“মাতৃত্বের নিঃসঙ্গ মন্দির”
-নবকুমার চক্রবর্ত্তী ( নবু )
ভুতোর বাগানের স্যাঁতসেঁতে অথচ চিরন্তন মায়াবী গলিটা যেখানে এসে শোভাবাজারের অরবিন্দ সরণির ব্যস্ত ও কোলাহলপূর্ণ বড় রাস্তায় আছড়ে পড়েছে, ঠিক সেখানটাতে প্রতিদিন ঘড়ির কাঁটা ধরে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় এক জোড়া কম্পিত পায়ের অতি পরিচিত ও মৃদু আওয়াজ পাওয়া যায়। সেই ধীর পদক্ষেপের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে পিচঢালা রাস্তার ওপর সশব্দে বাজে একটি প্রাচীন মেহগনি কাঠের লাঠির একটানা শব্দ—ঠক, ঠক, ঠক। এই শহরের তীব্র যান্ত্রিক গর্জন, শ্যামবাজার থেকে শোভাবাজার হয়ে ধর্মতলাগামী ট্রামের ক্যাঁচক্যাঁচ ধাতব আর্তনাদ, রাজপথের টোটো আর অটোর অবিরাম তীব্র হর্ন, আর সান্ধ্যকালীন ঘরমুখো ক্লান্ত অফিসযাত্রীদের অন্ধ তাড়াহুড়োর ভিড়েও ওই শব্দটা কখনো ঢাকা পড়ে না। মানুষটার নাম ঝর্ণা দেবী, তবে ভুতোর বাগান, আহিরীটোলা আর হেদুয়ার সমগ্র অঞ্চলবাসী তাঁকে এক নামে চেনে ‘ঝর্ণাদি’ বলে।
বয়স তাঁর আশির সোনালি সীমানা পেরিয়ে নব্বইয়ের ধূসর উপত্যকার দিকে যাত্রা শুরু করেছে অনেক আগেই। কালের নিষ্ঠুর ভারে মেরুদণ্ডটা ধনুকের মতো সামনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে পড়েছে বটে, কিন্তু নাকের ডগায় পরম যত্নে আটকে থাকা মরচে ধরা গোল ফ্রেমের চশমাটার ওপার থেকে যে স্থির দৃষ্টিটা পথচলতি আধুনিক মানুষের দিকে ভেসে আসে, তাতে যেন এক মহাকাব্যের চেয়েও দীর্ঘ, জটিল ও রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের অলিখিত ইতিহাস জ্বলজ্বল করে। সেই বিষণ্ণ চোখে সমাজের প্রতি যেমন কোনো কর্কশ অভিযোগ নেই, তেমনি নিজের ভাগ্যের প্রতি নেই কোনো নিষ্ফল আত্মগ্লানি। আছে শুধু এক অতলান্ত মহাসমুদ্রের মতো নিঃসীম নীরব প্রশান্তি, যা কেবল সেই সমস্ত বিরল মানুষের চোখেই দেখা যায়, যাঁরা জীবনের সমস্ত প্রতিকূল ঝড়ঝাপটা একাকী বুক চিতিয়ে সয়ে নিয়ে শেষ পর্যন্ত আপন আত্মমর্যাদায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে পেরেছেন।
পিছন ফিরে তাকালে আজ মনে হয় যেন অন্য কোনো এক জন্মের এক আশ্চর্য বিষাদময় রূপকথা; কিন্তু তা রূপকথা ছিল না, ছিল চরম নির্মম এক দুঃস্বপ্নের মতো জীবন্ত বাস্তব। ১৯৭২ সালের এক কুয়াশাচ্ছন্ন রক্তহিম শীতের সন্ধ্যায় উল্টোডাঙা রেল স্টেশনের কাছে ঘটে যাওয়া সেই অভিশপ্ত ট্রেন দুর্ঘটনা এক পলকেই ঝর্ণাদির সিঁথির তাজা লাল সিঁদুর আর দু’চোখের আজন্মের নিশ্চিন্ত ঘুম চিরতরে কেড়ে নিয়েছিল। কোলে-কাঁখে তখন তাঁর দুটি ফুটফুটে অবোধ ছেলে আর দুটি নিতান্তই কচি দুধের মেয়ে। সহায়-সম্বলহীন, কপর্দকশূন্য ও আত্মীয়স্বজনহীন সেই ঘোর অন্ধকার দিনগুলোতে উত্তর কলকাতার বহু দূর সম্পর্কের আত্মীয় এবং সুবিধাবাদী পাড়া-প্রতিবেশী ভেবেছিল অসহায় মেয়েটা হয়তো অনাহারে শেষ হয়ে যাবে কিংবা আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে। কিন্তু না, নিয়তির সেই নিষ্ঠুর পরিহাসের সামনে ঝর্ণাদি সেদিন এতটুকু মাথা নোয়াননি। চার সন্তানকে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে ‘আসল মানুষ’ করার এক অদম্য, অনমনীয় ও দুর্ভেদ্য জেদ তাঁকে পাথরের মতো শক্ত করে তুলেছিল।
তারপর শুরু হয়েছিল এক শ্বাসরুদ্ধকর ও দীর্ঘস্থায়ী অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। কোনো সৎ শ্রমসাধ্য কাজকেই তিনি নিজের জীবনে কোনোদিন ছোট মনে করেননি। ভোর চারটেয় ঘুম থেকে উঠে ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি, বিডন স্ট্রিট ও রবীন্দ্র সরণির বড় বড় বনেদি বাড়ির দরজায় দরজায় গিয়ে তিনি পরের এঁটো বাসন মেজেছেন, রাশি রাশি মশলা পিষেছেন, ঠান্ডা জলে কনকনে ভোরে কাপড় কেচেছেন। আবার মাসের শেষে যখন স্কুল থেকে নতুন বই-খাতার লম্বা ফর্দ আসত কিংবা পরীক্ষার বার্ষিক ফি জমা দেওয়ার চূড়ান্ত তারিখ ঘনিয়ে আসত, তখন নিজের সংসারের শেষ সম্বল—মায়ের দেওয়া অতি আদরের কাঁসা-পিতলের ভারী থালা, নকশাদার ঘটি আর বাটিগুলো একে একে বুক চাপড়ে তুলে দিয়েছেন নিমতলার পুরোনো ভাঙারির দোকানে। নিজের পরনের সাধারণ সুতির শাড়িতে একের পর এক তালি পড়েছে, উত্তর কলকাতার কনকনে শীতের রাতে গায়ে জড়ানোর মতো একখানা ভালো গরম চাদর পর্যন্ত জোটেনি তাঁর; কিন্তু চার সন্তানের স্কুলের ইউনিফর্ম আর পড়ার টেবিলে বই-খাতার জোগানে তিনি কখনো একচুলও খামতি হতে দেননি।
