আন্তরিকতার কাঙাল
সুবর্ণ রুদ্র
জয়দেববাবুর সকালগুলো আজকাল বড় বেশি দীর্ঘ মনে হয়। ঘুমটা ভেঙে যায় সেই কাকভোরে, কিন্তু বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করে না। জানালার বাইরে ভোরের আলো যখন সবেমাত্র আকাশটাকে ধুয়ে দিতে শুরু করে, তখন তার বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা লাগে। একটা দীর্ঘশ্বাস আপনাআপনি বেরিয়ে আসে। এই দোতলা বাড়িটা একসময় কত কোলাহলে মুখর ছিল! স্ত্রী আরতির হাসির শব্দ, ছেলেমেয়ে—পলাশ আর পারুলের—দৌড়ঝাঁপ, চেঁচামেচি, পড়ার ঘরের আবৃত্তি—সব মিলিয়ে একটা জীবন্ত সংসার ছিল। এখন সব নিস্তব্ধ। দেয়ালে টাঙানো আরতির হাসিমুখের ছবিটা ছাড়া এই বাড়িতে প্রাণের স্পন্দন প্রায় নেই বললেই চলে।
পলাশ থাকে কানাডায়, পারুল পুনেতে। দুজনেই সুপ্রতিষ্ঠিত। তাদের নিজেদের জগৎ, নিজেদের সংসার। মায়ের মৃত্যুর পর প্রথম প্রথম ঘনঘন ফোন করত। তারপর আস্তে আস্তে সেই ফোন সপ্তাহে একবার, তারপর পনেরো দিনে একবার এসে ঠেকেছে। জয়দেববাবু বোঝেন, ওরা ব্যস্ত। কিন্তু মন কি আর অতশত যুক্তি বোঝে? টেলিফোন যন্ত্রটা সঙ্গে না রেখে টেবিলে উপর যেন এক অনন্ত প্রতীক্ষায় বসে থাকে। প্রত্যেকবার রিং বেজে উঠলে জয়দেববাবুর বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। হয়তো পলাশ, নয়তো পারুল! কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই ফোনটা আসে কোনো বিমা কোম্পানির এজেন্টের বা কোনো অচেনা লোকের ভুল নম্বর থেকে। আশাটা কাঁচের বাসনের মতো টুং করে ভেঙে যায়।
ছেলেমেয়েরা একরকম জোর করেই নিচের তলাটা ভাড়া দিতে বাধ্য করেছে। তাদের যুক্তি—একা একা এত বড় বাড়িতে বাবার ভয় করতে পারে, আর ভাড়ার টাকাটা হাতে এলে সুবিধে। তাছাড়া, একটা পরিবার থাকলে অন্তত কথাবার্তা বলার লোক পাওয়া যাবে। জয়দেববাবু প্রথমে রাজি হননি। এই বাড়ির প্রতিটি কোণায় আরতির স্মৃতি মাখানো। বাইরের লোক এসে সেই স্মৃতিতে ভাগ বসাবে, এটা তিনি ভাবতে পারেননি। কিন্তু ছেলেমেয়ের জেদের কাছে হার মানতে হলো।
নতুন ভাড়াটে এলেন মুখার্জী বাবু। ভদ্র, শান্ত প্রকৃতির মানুষ। রিটায়ার্ড করেছেন বছর দুয়েক হলো। সংসারে তিনি, তার ছেলে রাজেশ আর ছেলের বউ শ্যামলী। রাজেশ এক বড় আইটি কোম্পানিতে চাকরি করে। মাইনে নাকি আকাশছোঁয়া। তবু নিজের বাড়ি না করে ভাড়া থাকে কেন, এই প্রশ্নটা জয়দেববাবুর মনে উঁকি দিয়েছিল। মুখার্জী বাবু নিজেই একদিন তার ব্যাখ্যা দিলেন, “কি হবে মশাই বাড়ি করে? ছেলের তো বদলির চাকরি। আজ কলকাতা, কাল বেঙ্গালুরু, পরশু হয়তো সিঙ্গাপুর। শিকড় গেড়ে লাভ কি?” কথাটা শুনে জয়দেববাবুর মনে হয়েছিল, যুগটা সত্যিই বদলে গেছে। তাদের সময়ে মানুষ একটা স্থায়ী ঠিকানা খুঁজত, আর এখনকার ছেলেমেয়েরা যাযাবরের মতো জীবন কাটাতে ভালোবাসে।
