনোর আগেই সব শেষ। ডাক্তার বলেছিলেন, তীব্র হৃদ্রোগের আক্রমণ হয়েছে। অর্ক সেই রাতটা বিশ্বাস করতে পারেনি। কয়েক ঘণ্টা আগেও যে মানুষটা তার সামনে বসে ছিল, সে আর নেই। মায়ের শেষ কথাটা বারবার কানে বাজছিল—“আমি কি তোর জীবনে কোনওদিন বোঝা হয়ে গেছি?”
অথচ সে জানত, তার মা কখনও তার কাছে বোঝা ছিলেন না। বরং তাঁর জন্যই তো এতদিন নিজের জীবনটাকে সামলে রেখেছিল।
মায়ের মৃত্যুর পর বাড়িটা হঠাৎ এত নিঃশব্দ হয়ে গিয়েছিল যে অর্ক নিজের পায়ের শব্দও শুনতে পেত। তেরো দিনের কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর একদিন মায়ের ফোনটা হাতে নিয়ে বসেছিল সে। ফোনটা অনেকদিন ধরে মায়ের বালিশের পাশে পড়ে ছিল। অর্ক আসলে কিছু খুঁজছিল না। শুধু মায়ের ফোনটা বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল। সেই সময় কল-লিস্টে মেঘলার নামটা চোখে পড়ল। নামটার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে অর্কের বুকের ভেতরটা কেমন যেন শক্ত হয়ে গেল। মেঘলার সঙ্গে মায়ের শেষ ফোনটা হয়েছিল সেদিন সন্ধ্যায়—তার মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে। অর্ক জানত না, ফোনে কী কথা হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল, মৃত্যুর আগে মা তাকে যে কথাটা বলেছিলেন—“তুই কি আমাকে কোনওদিন বোঝা মনে করেছিস?” কথাটা এতদিন ধরে তার মাথায় ঘুরছিল। সে জানত, মায়ের ওই প্রশ্নের কোনও স্বাভাবিক কারণ ছিল না। আর সেই কারণটা হয়তো এই ফোনের ওপাশেই ছিল। ফোনের রেকর্ডিং ফিচারে কলটা সংরক্ষিত ছিল। অর্ক কিছুক্ষণ দ্বিধা করে সেটি চালু করল। মায়ের সাথে মেঘলার কথোপকথন পুরোটা শুনল সে।
মেঘলা ফোনটা কেটে দিয়েছিল, তবে রেকর্ডিংটা সেখানেই শেষ হয়নি। মায়ের গলা শেষবার শোনা গিয়েছিল,
“তুই তো আমার মেয়ের মতো ছিলি…”
রেকর্ডিং শেষ হয়ে গিয়েছিল। অর্ক অনেকক্ষণ ফোনটা হাতে নিয়ে বসে ছিল। তার চোখ দিয়ে জল আসেনি। যেন কান্নারও আর জায়গা ছিল না। শুধু বুকের ভেতর একটা অসহ্য ঘৃণা জমে উঠছিল। সে আবার রেকর্ডিংটা শুনল। তারপর আর একবার। মেঘলার সেই ঠান্ডা গলা, “জীবন আবেগ দিয়ে চলে না”—কথাটা তার কানে হাতুড়ির মতো বাজছিল। অর্ক ফোনটা তুলে মেঘলার নম্বরে কল করল। বহুদিন পর। মেঘলা ফোন ধরতে একটু সময় নিয়েছিল।
“হ্যালো?”
অর্ক সরাসরি বলল,
“তুই মাকে কী বলেছিলি?”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর মেঘলা খুব ঠান্ডা গলায় বলল,
“কোন কথা?”
“তুই আমার মাকে শেষ ফোন করেছিল। সেই ফোনের রেকর্ডিং আমি শুনেছি।”
এবার মেঘলা একটু বিরক্ত হল।
“তাহলে আবার আমাকে জিজ্ঞেস করছ কেন?” অর্কের গলা কাঁপছিল।
“তুই মাকে মিথ্যে বলেছিলি যে আমি তোকে আর চাইছিলাম না?”
“মিথ্যে?”
অর্ক চেঁচিয়ে উঠল।
মেঘলা হেসে বলল,
“তুমি কি সত্যিই আমাকে ছাড়তে চাওনি ?”
“আমি তোকে বিয়ে করতে চেয়েছিলাম।”
“চেয়েছিলে। কিন্তু আমার কী চাই সেটা কি একবার ভেবেছিলে?”
অর্ক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“তুই জানতিস মা তোকে কতটা ভালোবাসে।” “জানতাম।”
“তাহলে ওই কথাগুলো বললি কী করে?”
মেঘলার গলায় এবারও কোনও অনুশোচনা ছিল না।
“কারণ আমাকে এই সম্পর্কটা শেষ করতে হয়েছিল। তোমার মা আমাকে আটকে রাখতেন আবেগ দিয়ে। আমি সেটা করতে দিতে পারিনি।”
অর্ক দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“তোর কথাগুলো শোনার পর মা সেই রাতেই মারা গেছে।”
মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “তার জন্য আমাকে দায়ী করছ?”
