একটি প্রেমের গল্প
রতন চক্রবর্তী
“””””””””””””””””
অনুরাগ আর অনুষ্কা দুজনেই একই সমন্বয় মহাবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত।এক সময় প্রকৃতির ইচ্ছায় আর পাঁচটা যুবক যুবতীর মতো ওদেরও মহাবিদ্যালয়ে পড়াকালীন অবস্থায় বাড়ন্ত যৌবনের টানে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠলো।এই প্রেম পর্ব চলাকালীন অবস্থায় ওরা কখনো মহাবিদ্যালয়ের ক্যান্টিনে বসে , কখনো মহাবিদ্যালয়ের ছুটির শেষে বাইরে বেরিয়ে কোন বড় রেস্টুরেন্টের কেবিনে বসে পছন্দ সই খাবার অর্ডার করে খেতে খেতে প্রেমের মিষ্টি মধুর কথা আদান-প্রদান করত।এমনি করে চলতে চলতে একদিন ওদের দুজনের প্রেম পর্বের কথা বাতাস বয়ে নিয়ে গিয়ে তাদের অভিভাবকের কাছে জানিয়ে দিল।অভিবাবকেরা প্রথমে শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন বটে। কিন্তু দুটি পরিবারের মধ্যেই আধুনিকতার ছোঁয়া ছিল বলে ব্যাপারটাকে তারা সহজেই হজম করে নিয়েছিলেন।পরবর্তীকালে তারা তাদের ছেলেমেয়েদের বিষয়টা সত্য না মিথ্যা তা জানার জন্য প্রশ্ন করলে দুজনেই লজ্জিত হয়ে মাথা নিচু করে স্বীকার করে নিলো।এরপর একদিন অনুষ্কার বাবা অনন্ত বাবু অনুষ্কার কাছ থেকে অনুরাগের বাড়ির ঠিকানা সংগ্রহ করে কাউকে কিছু না জানিয়েই একা একা এক বিকেলে অনুরাগের বাড়ি হাজির হলেন।অনুরাগের বাড়ির লোকেরা অপরিচিত অনন্ত বাবুকে দেখে চিনতে না পারার দরুন একটু বিস্মিত হয়েছিলেন বটে।কিন্তু অনন্ত বাবু যখন তার পরিচয় দিলেন তখন অনুরাগের বাড়ির লোকেরা তাকে ঘরে ডেকে যত্ন সহকারে বসতে বললেন।অনন্ত বাবু কোনো রকম ভূমিকা না করেই সরাসরি অনুরাগের বাড়িতে যে কয় জন লোক ছিলেন সবার সামনেই তার মেয়ে অনুষ্কার সাথে যে অনুরাগের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে সে কথা স্পষ্ট করে বললেন।তখন অনুরাগের বাড়ির লোকেরাও বিষয়টা জানেন বলে স্বীকার করলেন।এমন সময় অনুরাগের বাবা বললেন, ভালোই হয়েছে সরাসরি আপনি এসে আমাদের সঙ্গে যে আলোচনা রাখলেন তাতে আমরা খুশি হলাম।কিন্তু দুঃখের বিষয় এই মুহূর্তে আমরা ওদের বিয়ের জন্য কোন রকম চিন্তা ভাবনা করছি না।কারন,আমার ইচ্ছা আমার ছেলে গ্রেজুয়েশন কমপ্লিট করার পর আমার ব্যবসার দায়িত্ব নিয়ে যখন নিজে হাতে সবকিছু সামলাতে পারবে তখনই আমি ছেলের বিয়ে দেব।সব শুনে অনুষ্কার বাবা বললেন,বেশ তাই হবে। আমরা না হয় তত দিনই অপেক্ষা করব।অবশেষে এইসব কথোপকথন শেষ হলে অনুরাগের বাড়ির লোকেরা অনন্ত বাবুকে সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করতে যা করা দরকার তাই করলেন।
পরবর্তীকালে অনুরাগ এবং অনুষ্কা দুজনেই খবরটা জানতে পারলে মনে মনে তারা খুব খুশি হল।তাদের মধ্যে যে একটা ভয় ভীতি কাজ করছিল সেটা দূর হয়ে গেল। এখন ওরা অনেকটাই মুক্ত। খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে কমবেশি দুজনেই দুজনার অভিভাবকদের অনুমতিক্রমে একে অপরের বাড়িতে যাওয়া আসা করতে থাকলো। মুক্ত নীল আকাশের নিচে পাখিরা যেমন মুক্তমনে চলাফেরা করে তদ্রুপ ওরাও অনেকটা সেই রকম ভাবে চলাফেরা করতে থাকলো।