মুখার্জী বাবুর সাথে জয়দেববাবুর বেশ ভাব জমে গেল। বিকেলে ছাদে চেয়ার পেতে দুজনে বসেন। চা খেতে খেতে দেশের রাজনীতি থেকে পাড়ার কুকুরের ছানা বিয়োনো পর্যন্ত সবরকম গল্প হয়। মুখার্জী বাবু সজ্জন মানুষ, অন্যের ব্যাপারে নাক গলানো তার স্বভাব নয়। জয়দেববাবুর একাকিত্ব খানিকটা হলেও কাটে। কিন্তু দিনের শেষে যখন মুখার্জী বাবু নিজের সংসারে ফিরে যান, তখন জয়দেববাবুর শূন্যতাটা যেন আরও গভীর হয়ে বুকের উপর চেপে বসে। নিজের সংসার বলতে তো তার আর কিছু নেই।
শ্যামলী, মুখার্জী বাবুর ছেলের বউ। শান্ত, চুপচাপ, কিন্তু চোখ দুটো বড্ড মায়াবী। সারাদিন তার কাটে সংসারের কাজে। রাজেশ সকালে ল্যাপটপ নিয়ে বসে, তারপর অফিস যায়। ফেরে গভীর রাতে। সপ্তাহান্তে বন্ধুদের সাথে পার্টি। শ্যামলীর সাথে কথা বলার মতো এ বাড়িতে কেউ নেই। শ্বশুরমশাই ভালো মানুষ, কিন্তু তার সাথে কতটুকুই বা কথা বলা যায়? সারাদিনের খাটুনির পর যখন বারান্দায় এসে দাঁড়ায়, তখন তার দৃষ্টি চলে যায় দোতলার বারান্দায় বসে থাকা একা বৃদ্ধ জয়দেববাবুর দিকে। মেয়েটার ভেতরটা কেমন করে ওঠে।
একদিন বিকেলে শ্যামলী একবাটি সুজি নিয়ে ওপরে এল। জয়দেববাবু তখন বারান্দায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। মেয়েটাকে দেখে অবাক হলেন।
“কাকাবাবু, আপনার জন্য একটু সুজি এনেছি। বিকেলে হয়তো আপনার কিছু খেতে ইচ্ছে করে।” শ্যামলী লাজুক হেসে বলল।
জয়দেববাবু আপ্লুত হলেন। কতদিন পর কেউ তার জন্য এমন করে ভেবে কিছু এনেছে! তার নিজের মেয়ে পারুলও ফোন করে জিজ্ঞেস করে, “বাবা, খেয়েছ?” কিন্তু সেই জিজ্ঞাসার মধ্যে যে আন্তরিকতার অভাব, তা তার কান এড়ায় না। আর এই প্রায়-অচেনা মেয়েটি তার জন্য খাবার বানিয়ে এনেছে!
“কেন মা, এত কষ্ট করতে গেলে?” জয়দেববাবুর গলাটা ধরে এল।
“এতে আর কষ্ট কি! আমার তো সারাদিন কোনো কাজ নেই। আপনি খেলে আমার ভালো লাগবে।”
সেই শুরু। এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই শ্যামলী কিছু না কিছু নিয়ে ওপরে আসত। কখনও চপ ভেজে, কখনও একটু পায়েস, আবার কখনও বা নিজের হাতে বানানো আচার। জয়দেববাবুও মেয়েটার জন্য অপেক্ষা করে থাকতেন। এই আসা-যাওয়ার মধ্যে দিয়ে কখন যে একটা অদৃশ্য সেতু তৈরি হয়ে গেল, তা তারা কেউই টের পেলেন না। শ্যামলী এসে শুধু খাবার দিয়েই চলে যেত না, কিছুক্ষণ বসত। জয়দেববাবুর পুরোনো দিনের গল্প শুনত। তার স্ত্রী আরতির কথা, ছেলেমেয়ের ছোটবেলার দুষ্টুমির কথা। শ্যামলী মুগ্ধ হয়ে শুনত আর ভাবত, একটা সংসার কতটা ভালোবাসায় ভরা থাকলে এমন স্মৃতি তৈরি হয়!