অর্ক উত্তর দেওয়ার আগেই সে বলল,
“তোমার মা যদি আমাকে এত ভালোবাসতেন, তাহলে আমার সিদ্ধান্তটা মেনে নিতে পারতেন। একজন মানুষের নিজের জীবন বেছে নেওয়ার অধিকার আছে।”
অর্ক স্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু মেঘলা থামল না।
“আর একটা কথা বলি? এত বছর ধরে তোমার সঙ্গে থাকার কারণে আমার জীবনটাই নষ্ট হয়েছে। তুমি আমাকে আটকে রেখেছিলে। তোমার সঙ্গে থাকলে আমি কোথায় থাকতাম জানো? সেই একই জীবন, একই বাড়ি, একই হিসেব। তুমি আমাকে একটা জীবন দিতে পারতে না, অর্ক। আমি সেটা বুঝেছিলাম।”
অর্ক ধীরে বলল,
“তাই বলে মাকে তুই মিথ্যে বলবি?”
“নিজেকে বাঁচানোর জন্য যা দরকার, মানুষ তাই করে।”
“তুই নিজেকে বাঁচাসনি, মেঘলা। তুই শুধু নিজের সুবিধাটা বেছেছিস।”
মেঘলা ঠান্ডা গলায় বলল,
“তুমি যেটাকে সুবিধা বলছ, আমি সেটাকে আমার অধিকার বলি। আর তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা নিয়ে এখন আর কোনও আলোচনা করতে চাই না। সেটা শেষ।”
অর্কের শরীরের প্রতিটি স্নায়ু যেন শক্ত হয়ে গিয়েছিল। সে বুঝেছিল, যে মানুষটাকে সাত বছর ভালোবেসেছিল, তার কাছে সেই সাত বছর এখন শুধু একটা ভুল সিদ্ধান্ত। মায়ের মৃত্যুর কথাটাও তার কাছে কোনও অপরাধ নয়। নিজের কাজকে সে এখনও ঠিক বলেই মনে করছে। অর্ক আর কিছু বলল না। শুধু শেষবার বলল,
“তুই জানিস না, তুই কী করেছিস।”
মেঘলা বলল,
“আর তুমি জানো না, তুমি আমার জীবন থেকে কী কী কেড়ে নিয়েছ।”
অর্ক ফোনটা কেটে দিল। এত জোরে নয়, কোনও নাটকীয় শব্দ করে নয়। খুব ধীরে। যেন ওই একটা ছোট্ট কাজের মধ্য দিয়েই সে নিজের জীবনের একটা দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দিল। তারপর মায়ের ফোনটা বুকের কাছে চেপে ধরে অনেকক্ষণ বসে রইল। সেদিন অর্ক প্রথমবার কাঁদেনি। তার মনে হয়েছিল, কিছু কিছু মানুষের জন্য চোখের জলও অপচয়।একজন সস্তা চরিত্রের মেয়েকে ভালোবেসে নিজের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়টুকু সে নষ্ট করেছে।
মেঘলাকে সে সেদিন শুধু হারায়নি। সে তাকে নিজের সমস্ত স্মৃতি থেকে আলাদা করে ফেলেছিল। সাত বছরের ভালোবাসার জায়গায় শুধু একটা শব্দ রেখে দিয়েছিল—ঘৃণা।
সেই দিন থেকে মেঘলা আর কখনও যোগাযোগ বা ফোন করেনি। কোনও ক্ষমা চাওয়া নয়, কোনও ব্যাখ্যা নয়, কোনও ফিরে আসার চেষ্টা নয়। যেন সাত বছরের সম্পর্ক, অর্কের মা, সেই বাড়ি, সবকিছু তার জীবনের একটা পুরনো অধ্যায় ছিল, যেটা সে বন্ধ করে দিয়েছে।
অর্ক প্রথম কয়েক মাস শুধু রাগ নিয়ে বেঁচেছিল। তারপর সেই রাগ ধীরে ধীরে ঘৃণায় পরিণত হয়েছিল। কিন্তু ঘৃণার থেকেও বড় ছিল একটা শূন্যতা। বাড়ির দরজা খুলে আর কেউ বলত না,
“এসেছিস?”
রান্নাঘরে কেউ তার জন্য ভাত গরম রাখত না। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে কেউ ফোন করে জিজ্ঞেস করত না,
“খেয়েছিস?”