রাত জেগে কুপি জ্বালিয়ে সন্তানদের পাশে বসে তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাহারা দিতেন, যাতে ক্লান্ত হয়ে পড়ার টেবিলে তারা ঘুমিয়ে না পড়ে। চারজনকেই তিনি উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী স্কুল পেরিয়ে শহরের নামজাদা কলেজে পাঠিয়ে তথাকথিত আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত করে তুলেছিলেন। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে মর্মান্তিক ও নির্মম সত্য হলো এই যে, তিনি তাদের বড় বড় ডিগ্রিধারী অফিসার, বিশ্বখ্যাত আইটি ইঞ্জিনিয়ার আর কর্পোরেট সমাজের হোমরাচোমরা বানাতে পারলেও আসল অর্থে মানবিক ‘মানুষ’ করে তুলতে পারেননি। তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক মগজে পুঁথিগত বিদ্যার পাহাড় জমলেও মনের অন্তর্নিহিত জমিনটা চিরকালের মতো এক নিষ্ফলা মরুভূমি হয়ে রয়ে গিয়েছিল।
আজ সেই চার সন্তান আধুনিক সমাজের বুকে অত্যন্ত সফল ও সুপ্রতিষ্ঠিত, তাদের জীবনে বিত্তবৈভব আর কৃত্রিম আলোর কোনো খামতি নেই। বড় ছেলে অয়ন এখন এক আন্তর্জাতিক তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার শীর্ষ নির্বাহী, সল্টলেকের সিডি ব্লকে চারতলা আলিশান বাংলো ও সুইমিং পুল হাঁকিয়েছেন। ছোট ছেলে তনয় নিউ টাউনের অ্যাকশন এরিয়া ওয়ানের একটি আকাশচুম্বী বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে বাস করেন, যার ড্রাইভওয়েতে দাঁড় করানো থাকে জোড়া জার্মান গাড়ি। বড় মেয়ে ঈশিতা দক্ষিণ কলকাতার আলিপুরের অতি বনেদি ব্যবসায়ী পরিবারের প্রধান গৃহিণী, আর ছোট মেয়ে পৌলোমী যাদবপুরের এক নামী অধ্যাপকের ঘরণী হয়ে বছরভর দেশ-বিদেশে ছুটি কাটিয়ে বেড়ান। কেবল সেই চোখধাঁধানো আলোর বৃত্তে কোথাও তাঁদের জন্মদাত্রী মায়ের এতটুকু জায়গা হয়নি।
স্বার্থপরতা আর কর্পোরেট ভোগবাদের ঝকঝকে মুখোশের আড়ালে তাঁদের চোখে আজ বৃদ্ধা ঝর্ণাদির অবস্থান নিছক এক অবাঞ্ছিত ও অপ্রয়োজনীয় জঞ্জাল ছাড়া আর কিছুই নয়। শৈশবে যে স্নেহময় হাত দুটো তাঁদের মুখে অন্ন তুলে দিতে গিয়ে ঘষে ঘষে চামড়া তুলে ফেলেছিল, সেই হাতগুলোকেই আজ তাঁদের আভিজাত্যের ড্রয়িংরুমে বড় মলিন, অমার্জিত ও অপাংক্তেয় মনে হয়। আজীবন নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের বিনিময়ে অবহেলা আর তাচ্ছিল্যই যেন তাঁর জীবনের একমাত্র চরম প্রাপ্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনোদিন এক কাপ ভালোবাসার গরম চা কিংবা একমুঠো আন্তরিকতার ভাতও জোটে না নিজের গর্ভজাত রক্তের কাছ থেকে। দুর্গাপূজার অষ্টমীর পুষ্পাঞ্জলিতে কিংবা নাতি-নাতনিদের পাঁচতারা হোটেলের বিলাসবহুল পার্টিতে এই জীর্ণ শাড়ি পরা বুড়ি মাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার মতো সাহস বা রুচি তাদের কারোরই অবশিষ্ট থাকে না।
তবুও জীবনের চাকা তো কোনোদিন থেমে থাকে না। কারো করুণা বা দয়ার মুখাপেক্ষী হয়ে বেঁচে থাকা ঝর্ণাদির জন্মগত স্বভাবে কোনোকালেই ছিল না। রাজ্য সরকারের দেওয়া বার্ধক্য ভাতার সামান্য কয়েকটা টাকা আর শোভাবাজারের সেই আদ্যিকালের পৈতৃক ভিটের স্যাঁতসেঁতে একফালি নিচের ঘরে থাকা এক বৃদ্ধ দর্জি ভাড়াটের দেওয়া সামান্য ভাড়াতেই তাঁর কোনোমতে ডাল-ভাতের দিন গুজরান হয়ে যায়। কারো প্রতি কোনো নালিশ, হাহাকার বা অনুযোগ নেই তাঁর মুখে। প্রতিদিন বিকেলে তিনি নিজের ওই পুরোনো ভাঙা লাঠিটা শক্ত করে ধরে ধীর পায়ে ঘর থেকে বের হন। ভুতোর বাগানের ঐতিহাসিক অন্ধকার গলি পেরিয়ে এসে দাঁড়ান অরবিন্দ সরণির আলোর মুখে।
ঠিক সেই গলির মুখে, শতাব্দীপ্রাচীন ট্রাম লাইনের একখানা মরচে ধরা লোহার পিলারের গা ঘেঁষে একটি পুরোদস্তুর টিনের চালার চা ও তেলেভাজার গুমটি রয়েছে। সেই দোকানের মালিক, কারিগর ও সর্বময় অধিপতি হলো এই তল্লাটের এক মহাবিস্ময়কর চরিত্র—আশীষশেখর চক্রবর্ত্তী, যাকে এলাকার কচিকাঁচা থেকে প্রবীণ সমাজ সবাই এক ডাকে চেনে ‘আশীষ’ বা ‘আশীষ চক্রবর্ত্তী’ নামে। আশীষ হলো উত্তর কলকাতার খাঁটি আড্ডা-সংস্কৃতির এমন এক অনন্য সৃষ্টি, যার জিভে রস আর যুক্তির কোনোদিন আকাল পড়ে না। বছর চল্লিশের চিরকুমার আশীষ, গায়ের রং তামাটে, মাথায় একরাশ অবিন্যস্ত কোঁকড়ানো ঝাঁকড়া চুল। পরনে তার বারোমাস থাকে একটি চড়া হলুদ রঙের গোলগলা টি-শার্ট, যার বুকে কালো হরফে ব্যঙ্গ করে লেখা—‘অ্যান্টি-সোশ্যাল বাট কুল’।
