বিশেষ প্রতিবেদন, সবুজ স্বপ্ন: বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিক দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ সংকটের মাঝে পরিবেশ বাঁচানোর নতুন দিশা দেখালেন ভারতীয় তথা বাঙালি বিজ্ঞানীরা। খড়্গপুরের বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় (Vidyasagar University) এবং বোটানিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার (BSI) গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে সন্ধান মিলেছে এক অলৌকিক প্রাকৃতিক তন্তুর— যার নাম ‘গুরুবা বেত’। বিমান তৈরি থেকে শুরু করে অটোমোবাইল, চিকিৎসা সরঞ্জাম কিংবা প্রতিরক্ষার উচ্চপ্রযুক্তির কাজে ব্যবহৃত ক্ষতিকর কার্বন ফাইবার বা গ্লাস ফাইবারের পুরোপুরি পরিবেশবান্ধব বিকল্প হয়ে উঠতে পারে এই প্রাকৃতিক উপাদান।
বাঙালি গবেষকদের এই যুগান্তকারী আবিষ্কার ইতিমধ্যে স্থান করে নিয়েছে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান গবেষণা পত্রিকা ‘নেচার’ (Nature)-এর পাতায়।
কী এই ‘গুরুবা বেত’? কোথায় মিলল এর সন্ধান?
‘গুরুবা বেত’ মূলত পাম পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ক্যালামাস (Calamus) বা বেতজাতীয় এক প্রজাতির উদ্ভিদ। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উষ্ণমণ্ডলীয় বনাঞ্চলে এর দেখা মেলে। বাঙালি গবেষকদল উত্তরবঙ্গের কোচবিহার জেলার বনাঞ্চল থেকে বিশেষ এই গুরুবা বেত সংগ্রহ করে গবেষণাগারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন।
যদিও গ্রামীণ হস্তশিল্প, আসবাবপত্র ও গৃহস্থালির কাজে বেতের ব্যবহার নতুন নয়, তবে এর ভেতরের প্রাকৃতিক তন্তু (Natural Fiber) যে কার্বন ফাইবার বা অ্যারামিড ফাইবারের মতো শক্তিশালী ও টেকসই শিল্পোপাদান হতে পারে, তা আগে কারোর জানা ছিল না।
এই ঐতিহাসিক গবেষণার নেপথ্যে যাঁরা
বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা ও বনবিদ্যা (Botany & Forestry) বিভাগের বরিষ্ঠ অধ্যাপক অমলকুমার মণ্ডলের নেতৃত্বে কয়েক বছর ধরে এই বিশেষ প্রাকৃতিক তন্তু নিয়ে গবেষণা চলছে। এই যৌথ গবেষণা দলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন
-
অধ্যাপক অমলকুমার মণ্ডল (বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়)
-
রনি সাহা (গবেষক, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়)
-
ডাঃ দেবেন্দ্র সিং (বিজ্ঞানী, BSI)
-
রাহুল দেববর্মণ (বিজ্ঞানী, BSI)
অধ্যাপক অমলকুমার মণ্ডল জানান, “বর্তমান বিশ্বে উন্নত প্রযুক্তির ইন্ডাস্ট্রিতে প্রাকৃতিক ও নবায়নযোগ্য (Renewable) তন্তুর চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। গুরুবা বেত থেকে প্রাপ্ত পলিমার কম্পোজিট মহাকাশ প্রযুক্তি, হাই-স্পিড কার, অ্যারোনটিক্স, স্পোর্টস সামগ্রী এবং মেডিক্যাল ডিভাইসে ক্ষতিকারক সিন্থেটিক ফাইবারের বদলে সহজেই ব্যবহার করা সম্ভব।”
কেন কৃত্রিম ফাইবার ও প্লাস্টিকের পরিবর্তন জরুরি?
