ডাব ও লালগোলা
বাসুদেব চন্দ
আজকাল আমার কোনও কথাই বউটা বিশ্বাস করতে চায় না। কারণ শুরুতেই এমন একটা কথা বলেছিলাম যার জন্য বিশ্বাসের অপমৃত্যু ঘটেছে!
ঘটনাটা হল-
বিয়ের পর অষ্টমঙ্গলায় শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছি। অনেকটা পথ। একটু জল হলে ভালো হয়। একজন ডাবওয়ালাকে দেখতে পেয়ে গাড়ি থামালাম (নিজের নয়, বিয়ের আনন্দে গোটা একটা গাড়ি একাই ভাড়া করেছি দোকা যাব বলে)।
“ডাব খাবে?”
অল্প বয়সী লাজুক বউ, ঘাড় নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলল না ‘না’ বলল ঠিক বোঝা গেল হল না। অবশ্য না বললে শুনছেটা কে; সারাটা পথ বউয়ের খেয়াল রাখব বলে শপথ করেছি, কিছু না-খাওয়ালে চলবে কেন।
“এসো” বলে হাত ধরে নামালাম। খুশিতে লাজুক হাসি চলকে উঠল!
ডাবওয়ালাও কড়কড়ে একজোড়া নতুন বর-বউ দেখে ড্যাব ড্যাব চোখে তাকিয়ে রইল, তারপর অতি উৎসাহে কচি কচি দুটো ডাব এগিয়ে দিল; প্রথমে বউকে, তারপর আমাকে।
দু-জনেই পাইপ বেয়ে জল টানতে শুরু করলাম। আমি ইচ্ছে করেই আস্তে আস্তে টানছি, ওর যাতে আগে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু নতুন বউয়ের খাওয়া কি আর অত তাড়াতাড়ি হয়। হয়েও হয় না।
তবে একটা সময় পর ওর পাইপের ‘চো-চো’ শুনে বুঝতে পারলাম-“এবার হয়ে গেছে!”
আড়চোখে দেখতে লাগলাম, কী করে।
ডাবওয়ালার চোখের ইশারায় নতুন বউ ডাবটাকে ফেলে দিল। সঙ্গে সঙ্গে আমি ‘লুফে নিলাম’!
পয়সা মিটিয়ে দুটিতে মিলে গুটিগুটি পায়ে হাঁটিতে হাঁটিতে বলিলাম-
“ডাবটাকে ফেলে দিলে!?”
“ফেলব না? তুমিও তো ফেলে দিলে?”
“আমি ফেলেছি তুমি ফেলেছো বলে। বাড়ি নিয়ে গেলে কাজে লাগত।”
“তার মানে?”
“শোনো, তুমি কিন্তু বাড়ির বড় বউ, এগুলো তোমার জেনে রাখা দরকার-
আমাদের আর্থিক অবস্থা তেমন নয় যে রোজ রোজ ডাব কিনে খাব। আমরা প্রথমে একটা ডাব কিনে জলটা খেয়ে নিই। তারপর জল ঢেলে রেখে দিই, পরদিন খাই। আবার তাই। এভাবে মাস কাবার হয়ে যায়।”
“এ বাবা! এটা তো জানতাম না!”
“ঠিক আছে, প্রথম প্রথম এরকম ভুল হতেই পারে। এরপর থেকে খেয়াল রেখো।”
এমন সিরিয়াসলি বলেছিলাম, ও বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছিল।
আমার শ্বশুর’বাবা এই কথাটা শুনে বলেছিলেন- ‘এ তো ডেঞ্জারাস ছেলে রে বাবা, উঠতে বসতে তোকে ঘোল খাওয়াবে! খুব সাবধানে থাকিস মা’!
আমার মা সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল- ‘অর কথায় কিসু মনে কইরো না, ও সুযোগ পাইলেই সবাইরে বোকা বানায়’।
★★★
এই সবাইয়ের মধ্যে আরেকজন পড়ে। পিংকি মেয়েটি আমাকে নিজের দাদার থেকেও বেশি বিশ্বাস করে এবং ভালোবাসে। কাজেই সেই সুযোগটা কাজে লাগাতে আমার কোনও অসুবিধা হল না।
তখন আমার চেম্বার ছিল ওদের বাড়ির পিছনের দিকে একটা গুদামঘরে। কম দামে ভাড়া নিয়েছি। চেম্বারের মেম্বার সংখ্যা তখন সর্বসাকুল্যে দু-জন, আমি আর সুপ্রিয়। এই সুপ্রিয় একদিন পিংকির খুব প্রিয় হয়ে উঠল!