জয়দেববাবু একদিন খেয়াল করলেন, তার পাঞ্জাবির একটা বোতাম ছেঁড়া। শ্যামলী সেটা দেখতে পেয়ে বলল, “দিন কাকাবাবু, আমি লাগিয়ে দিচ্ছি।”
জয়দেববাবু সংকোচ করছিলেন, কিন্তু মেয়েটা প্রায় জোর করেই পাঞ্জাবিটা নিয়ে গেল। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে শুধু বোতাম লাগানো নয়, সুন্দর করে ইস্ত্রি করে ফেরত দিয়ে গেল। জয়দেববাবু পাঞ্জাবিটা হাতে নিয়ে দেখলেন, একটা অচেনা পারফিউমের মিষ্টি গন্ধ লেগে আছে। তার মনে হলো, এই গন্ধটা বড় জীবন্ত, বড় মমতামাখা। তার নিজের মেয়ে পারুল শেষ কবে তার ছেঁড়া জামায় বোতাম লাগিয়ে দিয়েছে, তিনি মনে করতে পারলেন না।
শ্যামলীর নিজের জগতেও একটা বিরাট শূন্যতা ছিল। রাজেশ ভালো স্বামী। টাকা-পয়সার অভাব রাখেনি। দামি শাড়ি, গয়না, যখন যা চেয়েছে এনে দিয়েছে। কিন্তু শ্যামলী যা চায়, তা রাজেশের কাছে নেই—সময় আর সঙ্গ। রাজেশের জগৎটা ল্যাপটপ, কোডিং আর ডেডলাইনে বাঁধা। শ্যামলীর মনের খবর রাখার ফুরসত তার নেই। শ্যামলী বাংলা সাহিত্য নিয়ে এম.এ. পাশ করেছিল। তার ইচ্ছে ছিল, কোনো কলেজে পড়ানোর। কিন্তু বিয়ের পর সে সব স্বপ্ন শ্বশুরবাড়ির হেঁশেলে ভাতের ফ্যানের সাথে ড্রেনের জলে পড়ে মিশেগেছে। রাজেশ বলেছিল, “চাকরি করে কি হবে? আমি তো আছি।” কিন্তু শ্যামলীর ভেতরকার ‘আমি’-টা যে শুধু খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে চায় না, সেটা বোঝার মতো সংবেদনশীলতা রাজেশের ছিল না।
জয়দেববাবুর সাথে কথা বলতে বলতে শ্যামলী নিজের সেই হারিয়ে যাওয়া সত্তাটাকে খুঁজে পেত। জয়দেববাবু তাকে বই পড়তে দিতেন। পুরোনো লাইব্রেরি থেকে নিজের পছন্দের লেখকদের বই এনে দিতেন। একদিন তিনি বললেন, “তুমি তো লেখালেখিও করতে পারো, মা। তোমার কথা বলার ভঙ্গিটা খুব সুন্দর।”
কথাটা শুনে শ্যামলীর বুকের ভেতরটা দুলে উঠেছিল। কেউ তাকে এতদিন পর আবার তার সত্তার কথা মনে করিয়ে দিল! সেদিন রাতে সে অনেকদিন পর একটা ডায়েরি খুলে বসেছিল। কিছু লিখতে পারেনি, কিন্তু সাদা পাতাগুলোর দিকে তাকিয়ে তার চোখে জল এসে গিয়েছিল। এই নীরব স্বীকৃতিটুকুই তার কাছে ছিল অনেক বড় পাওয়া।
তাদের এই সম্পর্কটা ছিল সম্পূর্ণ নির্ভেজাল, নিঃস্বার্থ। জয়দেববাবু শ্যামলীর মধ্যে নিজের মেয়ের ছায়া খুঁজে পেতেন, আর শ্যামলী পেত একজন বন্ধু প্রেমিকের আশ্রয়, একজন অভিভাবকের স্নেহ। মাঝে মাঝে জয়দেববাবু ভাবতেন, তার নিজের ছেলেমেয়েরা যদি এতটুকু বুঝত! পলাশ ফোন করলে জিজ্ঞেস করে, “বাবা, টাকার দরকার আছে?” পারুল জিজ্ঞেস করে, “শরীর ঠিক আছে তো? ডাক্তার দেখিয়েছ?” কিন্তু কেউ জিজ্ঞেস করে না, “বাবা, তোমার মন ভালো আছে? একা লাগে না?” এই প্রশ্নটুকুর জন্যই জয়দেববাবুর মনটা কাঙালের মতো অপেক্ষা করে থাকে।
