খালি খাতা
ডাঃ রঞ্জন কুমার দে (বারিদ বরণ)
শীতের সকালের হালকা কুয়াশা তখনও স্কুলের মাঠে লেগে আছে। ঘণ্টা পড়তেই ক্লাস সেভেনের ছাত্ররা একে একে বেঞ্চে বসে পড়ল। অরিন্দম স্যার ধীরে ধীরে ক্লাসে ঢুকলেন। তার হাতে খাতার একটা বড় গাদা।
আজ রচনা খাতা দেখার দিন।
স্যার বললেন,
“যারা ‘আমার প্রিয় মানুষ’ বিষয়ের রচনা লিখেছ, খাতা জমা দাও।”
এক এক করে খাতা সামনে এল। কেউ মাকে নিয়ে লিখেছে, কেউ বাবাকে নিয়ে, কেউ আবার দাদুকে নিয়ে। স্যার পড়ে পড়ে মাথা নাড়ছেন।
শেষ বেঞ্চে বসে থাকা একটা ছেলেকে তখনও কেউ খেয়াল করেনি।
রাহুল।
চুপচাপ বসে আছে।ক্লাসের কোলাহলের ভেতরে সে যেন একেবারে অদৃশ্য হয়ে বসে আছে।তার গায়ে স্কুলের ইউনিফর্ম আছে ঠিকই, কিন্তু রং প্রায় মুছে গেছে। শার্টের কাঁধে সেলাই করা পুরোনো প্যাচ, হাতার প্রান্তগুলো ছিঁড়ে সুতো বেরিয়ে আছে। প্যান্টটা একটু বড়—সম্ভবত কারও পুরোনোটা কেটে ঠিক করা। হাঁটুর কাছে কাপড়টা ঘষে পাতলা হয়ে গেছে। পায়ে জুতো আছে, কিন্তু তার সামনের অংশ ফেটে মুখ খুলে আছে।মাঝে মাঝে সে পা দুটো বেঞ্চের নিচে গুটিয়ে রাখে,যেন কেউ সেই ফাটা জুতোটা দেখতে না পায়।
তার ব্যাগটাও নতুন নয়।পুরোনো কাপড়ের ব্যাগ, রং বিবর্ণ হয়ে গেছে। একপাশে সেফটি পিন দিয়ে ছেঁড়া জায়গাটা আটকানো।রাহুল দুহাতে সেটাকে হাঁটুর কাছে শক্ত করে ধরে আছে। যেন ওই ব্যাগটাই তার একমাত্র সম্পদ।
মুখটা শুকনো, চোখের নিচে কালচে দাগ। বয়স মাত্র বারো, তবু চোখের ভেতরে অদ্ভুত ক্লান্তি, যেন সে অনেক দূরের পথ হেঁটে এসেছে।
ক্লাসে অন্যরা কথা বলছে, হাসছে, কেউ খাতা খুলছে, কেউ বই।রাহুল শুধু চুপ করে বসে আছে।সে জানে, আজ আবার তার খালি খাতাটা সামনে যাবে।
স্যার বললেন,
“রাহুল, তোমার খাতা?”
রাহুল ধীরে ব্যাগ খুলে একটা নীল খাতা বের করল। হাত কাঁপছে যেন। স্যার সেটা নিয়ে খুললেন।
প্রথম পাতা—খালি।
দ্বিতীয় পাতা—খালি।
তারপরের সব পাতাই সাদা।
স্যারের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“এটা কী? একটা লাইনও লেখোনি?”
ক্লাসে হাসির ঢেউ উঠল।
কেউ বলল,
“স্যার, ও কখনোই কিছু লেখে না।”
স্যার একটু রেগে উঠলেন,
“স্কুলে পড়তে আসো, না শুধু সময় কাটাতে? এতদিন ধরে বলছি রচনা লিখতে,আর তুমি একটা পাতাও লেখোনি?”
রাহুল দাঁড়িয়ে রইল মাথা নিচু করে। তার ঠোঁট কাঁপছিল, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোল না।
স্যার শেষ পর্যন্ত বললেন,
“আজ তোমার বাড়িতে যাব আমি। তখন বুঝব কেন তোমার খাতা সবসময় খালি থাকে।”
ক্লাস নিঃশব্দ হয়ে গেল।
স্কুল ছুটির পরে অরিন্দম স্যার বাড়ি ফিরে একটু জলখাবার খেয়েই বেরিয়ে পড়লেন।
রাহুলের দেওয়া ঠিকানাটা দেখে তিনি একটু অবাকই হয়েছিলেন। শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে একটা বস্তি।
সেখানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা নেমে এসেছে।
সরু গলি, টিনের চাল, ভাঙা দেওয়াল—কোথাও কোথাও কেরোসিনের বাতি জ্বলছে। বাতাসে ধোঁয়া আর রান্নার গন্ধ মিশে আছে।
স্যার একটা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ডাকলেন,
“রাহুল!”