এমনি করে চলতে চলতে একদিন অনুরাগ অনুষ্কা কে বলল, সুন্দরবন বাসন্তী তে তার এক মাসির বাড়ি আছে। যেখানে ২৫ শে ডিসেম্বর খ্রিস্টান মিশনারীদের দ্বারা যীশু খ্রীষ্টের জন্মদিন উপলক্ষে বিরাট উৎসব পালিত হয়।কদিনের জন্য সে সেখানে এই উৎসবের আনন্দ উপভোগ করার জন্য যাবে এবং অনুষ্কাকেও নিয়ে যাবে। সব শুনে অনুষ্কা তখন তার নিজের বাড়ি থেকে অনুমতি পেলে তবেই যেতে পারবে এই কথাটি অনুরাগকে জানালো। শেষমেষ অবশ্য অনুষ্কা তার বাড়ির অনুমতি পেয়ে ছিল বটে। তারই জন্য নির্দিষ্ট দিনের একদিন আগেই অনুরাগ অনুষ্কা কে সঙ্গে নিয়ে সবুজের সৌন্দর্যে মোরা আর নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবন বাসন্তী তে মাসি অনামিকার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। ইতিমধ্যে অনুরাগের মা অন্তরা দেবী তার বোন অনামিকাকে খবরটা পৌঁছে দিয়েছিলেন। তারপর যখন প্রায় বেলা গড়িয়ে আসার সময় হলো তখন অনুরাগ এবং অনুষ্কা দুজনে মাসীর বাড়িতে এসে পৌঁছলো। মাসি অনামিকা যেহেতু নিঃসন্তান ছিলেন সেই কারণে তিনি অনুরাগ ও অনুষ্কাকে দেখে খুব খুশি হলেন। তারপর মাসি অন্তরা দেবী ওরা দীর্ঘ পথ জার্নি করে এসেছে বলে আর দেরি না করে তাড়াতাড়ি কিছু জলখাবার বানিয়ে এনে দুজনকে দিলেন । তারপর সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে গৃহ মন্দিরে এবং তুলসী তলায় ধুপ দ্বীপ জ্বালিয়ে ঈশ্বর আরাধনা করার পর রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতে লেগে পড়লেন। এরই মধ্যে মেসো অবিনাশ বাবু তার অফিস থেকে ফিরে হাতমুখ ধুয়ে খাটের উপর বসে অনুরাগ কে ডেকে বাড়ির সমস্ত খোঁজখবর সহ অনুষ্কার বাড়িতে কে কে আছেন সেই সকল খোঁজ-খবর এবং অন্য অন্য কিছু প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলতে লাগলেন। এরই মধ্যে যখন রাত প্রায় নটা তখন রাতের খাবারের জন্য অনামিকার ডাকে সকলে এক টেবিলে খেতে বসে পড়লেন। তারপর খাওয়া দাওয়া শেষ করে যেহেতু গ্রামের বাসিন্দা, অধিক রাত পর্যন্ত জেগে থাকার অভ্যাস নেই,তাই দশটার মধ্যেই সকলে ঘুমিয়ে পড়লেন।
দ্বিতীয় দিন ২৫ শে ডিসেম্বর। অনুরাগ ও অনুষ্কা দুজনে ই মধ্যাহ্ন ভোজের পর খানিকক্ষণ বিশ্রাম শেষে সাজগোজ করে বিকেল চারটের নাগাদ মাসিমা অনামিকার অনুমতি নিয়ে ওরা বেরিয়ে পড়ল খ্রিস্টান মিশনারী দিকে। অনুরাগ যেহেতু এর আগে দু-তিনবার এসেছিল তাই তার ওখানকার রাস্তাঘাট জানাই ছিল বলে কোন অসুবিধা হয়নি। ধীরে ধীরে মেলা প্রাঙ্গনে ঢুকে প্রথমেই তারা গির্জার ভিতর প্রবেশ করলো এবং জেসাস ক্রাইস্ট কে ক্রস চিহ্নের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করে গির্জার ভেতরে থাকা যীশু খ্রীষ্টের বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন রূপের ছবি গভীর মনোযোগ সহকারে দুজনে দেখতে থাকলো। তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে এসে প্রায় সন্ধ্যা লগনে যীশু খ্রীষ্ট কে নিয়ে মিশনারী ছাত্র-ছাত্রীদের দ্বারা এবং এলাকার কয়েকশত খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের দ্বারা যে আলোক উজ্জ্বল বর্ণাঢ্য মিছিল বেরিয়েছিল তা পিচের চওড়া রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে গভীর মনোযোগ সহকারে দেখছিল। তারপর মিছিলটা যখন অনেকটা দূর এগিয়ে গিয়েছিল তখন ওরা আবার দুজনে মেলা প্রাঙ্গণে এসে বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখতে দেখতে অনুষ্কা নিজের জন্য কিছু সাজগোজের জিনিস ক্রয় করে নিলো। অনুরাগ কিছু রুচিশীল খাবার কিনে প্যাকেটে করে নিয়ে এসে মাসিমা অনামিকার হাতে দিতেই মাসিমা সেই খাবারগুলো সকলের মধ্যে ভাগ করে দিলেন । তারপর খানিকক্ষণ সকলে টিভির পর্দায় চোখ রেখে নিত্যদিনের অভ্যাস মতো আবার রাত দশটার মধ্যে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
দিন দুই বাদে অর্থাৎ পাঁচ দিনের দিন আবার ওরা অনুরাগ ও অনুষ্কা ঘুরতে বেরিয়ে পরল বাড়ি থেকে বেশ কিছুটা দূরে পুরন্দরে গড়ে ওঠা একটি গো মুখের উদ্দেশ্যে । সেখানে গোধূলি তে লাল সূর্য ডোবার দৃশ্য দেখবে বলে। দুজনে নদীর বাঁধের পথ দিয়ে হাতে হাত ধরে ধীরে ধীরে হেঁটে চলেছে ফুরফুরে বাতাসের স্পর্শ লাগিয়ে গায়। নদীর বুকে গোটা দুই তিন পাল তোলা নৌকার চলা আর নদী চড়ে লাল কাঁকড়ার চঞ্চল চলাফেরা দেখতে দেখতে অনুষ্কার বেশ আনন্দই হচ্ছিল। কারণ সে শহরের মেয়ে জীবনে এই প্রথম গ্রামের বুক ধরে বয়ে চলা নদীর এই দৃশ্য দেখছিল। বহু লেখকের গল্পে গ্রামীণ দৃশ্যের বর্ণনা অনুষ্কা পূর্বে পাঠ করলেও কোনদিন স্বচক্ষে দেখেনি বলে সেদিন যেন তার মনে একটা আলাদা অনুভূতি জেগে উঠেছিল। যাইহোক , এইভাবে বেশ কিছুটা সময় চলতে চলতে অবশেষে এসে পৌঁছলো পুরন্দরে বাঁধানো সেই গোমুখের ধারে। বাঁধানো গো মুখের ওপর বসে প্রেম আলাপের সাথে সাথে যখন অপেক্ষা করছিল সূর্য ডোবার দৃশ্যটা দেখবে বলে , তখন হুড়মুড়িয়ে একটা দমকা বাতাস তাদের দুজনের গায়ে লাগতেই অনুষ্কার বুকের ওড়নার এক ধার গুটিয়ে গলায় পেঁচিয়ে গেল। ঠিক সেই সময় অনুরাগের চোখটা গিয়ে পড়লো অনুষ্কার বুকের উপর। ভরা যৌবনের উত্তাল ঢেউ তখন নদীর বুকে জেগে ওঠা ঢেউয়ের চাইতেও বেশি আকর্ষণ করলো অনুরাগ কে। তাই আরচোখে নয় সরাসরি তাকিয়ে দেখতে থাকলো সেই ঢেউ। এমন সময় অনুষ্কা অনুরাগের দিকে তাকিয়ে বলল , কি দেখছো অমন করে? অনুরাগ তখন বলল , দেখছি তোমার সৌন্দর্যকে। বলেই অনুরাগ নিজের ব্যালেন্সটাকে একটু হারিয়ে ফেলে অনুষ্কার গালে একটা চুম্বন দিয়ে বুকের উপর মুখ গুঁজে বেশ খানিকক্ষণ জড়িয়ে ধরে রাখল। অনুষ্কা কিন্তু বারণ করল না। হয়তো তার মনেও এমন একটা কিছুর আশা ছিল। যাই হোক ,এইভাবে ওরা খানিকটা সময় কাটানোর পর হঠাৎ নদীর ওপারে চোখ তুলে তাকাতেই দেখলো সিঁদুরে রাঙা সূর্যটা ধীরে ধীরে অস্থাম্বিত হচ্ছে। মনে হচ্ছিল যেন সূর্যটা নদীর জলে ডুব দিচ্ছে । ইতিমধ্যে আকাশের উড়ন্ত পাখিরাও ভাগে ভাগে সারিবদ্ধভাবে যে যার আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হতে থাকলো। মেঠো পথ ধরে লাঙ্গল কাঁধে গরু নিয়ে আসা চাষিরাও ঘরে ফেরার উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসতে থাকলো। তারপর অনুরাগ, অনুষ্কা আর দেরি না করে ঘরে ফিরে আসার উদ্দেশ্যে পুরন্দরের বাঁধানো গো মুখ থেকে নেমে পরল। ধীরে ধীরে হেঁটে এসে যখন ঘরে পৌঁছল তখন সন্ধ্যা ছুই ছুই।
—oooXXooo—
![]()








