ফো পাহ্
নিলয় বরণ সোম
ফো পাহ্। (faux pas) সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে প্রথমেই মনে পড়ে গেল জটায়ু তথা লালমোহন গাঙ্গুলির কথা। ভদ্রলোক এমনিতে একটু সব গুলিয়ে ফেলেন , আজকের ভাষায় বিশ্লেষণ করতে গেলে , ওর বোধহয় social anxiety বিস্তর। তাই ঘাবড়ে গিয়ে হাঁয়েস ( হ্যাঁ এবং ইয়েসের সন্ধিপদ ) তাকে আকছার বটে শোনা যায়।
কথা হচ্ছিল চার আড্ডাধারীর মধ্যে , বিষয়বস্তু সে ফো পাঁ। যে যার গল্পের ঝুলি ঝাড়ছিল।
প্রথম আড্ডাধারীর অভিজ্ঞতা বিয়েবাড়ি নিয়ে। কোনো এক বিয়েবাড়িতে চিংড়ি মাছের মালাইকারি পেয়ে যতটাই খুশি হয়েছিল ,সে ততটাই বিব্রত হয়েছিল , কারণ সে কাঠি ধরে খোসা সমেত চিংড়ি খাওয়া এক ঝক্কির ব্যাপার। বুদ্ধিযস্য বলং তস্য , সুতরাং , সে একটি কাঁটাচামচ নিয়ে , কাঠির থেকে সেই চিংড়িমাছ ছাড়ানোর চেষ্টা করল।একটি দুটি খন্ড ছাড়ানোও হল ঠিক , তৃতীয় খন্ডটি কাঁটাচামচের ঘায়ে প্রজেক্টাইলের মতো উড়ে গেল। যাবি তো যা, গিয়ে ঠেকল উল্টোদিকে বসা এক সুন্দরীর আঁচলের ঠিক উপরটাতে। ভদ্রমহিলা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে পুরোটা বোঝার সঙ্গে সঙ্গে সেই আড্ডাধারী কাচুমাচু মুখ করে একটা টিস্যু পেপার নিয়ে সুন্দরীর কাছে গিয়ে হাজির। না , চিংড়ির পরশ লাগা মোক্ষম জায়গাটিতে টিস্যু পেপার বোলাতে গেলে গণধোলাই পড়ারই কথা , সে পথে সে যায় নি । সে শুধু ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে সুন্দরীর হাতে একটা টিস্যু পেপার তুলে দিয়েছিল। কিন্তু সুন্দরীর মন ভিজল না , রোষ কষায়িত নেত্রে , বা হাত তুলে সে বলল , থাক !
এরপর থেকে সেই বন্ধু বিয়ে অন্নপ্রাশনের নিমন্ত্রণ পেলেই খোঁজ নেয় , মেনুতে চিংড়ির মালাইকারি আছে কিনা , থাকলে , যাওয়া নেই !
এবার দ্বিতীয় আড্ডাধারীর কথা. সে বলল , আরে আমারও গল্প তো বিয়েবাড়ি নিয়েই , সে কয়েক যুগ আগে। তখন কলকাতায় প্রিমিয়ার পদ্মিনী বেশ চলছে , বিশেষ করে ছোট পরিবার , সুখী পরিবারগুলিতে।
বক্তার মাসতুতো দিদি ও জামাইবাবু বিয়েবাড়িতে নিমন্ত্রিত , অন্য অনেকের সঙ্গে পিসি ও পিসতুতো দাদাও নিমন্ত্রিত। দুটি পরিবারের কথা আলাদা করে বলা হল কারণ , ঘটনাটা প্রিমিয়ার পদ্মিনীকে নিয়েই। মাসতুতো দিদি যাবেন পার্লারে সাজতে , জামাইবাবু তাকে পার্লারে নামিয়ে দিয়ে নিজের কাজে চলে যাবেন , আবার দুজনে সন্ধ্যাবেলা চলে আসবেন। মুশকিল হলো পিসি যখন একটু বাড়িতে বিশ্রাম করে ফের আসতে চাইলেন। ব্যাপারটা হল এই , দুটি গাড়ি একই রঙের, আর এক পদ্মিনীর চাবি অন্যটাতে দৈবাৎ লেগে গিয়েছিল , জামাইবাবু তাই তার সম্পর্কিত শালার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন, পিসতুতো ভাইয়ের হাতে হ্যারিকেন।
এই গল্প শুনে একজন বাদে বাকি আড্ডাধারীরা হা হা করে উঠল , গুলি, একদম গুল, দিদিও কি নিজের গাড়ি চিনতে ভুল করেছিলেন ?এ কি করে হয় ? বক্তার সাফাই হল , দিদি নাকি প্রথমবার পার্লারে সাজতে যাচ্ছিলেন , পার্লার নির্বাচন করার আগে মোটামুটি পার্ক স্টিট থেকে ট্যাংরা পাড়া সার্ভে করে নিয়েছিলেন। সুতরাং , যার প্রিমিয়াম পদ্মিনী সাজার শখ , সামান্য প্রিমিয়ার পদ্মিনী নিয়ে সে কী করবে ?