গলায় তার জড়ানো থাকে একটা লাল-সাদা চেককাটা সুতির খাঁটি দিশি গামছা, আর নাকের ঠিক ডগা বরাবর বিপজ্জনকভাবে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে একখানা ভাঙা ডাঁটির কালো সানগ্লাস। সে একাধারে চায়ের জাদুকর, স্বঘোষিত বৈশ্বিক সমাজতত্ত্ববিদ, উত্তর কলকাতার সান্ধ্য বিতর্কের অপ্রতিদ্বন্দ্বী সেনাপতি এবং এলাকার সমস্ত খবরাখবরের কেন্দ্রীয় সচিবালয়। আশীষ যদি একবার নিজের ভঙ্গিমায় মুখ খোলে, তবে শোভাবাজার থেকে হাতিবাগানগামী চলতি বাসও তার বাচনভঙ্গির ওজন সামলাতে না পেরে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হয়। তার কথা বলার নাটুকে শারীরিক ভাষা, চোখ গোল গোল করে হাত নাড়ানো আর কথার পিঠে কথার চাবুক মারার অভূতপূর্ব ধরণ পথচলতি গম্ভীর মানুষের মুখেও মুহূর্তে হাসির বাঁধভাঙা তুফান ছুটিয়ে দেয়।
ঝর্ণাদি প্রতিদিন বিকেলে এসে আশীষের দোকানের ঠিক সামনে পাতা নড়বড়ে কাঠের তক্তাপোশখানায় বসেন। এটা যেন বিগত এক দশকের এক অলিখিত মহাজাগতিক নিয়ম। আশীষও হাজারো খদ্দেরের ভিড়ের মধ্যেও ঝর্ণাদির কাঠের লাঠির ওই ক্ষীণ ঠক-ঠক আওয়াজ দূর থেকে পেলেই হাতের সমস্ত কাজ ফেলে এক অদ্ভুত তৎপরতায় প্রস্তুত হয়ে যায়। আজও তার চুলমাত্র ব্যতিক্রম হলো না। ঝর্ণাদি এসে আস্তে করে কাঠের বেঞ্চের এক কোণে বসতেই আশীষ তার হাতের বড় পিতলের ঝাঁঝরিটা সশব্দে কড়াইয়ের ওপর রেখে দিল। তারপর নাকের ডগা থেকে সানগ্লাসটা এক ঝটকায় কপালে তুলে একখানা চরম নাটকীয় কায়দায় বুক চিতিয়ে এগিয়ে এল।
আশীষ দুই হাত বুকের সামনে জোড় করে, মুখমণ্ডলে একরাশ মাত্রাতিরিক্ত ভক্তি আর সূক্ষ্ম বিদ্রূপের মিশেল এনে হাঁক ছাড়ল, “আরে ও আমাদের শোভাবাজারের মহীয়সী সম্রাজ্ঞী! প্রণাম গ্রহণ করুন ম্যাডাম! ধূলি দিন, পদধূলি দিন এই নগণ্য অধমের দোকানে! আপনার পবিত্র আগমনেই তো এই বঙ্গদেশের টলটলায়মান সামাজিক পরিকাঠামো এখনো কোনোমতে ধুঁকতে ধুঁকতে অক্সিজেন পাচ্ছে। আসুন, তশরিফ রাখুন এই শতাব্দীপ্রাচীন রাজকীয় কাঠের সিংহাসনে। আজ আপনার জন্য আমি এমন একখানা বিশেষ চা তৈরি করছি ঝর্ণাদি, যা খেলে স্বয়ং লন্ডনের রাজপ্রাসাদের প্রধান বাবুর্চিও চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমার দোকানে কয়লা ভাঙতে বসে যাবে। জায়ফল, জৈত্রী, দারুচিনি আর স্পেশাল কালিম্পংয়ের এলাচের এমন একখানা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সংমিশ্রণ ঘটিয়েছি যে, এক চুমুক পেটে গেলেই আপনার শরীরের সমস্ত হাড়ের বাতের ব্যথা নিমেষেই রকেটের গতিতে মহাকাশে পাড়ি দেবে। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো, এর জন্য কোনো জিএসটি লাগবে না, পিওর অকৃত্রিম শ্রদ্ধা আর স্নেহের ভ্যাট ছাড়া!”
ঝর্ণাদি নিজের ফোকলা মাড়ি বের করে এক চিলতে অমায়িক ও অপার্থিব হাসলেন। তারপর পরনের জীর্ণ আঁচল দিয়ে চশমার ধুলোমাখা কাচটা সাবধানে মুছতে মুছতে অত্যন্ত শান্ত গলায় বললেন, “ওরে আশীষ, অত এলাচ আর গরম মশলা দিয়ে চা বানাসনে রে পাগল। কাল রাত থেকেই শরীরটা কেমন যেন ম্যাজম্যাজ করছে, বুকটাও মাঝে মাঝে চিনচিন করে ওঠে। একটু সাধারণ আদা দিয়ে হালকা লিকার করে দে, তাতেই আমার অমৃতের কাজ হবে।”
আশীষ সঙ্গে সঙ্গে নিজের দুই হাত কোমরে রেখে দাঁড়িয়ে পড়ল এবং এমন একখানা চোখ-মুখের অভিব্যক্তি করল যেন কোনো আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সম্মেলনের প্রধান ডিরেক্টর এক মারাত্মক মেডিকেল রহস্যের সন্ধান পেয়েছেন। সে চোখ দুটো গোল গোল করে কপালে তুলে বলল, “বুক চিনচিন করবে না তো কি সেখানে বৈকুণ্ঠের সানাই বাজবে ঝর্ণাদি? আপনার বুকের ভেতর কি কোনো সাধারণ নশ্বর মানুষের রক্তমাংসের কলকব্জা বসানো আছে নাকি? ওটা তো একটা আস্ত বিয়াল্লিশ মডেলের সেকেন্ড হ্যান্ড স্টিম ইঞ্জিনের কারখানা! যে মহীয়সী নারী একাত্তর-বাহাত্তর সালের খাদ্য আন্দোলন, উল্টোডাঙার রেল দুর্ঘটনা, উত্তর কলকাতার কলেরার মহামারী আর নিজের চারখানা নররূপী স্বার্থপর সন্তানের অত্যাচার একলা বুকে চিবিয়ে হজম করে নিল, তাঁর বুক চিনচিন না করলে তো আধুনিক কার্ডিওলজির সমস্ত বইগুলো গঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়া উচিত! আচ্ছা, কাজের কথায় আসি। আপনার সেই মহামানব বংশের বড় সুপুত্র—যাঁর নাম শুনলে নাকি সল্টলেকের কাচের বিল্ডিংগুলোর এসিও ভয়ে কাঁপতে থাকে—সেই অয়নবাবুর কি কোনো নতুন আদেশনামা জারি হয়েছে নাকি? আজ সকাল থেকেই তো আহিরীটোলার মোড়ে কানাকানি শুনছি, আপনাদের ওই ভুতোর বাগানের শতবর্ষের ভিটে নিয়ে নাকি বড়সড় কোনো প্রলয়কাণ্ড ঘটতে চলেছে!”