মেঘলা তার প্রেম কেড়ে নিয়েছিল, কিন্তু তার মা চলে যাওয়ার পর অর্ক বুঝেছিল,সে আসলে তার জীবনের এমন একটা জায়গা ভেঙে দিয়ে গেছে, যেটা আর কোনওদিন পূরণ হবে না।
অর্কও আর কোনওদিন মেঘলার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টাও করেনি। মেঘলার নম্বরটা ফোন থেকে মুছে দিয়েছিল কি না, সে কথাও তার মনে নেই। শুধু একটা সময়ের পর মেঘলার নামটা আর তার দৈনন্দিন জীবনে আসত না। অথচ মানুষকে জীবন থেকে সরিয়ে দেওয়া আর তার স্মৃতিকে মুছে ফেলা এক নয়। অর্ক কাজের মধ্যে ডুবে থেকেছে, নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু কোনও কোনও রাতে বাড়ি ফিরে মায়ের ঘরের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়ালে তার মনে হতো, পৃথিবীতে তার নিজের বলে যে জায়গাটা ছিল, সেটাই যেন আর নেই।
মায়ের মৃত্যুর পর সংসারটা চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাকে অনেক কিছু নতুন করে শিখতে হয়েছিল। আগে যে মানুষটি তার প্রতিটি ব্যর্থতার পর বলতেন,
“আবার চেষ্টা কর, হয়ে যাবে”,
সেই মানুষটি আর ছিলেন না। কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আর কেউ বলতেন না,
“ভেবে দেখিস, তুই যেটা ভালো বুঝিস করিস।”
সাফল্যের খবর দেওয়ার মতো মানুষ ছিল না,ব্যর্থতার দিন মাথায় হাত রাখার মতোও কেউ ছিল না। তবু অর্ক থামেনি। হয়তো থামতে পারেনি। মেঘলার বলা কথাটা—তার সঙ্গে থাকলে অর্ক তাকে কোনও জীবন দিতে পারত না—অর্কের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই ক্ষতকে প্রতিশোধের অস্ত্র না করে সে নিজের অক্ষমতাগুলোকে চিনতে শুরু করেছিল। সে বুঝেছিল, শুধু কাউকে ভালোবাসলেই জীবন চলে না; নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও দরকার। তবে সে এই ক্ষমতা অর্জন করতে চেয়েছিল নিজের জন্য, মেঘলাকে একদিন দেখিয়ে দেওয়ার জন্য নয়।
প্রথম কয়েক বছর তার জীবন ছিল একটানা পরিশ্রম আর অনিশ্চয়তার। কাজের জায়গায় ভুল হয়েছে, প্রত্যাশামতো ফল আসেনি, যেসব পরিকল্পনায় সে ভরসা করেছিল সেগুলোর কোনও কোনওটা মাঝপথে ভেঙে গেছে। কখনও মনে হয়েছে, এত চেষ্টা করেও বুঝি কিছু হবে না। তবু পরদিন সকালে আবার কাজে বসেছে। কারণ সে জানত, তার ব্যর্থতার খবর শুনে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো মা আর নেই, আর সেই অভাবের দায় অন্য কারও ওপর চাপিয়ে দিয়ে লাভও নেই। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করল। নিজের কাজের ওপর তার দখল বাড়ল, অভিজ্ঞতা বাড়ল, মানুষের বিশ্বাস অর্জন করল।
ছোট পরিসরে শুরু করা কাজ একসময় বড় হয়ে উঠল। দশ বছরের মাথায় অর্ক এমন একটি জায়গায় পৌঁছল, যেখানে আর্থিক অনিশ্চয়তা তার প্রতিদিনের সঙ্গী নয়। নিজের বাড়ি হল, কাজের পরিধি বাড়ল, পরিচিতিও এল। একসময় যে মধ্যবিত্ত জীবনের জন্য মেঘলা তাকে অযোগ্য ভেবেছিল, সেই জীবনকে অর্ক নিজের পরিশ্রমে এমন জায়গায় নিয়ে গেল, যেখানে অন্যের চোখে নিজেকে প্রমাণ করার আর কোনও প্রয়োজন রইল না। তবু তার সাফল্যের সবচেয়ে বড় মুহূর্তগুলোতেও একটা অভাব থেকে গিয়েছিল। কোনও গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরে সে কখনও কখনও অভ্যাসবশত ফোনটা হাতে নিত, মনে হতো মাকে খবরটা দেবে। তারপর মনে পড়ত, খবরটা শোনার মানুষটি নেই। সাফল্য তাকে স্বচ্ছলতা দিয়েছিল, আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল, কিন্তু অতীতের সেই রাতটাকে বদলে দিতে পারেনি।
সাফল্যের কোনও পর্যায়েই সে মেঘলাকে খুঁজতে যায়নি। মেঘলা কোথায় আছে, কেমন আছে, তার জীবনে কী ঘটছে—এসব জানার কোনও আগ্রহ সে বাঁচিয়ে রাখেনি। তার কাছে মেঘলা ছিল এমন এক অতীত, যার কথা মনে পড়লে ভালোবাসার চেয়ে বিশ্বাস ঘাতকতার যন্ত্রণা তাকে বেশি কষ্ট দিত। সে মেঘলাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু মায়ের শেষ প্রশ্ন আর ফোনের রেকর্ডিংটা কোনওদিন ভুলতে পারেনি।