যে বন্ধু এতক্ষন চুপ করে ছিল, সে বলল , আমার শোনা ফো পাহ্।র গল্পও গাড়ি নিয়ে। ওর গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে সকলের কমন বন্ধু , রাজর্ষি। রাজর্ষির বাড়ির সামনে বিরাট একটা ঝিল আছে। একদিন ক্লাব থেকে টেনিস খেলে ফিরে , বাড়ির বারান্দায় চা খেতে খেতে তার স্ত্রীকে ডেকে বলল , দেখ কোন আহাম্মক গাড়িটা হ্যান্ডব্রেক না লাগিয়ে পার্ক করেছে , ঝিলের দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে দেখ !
রাজর্ষির বৌ গাড়িটা দেখেই আঁতকে উঠল , কারণ রাজর্ষি সেদিন গাড়ি নিয়ে টেনিস খেলতে গিয়েছিল ! রাজর্ষিকে সবাই চেনে বলে , এই গল্প সকলেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হল।
চতুর্থজনের পালা। সে শোনাল অফিসজীবনের এক গল্প। ওদের অফিসে নাকি একজন পদস্থ অফিসার ভাষণ দিতে এসেছিলেন কোন এক অনুষ্ঠানে। বক্তৃতায় কলার মাইক ব্যবহার করা অনেকেই পছন্দ করেন , উনিও তাই করলেন। কলার মাইকের ব্যাটারী হোল্ডার বক্তার পকেটে গুঁজে রাখতে হয়। ব্যাপারটা হল এই , বক্তৃতা শেষে ভদ্রলোক হোল্ডারের সুইচ অফ করেন নি , সুতরাং বক্তৃতার ঠিক পরেই ওর যে ফোনটা এসেছিল , এবং ফোনে মাখো মাখো ভাবে উনি যে আমি লাভ ইউ ডার্লিং বলছিলেন , কলার মাইকের কল্যানে , সেই প্রেম বাক্যটি তেষট্টি জন শ্রোতা , দুই জন ব্যবস্থাপক অফিসার ও একজন আর্দালি সকলের কানে পৌঁছে যায়। দৌড়ে গিয়ে ব্যাপারটা সামলে দেয় অবশ্য সেই আর্দালি।
পঞ্চম আড্ডাধারী , ফো পাহ্র প্রসঙ্গ ওঠাতেই খুব অস্বস্তি বোধ করছিলেন। লোকে ওকে খুব সাবধানী এবং সতর্ক মানুষ হিসাবেই জানে। কিন্তু একবার যে হোয়াটসআপে নিজের অধীনস্থ অফিসারকে একটা গোপন মেসেজ পাঠাতে গিয়ে সেটা হোয়াটসআপের স্টেটাসে চলে গিয়েছিল , সে গোপন কথা ও এতদিনে কবুল করল। এমনিতে কোনোকিছু হোয়াটসাপের স্টেটাসে দেওয়া আর বাজারের মধ্যে চোঙা দিয়ে ঘোষণা করা তাত্ত্বিক ভাবে একই ব্যাপার , তবে সবাই মেসেজই দেখে , স্টেটাস দেখে না , আর প্রাপক অফিসারটি ব্যাপারটি লক্ষ্য করায় , জোর বিপদ থেকে সে বেঁচেছিল। এই প্রসঙ্গ উঠতেই আড্ডার গতি চলে গেল ট্রাম্পের পরামর্শদাতার দিকে, যে নাকি যুদ্ধের গোপন পরিকল্পনা এক আঙুলের ছোঁয়ার ভুলে পাঠিয়ে দিয়েছেন এক সাংবাদিকের কাছে I এইসব সাংঘাতিক গোপন পরিকল্পনা পৃথিবীর শক্তিধর দেশগুলোর পক্ষে নতুন কিছু নয় – কিন্তু টেকনোলজির ভুলে এরকম বে -আব্রু পড়াটা নিশ্চয়ই নতুন।
আলোচনা এরপর ট্রাম্প , পুতিন , মহম্মদ ইউনিস এসব দিকেই ঘুরতে থাকায় , আজকের আড্ডার ষষ্ঠ সদস্য হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ওর সমস্যা হল ওকে যদি বলতে হত , তাহলে তো ও কোনটা ছেড়ে কোনটা নিয়ে বলবে! ভুল করে লেডিস টয়লেটে ঢুকে পড়া , যে দুই বাড়ির মুখ দেখাদেখি বন্ধ , তাদের একজনের কাছে অন্যজনের প্রশংসা করা , এক দোকানের থেকে জিনিস কিনে ভুল করে অন্য দোকানে ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করা, উল্টো টি শার্ট পরে দোকান বাজারে যাওয়া, লিস্ট যে অন্তহীন!
যদি কেউ এ সম্বন্ধে বিস্তারিত জানতে চান , সুনীলের মত বলতে হয় , আমার আগাম অনুমতি দরকার , তার সাথে চাই নীল জামা, যার কলারের সাইজ বত্রিশ !
—oooXXooo—
![]()