ঝর্ণাদি একটা দীর্ঘ ও গভীর শ্বাস ফেললেন। তাঁর শীর্ণ হাতের কুঁচকে যাওয়া শিরা-ওঠা আঙুলগুলো মেহগনি কাঠের লাঠির হাতলটাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তিনি মলিন মুখে বিষণ্ণ গলায় বললেন, “কী জানি রে আশীষ। অয়ন কাল রাতে অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাৎ ড্রাইভারকে নিয়ে শোভাবাজারে এসেছিল। বলল, এই প্রাচীন পোড়ো বাড়িটার নাকি আর কোনো অস্তিত্বের মূল্য নেই, ছাদের কড়ি-বরগা যে কোনো দিন মাথায় ভেঙে পড়তে পারে। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের এক মহাশক্তিশালী প্রমোটার নাকি দশ কাঠা জমিতে সুবিশাল বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট তুলবে। আমাকে বলল, ‘মা, তোমার এই শেষ বয়সে ধুলোবালি আর নর্দমার দুর্গন্ধে একা একা পড়ে থাকার কোনো দরকার নেই। তোমাকে আমরা নিউ টাউনের একখানা ফাইভ-স্টার ইন্টারন্যাশনাল ওল্ড এজ হোমে—না কী যেন একটা কেতাদুরস্ত ইংরেজি নাম বলল… সিনিয়র সিটিজেন লাক্সারি রিসর্টে পাঠিয়ে দেব। সেখানে সুইমিং পুল আছে, প্রতিদিন ভোরে স্পেশাল নার্স এসে থার্মোমিটার আর স্টেথোস্কোপ লাগাবে, এসি ঘরে শুয়ে টিভি দেখবে।’ আমাকে কেবল ওই ভিটের পাওয়ার অব অ্যাটর্নির সাদা কাগজে একটা সই এঁকে দিতে বলল।”
আশীষ নিজের কাঁধের লাল-সাদা গামছাখানা এক ঝটকায় শূন্যে তিন পাক ঘুরিয়ে নিল। তারপর এমন এক অভিনব ভঙ্গিতে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল যেন সে এখন কোনো ঐতিহাসিক মহানাটকের মূল প্রতিনায়ককে প্রকাশ্যে তুলোধোনা করতে চলেছে। গায়ের ‘অ্যান্টি-সোশ্যাল বাট কুল’ টি-শার্টের হাতাটা কনুই পর্যন্ত সজোরে গুটিয়ে সে গলা ফাটিয়ে বলল, “শুনুন কথা! শুনুন একবার বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সর্বকালের সেরা রসিকতার কথা! একেই তো একেবারে খাঁটি ও নিখুঁত বাংলায় বলে—*নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ*! নিজে সল্টলেকের সিডি ব্লকে কোটি টাকার মার্বেল বসানো রাজপ্রাসাদে থেকে বিদেশি অ্যালসেশিয়ান কুকুর পুষে রোজ বিকেলে ড্রাই ফ্রুটস খাওয়াবে, আর যে মা রক্ত জল করে নিজের কঙ্কালসার দেহটাকে তিল তিল করে শুকিয়ে কনভেন্টের মাইনে জুগিয়েছিল, তাঁকে পাঠাবে বৃদ্ধাশ্রমের বাতানুকূল শো-কেসে! বলিহারি যাই আপনাদের ওই উচ্চশিক্ষিত সমাজের চকচকে ডিগ্রির আভিজাত্যকে! এদের তো কম্পিউটার সায়েন্স, এম.বি.এ আর বিদেশের সনদের কাগজের নিচে দাঁড়িয়ে স্বয়ং নরকের দূতেরাও লজ্জায় গলায় দড়ি দেবে!”
দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে তখন পাড়ার আরও জনা পাঁচেক নিয়মিত খদ্দের গরম তেলেভাজা আর ভাঁড়ের চা খাচ্ছিল। আশীষের এই নাটকীয় ও ব্যঙ্গাত্মক বাচনভঙ্গি শুনে তারা সবাই আর হাসি চেপে রাখতে না পেরে হো-হো করে হেসে উঠল। পাশের সেলুনের মালিক হরিপদ কাঁচি চালানো ক্ষণিকের জন্য থামিয়ে উঁকি দিয়ে বলল, “কী রে আশীষ, আজ আবার কোন কর্পোরেট ভগবানকে গঙ্গাস্নান করাচ্ছিস রে?”
আশীষ হরিপদর দিকে ফিরে একখানা চোখ মটকে চরম ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলল, “কাকে আবার হরিদা? আমাদের সমাজের ওইসব বিলিতি টাই-পরা সভ্য জানোয়ারদের, যারা জন্মদাত্রী মাকে ভাগাড়ে ফেলে দিয়ে মাদার্স ডে-তে ফেসবুকে রবীন্দ্রনাথের গানের লাইন কোট করে দশ হাজার লাইক কুড়োয়! আরে ঝর্ণাদি, আপনার ওই সোনার টুকরো বড়ছেলে অয়নবাবুকে আমি চিনি না ভেবেছেন? গত পরশুদিন সন্ধ্যেবেলা শোভাবাজারের ট্রাফিক মোড়ে তাঁর কোটি টাকার কালো স্করপিও গাড়িটা আটকে ছিল। জানলার ব্ল্যাক গ্লাসটা ইঞ্চিখানেক নামিয়ে আমাকে আঙুল নাড়িয়ে ইশারায় ডাকল। আমি সামনে যেতেই একখানা কচকচে পাঁচশো টাকার নোট বাড়িয়ে দিয়ে অত্যন্ত দেমাগি গলায় বলল, ‘এই যে চা-অলা ছোকরা, একটা স্পেশাল গোল্ডফ্লেক সিগারেট দাও তো জলদি।’ আমি সোজা গাড়ির দরজায় হাত রেখে বলে দিলুম, ‘শুনুন মহামান্য স্যার, গোল্ডফ্লেক তো আমার গরিবের দোকানে রাখি না, তবে আপনি যদি আদেশ করেন তো আমার এই জ্বলন্ত উনুনের এক ঘটি ফুটন্ত গরম জল আপনার মুখে ঢেলে দিতে পারি, ভেতরের সব নোংরামি, স্বার্থপরতা আর পচা অহংকারগুলো একেবারে অ্যাসিড ওয়াশ হয়ে যাবে!’ শুনেই তো ভদ্রলোক এমন ভড়কে গেল যে লাল বাতি থাকা অবস্থাতেই উল্টোডাঙার দিকে গাড়ি হাঁকিয়ে ভোঁ-দৌড় দিল!”
