“ক্লিওপেট্রা”
✍ ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়
(তৃতীয় পর্ব)
অ্যান্ড্রোমিডা রাণী ক্লিওপেট্রার প্রধানা দাসী। বড়ো মিষ্টি এই মেয়েটি। অসময়ে রাণীকে মদ্যপান করতে দেখে উদ্বিগ্ন। পর্দা সরিয়ে প্রাসাদের বিলাসবহুল ঘরটিতে ঢুকলেন।দেখলেন রাণীর চোখে জল। ছুটে গিয়ে রাণীকে ধরলেন। “কাঁদবেন না ঈশ্বরী! আপনার চোখের জল প্রলয়ের সৃষ্টি করবে। মিশরের দেবী আপনি। আমাদের রক্ষাকর্তা। এ আপনাকে শোভা পায় না।”
নেশায় পা টলছে রাণীর। এবার হেসে উঠলেন। এমন অট্টহাসি প্রাসাদে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। বললেন “অ্যান্ড্রোমিডা! তুমি কী শুনতে পাচ্ছো আমার ব্যথিত হৃদয়ের আর্তনাদ? তুমি তো নারী। বুঝতে পারো নারী হৃদয় কী চায়?”
“বুঝতে পারি রাণীসাহেবা। আমার থেকে ভালো আর কে চেনে আপনাকে। এই জীবনের রক্ষাকর্তা আপনি। আপনি দেবী!”
“ইতিহাস কী তাই বলবে অ্যান্ড্রোমিডা!বলো তুমি। পুরুষ শাসিত সমাজ আমাকে ভোগ করে গায়ে কলঙ্ক ছেটাবে।বলবে আমি লালসাময়ী, লোভী,আরো কত কিছু।”
অ্যান্ড্রোমিডা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে ওঠে যে ইতিহাসের চোখমুখ ঢাকা তা বলতে পারে। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস একদিন শুভবুদ্ধির জাগরণ ঘটবে। মানুষ বুঝবে দুধ আর পানির তফাৎ।
“জানো অ্যান্ড্রোমিডা !কাল রাতে রোমান সৈন্যরা তাড়া করেছিল আমাকে ।সত্তরটা নৌবহর নিয়ে পালিয়ে আসছি যখন তখন তোমার কথা মনে এলো ।সুদানের কাছে যেখানে সাদা নীল আর নীল জল একত্রিত সেখান থেকেই তো তোমাকে উদ্ধার করেছিলাম ।কী ভয়ঙ্কর কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ওরা ।ভাবলে মাথা গরম হয়ে যায় ।যত দায় এই নারীজাতিকে বহন করতে হবে ” ।উত্তেজিত হয়ে ওঠেন সম্রাজ্ঞী ।
রাণীকে শান্ত করাতে পারে না প্রধানা দাসী ।স্মৃতিতে ভেসে আসে অভিশপ্ত দিনটির কথা ।নীল নদে জল কমে গেলেই কুমারী মেয়েকে ভাসিয়ে দিতো মিশরীয়রা ।তাতে নাকি নীলনদ খুশি হবে ।মরুভূমির দেশে নীলনদ প্লাবন আনবে ।
বাবা মাকে টাকার লোভ দেখিয়ে,কখনো বা ভয় দেখিয়ে কুমারী মেয়েকে বলি দেয় ওরা ।চলে উৎসব,খানাপিনা ।কী নিষ্ঠুর !,সেদিন অ্যান্ড্রোমিডা কে যখন ভাসিয়ে দেবার জন্য সবাই আনন্দমুখর তখন ফ্যারাও ,মিশর সম্রাজ্ঞী ক্লিওপেট্রা মুক্তিদূতের মতো হাজির হলেন ।ভাবলে হৃৎপিণ্ডের আওয়াজ স্তব্ধ হয়ে আসে ।
মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে জীবনের জয়গান তো রাণী শুনিয়েছিলেন ।আর বাকীরা মদ্য মাংসে আর উৎসবে বিভোর ।অথচ সাম্রাজ্যের অলিন্দে কান পাতলে শোনা যায় উনি নাকি যৌন আবেদনময়ী! চিৎকার করে ওঠে অ্যান্ড্রোমিডা ।”স্তব্ধ হ ও! ঘেয়ো কুত্তার দল ।বড়ো বড়ো সম্রাট আটটা করে স্ত্রী করেন ।অন্য রাজ্য দখল করে তাদের রাণীকে বিবাহ করেন ।যৌন দাসী রাখেন অগুনতি ।আর ইতিহাস তাদের গুনগান করে চলে ।আর একটা নারী যখন ওই এক ই কাজ করে তখন সে দুশ্চরিত্রা, নিষ্ঠুর ।হায় সমাজ!হায় রে বেটি ছাওয়া” ।
অ্যান্ড্রোমিডা চিৎকার করলে সম্বিত ফিরে পান রাণী ।মৃদু হেসে ওর গালে হালকা টোকা দেন ।বলেন “জানিস ।আমি কী স্বপ্ন দেখি?”
বোকার মতো তাকিয়ে থাকে দাসী ।রাণী বলে ওঠেন “এমন দিন পৃথিবীতে আসবে সেদিন হাজার হাজার ক্লিওপেট্রা সৃষ্টি হবে ।নারী জাগরণ ঘটবে ।অধিকার সচেতন হবে নারী সমাজ ।ছিনিয়ে নেবে নিজের প্রাপ্য সম্মান ।সেদিন নারী সুলতানা হবে,মন্ত্রী হবে “।আবার অট্ট হাসিতে প্রাসাদ কাঁপতে থাকে ।
অ্যান্ড্রোমিডা র মুখে সারল্যের হাসি ।বলে ওঠে আপনার ভবিষ্যৎ বাণী সত্য হবে রাণীসাহেবা ।চলুন ।আপনার স্নানের সময় অতিক্রান্ত হতে চলেছে ।স্নান ঘরে চলুন সাহেবা ।
ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানান রাণী ।
(এরপর… ক্রমশ…)
![]()







