বিশেষ সংবাদ প্রতিবেদন, নিউজ ব্যুরো আমার আলো, রঞ্জিত চক্রবর্ত্তী:
একদিকে বিশ্ব উষ্ণায়নের ভয়ংকর থাবা, অন্যদিকে অপরিকল্পিত নির্মাণ ও ভূগর্ভস্থ জলের যথেচ্ছ ব্যবহার— এই জোড়া ফলায় বিদ্ধ হয়ে আগামী ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে বঙ্গোপসাগরের গভীরে তলিয়ে যেতে পারে আমাদের প্রিয় শহর কলকাতা। এমনই এক ভয়ঙ্কর আশঙ্কার কথা শোনালেন বিশিষ্ট ভূতত্ত্ববিদ ডঃ সজীব কর। তাঁর গবেষণালব্ধ তথ্য এবং আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের রিপোর্ট অনুযায়ী, আর হয়তো বেশি সময় নেই— দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যেতে পারে তিলোত্তমা মহানগরীর অস্তিত্ব।
ভয়াবহ ভবিষ্যৎবাণী: কেন ডুবছে কলকাতা?
ডঃ সজীব করের মতে, কলকাতার এই মহাবিপর্যয়ের প্রধানত দুটি কারণ রয়েছে:
১. সমুদ্রের জলস্তর বৃদ্ধি (Sea Level Rise): বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে অ্যান্টার্কটিকা ও সুমেরু অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলছে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এর ফলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সমুদ্রের জলস্তর প্রায় এক মিটার পর্যন্ত বেড়ে যাবে। বর্তমানে কলকাতার গড় উচ্চতা সমুদ্রের জলতল থেকে মাত্র ৪.৫ মিটার (যা একসময় প্রায় ৭ মিটার ছিল)। জলস্তর বাড়লে জোয়ারের সময় ভাগীরথী-হুগলি নদীর জল সহজেই কলকাতার ভূমি স্পর্শ করবে এবং নোনা জল শহরে প্রবেশ করে মাটির তলাকে আরও দুর্বল করে দেবে।
২. ভূমিক্ষয় ও দুর্বল ভিত্তি (Land Subsidence): কলকাতা শহর নবীন পলিমাটির ওপর তৈরি। এই মাটির নিচে অসংখ্য ফাটল (যেমন ইওসিন হিঞ্জ) রয়েছে। কিন্তু গত কয়েক দশকে এই মাটির উপর বিপুল চাপ সৃষ্টি হয়েছে:
- অপরিকল্পিত বহুতল: ভূতত্ত্ববিদের মতে, কলকাতার মাটি ১০-১২ তলার বেশি ভার নেওয়ার ক্ষমতা রাখে না, অথচ সেখানে তৈরি হচ্ছে ২৫ থেকে ৪২ তলা পর্যন্ত সুউচ্চ অট্টালিকা। এই অতিরিক্ত ওজনের কারণেই শহর দ্রুত বসে যাচ্ছে।
- ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলন: হাইরাইজ বিল্ডিংগুলো লাগাতার পাম্প করে মাটির নিচ থেকে বিপুল পরিমাণ জল তুলে নেওয়ায় মাটির তলা ফাঁপা হয়ে যাচ্ছে এবং নরম পলি সরে যাচ্ছে।
- পুকুর ও জলাধার ধ্বংস: শহরের বহু প্রাকৃতিক জলাধার বুজিয়ে ফেলার কারণে বৃষ্টির জল মাটিতে প্রবেশ করে মাটির স্তরকে মজবুত করতে পারছে না, উল্টে ভূমি দ্রুত অবনমিত হচ্ছে।
কতটা দ্রুত তলিয়ে যাচ্ছে মহানগরী?
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমীক্ষা এই বিপদকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা: পৃথিবীর দ্রুততম ডুবে যাওয়া শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তা। অপরিকল্পিত নির্মাণ ও ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলনের কারণে এই শহর প্রতি বছর প্রায় ১৮.৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত তলিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, কলকাতার অবস্থাও দ্রুত জাকার্তার মতো হতে পারে।
বিপন্ন অঞ্চল: ডঃ করের মতে, শুধু কলকাতা নয়, ভাগীরথী-হুগলি নদীর দু’পাশের প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকা, যার মধ্যে হাওড়া, দক্ষিণেশ্বর, বরানগর, বাগবাজার, শ্যামবাজার, কলেজ স্ট্রিট, ধর্মতলা, খিদিরপুর-এর মতো জনবহুল এলাকা রয়েছে, তা সম্পূর্ণরূপে জলের তলায় চলে যেতে পারে।
উদ্বেগজনক তথ্য: ১৭ কোটি মানুষ হবেন ‘পরিবেশগত শরণার্থী’
ডঃ করের গবেষণায় উঠে এসেছে আরও একটি ভয়ঙ্কর তথ্য— শুধু ১২-১৫টি শহর নয়, এই বিপর্যয়ের ফলে ভারতবর্ষের উপকূলবর্তী পূর্ব ও পশ্চিম দিকে প্রায় ৮২ কিলোমিটার স্থলভাগ সমুদ্রের নিচে চলে যাবে। এর ফলে প্রায় ১৭ কোটি মানুষ তাদের বাসস্থান হারাবেন এবং ‘এনভায়রনমেন্টাল রিফিউজি’ বা ‘পরিবেশগত শরণার্থী’তে পরিণত হবেন।
অত্যন্ত জরুরি ভিত্তিতে শহরের পরিকল্পনা পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলনে নিয়ন্ত্রণ, জলাধার সংরক্ষণ এবং উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষায় পদক্ষেপ না নিলে অদূর ভবিষ্যতে এক প্রলয়ঙ্করী বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে চলেছে মহানগরী কলকাতা।
![]()