আশীষের কথা বলার অসাধারণ কৌতুকপূর্ণ ভঙ্গি এবং তার চোখ-মুখের অসম্ভব মজার অভিব্যক্তিতে উপস্থিত সমস্ত মানুষ হাসিতে লুটিয়ে পড়ার উপক্রম হলো। কিন্তু ঝর্ণাদি শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন। তাঁর চোখের কোণে জমে থাকা জলটা চশমার কাচ ভেদ করে স্পষ্ট টলটল করে উঠল। তিনি কাঁপাকাঁপা গলায় বললেন, “ওদের একা দোষ দিয়ে কী হবে রে আশীষ? সময়ের দোষ, এই কলিযুগের দোষ। ওদের তো আমিই এমন বড়লোক হওয়ার আকাশছোঁয়া স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলাম। ছোটবেলায় যখন একবেলা ভাত আর একবেলা নুন-জল খেয়ে দিন কাটত, তখন ওদের মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে বলতাম—‘তোরা শুধু বড় হ, মন দিয়ে লেখাপড়া কর, তোরা বড় হয়ে বিরাট গাড়ি চড়বি, প্রাসাদে থাকবি।’ ওরা আমার সেই স্বপ্নটাই পাই টু পাই পূরণ করেছে রে আশীষ, শুধু সেই রঙিন স্বপ্নের কোলাজ থেকে আমাকে একপাশে ডাস্টবিনের মতো সরিয়ে দিয়েছে।”
আশীষ মুহূর্তের মধ্যে নিজের মুখের সমস্ত ভাঁড়ামো মুছে ফেলে অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে গেল। তার চোখে খেলে গেল এক অদ্ভুত তীব্র ও ধারালো ব্যঙ্গ। সে এক পা এগিয়ে এসে খুব শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলল, “থামুন তো ঝর্ণাদি! দয়া করে ওই ‘সময়ের দোষ’ আর ‘ভাগ্যের দোষ’ বলে ওদের কৃতঘ্নতার গায়ে চন্দনের সুগন্ধি প্রলেপ মাখাবেন না! সময় বা যুগ কি ওদের কোনোদিন কানে কানে এসে প্ররোচনা দিয়ে গেছে যে, যে মা পরের বাড়ির এঁটো থালাবাসন মেজে তোদের প্রতিষ্ঠা দিল, বড় হয়ে সেই মাকে ডাস্টবিনের আবর্জনার মতো ছুড়ে ফেলে দাও? শুনুন, ওই যে বাগবাজার খালের ধারের বস্তির রিকশাঅলা বলরামদা—যে দিনে তিনশো টাকা রোজগার করতে গিয়ে রিকশার প্যাডেলে নিজের পায়ের ছাল-চামড়া তুলে ফেলে, সেও কিন্তু প্রতিদিন রাতে ঘরে ফিরে আগে তার পক্ষাঘাতগ্রস্ত বৃদ্ধা মায়ের মুখে দুধ-রুটি তুলে দেয়, তারপর নিজে শুকনো মুড়ি চিবোয়। আর আপনার ওই সোনার চাঁদের দল? ওই যে ছোট ছেলে তনয়বাবু—নিউ টাউনের আইটি-রাজপুত্র, সে নাকি গত সপ্তাহে সল্টলেকের এক পাঁচতারা ক্লাবে গিয়ে অনাথ আশ্রমের শিশুদের জন্য এক লাখ টাকা অনুদান দিয়ে খবরের পাতায় রঙিন ছবি ছাপিয়েছে! আর নিজের গর্ভধারিণী মা শোভাবাজারের ভাঙা গলির মুখে ধুলোবালির মধ্যে বসে তিন টাকার নোনতা বিস্কুট চিবিয়ে দিন গুজরান করছে! এর চেয়ে বড় হাস্যকর ও নোংরা ভণ্ডামি এই সভ্য দুনিয়ায় আর কী হতে পারে বলুন?”
আশীষ যখন এভাবে যুক্তির চাবুক আছড়ে ফেলছিল, ঠিক তখনই অরবিন্দ সরণির দিক থেকে কানফাটানো হর্ন বাজিয়ে একটি ঝাঁ-চকচকে নেভি ব্লু রঙের বিলাসবহুল মার্সিডিজ এসইউভি গাড়ি এসে ভুতোর বাগানের গলির মুখে কড়া ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে পড়ল। গাড়ির চাকায় পিষে যাওয়া রাস্তার নোংরা ধুলো চারপাশের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। গাড়ির সামনের চকচকে দরজা খুলে তীব্র বিরক্তি নিয়ে নামলেন স্যুট-টাই পরা রাশভারী চেহারার অয়নবাবু, আর পেছনের দরজা ঠেলে নামলেন আধুনিক ডিজাইনার ব্লেজার পরা ছোট ভাই তনয়। তাঁদের দুজনেরই নাকে রুমাল চাপা, পায়ে লক্ষ টাকার ইতালিয়ান চামড়ার জুতো। শোভাবাজারের সরু গলির কাদা, জমা জল আর খোলা ড্রেনের তীব্র গন্ধ বাঁচিয়ে তাঁরা এমন সতর্কভাবে পা ফেলছিলেন যেন কোনো আন্তর্জাতিক মহাকাশচারী ভুল করে বিষাক্ত কোনো গ্রহে অবতরণ করেছেন।
অয়নবাবু হনহন করে এগিয়ে এসে আশীষের দোকানের সামনে ঝর্ণাদিকে জীর্ণ বেশে বসে থাকতে দেখে চিৎকার করে উঠলেন, “মা! তুমি এখনো এই নোংরা ভ্যানগাড়ির পাশে একটা থার্ড ক্লাস চায়ের দোকানে ভিখারির মতো বসে আছ? তোমাকে কতবার ফোনে ওয়ার্নিং দিয়েছি, এই বস্তির মতো জায়গায় এসে আড্ডা মারবে না? আমাদের একটা সোশ্যাল সার্কেল আছে, একটা কর্পোরেট ইমেজ আছে তো নাকি? আমার কোম্পানির কোনো বিদেশি ক্লায়েন্ট যদি এই রাস্তা দিয়ে এয়ারপোর্টে যাওয়ার সময় তোমাকে এই অবস্থায় দেখে, আমার আন্তর্জাতিক প্রেস্টিজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?”