পিংকি সুযোগ পেলেই চেম্বারে ঢুকে পড়ে। একদিন পড়তে পড়তে চলে এল, হাতে খাতা আর পেন। ভাবখানা এমন যেন অংক করতে এসেছে। সুপ্রিয় তখন আসেনি।
“বাসুদা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব? কাউকে বলবে না?”
“আজ পর্যন্ত কত কথা আমায় বলেছিস, এক কণাও কারো কানে তুলেছি?”
“শোনো না….
তোমার সুপ্রিয়র বাড়িটা কোথায় গো?”
ঠিকানা বললাম-
“ওরা ক’ ভাইবোন?”
সংখ্যাটা বললাম-
“ওর বাবা কী করেন গো?”
“কিছুই করেন না।”
“কিছুই করেন না’-মানেটা কী? বসে বসে খায় নাকি?”
“বসে বসে খাওয়াটাই তো ওঁর কাজ। খাবার জন্য কেন দৌড়তে যাবে!’
এবার পিংকির মাথা চুলকানো শুরু হয়ে গেল। বলল-
“একটু পরিষ্কার করে বলো না গো!”
“শোন তাহলে, শিয়ালদা-বনগাঁ লাইনে রোজ ক-টা ট্রেন চলে জানিস?”
“জানি না গো।”
“আমিও জানি না। যেটা জানি, সেটা হল- ওই লাইনের একটা ট্রেনের মালিক হলেন সুপ্রিয়র বাবা শ্রী ‘ভরত চন্দ্র সরকার’।”
“কী বলেছো! সত্যিইই?”
“আমি তোকে মিথ্যে বলতে পারি?”
পাটিগণিতের অংক মিলে গেলে যেমন আনন্দ হয়, তেমন আনন্দে লাফাতে লাফাতে পিংকি উপরে চলে গেল। কিচ্ছুটি বলে গেল না!
আমি কাজে মন দিলাম।
মিনিট দশকের মধ্যেই পিংকির বাবা নেমে এলেন। মুখখানা গম্ভীর। ভারী গাল দুটো টসটসে লাল। বড্ড দেমাকী লোক, খালি বড়লোকি চাল!
“বাসু বাবু, একটা সুখব আছে!”
“কী দাদা!”
“পিংকির জন্য দারুণ একটা ছেলে পেয়েছি।”
“এটা তো সত্যিই সুখবর!ছেলেটি কী করে ?”
“কিছুই করে না, বসে বসে শুধু খায়।”
এতক্ষণ আমি বসেই ছিলাম, ওঁর কথা শুনে এবার উঠে দাঁড়ালাম। ষাঁড় আক্রমণ করার আগে সামনের পা-দুটো যেভাবে মাটি আঁচড়াতে থাকে, মনে হল আমার বনগাঁ লোকালটা ঠিক সেভাবেই আমার দিকে ছুটে আসবে!
একটা শুকনো হাসি হেসে বললাম-
“কে আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খায় দাদা, সবাই বসেই খায়। কিন্তু পেশা তো একটা থাকবে।”
“তেমন কিছু না; সামান্য একজন মালিক!”
“কীসের?”
“লালগোলা-এক্সপ্রেসের!”
কথাটা বলেই মাটি কাঁপিয়ে চলে গেলেন!
কী কেলো রে মাইরি; আমার গুলটা যে দাদাও গিলে নেবেন, স্বপ্নেও ভাবিনি!
★★★
একদিন আমি একটা রেললাইনের উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, আমার পিছন পিছন ধেয়ে আসছে নীল রঙের একটা লালগোলা! গোলার ইঞ্জিনের উপরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন দু-জন বাবা। একজনের হাতে ইয়া-বড় একটা ফাঁস-দড়ি, আরেকজনের হাতে গোটা একটা ডাব! ভাবখানা এমন- যেন দড়ি ফেলে ধরবে, তক্ষুণি আরেকজন ডাব ছুঁড়ে মারবে!
বেগতিক দেখে, লাইনের উপর শুয়ে পড়ে ক্ষমা চাইলাম এবং কানমুলে প্রতিজ্ঞা করলাম- ‘সরলতার সুযোগ নিয়ে জীবনেও কাউকে বোকা বানাব না’!
কিন্তু ভূতে না-শোনে মিথ্যুকের কাহিনি! গোলাটা কামান দাগতে দাগতে আমার উপর দিয়ে চলে গেল!
আমার কাটা পড়ার চিৎকার ট্রেনের চিৎকারে চাপা পড়ে গেল, শুনতে পেল শুধু বউ। এক ধাক্কায় ডেকে তুলে বলল- কাল থেকে তুমি আলাদা শোবে!”
—oooXXooo—

![]()