আজকের শিল্পজগতে কার্বন ফাইবার, গ্লাস ফাইবার এবং অ্যারামিড ফাইবার ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলেও এগুলির উৎপাদন ও বর্জ্য ব্যবস্থার ক্ষতিকর দিকগুলো দেখলে চমকে যেতে হয়:
-
উচ্চ শক্তি অপচয়: ১ কেজি কার্বন ফাইবার উৎপাদনে সাধারণ স্টিল বা অ্যালুমিনিয়ামের তুলনায় প্রায় ১০ থেকে ১৫ গুণ বেশি শক্তি (Energy) ব্যয় হয়, যা প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন করে।
-
ক্ষয়হীন বর্জ্য সংকট: প্লাস্টিকের মতো সিন্থেটিক কার্বন ও গ্লাস ফাইবার শত শত বছরেও মাটিতে মেসে না। এগুলি পুনর্ব্যবহার (Recycle) করা অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল।
-
মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিষ: চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মানুষের রক্তনালির প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি স্থানে এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা প্রবেশ করছে, যা স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক এবং ক্যানসারের মতো মারাত্মক ব্যাধির অন্যতম কারণ।
-
প্রাকৃতিক তন্তুর সুবিধা: গুরুবা বেতের মতো প্রাকৃতিক ফাইবার সম্পূর্ণ জৈবপচনশীল (Biodegradable), হালকা অথচ অসাধারণ টান-ক্ষমতা (Tensile Strength) সমৃদ্ধ এবং উৎপাদনে কার্বন পদচ্ছাপ (Carbon Footprint) প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।
প্লাস্টিক ও সিন্থেটিকের বিকল্পে বাঙালির একের পর এক জয়যাত্রা
গুরুবা বেতের এই আবিষ্কার কেবল একক ঘটনা নয়; প্লাস্টিক ও ক্ষতিকর পদার্থের হাত থেকে মানবজাতিকে বাঁচাতে বাঙালি বিজ্ঞানীরা বারবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিপ্লব ঘটিয়েছেন।
-
গুরুবা বেত পলিমার কম্পোজিট (বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় ও BSI) কোচবিহারের জঙ্গল থেকে আনা বেতের মেকানিক্যাল এবং থার্মাল প্রপার্টি পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এটি সিন্থেটিক পলিমারের মতোই তীব্র চাপ ও তাপ সহ্য করতে পারে। এই ন্যাচারাল ফাইবার কম্পোজিট পরিবেশবান্ধব হওয়ায় সবুজ প্রযুক্তিতে (Green Technology) নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
-
জলে দ্রবণীয় ও ভোজ্য বায়োপ্লাস্টিক (বিজ্ঞানী সুদীপ্ত বসু ও তাঁর দল) আলুর শ্বেতসার ও ভোজ্য তেল ব্যবহার করে এমন প্লাস্টিক তৈরি করা হয়েছে, যা জলে ফেললে নিমেষে গুলে যায় এবং মাটিতে রাখলে ১৮০ দিনে সম্পূর্ণ সার হয়ে যায়।
-
মাইক্রোপ্লাস্টিক ধ্বংসকারী থ্রি-ডি হাইড্রোজেল (IISc বেঙ্গালুরুর বাঙালি বিজ্ঞানী সূর্যসারথি বসু) জলে থাকা বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক আটকে অতিবেগুনি রশ্মির সাহায্যে তা ধ্বংস করতে সক্ষম বিশেষ থ্রি-ডি হাইড্রোজেল আবিষ্কার করেছেন অধ্যাপক সূর্যসারথি বসু।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা ও শিল্পক্ষেত্রে প্রভাব
বিজ্ঞানী দেবেন্দ্র সিংয়ের মতে, বিশ্ব বাজারের টেকসই শিল্পোন্নয়নে (Sustainable Industrialization) এই গুরুবা বেত আগামী দিনে বিলিয়ন ডলারের শিল্পের রূপ নিতে পারে। প্লাস্টিক বর্জন ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিশ্বব্যাপী যে শপথ নেওয়া হয়েছে, তাতে ভারতের এই প্রাকৃতিক সম্পদ নিশ্চিতভাবেই অগ্রণী ভূমিকা নেবে।
বাঙালি বিজ্ঞানীদের এই সাফল্য আবারও প্রমাণ করে দিল— প্রকৃতির সমস্যা সমাধানের চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে প্রকৃতির কোলেই!
#গুরুবা_বেত #বাঙালি_বিজ্ঞানী #প্লাস্টিকের_বিকল্প #সবুজ_প্রযুক্তি #বিদ্যাসাগর_বিশ্ববিদ্যালয় #বিজ্ঞান_সংবাদ #পরিবেশ_সুরক্ষা #নেচার_জার্নাল #পশ্চিমবঙ্গ_সংবাদ
#GurubaBet #PlasticAlternative #BengaliScientists #GreenTechnology #NatureJournal #SustainableFuture #BioComposites #VidyasagarUniversity #EcoFriendlyInnovation #EnvironmentalScience
![]()