তনয়বাবু তাঁর পকেট থেকে লেটেস্ট মডেলের গোল্ডেন আইফোনটা বের করে স্মার্টওয়াচে সময় দেখতে দেখতে অত্যন্ত বিরক্ত গলায় যোগ করলেন, “এক্স্যাক্টলি মা! আমরা সেই কখন থেকে সল্টলেক আর রাজারহাট থেকে গাড়ি ড্রাইভ করে বিকেলের ট্রাফিক জ্যাম ঠেলে আসছি। তোমাকে পুরোনো ঘরে না পেয়ে গোটা এলাকা চষে ফেলতে হচ্ছে। চলো চলো, দেরি কোরো না। প্রমোটার ব্যানার্জিবাবু সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের রেজিস্ট্রি অফিসে আমাদের জন্য বড় বড় উকিল নিয়ে অপেক্ষা করছেন। আজই সমস্ত পাওয়ার অব অ্যাটর্নির লিগ্যাল পেপারসে সই-সাবুদ করতে হবে। আগামী সোমবার থেকে ডেমোলিশন শুরু না হলে আমাদের নতুন ফ্ল্যাটের কোটি টাকার ব্যাঙ্ক ফাইন্যান্সিং আটকে যাবে।”
ঝর্ণাদি কোনো প্রত্যুত্তর দিলেন না। তিনি এক নির্বাক পাষাণ প্রতিমার মতো শান্ত মুখে শুধু নিজের লাঠির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর শীর্ণ হাতের কাঁপুনিটা শুধু আরও একটু স্পষ্ট হয়ে উঠল।
পুরো দৃশ্যটা দেখে আশীষের রক্ত যেন এক মুহূর্তে ফুটন্ত চায়ের মতো টগবগ করে ফুটতে শুরু করল। সে এক ঝটকায় চায়ের কাপ ধোয়ার নোংরা জলভর্তি অ্যালুমিনিয়ামের গামলাটা মাটিতে সশব্দে নামিয়ে রাখল। তারপর কপাল থেকে সানগ্লাসটা পুরোপুরি খুলে একখানা পুরোনো খবরের কাগজের ওপর রেখে দিল। বুক চিতিয়ে, দুই হাত কোমরে দৃঢ়ভাবে গুঁজে সে একেবারে রাজার মতো নির্ভীক পদক্ষেপে অয়ন আর তনয়ের মুখের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মুখে একখানা মারাত্মক মিষ্টি অথচ বিষাক্ত ও ব্যঙ্গাত্মক হাসির ঢেউ খেলিয়ে সে বলল, “আরে আরে আরে! আসুন আসুন, বঙ্গমাতার দুই অমর সৃষ্টি! গ্লোবাল ইকোনমির দুই জীবন্ত মুকুটহীন সম্রাট! কী পরম সৌভাগ্য আমার এই ভাঙাচোরা, মাছি-ভনভন করা ফুটপাথের দোকানের! তা মহামান্য স্যারেরা, আপনাদের এই কোটি টাকার বিমান মার্কা গাড়িটা কি উল্টোডাঙা হাডকো মোড় হয়ে সোজা ভিআইপি রোড ধরে সল্টলেক থেকে উড়ে এল, নাকি মাঝপথে শ্যামবাজারের ট্রাফিকের সাধারণ ধুলোবালির স্পর্শ লেগে আপনাদের আভিজাত্যের বনেদি চামড়ায় ফোস্কা পড়ে গেল? বলি, আপনাদের ওই বিলাসবহুল গাড়ির চাকায় শোভাবাজারের মাটি লেগে ধর্ম আর জাত সব একবারে বিসর্জন গেল না তো?”
অয়নবাবু নিজের ভ্রু কুঁচকে চরম তাচ্ছিল্যভরে আশীষের আপাদমস্তক একবার মেপে নিয়ে কর্কশ গলায় বললেন, “হু দ্য হেল আর ইউ? একটা থার্ড ক্লাস বস্তির চা-অলা হয়ে তুমি আমাদের ফ্যামিলি ম্যাটারে নাক গলাচ্ছ কেন? নিজের চরকায় তেল দিতে পারো না?”
আশীষ বিন্দুমাত্র ঘাবড়াল না, বরং তার মুখের হাসির ব্যঙ্গাত্মক তীব্রতা দ্বিগুণ হয়ে গেল। সে এক পা আরও এগিয়ে এসে দুই হাত জোড় করে চরম নাটকীয় বিনয়ের ভান করে বলল, “আজ্ঞে স্যার, আমি তো সামান্য চাটুজ্জে পরিবারের অখ্যাত চা-অলা আশীষ। তবে জেনে রাখুন, আমার চরকায় সবসময় এক নম্বর খাঁটি ঘানির তেল মজুত থাকে, কিন্তু আপনাদের যে ভেতরের মানবিকতার ইঞ্জিনে মোবিল শুকিয়ে একেবারে ছাই হয়ে গেছে স্যার! বুড়ি মায়ের চোখের জল আর দীর্ঘশ্বাসকে পুঁজি করে আপনারা এখন প্রমোটারের টাকায় নিউ টাউনে ফ্ল্যাট হাঁকিয়ে আধুনিকতার জয়ডঙ্কা বাজাবেন? বাহ্, কী চমৎকার আধুনিক টেকনোলজি! একেই তো আমাদের গ্রামবাংলার নিখাদ ভাষায় বলে—*গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল*! ভিটের দলিল এখনো মায়ের রক্তে লেখা নামে রেজিস্ট্রি হয়ে অক্ষত রয়েছে, মা এখনো এক ফোঁটা কালির দাগ দেয়নি আপনাদের নোংরা দলিলে, আর আপনারা নাকি সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের এসি চেম্বারে বসে প্রমোটারের সঙ্গে কোটি টাকার কমিশন আর বিলাতি শ্যাম্পেনের বোতল খোলার উৎসব শুরু করে দিয়েছেন?”
তনয়বাবু রাগে কাঁপতে কাঁপতে নিজের চোখের ডিজাইনার চশমা খুলে আঙুল উঁচিয়ে বললেন, “ইউ ব্লডি রাস্কেল! মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ! মা আমাদের, প্রপার্টি আমাদের, এখানে কোনো রাস্তার ছোটলোকের কথা বলার কোনো অথরিটি নেই। বেশি বাড়াবাড়ি করলে এক সেকেন্ডে পুলিশ কমিশনারকে ফোন করে তোমার এই অবৈধ দোকান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেব!”