একদিন সন্ধ্যায় জয়দেববাবু ছাদে বসে আছেন, সাথে মুখার্জী বাবু। হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। জয়দেববাবু প্রায় ছুটে নিচে নামলেন। পলাশের ফোন।
“হ্যালো বাবা।”
“হ্যাঁ পলাশ, বল। কেমন আছিস তোরা?” জয়দেববাবুর গলায় উত্তেজনা।
“ভালো। শোনো, একটা জরুরি কথা ছিল। ওখানকার বাড়ির ট্যাক্সটা দিয়ে দিয়েছ?”
জয়দেববাবুর বুকের ভেতরটা দপ করে নিভে গেল। তিনি ভেবেছিলেন, ছেলে হয়তো এমনিই ফোন করেছে। কিন্তু সবই প্রয়োজন।
“হ্যাঁ, দিয়ে দিয়েছি।”
“ওহ, আচ্ছা। আর ভাড়াটেদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো? ভাড়াটা সময়মতো পাচ্ছো?”
জয়দেববাবু কি উত্তর দেবেন ভেবে পেলেন না। তার বলতে ইচ্ছে করছিল, “ভাড়াটেরা আমার ভাড়াটে নয়, ওরা আমার প্রতিবেশী। ওরা আমাকে সময় দেয়, সঙ্গ দেয়, যা তোরা দিস না।” কিন্তু তিনি কিছুই বললেন না। শুধু বললেন, “না, কোনো সমস্যা নেই। ওরা খুব ভালো।”
“ঠিক আছে। আচ্ছা বাবা, এখন রাখি। একটু ব্যস্ত আছি। পরে কথা হবে।” ফোনটা কেটে গেল।
জয়দেববাবু পাথরের মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। টেলিফোন যন্ত্রটাকে তার মনে হলো এক নিষ্ঠুর প্রহসন। ওটা সংযোগের সেতু নয়, ওটা আসলে দূরত্বের প্রতীক। ঠিক সেই মুহূর্তে শ্যামলী এক কাপ গরম আদা দেওয়া চা নিয়ে ঘরে ঢুকল।
“কাকাবাবু, আপনি এখানে দাঁড়িয়ে? চা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে তো।”
জয়দেববাবু মুখ তুলে শ্যামলীর দিকে তাকালেন। মেয়েটার মুখে কি সরল একটা মায়া! তিনি আলতো করে হাসলেন। বললেন, “বোসো মা, তোমার সাথে একটু গল্প করি।”
শ্যামলী বসল। জয়দেববাবু তার ছেলেবেলার গল্প শুরু করলেন। তার মা কেমন পিঠে বানাতেন, বাবা কেমন রাশভারী কিন্তু স্নেহপ্রবণ ছিলেন—সেই সব গল্প। শ্যামলী মন দিয়ে শুনতে লাগল। তার মনে হলো, এই বৃদ্ধ মানুষটার বুকের ভেতর কত স্মৃতি, কত অভিমান জমা হয়ে আছে! সে আলতো করে বলল, “কাকাবাবু, আপনার মায়ের হাতের নারকেল নাড়ুর গল্পটা একদিন শিখিয়ে দেবেন? আমি আপনাকে বানিয়ে খাওয়াব।”
জয়দেববাবুর চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। তার মনে হলো, রক্তের সম্পর্কই সব নয়। আন্তরিকতার টান থাকলে পরের ছেলেও আপন হয়, পরের মেয়েও নিজের হয়ে ওঠে।