অন্যদিকে মেঘলার জীবনও তার নিজের পছন্দমতো পথে এগিয়েছিল—অন্তত প্রথম দিকে। সৌরভের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল। শহরের অভিজাত এলাকায় সুন্দর ফ্ল্যাট, দামি আসবাব, বিদেশে বেড়াতে যাওয়া, পরিচিত মহলে ওঠাবসা—যে জীবনকে সে একসময় নিজের প্রাপ্য বলে মনে করত, তার অনেকটাই সে পেয়েছিল। কিন্তু যে জীবনকে বাইরে থেকে এত আকর্ষণীয় মনে হয়, তার ভিতরের সম্পর্কগুলোও যে একই রকম নিরাপদ হবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। সৌরভের কাছে মেঘলার মূল্য ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল। একসময় যে সৌন্দর্য, সামাজিক পরিচিতি আর আকর্ষণ তাকে মুগ্ধ করেছিল, সেগুলোর বাইরে মেঘলাকে জানার আগ্রহ তার ছিল না। সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হল, ছোটখাটো মতবিরোধ জমতে জমতে এমন জায়গায় পৌঁছল, যেখানে একসঙ্গে থাকা দুজন মানুষের কাছে আলাদা হয়ে যাওয়াই সহজ বলে মনে হল। তাদের বিচ্ছেদ হল। মেঘলা প্রথমে ভেবেছিল, সে আবার নতুন করে সব গুছিয়ে নেবে। তার নিজেরও কাজ ছিল, কিছু সঞ্চয় ছিল, পরিচিত মানুষজন ছিল। কিন্তু একের পর এক পরিবর্তনের মধ্যে সে বুঝতে পারল, যে জীবনকে এত যত্ন করে সাজিয়েছিল, তার ভিতটা ততটা শক্ত ছিল না।
কাজ হারাল, সঞ্চয় কমতে লাগল, যাদের সঙ্গে একসময় নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, তাদের অনেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়ল নিজেদের জীবনে। সাহায্য চাওয়ার মতো মানুষ ক্রমশ কমে এল। যে পরিচিতিগুলোকে সে একসময় নিজের সামাজিক নিরাপত্তা বলে ভেবেছিল, সেগুলোর অধিকাংশই আসলে তার ভালো সময়ের সঙ্গী ছিল। মেঘলা তখন প্রথমবার উপলব্ধি করল, একা হয়ে যাওয়া আর একা থাকতে চাওয়া এক জিনিস নয়। নিজের সিদ্ধান্তে পুরনো সম্পর্কগুলো ছেড়ে আসা যায়, কিন্তু নতুন করে বিপদে পড়লে সেই সিদ্ধান্তগুলোর পরিণতি এড়ানো যায় না।
দশ বছর পেরিয়ে গিয়েছিল। অর্কের জীবন তখন অনেকটাই বদলে গেছে। একদিন হঠাৎ করেই আর্কের সাথে মেঘলার এক পুরনো বান্ধবী তনুশ্রীর দেখা। একসময় তনুশ্রী অর্ক আর মেঘলার সম্পর্কের খুব কাছের সাক্ষী ছিল। সাত বছরের সম্পর্কটাকে মেঘলা যেভাবে নিজের সুবিধেমতো ছিন্ন করেছিল, অর্কর মায়ের সঙ্গে যেভাবে নিষ্ঠুর মিথ্যে কথা বলেছিল, তার সবটাই তনুশ্রী জানত। সেই ঘটনার পর অর্কর জীবনে কী ঝড় বয়ে গিয়েছিল, সেটাও তার অজানা ছিল না।
বহু বছর পর তনুশ্রীর মুখেই অর্ক শুনল মেঘলার বর্তমান অবস্থার কথা। সৌরভের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর মেঘলা একেবারে একা হয়ে পড়েছে। হাতে বিশেষ টাকা নেই, নিয়মিত কাজও নেই। তার ওপর শরীরের এমন অবনতি হয়েছে যে চিকিৎসা করানো জরুরি, অথচ চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতেই সে হিমশিম খাচ্ছে।
খবরটা শুনে অর্কের প্রথমে কোনও প্রতিক্রিয়া হয়নি। তারপর অদ্ভুতভাবে তার মনে পড়ে গেল মেঘলার সেই কথাটা—“তোমার সঙ্গে থাকার কারণে আমার জীবনটাই নষ্ট হয়েছে।”
অর্ক মনে মনে বলেছিল, যে জীবনকে বেছে নেওয়ার জন্য তুই আমাকে ছেড়ে গিয়েছিলি, আজ সেই জীবনের হিসেব তোকেই মেলাতে হচ্ছে।সে চাইলে সেখানেই কথাটা শেষ করে দিতে পারত। মেঘলার জীবনে যা ঘটেছে, তার জন্য অর্ক দায়ী নয়। মেঘলা তার কাছে কোনওদিন ক্ষমাও চায়নি, তার মায়ের মৃত্যুর পর একবারও খোঁজও নেয়নি। বরং শেষ ফোনে নিজের সিদ্ধান্তকে সঠিক প্রমাণ করতে গিয়ে অর্ককেই দোষী করেছিল। আজ তার বিপদের সময় এগিয়ে যাওয়ার কোনও বাধ্যবাধকতা অর্কের ছিল না।
তনুশ্রী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অর্কর মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল,
“আমি জানি, ওর কথা তোমাকে বলা উচিত কি না, বুঝতে পারছি না। মেঘলা তোমার সঙ্গে যা করেছে, তার পরে ওর জন্য তোমার কাছে কোনও সাহায্য চাইবার অধিকার আমারও নেই। তবু তোমাকে বললাম, কারণ ওর অবস্থা সত্যিই ভালো নয়।”
অর্ক অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। মেঘলার নামটা শুনে তার ভেতরে কোনও পুরোনো ভালোবাসা জেগে ওঠেনি। যে মেয়েটা একদিন তার মায়ের স্নেহকেও মিথ্যের আড়ালে ঠেলে দিতে দ্বিধা করেনি, আজ তার জন্য কিছু করার কথা ভাবতেই বুকের মধ্যে একটা কঠিন বাধা তৈরি হচ্ছিল।
অর্ক নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
“চিকিৎসা হচ্ছে না কেন?”