আশীষ তখন নিজের দুই উরুতে সজোরে থাপ্পড় মেরে একখানা বিকট শব্দ করে হাততালি দিয়ে উঠল, “ওরে আমার বাঘা আইটি ম্যানেজার রে! পুলিশ কমিশনারকে ফোন করবেন? করে দিন না স্যার এখনই! ওই শ্যামবাজার আর বড়তলা থানার বড়বাবুরা প্রতিদিন সকালে ডিউটিতে যাওয়ার আগে এই ভাঙা বেঞ্চে বসে আমার হাতের স্পেশাল আদা-চা খেয়ে তবে লাঠি ধরেন। তাঁদের ডেকে বলবেন—‘অফিসার, এই চা-অলা আমাদের সল্টলেকের সাহেবদের বলছে যে জন্মদাত্রী বুড়ি মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো মহাপাপ!’ পুলিশবাবুরা তো শুনেই আপনাদের দুজনকে একখানা করে ট্রাফিক জরিমানার সঙ্গে ফ্রিতে প্রাইমারি স্কুলের নীতিশিক্ষার বই ধরিয়ে দিয়ে লক-আপে বসিয়ে রাখবেন! বলিহারি যাই আপনাদের নির্লজ্জ দেমাগকে! যে মা আপনাদের বড় করতে গিয়ে উল্টোডাঙার রেল দুর্ঘটনার পর নিজের যৌবন, সুখ, শাড়ি, অলংকার—এমনকি মায়ের দেওয়া শেষ স্মৃতি কাঁসার থালাবাসন পর্যন্ত নিমতলার ভাঙারির কাছে বেঁচে দিয়ে আপনাদের কনভেন্টের ফিজ মিটিয়েছিল, আজ তিনি আপনাদের ড্রয়িংরুমে ‘সোশ্যাল স্টেটাসের কলঙ্ক’? আপনারা কোট-টাই পরে সাহেব সেজেছেন ঠিকই, কিন্তু আপনাদের ভেতরের বিবেকটা আসলে কর্পোরেশনের নর্দমার নোংরা জলের চেয়েও হাজার গুণ বেশি দুর্গন্ধযুক্ত!”
অয়নবাবু রাগে দিশাহারা হয়ে নিজের ছোট ভাই তনয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই রাস্তার গুণ্ডার সঙ্গে কথা বলে নিজের লেভেল নামানোর কোনো মানে হয় না।” তারপর তিনি ঝর্ণাদির দিকে ঘুরে রক্তচক্ষু করে ধমকে উঠলেন, “মা, তুমি কি এই ছোটলোকের সামনে আমাদের এভাবে প্রকাশ্য রাস্তায় অপমান করাবে? তোমাকে বলছি শেষবারের মতো, ওঠো! সোজা গাড়িতে গিয়ে বসো। আমাদের হাতে নষ্ট করার মতো ফালতু সময় এক মিনিটও নেই।”
পুরো অরবিন্দ সরণির মোড়টা তখন এক অদ্ভুত থমথমে রূপ ধারণ করেছে। আশেপাশের সব দোকানদার, পথচলতি মানুষ, ট্রাম স্টপের যাত্রীরা, এমনকি পাশের অটো স্ট্যান্ডের চালকেরাও গোল হয়ে ভিড় করে দাঁড়িয়ে পড়েছে। বাতাসের শব্দ যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। সবার কৌতূহলী ও বিচারক চোখ এখন শুধু ঝর্ণাদির মুখের দিকে নিবদ্ধ।
ঝর্ণাদি ধীরে ধীরে তাঁর দীর্ঘদিনের কম্পিত ও শীর্ণ মাথাটি তুললেন। তাঁর চশমার ফ্রেমের ওপার থেকে যে শান্ত দৃষ্টিটা এবার অয়ন আর তনয়ের রক্তচক্ষুর ওপর স্থির হয়ে পড়ল, তাতে কোনো উন্মত্ত ক্রোধ ছিল না, কোনো অভিশাপের ভাষা ছিল না—ছিল কেবল এক অনন্ত হিমালয়ের মতো অটল, অবিচল ও গভীর শূন্যতা। তিনি পরম শান্তিতে নিজের সেই মেহগনি কাঠের প্রাচীন লাঠিটায় দুই হাত দিয়ে ভর দিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর শীর্ণ ও দুর্বল শরীরটা সামনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে থাকলেও সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে তাঁকে যেন কোনো এক অপরাজেয় দুর্গের মতো বিশাল মনে হলো।
ঝর্ণাদি খুব নিচু, অথচ অবিশ্বাস্য রকম পরিষ্কার, ভারী ও বজ্রকঠিন গলায় বললেন, “অয়ন, তনয়… তোরা গাড়িতে গিয়ে বোস। আমি কোথাও যাব না।”
তনয় স্তম্ভিত হয়ে চোখ বড় বড় করে বলল, “মানে? মা, তুমি কি মাথা খারাপ করে ফেলেছ? তুমি বুঝতে পারছ এটা কত বড় প্রজেক্ট? প্রায় চার কোটি টাকার ডিল! প্রমোটার আমাদের প্রত্যেক ভাইকে আলাদা আলিশান ফ্ল্যাট আর নগদ পঞ্চাশ লাখ টাকা করে ক্যাশ দেবে!”
ঝর্ণাদি একটা অতি করুণ, ম্লান ও শান্ত হাসলেন। সেই হাসির গভীরতায় যেন গত পঞ্চাশ বছরের সমস্ত অনাহার, অপমান, তিতিক্ষা আর মাতৃত্বের মহাকাব্য এক নিমেষে মূর্ত হয়ে উঠল। তিনি বললেন, “কোটি টাকার হিসেব আর ব্যাঙ্কের ব্যালেন্স তোরা খুব নিখুঁত বুঝিস বাবা, কিন্তু জীবনের আসল জমা-খরচের হিসেবটা তোরা কোনোদিনই শিখতে পারলি না। এই ভুতোর বাগানের ভিটের প্রতিটি পুরোনো ইটে তোদের বাবার শেষ স্পর্শ আর স্মৃতি লেগে আছে। এই একফালি স্যাঁতসেঁতে উঠোনে তোরা চার ভাইবোন হামাগুড়ি দিয়ে বড় হয়েছিস, তোদের শৈশবের ধুলোবালি আর কাদার গন্ধ এই দেওয়ালে মিশে আছে। এই ভিটে ভেঙে ফেললে তোদের অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্স উপচে পড়বে ঠিকই, কিন্তু আমার বেঁচে থাকার শেষ আত্মপরিচয়টুকু ধুলোয় মিশে যাবে। তোরা বাড়ি চাস তো? তোরা তো আমারই পেটের রক্ত, আমি বেঁচে থাকতে তোদের বিরুদ্ধে কোনো কোর্ট-কাচারির নোটিশ পাঠাব না। কিন্তু এই অশীতিপর বয়সে এসে তোদের দেওয়া কোনো বাতানুকূল সোনার খাঁচায় আমি দয়ার ভিখারি হয়ে মরতে পারব না। আমি পাড়ার উকিলকে দিয়ে রেজিস্ট্রি করে রেখেছি, আমার মৃত্যুর পর এই পোড়ো ভিটে তোদের নামেই যাবে, তখন তোরা যত খুশি বুলডোজার আর ক্রেন নামিয়ে গুঁড়িয়ে দিস। কিন্তু যতদিন এই নশ্বর দেহে এক ফোঁটা রক্ত আর শ্বাস অবশিষ্ট আছে, ততদিন এই শোভাবাজারের মাটি আর আমার ভিটের চৌকাঠ ছেড়ে আমি এক ইঞ্চিও কোথাও নড়ব না।”
অয়ন আর তনয় পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ঝর্ণাদির মুখের সেই অচেনা, অপ্রতিরোধ্য ও অপ্রমেয় তেজ দেখে তাঁদের সমস্ত কর্পোরেট দম্ভ, অহংকার আর আভিজাত্যের বেলুন যেন এক লহমায় চুপসে গেল। যে স্নেহময়ী বুড়ি মাকে তাঁরা চিরকাল এক মুখ বুজে সব সয়ে নেওয়া নির্বাক নারী হিসেবে জেনে এসেছেন, সেই মায়ের ভেতরের এই সুপ্ত আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ তাঁদের চরমভাবে বাকরুদ্ধ করে দিল।
আশীষ তখন নিজের কাঁধের লাল-সাদা গামছাখানা আবার নতুন কায়দায় কাঁধে ফেলে একখানা রাজকীয় বিদ্রূপাত্মক স্যালুট ঠুকে দিল। সে উচ্চকণ্ঠে পুরো মোড় কাঁপিয়ে চিৎকার করে বলল, “কেয়া বাত! কেয়া বাত! একদম যাকে বলে ক্লাসিক বাপের বেটি ডায়লগ! শুনলেন তো কর্পোরেট মহারাজারা? এবার দয়া করে আপনাদের ওই বিলাসবহুল এসি রকেটের হ্যান্ডেলটা ধরুন আর উল্টোডাঙার ফ্লাইওভার দিয়ে সোজা নিজেদের কাচের প্রাসাদে ফিরে যান। শোভাবাজারের বুড়ি মা কিন্তু নিজের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত নিজের তৈরি রাজত্বেই নিজের শর্তে বাঁচবে!”