গল্পের শেষে কোনো নাটকিয় মোড় আসে না। জয়দেববাবুর জীবন একই খাতে বইতে থাকে। পলাশ বা পারুল তাদের ব্যস্ত জীবন থেকে বেরিয়ে এসে বাবার পাশে দাঁড়ায় না। তাদের সংক্ষিপ্ত, দায়সারা ফোনগুলো আসতেই থাকে। জয়দেববাবুর একাকিত্ব পুরোপুরি কাটে না। রাতের বেলায় পুরোনো স্মৃতিরা তাকে এখনও ঘিরে ধরে।
কিন্তু এখন তার দিনগুলো আর আগের মতো বিবর্ণ নয়। শ্যামলীর আনা একবাটি পায়েস, তার জন্য বুনে দেওয়া একটা সোয়েটার, বা একসাথে বসে পুরোনো দিনের গল্প করার মুহূর্তগুলো তার ধূসর জীবনে এক পশলা বৃষ্টির মতো। শ্যামলীর জীবনেও একটা বদল এসেছে। সে এখন আর শুধু রাজেশের স্ত্রী বা মুখার্জী বাবুর পুত্রবধূ নয়। সে জয়দেববাবুর ‘মা’। এই নতুন পরিচয়ের মধ্যে সে নিজের আত্মসম্মান খুঁজে পেয়েছে। তার অস্ফুট বিদ্রোহটা এখন আর শুধু চাপা দীর্ঘশ্বাসে সীমাবদ্ধ নেই, সেটা জয়দেববাবুর জন্য এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পায়। তার না-পাওয়ার যন্ত্রণাগুলো এই বৃদ্ধের মুখে হাসি ফোটানোর মধ্যে দিয়ে শান্ত হয়।
একদিন দুপুরে খাওয়ার পর জয়দেববাবু তার পুরোনো আরামকেদারায় বসে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তার কোলের ওপর রাখা ছিল একটা খোলা বই। শ্যামলী দোতলায় এসেছিল মশলা বাটার শব্দে তার ঘুমের ব্যাঘাত হচ্ছে কিনা দেখতে। ঘুমন্ত মানুষটার মুখের দিকে তাকিয়ে তার ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। কি শান্ত, অসহায় দেখাচ্ছে! যেন দীর্ঘ পথ হেঁটে আসা এক ক্লান্ত পথিক। সে নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে জয়দেববাবুর পায়ের কাছে পড়ে থাকা চাদরটা তুলে তার গায়ে জড়িয়ে দিল। তারপর ধীর পায়ে নিজের সংসারে ফিরে গেল। তার মনে হলো, জীবনটা হয়তো এমনই। কেউ শিকড় ছিঁড়ে দূরে চলে যায়, আর কেউ সেই ছেঁড়া শিকড়কে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার রসদ খোঁজে। জয়দেববাবু সেই রসদটুকু খুঁজে পেয়েছেন তাদের এই ভাড়াটে পরিবারটির মধ্যে, বিশেষ করে শ্যামলীর মধ্যে। আর শ্যামলী? সে হয়তো এই নিঃসঙ্গ মানুষটার সেবা করার মধ্যে দিয়েই নিজের অস্তিত্বের একটা অর্থ খুঁজে পেয়েছে।
বাইরে তখন চৈত্রের দুপুর। রোদের তেজ বাড়ছে। জয়দেববাবুর বাড়িটা আগের মতোই শান্ত, নিস্তব্ধ। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতার গভীরে এখন একটা নতুন সুর বাজে—আন্তরিকতার সুর। যে সুর শোনার জন্য কান নয়, মন লাগে।
শেষ
![]()