“টাকার অভাবে। কিছু পরীক্ষা বাকি আছে, ওষুধও নিয়মিত কিনতে পারছে না।”
অর্ক জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“তুই ওর চিকিৎসার ব্যবস্থা কর তনুশ্রী। ভালো ডাক্তার দেখাস, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাস। খরচের জন্য চিন্তা করিস না।টাকা যা লাগে আমি দেবো।”
তনুশ্রী অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
“তুমি বলছো?”
“হ্যাঁ।”
“মেঘলার জন্য?”
অর্ক এবার তার দিকে তাকাল। চোখে কোনও কোমলতা ছিল না, আবার প্রতিশোধের উন্মাদনাও ছিল না।
“আমি ওকে ক্ষমা করিনি, তনুশ্রী। ও কী করেছে, আমি ভুলে যাইনি। কিন্তু আমার ঘৃণার জন্য একজন অসুস্থ মানুষ চিকিৎসা পাবে না— এটা আমি হতে দিতে চাই না।”
তনুশ্রী কিছুক্ষণ কোনও কথা বলতে পারল না। অর্ক নিজেই চিকিৎসার খরচ বহনের দায়িত্ব নিল, তবে একটি শর্তে— মেঘলা যেন কিছুতেই তার নাম জানতে না পারে। তনুশ্রীই সমস্ত ব্যবস্থা করবে। চিকিৎসার খরচ, পরীক্ষা, ওষুধ,সবকিছুই অর্কর দেওয়া টাকা থেকে হবে, কিন্তু মেঘলার কাছে সাহায্যটা আসবে তার বান্ধবীর হাত ধরে।
অর্কর অনুরোধে তনুশ্রী রাজি হয়েছিল। হয়তো সে নিজেও জানত, মেঘলা অর্কর নাম জানতে পারলে এই সাহায্য নিতে চাইত না। আবার এটাও জানত, সত্যিটা জানলে মেঘলার ভেতরে এমন কিছু প্রশ্ন জেগে উঠবে, যার উত্তর অর্ক কোনওদিনই দিতে চাইবে না।
এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে তনুশ্রী মেঘলার চিকিৎসার সমস্ত ব্যবস্থা করল। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, পরীক্ষা করানো, ওষুধ কেনা প্রতিটি ক্ষেত্রেই সে পাশে রইল। মেঘলা ভাবল, এতদিনের বন্ধুত্বের ঋণ শোধ করছে তনুশ্রী। তার অসহায় অবস্থায় বান্ধবী পাশে দাঁড়িয়েছে, এর বেশি কিছু সে ভাবেনি।
ধীরে ধীরে মেঘলার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করল। চিকিৎসক জানালেন, নিয়মিত চিকিৎসা চললে বিপদের আশঙ্কা অনেকটাই কমে যাবে। মেঘলা যেন নতুন করে বাঁচার একটা সুযোগ পেল। তনুশ্রীকে সে বারবার বলত,
“তুই না থাকলে আমি কী করতাম, জানি না। আমার জন্য তুই এত কিছু করলি কী করে?”
তনুশ্রী প্রতিবারই এড়িয়ে যেত। বলত,
“এসব কথা বলিস না। আগে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠ।”
মাস দুয়েকের মধ্যে মেঘলা অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠল। একদিন চিকিৎসকের পরামর্শে শেষ কয়েকটি পরীক্ষা করাতে গিয়ে একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটল।
হাসপাতালের হিসাব বিভাগ থেকে তনুশ্রীকে জানানো হল, চিকিৎসার খরচের একটি অংশ যে বিশেষ সহায়তা তহবিল থেকে মেটানো হয়েছে, তার নথিতে একটি স্বাক্ষর ও অনুমোদনের তথ্য বাকি রয়েছে। তনুশ্রী তখন সেখানে উপস্থিত ছিল না।তাই মেঘলাকে নিজের চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাগজপত্র বুঝে নিতে বলা হলে, সে একটি নথিতে চোখ বোলাতে গিয়ে হঠাৎ থমকে গেল।
সেখানে অনুমোদনকারীর নাম লেখা “অর্ক চ্যাটার্জী”।
মেঘলা প্রথমে নামটার দিকে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল। একই নামের অন্য কেউ হতে পারে, নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল সে। কিন্তু নথিতে সংস্থার নামের পাশে যে স্বাক্ষর ছিল, সেটাও তার চেনা। বহু বছর আগে অর্কর দেওয়া একটি চিঠিতে সে এই স্বাক্ষর দেখেছিল।
তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল।
যে মানুষটার সাহায্য নিয়ে সে এতদিন বেঁচে উঠছিল, সেই মানুষটাই অর্ক— অথচ সে কিছুই জানত না!
