বিশেষ প্রতিবেদন:
আমাদের দেশের প্রায় ৯৯% মানুষের মনে একটি অত্যন্ত বড় ভুল ধারণা রয়েছে—”আমি যদি আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কাউকে নমিনি করে যাই, তবে আমার অবর্তমানে সেই ব্যক্তিই আমার সমস্ত জমানো টাকার একমাত্র মালিক হবেন।” আপনিও কি এমনটাই ভাবছেন? তবে সাবধান! ২০২৫ সালে দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) এবং রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI)-এর সাম্প্রতিক নির্দেশিকা আপনার এই ভুল ধারণা সম্পূর্ণ ভেঙে দিতে পারে। আপনার একটি ছোট্ট অসচেতনতার কারণে আপনার মৃত্যুর পর আপনার পরিবারকে নিজের হক আদায়ের জন্য বছরের পর বছর কোর্ট-কাছারির চক্কর কাটতে হতে পারে।
নমিনি হয়েও ২ বছর ব্যাংকের দরজায় মৃণাল
বাস্তব জীবনের একটি ঘটনা দিয়ে বিষয়টি বোঝা যাক। মৃণাল নামের এক যুবকের বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পর সংসার চালানোর জন্য তার মা তাকে বাবার স্টেট ব্যাংক (SBI) অ্যাকাউন্ট থেকে ৩ লক্ষ টাকা তুলে আনতে বলেন। মৃণাল নিশ্চিত ছিলেন কারণ ওই অ্যাকাউন্টে নমিনি হিসেবে ওনার নিজের নামই রেজিস্টার্ড ছিল। কিন্তু ব্যাংকে ডেথ সার্টিফিকেট দেখাতেই ম্যানেজার পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, “শুধু নমিনি থাকলেই হবে না, সিভিল কোর্ট থেকে সাকসেশন সার্টিফিকেট (Succession Certificate) নিয়ে আসুন।”
মৃণাল যখন আইনজীবীর শরণাপন্ন হন, তখন জানতে পারেন যে এই সাকসেশন সার্টিফিকেট বের করতে কমপক্ষে দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগবে! শুধু তাই নয়, ৩ লক্ষ টাকা তুলতে কোর্ট ফি ও উকিলের খরচ বাবদ প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পকেট থেকে চলে যাবে। নিজের বাবার রক্তজল করা টাকা নিজের হাতে পেতেই মৃণালের পরিবার এক প্রকার দিশেহারা হয়ে পড়ে।
আইনের আসল সত্যি – নমিনি আসলে কে?
আইনি ভাষায় নমিনি (Nominee) কিন্তু কোনো সম্পত্তির প্রকৃত মালিক নন। নমিনি হলেন একজন ‘ট্রাস্টি’ (Trustee) বা কেয়ারটেকার। সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায় পরিষ্কার বলছে— ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের মৃত্যুর পর ব্যাংক শুধুমাত্র নমিনির হাতে টাকাটা সাময়িকভাবে তুলে দেওয়ার দায়িত্ব নেয়। কিন্তু সেই টাকার আসল আইনি অধিকার বা মালিকানা বর্তাবে মৃত ব্যক্তির সমস্ত লিগ্যাল হায়ার (Legal Heirs) বা আইনি উত্তরাধিকারীদের ওপর।
ধরা যাক, এক ব্যক্তি তার বড় ছেলেকে নমিনি করে ৫ লক্ষ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট (FD) করে মারা গেলেন। বড় ছেলে টাকাটা ব্যাংক থেকে তুললেও, আইনত তাকে সেই টাকা তার মা এবং বাকি ভাই-বোনদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে দিতে হবে। নমিনি হওয়ার কারণে তিনি একাই সব টাকার মালিক হতে পারেন না।
আরবিআই-এর সাম্প্রতিক গাইডলাইন ও টাকার পরিমাণ অনুযায়ী ৩টি স্ল্যাব:
সুপ্রিম কোর্টের এই কড়া নিয়মের পর ব্যাংকগুলো এখন আইনি ঝামেলা এড়াতে অত্যন্ত সতর্ক হয়ে গেছে। টাকার পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংকগুলো এখন ৩টি ধাপে দাবি নিষ্পত্তি (Death Claim) করছে:
১. ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত: অ্যাকাউন্ট বা এফডিতে ১ লক্ষ টাকা বা তার কম থাকলে সাধারণত ব্যাংক বেশি জটিলতা করে না। অরিজিনাল ডেথ সার্টিফিকেট, নমিনির আধার/প্যান কার্ড এবং ব্যাংকের ডেথ ক্লেম ফর্ম জমা দিলেই কয়েক সপ্তাহের মধ্যে টাকা রিলিজ হয়ে যায়।
২. ১ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষ টাকা: এই ক্ষেত্রে ব্যাংক সমস্ত লিগ্যাল হায়ারদের কাছ থেকে NOC (No Objection Certificate) এবং একটি ইন্ডেমনিটি বন্ড (Indemnity Bond) দাবি করে। অর্থাৎ পরিবারের কোনো সদস্যের টাকা তুলতে আপত্তি নেই, তা স্ট্যাম্প পেপারে সই করে দিতে হবে। পরিবারে কোনো বিবাদ থাকলে এই এনওসি জোগাড় করাই বড় মানসিক যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়ায়।