ভেতর থেকে একটা কাশির শব্দ এল।দুর্বল শরীর নিয়ে এক বৃদ্ধ মহিলা দরজা ঠেলে বেরোলেন।
“আপনি?”
“আমি রাহুলের স্কুলের শিক্ষক।”
মহিলার মুখে একটু অস্বস্তির ছায়া।
“ও তো এখন বাড়িতে নেই।”
স্যার একটু অবাক হলেন,
“কোথায় গেছে?”
মহিলা একটু লজ্জা পেয়ে বললেন,
“হোটেলে কাজ করে… বাসন মাজে।”
স্যারের বুকটা যেন কেমন করে উঠল।
“এই বয়সে?”
মহিলা চুপ করে রইলেন। কিছুক্ষণ পরে বললেন,
“ও কাজ না করলে আমরা খাই কী?”
তার কণ্ঠে কোনো অভিযোগ নেই, শুধু ক্লান্তি।
“কেনো ওর বাবা মা…” স্যারের চোখে মুখে কৌতূহল।
বৃদ্ধা শুকনো মুখে তাকালেন,
“বাপ তো জন্ম দিয়েই পালিয়ে গেছে। আর মা টাও তো টিবি হয়ে বিছানায় পড়েছে । আমি ওর দিদিমা।”
আশ্চর্য রকম শান্ত তার গলাটা।
অরিন্দম স্যার ভিতর থেকে কেঁপে উঠলেন।
গলির শেষ মাথায় একটা ছোট হোটেল। ভিতর থেকে থালা-বাসনের ঠকঠক শব্দ আসছে।
স্যার ভেতরে ঢুকতেই দেখলেন,একটা বড় টবে সাবানের জল। তার মধ্যে অসংখ্য থালা-বাটি। আর সেই জলের ভেতরে ঝুঁকে আছে রাহুল।ছোট হাত দুটো অবিরাম বাসন ঘষে চলেছে।
স্যার ডাকলেন,
“রাহুল।”
ছেলেটা চমকে তাকাল।
“স্যার!”
তার চোখে একসাথে ভয় আর লজ্জা।
স্যার ধীরে জিজ্ঞেস করলেন,
“তুমি কখন থেকে কাজ করো এখানে?”
“স্কুল থেকে এসে… রাত বারোটা পর্যন্ত।”
“তারপর?”
“বাড়ি গিয়ে ঘুমাই… সকালেই আবার স্কুল।”
স্যারের গলা শুকিয়ে গেল।
তিনি দেখলেন—রাহুলের হাতের আঙুলগুলো কুঁচকে গেছে, কোথাও কোথাও কেটে গেছে।
এক কোণে তার স্কুল ব্যাগটা রাখা। ব্যাগের ভেতর থেকে সেই খালি খাতাটা একটু বেরিয়ে আছে।
স্যার খাতাটা হাতে নিলেন।তিনি ভাবছিলেন, পাতাগুলো নিশ্চয়ই আগের মতোই সাদা থাকবে।
প্রথম পাতা খুললেন।
পাতা সত্যিই খালি।
দ্বিতীয় পাতাও সাদা।
স্যার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
কিন্তু আজ তার মনে হলো,
এই খালি সাদা পাতাগুলো আসলে খালি নয়। এখানে লেখা আছে রাতভর বাসন মাজার শব্দ, ক্ষুধার্ত পেটের জ্বালা, অসুস্থ্য মায়ের কাশির শব্দ, এক শিশুর না-পারা, না-পাওয়ার ক্লান্তির ইতিহাস। এ যেনো এক শিশুর অসময়ে বড় হয়ে যাওয়ার গল্প।
স্যারের চোখ ঝাপসা হয়ে গেল।
ঠিক তখনই তিনি পরের পাতাটা উল্টালেন।
হঠাৎ থমকে গেলেন।পাতার মাঝখানে কাঁপা হাতে বড় বড় করে লেখা একটা শব্দ,
“মা”
শুধু একটাই শব্দ।
তার নিচে আর কিছু নেই। কালির দাগ একটু ছড়িয়ে গেছে। মনে হয় লিখতে লিখতেই হাত কেঁপেছে।
সেই মুহূর্তে তিনি বুঝলেন,
এই একটা শব্দেই একটা শিশুর পুরো পৃথিবী লেখা আছে।
স্যার অনেকক্ষণ সেই শব্দটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
হয়তো রাহুল স্কুলে বকুনি খাওয়ার পর,রাতের কাজের ফাঁকে ক্লান্ত হাত নিয়ে খাতাটা খুলেছিল।
রচনার বিষয় ছিল—
“আমার প্রিয় মানুষ”।
আর এত কষ্টের ভেতর থেকেও তার মনে প্রথম যে শব্দটা এসেছে সেটা শুধু “মা”।
হঠাৎ যেন বুকের ভেতর কোথাও একটা ভারী পাথর নেমে এল।সকালের সেই ক্লাসরুমটা তার মনে পড়ে গেল।সবাইয়ের সামনে তিনি কড়া গলায় বকছিলেন ছেলেটাকে,
“একটা লাইনও লেখোনি?”