সেদিনই মেঘলা তনুশ্রীকে বাড়িতে ডেকে পাঠাল। নথিটা তার সামনে রেখে একটাই প্রশ্ন করল,
“আমাকে এতদিন মিথ্যে বলেছিস কেন?”
তনুশ্রী প্রথমে চুপ করে রইল। তারপর বলল,
“আমি তোকে মিথ্যে বলতে চাইনি। অর্ক আমাকে অনুরোধ করেছিল, ওর নাম যেন তোকে না জানাই।”
“কিন্তু কেন? ও কেন আমার জন্য এত কিছু করবে?”
এবার তনুশ্রীর এতদিনের জমিয়ে রাখা ক্ষোভ বেরিয়ে এল।
“সেই প্রশ্নটা তুই নিজেকেই কর। যে মানুষটাকে তুই নিজের জীবন থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলি, যে মানুষটার মায়ের কাছে তুই মিথ্যে বলে এসেছিলি, সেই মানুষটা তোর অসুস্থতার খবর শুনে আমাকে ডেকে বলেছিল, তোর চিকিৎসার যেন কোনও অভাব না হয়। ও একটাই শর্ত দিয়েছিল,তুই যেন ওর নাম না জানতে পারিস। ও তোর কাছে কিছু চায়নি, মেঘলা। ধন্যবাদও নয়, কৃতজ্ঞতাও নয়।”
মেঘলা যেন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। সে ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়ল। তার মনে পড়ল, অর্কর মা একদিন তাকে নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করে বলেছিলেন,
“তুই তো আমার মেয়েই।”
আর সেই মায়ের শেষ দিনগুলোতে সে কী করেছিল!
এতদিন সে ভেবেছিল, অর্কর ঘৃণা তার প্রাপ্য। হয়তো অর্ক কোনওদিন তার নামও শুনতে চাইবে না। কিন্তু সেই মানুষটাই তার জীবন বাঁচানোর ব্যবস্থা করেছে, এমনভাবে যে তার বিনিময়ে কোনও সম্পর্ক, কোনও স্বীকৃতি, এমনকি কৃতজ্ঞতার একটি শব্দও দাবি করেনি।
মেঘলা কাঁপা গলায় বলল,
“তুই কি ওর সঙ্গে দেখা করেছিস? ও কি আমার কথা জিজ্ঞেস করেছে?”
“শুধু তোর চিকিৎসার খবর নিয়েছে। তুই ঠিকমতো ওষুধ খাচ্ছিস কি না, চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কি না— এইটুকু। আর কিছু নয়।”
“ও কি আমাকে ক্ষমা করেছে?”
তনুশ্রী এবার স্পষ্ট গলায় বলল,
“না, মেঘলা। ও তোকে ক্ষমা করেনি। ওর কথা শুনে আমার সেটাই মনে হয়েছে। ও শুধু চায়নি, তোর অসহায়তার সুযোগ নিয়ে তোর জীবনটা আরও কঠিন হয়ে উঠুক।”
মেঘলা আর কোনও কথা বলতে পারল না। তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। এতদিন যে মানুষটাকে সে নিজের জীবনের একটি ভুল অধ্যায় ভেবে বন্ধ করে দিয়েছিল, আজ সেই মানুষটাই তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়ে নিঃশব্দে পাশে দাঁড়িয়েছে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় আঘাতটা ছিল অন্য জায়গায়।
অর্ক তাকে বাঁচিয়েছে, অথচ তাকে ফিরে পেতে চায়নি।তাকে সাহায্য করেছে, অথচ তাকে ক্ষমা করেনি।
আর এই প্রথম মেঘলা বুঝল, কাউকে হারিয়ে ফেলা আর কারও কাছে ক্ষমা পাওয়ার সমস্ত অধিকার হারিয়ে ফেলা এক কথা নয়। অর্ক তার জীবন থেকে চলে গিয়েছিল বহু বছর আগে। কিন্তু তার প্রতি করা অন্যায়ের সত্যিটা আজও মেঘলার জীবন থেকে মুছে যায়নি।
সেদিন রাতে মেঘলার আর ঘুম এল না। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল সেই নামটা— অর্ক। যে মানুষটাকে সে একদিন নিজের জীবন থেকে এমন নিষ্ঠুরভাবে সরিয়ে দিয়েছিল, সেই মানুষটাই আজ তার জীবনের সবচেয়ে অসহায় সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছে। অথচ একবারও নিজের পরিচয় দেয়নি, একবারও জানতে চায়নি, মেঘলা তার এই সাহায্যের কথা জেনেছে কি না।
কেন?