অয়ন আর তনয় আর একটি বাক্যও সেখানে উচ্চারণ করার সাহস পেলেন না। চারপাশের মানুষের তীব্র ঘৃণাপূর্ণ নীরব চাহনি আর আশীষের ধারালো বিদ্রূপের চাবুক তাঁদের চামড়া যেন জ্বালিয়ে দিচ্ছিল। তাঁরা অত্যন্ত দ্রুতপায়ে গাড়িতে গিয়ে উঠলেন এবং তীব্র শব্দে ডোর লক করে দিলেন। বিকট গর্জন তুলে এসইউভি গাড়িটি উল্টোডাঙার মূল সড়কের দিকে ধোঁয়া উড়িয়ে মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে গেল।
চারপাশটা আবার ধীরে ধীরে চেনা শান্ত ছন্দে ফিরে আসতে শুরু করল। শ্যামবাজারের দিক থেকে আসা লাল ট্রামের ঘণ্টার মধুর টুং-টাং সুর বাতাসে অনুরণিত হলো। সন্ধ্যার অন্ধকার তখন গাঢ় মায়ায় ঢেকে দিয়েছে উত্তর কলকাতার প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী অলিগলিগুলোকে। রাস্তার ধারের পুরোনো ল্যাম্পপোস্টগুলোর টিমটিমে হলুদ আলোয় শোভাবাজারের অরবিন্দ সরণি এক অদ্ভুত বিষাদময় রূপ ধারণ করল।
ঝর্ণাদি তখনো মেহগনি কাঠের লাঠিটা শক্ত করে ধরে ফুটপাথের ধারে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আশীষ ধীর পায়ে এগিয়ে এসে অত্যন্ত সলজ্জ ও নরম গলায় বলল, “ঝর্ণাদি, রাগ করলেন না তো আমার ওপর? আমার তো জানেনই একটু স্বভাবদোষ আছে… একটু বেশিই সুর চড়িয়ে চ্যাঁচামেচি করে ফেললাম হয়তো।”
ঝর্ণাদি ধীরে ধীরে তাঁর কাঁপাকাঁপা, শীর্ণ ও মমতাময়ী হাতটি আশীষের ঝাঁকড়া চুলের মাথায় আশীর্বাদের মতো রাখলেন। তাঁর চশমার ফ্রেমের নিচ দিয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুর এক ফোঁটা স্ফটিক হয়ে চিবুকের খাঁজে এসে থামল। মুখে এক অনাবিল, স্বর্গীয় ও পরম তৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে তিনি বললেন, “না রে আশীষ, তুই চ্যাঁচামেচি করিসনি বাবা। তুই ওদের সেই পরম সত্যের আয়নাটা মুখের সামনে তুলে ধরেছিস, যা আমি চল্লিশ বছর ধরে স্নেহের অন্ধ মোহে পড়ে বলতে পারিনি। মানুষ নিজের শরীর নিংড়ে সন্তানকে জন্ম দিতে পারে রে আশীষ, বড় বড় স্কুলে পড়িয়ে অফিসার বানাতে পারে, কিন্তু তাদের হৃদয়ের ভেতর ভালোবাসা আর নিঃস্বার্থ মনুষ্যত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। সে ক্ষমতা কেবল সেই পরমেশ্বরের হাতে।”
ঝর্ণাদি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালেন না। তিনি নিজের কাঠের লাঠির ওপর সমস্ত ভর রেখে আবার অতি ধীর অথচ শান্ত পদক্ষেপে ভুতোর বাগানের অন্ধকার গলির দিকে ফিরে চলতে লাগলেন। সেই চিরচেনা শব্দ—ঠক, ঠক, ঠক—ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল উত্তর কলকাতার সন্ধ্যার রহস্যময় অন্ধকারের গভীরে।
আশীষ দাঁড়িয়ে রইল একাকী, নিঃশব্দে। একদৃষ্টিতে সেই দূরে চলে যাওয়া ক্লান্ত ছায়ামূর্তিটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সে নিজের গামছার কোণা দিয়ে দু’চোখের আর্দ্রতা একবার সন্তর্পণে মুছে নিল। তারপর উনুনের ফুটন্ত কেতলির দিকে চেয়ে একটি গভীর স্বগতোক্তি করল, “এই শহরটা সত্যিই বড় অদ্ভুত এক তামাশার জায়গা… এখানে কোটি টাকার ফ্ল্যাট, গাড়ি আর আধুনিকতার বৈভব কেনা যায় অনায়াসেই, কিন্তু একটা নির্ভেজাল মায়ের আঁচলের পরম পবিত্র ছায়া কোনো শপিং মলে হাজার কোটি টাকা দিয়েও কিনতে পাওয়া যায় না।”
সমাপ্ত
![]()