সেই মুহূর্তে তিনি বুঝতে পারলেন,
তিনি শুধু একটা খাতা দেখেছিলেন, কিন্তু একটা জীবন দেখেননি।এই ছোট্ট ছেলেটা সারাদিন স্কুল করে,তারপর রাতভর বাসন মাজে। বাড়ী ফিরে অসুস্থ্য মায়ের মাথার পাশে বসে তার পরিচর্যা করে হয়তো।তারপরও খাতাটা খুলে লিখতে বসেছে।আর তিনি তাকে অলস বলেছিলেন।
স্যারের গলাটা শুকিয়ে গেল।তার মনে হলো, আজ সত্যিই কেউ যদি তাকে প্রশ্ন করে,
“অলস কে?”
তাহলে হয়তো উত্তরটা আর রাহুল নয়।
খাতার পাতায় লেখা “মা” শব্দটার ওপর হঠাৎ একটা জলবিন্দু পড়ে গেল। স্যার বুঝতেই পারেননি কখন তার চোখ ভিজে উঠেছে।
তিনি ধীরে খাতাটা বন্ধ করলেন।
আজ তিনি একটা নতুন পাঠ শিখলেন।শিক্ষক হয়েও
আজ একজন ছাত্রই তাকে মানুষ হওয়ার পাঠ পড়িয়ে দিল। খাতাটা সাথে নিয়েই বাড়ী ফিরলেন অনিন্দ্য স্যার।
পরদিন ক্লাসে স্যার রাহুলের খাতা টা নিয়ে ঢুকলেন। শুরুতেই তিনি রাহুলের খাতাটা হাতে তুলে ধরলেন।
“তোমরা এই খাতাটা খালি দেখছ।এটা রাহুলের খাতা।”
ক্লাসে নিস্তব্ধতা।
স্যার ধীরে বললেন,
“কিন্তু আমি এখানে অনেক লেখা দেখছি।”
ছাত্ররা অবাক।
“এখানে লেখা আছে। একটা ছেলের রাত জেগে কাজ করার গল্প, অসুস্থ মায়ের জন্য লড়াই করার গল্প, তারপরেও প্রতিদিন স্কুলে আসার সাহসের গল্প ।”
তিনি একটু থামলেন।
তারপর খুব আস্তে বললেন,
“তোমাদের খাতায় অনেক শব্দ আছে।কিন্তু এই খালি খাতাটায় আছে একটা জীবনের ইতিহাস।”
ক্লাসের কেউ আর কথা বলল না।
স্যার খাতাটা বন্ধ করলেন।
“তবে আমি বলছি,একদিন এই খাতা ভরবে।”
স্যার একটু থামলেন,
“যে ছেলে এত লড়াই করে বাঁচতে পারে, সে একদিন নিজের গল্প নিজেই লিখবে।”
হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল।শেষ বেঞ্চটা ফাঁকা।
স্যারের ভুরু কুঁচকে গেল।
“রাহুল আজ আসেনি?”
সামনের বেঞ্চ থেকে এক ছাত্র ধীরে বলল,
“ না স্যার… আজ ভোরে ওর মা মারা গেছে।”
ক্লাসরুমটা হঠাৎ যেন আরও নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
স্যারের হাতে ধরা খাতাটা কেঁপে উঠল।
তিনি ধীরে আবার খাতাটা খুললেন।
পাতার মাঝখানে কাঁপা হাতে লেখা সেই একটাই শব্দ,
“মা”
স্যার অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
হঠাৎ মনে হলো,
এই রচনাটা আর কোনোদিন শেষ হবে না। কারণ যার জন্য রচনাটা শুরু হয়েছিল, সে মানুষটাই আজ আর নেই।কিন্তু তার জন্য লড়ে যাওয়া এক ছেলের গল্পটা রয়ে গেল।রয়ে গেল সেই খালি খাতায়,রয়ে গেল এক শিক্ষকের অপরাধবোধে, রয়ে গেল একটা ক্লাসরুমের নীরবতায়।
জানালা দিয়ে তখন বিকেলের আলো ঢুকছিল।সেই আলো এসে পড়েছিল একটা খালি খাতার ওপর।
যেটা আসলে কখনোই খালি ছিল না।
—oooXXooo—
![]()