এই প্রশ্নটার উত্তর জানার জন্যই কি তার এত অস্থিরতা? নাকি এতগুলো বছর পর অর্কর সঙ্গে একবার কথা বলার ইচ্ছেটা অন্য কোনও অনুভূতি থেকে জন্ম নিচ্ছে— যে অনুভূতিকে সে নিজেই এতদিন অস্বীকার করে এসেছে?
মেঘলা নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল, অর্ককে ফোন করার কোনও অধিকার তার নেই। যে মানুষটার বিশ্বাস সে নিজের হাতে ভেঙেছে, যে মানুষের মায়ের শেষ স্মৃতিটুকু তার জন্য যন্ত্রণায় ভরা, সেই মানুষের কাছে সে কী মুখ নিয়ে যাবে? শুধু একটা ধন্যবাদ জানানোর জন্য? নাকি নিজের অপরাধবোধের ভার একটু হালকা করার জন্য?
কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, অর্ক যদি সত্যিই তাকে ঘৃণা করত, তবে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা কেন করল? সে তো চাইলে দূরে থাকতে পারত। তার দুর্দশার খবর শুনেও মুখ ফিরিয়ে নিতে পারত। অর্ক তা করেনি।
পরদিন সকালে মেঘলা তনুশ্রীকে ফোন করল।
“তোর কাছে অর্কর নম্বরটা আছে?”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর তনুশ্রী জিজ্ঞেস করল,
“কেন?”
“ওর সঙ্গে একবার কথা বলতে চাই।”
“কী বলবি?”
মেঘলা উত্তর দিতে পারল না। কী বলবে, তা সে নিজেও জানত না। শুধু মনে হচ্ছিল, এই কথাগুলো না বলা পর্যন্ত তার মনের ভেতরের অস্থিরতা থামবে না।
তনুশ্রী দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“মেঘলা, ভেবে দেখিস। ও তোকে সাহায্য করেছে বলে এমন নয় যে ও আবার তোর সঙ্গে কথা বলতে চাইবে। ওর পুরোনো ক্ষতগুলো আবার জাগিয়ে তোলার অধিকার তোর নেই।”
“আমি জানি। আমি ওর কাছে ফিরে যেতে চাইছি না, তনুশ্রী। শুধু একবার কথা বলতে চাই। ও যদি ফোন না ধরে, কিংবা কথা বলতে না চায়, আমি আর কোনওদিন বিরক্ত করব না।”
অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর তনুশ্রী নম্বরটা দিল। “তবে একটা কথা মনে রাখিস, ও তোকে সাহায্য করেছে মানেই ওর কাছে তোর সব অপরাধের হিসাব মুছে গেছে, এমন নয়।”
মেঘলা জানত।
তবু নম্বরটা হাতে নিয়ে তার আঙুল কাঁপছিল। ফোনের পর্দায় অর্কর নামটা লিখে সে অনেকক্ষণ বসে রইল। কতবার যে নম্বরটা মুছে আবার লিখল, তার হিসাব নেই। শেষ পর্যন্ত সমস্ত দ্বিধা সরিয়ে কলের বোতামটা টিপে দিল।
একবার রিং হল।
দু’বার।
তিনবারের মাথায় ফোনটা ধরল অর্ক।
“হ্যালো?”
একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর। অথচ কত দূরের মনে হল মেঘলার কাছে! এই কণ্ঠস্বর একসময় তার প্রতিদিনের আশ্রয় ছিল। আজ সেই কণ্ঠস্বর শুনেই তার গলা শুকিয়ে গেল।
“অর্ক… আমি মেঘলা বলছি।”
ওপাশে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এল।
তারপর অর্ক শান্ত গলায় বলল,
“চিনতে পেরেছি। বল।”
এইটুকুই…না কোনও বিস্ময়, না কোনও প্রশ্ন, না এতগুলো বছর পর হঠাৎ তার ফোন পাওয়ার কোনও প্রতিক্রিয়া। যেন মেঘলা তার জীবনের বহু আগেই শেষ হয়ে যাওয়া একটা অধ্যায়, যার নাম শুনে আজ আর কোনও অনুভূতির জন্ম হয় না।
মেঘলা নিজেকে সামলে নিল।
“তুমি আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলে?”
“হ্যাঁ।”
এত সহজ, এত সংক্ষিপ্ত উত্তর শুনে সে আরও ভেঙে পড়ল।
“কেন, অর্ক?”
“কেন আবার কী?”