৩. ৫ লক্ষ টাকার বেশি: টাকার অঙ্ক ৫ লক্ষের বেশি হলেই বেশিরভাগ ব্যাংক মুখের ওপর সাকসেশন সার্টিফিকেট চেয়ে বসে। এটি পেতে সিভিল কোর্টে মামলা করা, খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়া এবং মোট টাকার ওপর প্রায় ৩% থেকে ৫% কোর্ট ফি দিতে হয়, যা সাধারণ মানুষের জন্য এক প্রকার দুঃস্বপ্ন।
(অনেকে মনে করেন ‘উইল’ বা ‘ইচ্ছাপত্র’ থাকলে সাকসেশন লাগবে না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সহ বেশ কিছু রাজ্যে উইল কার্যকরী করতে কোর্ট থেকে ‘প্রোবেট’ (Probate) নিতে হয়, যাতে ৬ মাস থেকে ১ বছর সময় এবং মোটা অঙ্কের ফিস লেগে যায়।)
ভয়ঙ্কর হয়রানি থেকে বাঁচার ৩টি ‘মাস্টার হ্যাক’ বা উপায়:
আপনার পরিবারকে এই ধরনের আইনি জটিলতা এবং ভিখারির মতো কোর্টের দরজায় ঘোরা থেকে বাঁচাতে আজই এই ৩টি পদক্ষেপ নিন:
-
১. জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট (সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়): আপনার জমানো টাকা কখনো একক বা সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টে রাখবেন না। আজই ব্যাংকে গিয়ে আপনার স্ত্রী বা সন্তানের সাথে অ্যাকাউন্টটি Joint Account করুন এবং মোড অফ অপারেশন রাখুন “Either or Survivor”। এর ফলে, কোনো কারণে একজনের মৃত্যু হলেও অন্যজনকে কোনো সাকসেশন সার্টিফিকেট বা NOC দেখাতে হবে না। জীবিত ব্যক্তি শুধুমাত্র ডেথ সার্টিফিকেট দেখিয়েই পুরো টাকার আইনি মালিকানা পেয়ে যাবেন।
-
২. লিগ্যাল হায়ার সার্টিফিকেট (Legal Heir Certificate): যদি অ্যাকাউন্ট সিঙ্গেল থাকে এবং ব্যাংক ৫ লক্ষ টাকার বেশি অ্যামাউন্টের জন্য সাকসেশন সার্টিফিকেট চায়, তবে কোর্টে যাওয়ার আগে স্থানীয় বিডিও (BDO), এসডিও (SDO) বা মিউনিসিপালিটি থেকে একটি ‘লিগ্যাল হায়ার বা ওয়ারিশন সার্টিফিকেট’ তৈরি করে নিন। ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে এটি বিনামূল্যে পাওয়া যায়। অনেক ব্যাংক ম্যানেজারের সাথে কথা বলে এই কাগজ জমা দিয়েও ক্লেম রিলিজ করা সম্ভব।
-
৩. আরবিআই ওমবার্ডসম্যান (RBI Ombudsman)-এর সাহায্য: সমস্ত সঠিক নথিপত্র এবং নমিনেশন থাকা সত্ত্বেও যদি কোনো ব্যাংক ম্যানেজার ইচ্ছাকৃতভাবে আপনাকে দিনের পর দিন ঘোরায়, তবে মনে রাখবেন আরবিআই-এর নিয়ম অনুযায়ী সমস্ত ডকুমেন্ট পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে ডেথ ক্লেম সেটেল করতে হবে। অন্যথায় আপনি সরাসরি আরবিআই-এর অনলাইন পোর্টালে (Banking Ombudsman) ওই ব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। অভিযোগ পাওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিজে থেকে আপনার টাকা রিলিজ করে দিতে বাধ্য থাকবে।
পরিশেষে: আমরা সারাজীবন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজগার করি আমাদের পরিবারের সুরক্ষিত ভবিষ্যতের জন্য। কিন্তু আপনার অবর্তমানে সেই টাকা যদি ব্যাংকের ফাইলেই আটকে থাকে, তবে তার চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কিছুই হতে পারে না। তাই আজই আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টটি পরীক্ষা করুন, প্রয়োজনে জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে রূপান্তর করুন এবং নমিনি কাকে রাখছেন তা পরিবারের সদস্যদের স্পষ্ট জানিয়ে রাখুন।
#ব্যাংকিংনিয়ম #সুপ্রিমকোর্ট #নমিনিআইন #ব্যাংকঅ্যাকাউন্ট #অর্থনৈতিকসচেতনতা #আরবিআইগাইডলাইন #JointAccountসুবিধা #পশ্চিমবঙ্গব্যাংকিং #পারিবারিকসুরক্ষা #BengalMoneyMentor
#NomineeRules2026 #BankingLawIndia #SupremeCourtJudgement #RBIOmbudsman #SuccessionCertificate #JointAccount #FinancialLiteracy #DeathClaimSettlement #NomineeVsHeir #MiddleClassProblems
![]()