“আমার জন্য এত কিছু করলে কেন? তুমি তো জানো, আমি তোমার সঙ্গে কী করেছি। তোমার মায়ের সঙ্গে কী করেছি। তুমি তো আমাকে কোনওদিন ক্ষমা করবে না।”
এবার অর্ক একটু থামল। তারপর বলল,
“ঠিকই বলেছিস। আমি তোকে ক্ষমা করিনি।”
মেঘলার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। তবু সে ফোনটা কানে ধরে রইল।
অর্ক আবার বলল, “কিন্তু তোর চিকিৎসা না হলে আমার কী লাভ হত, মেঘলা? তুই কষ্ট পেলে আমার মায়ের অপমান মুছে যেত? আমার জীবনের ওই রাতটা বদলে যেত? কিছুই তো বদলাত না।”
মেঘলা কোনও উত্তর দিতে পারল না।
“আমি তোকে সাহায্য করেছি, কারণ তোর চিকিৎসার ব্যবস্থা করার সামর্থ্য আমার ছিল। তোকে শাস্তি দেওয়ার জন্য তোর অসুস্থতার সুযোগ নেওয়ার কোনও ইচ্ছা আমার ছিল না। আর এটাকে আমার ভালোবাসা ভেবে ভুল কোরিস না। সেই সম্পর্ক, সেই বিশ্বাস— সবকিছু অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।”
মেঘলা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আমি জানি, আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়ারও যোগ্য নই। কিন্তু…”
কথাটা শেষ করতে পারল না সে।
অর্কর গলায় কোনও রাগ ছিল না। কিন্তু সেই নির্লিপ্ততাই যেন মেঘলাকে আরও বেশি আঘাত করছিল।
“মেঘলা, অতীতের সবকিছুর উত্তর এই একটা ফোনে পাওয়া যাবে না। তুই সুস্থ হয়ে উঠেছিস, এটাই যথেষ্ট। নিজের যত্ন নিস।”
“অর্ক, আর একবার…”
“ভালো থাকিস।”
ফোনটা কেটে গেল।
মেঘলা অনেকক্ষণ মোবাইলটা কানে ধরে বসে রইল। তারপর ধীরে ধীরে ফোনটা নামিয়ে আনল। তার বলার মতো কত কথা ছিল— ক্ষমা চাওয়া, নিজের অপরাধ স্বীকার করা, অর্কর মায়ের কাছে যে অন্যায় সে করেছিল, তার জন্য অনুতাপ জানানো। কিন্তু সে বুঝল, সব কথা বলার সুযোগ পাওয়াই তার অধিকার নয়। কিছু সম্পর্ক ভেঙে গেলে শুধু মানুষটাকে হারাতে হয় না, তার কাছে নিজের কথা বলার অধিকারটুকুও হারিয়ে যায়।
আর অর্ক?
ফোনটা কেটে দিয়ে সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। মেঘলার কণ্ঠস্বর শুনে পুরোনো স্মৃতিগুলো ফিরে এসেছিল ঠিকই, কিন্তু তার সিদ্ধান্ত বদলায়নি। সে মেঘলাকে ক্ষমা করেনি। তার মায়ের শেষ রাতের যন্ত্রণা সে ভুলতে পারেনি। তবু মেঘলার অসুস্থতার সময় সাহায্য করার সিদ্ধান্তটাও তার কাছে ভুল ছিল না।কারণ অর্ক জানত, ক্ষমা না করেও কারও জন্য ভালো কিছু করা যায়। কাউকে জীবনে ফিরিয়ে না নিয়েও তার বেঁচে থাকার পথটুকু সহজ করে দেওয়া যায়।সাত বছরের ভালোবাসার পর মেঘলা তার বিশ্বাস ভেঙেছিল। অর্ক সেই বিশ্বাস আর কোনওদিন ফিরিয়ে পাবে না। কিন্তু সেই বিশ্বাসঘাতকতার জন্য নিজের মানবিকতাটুকুও হারিয়ে ফেলবে— এতটা বদলে যেতে সে রাজি ছিল না।
সেই রাতে অর্কর ঘরে মায়ের পুরোনো আলমারিটা খুলে রাখা ছিল। ভেতরে যত্ন করে রাখা শাড়িগুলোর মধ্যে একটিতে হাত বুলিয়ে সে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। একসময় মা শাড়িটা মেঘলার জন্য কিনেছিলেন। ভেবেছিলেন, একদিন নিজের হাতে হবু বউমাকে দেবেন।
শাড়িটা আর কাউকে দেওয়া হয়নি।
অর্ক আলমারিটা বন্ধ করে দিল।
মেঘলাকে সে সাহায্য করেছে, কিন্তু নিজের জীবনে ফিরিয়ে আনেনি। তার প্রতি ঘৃণা আর মায়ের প্রতি ভালোবাসার মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে— যে সিদ্ধান্তে ক্ষমা নেই, পুনর্মিলন নেই, শুধু নিজের বিবেকের কাছে সৎ থাকার চেষ্টা আছে। সে বুঝেছিল, কাউকে ক্ষমা করা আর কাউকে মানুষ হিসেবে বাঁচতে দেওয়া এক কথা নয়।
অর্ক মেঘলাকে ক্ষমা করেনি। শুধু প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নিজেকে মেঘলার মতো চরিত্রের করে তোলেনি।
********X********
![]()







