সংবাদ প্রতিবেদন, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব এবং নজিরবিহীন পটপরিবর্তনের পর এবার প্রশাসনিক স্তরে বড়সড় ‘ক্র্যাকডাউন’-এর পথে হাঁটল বর্তমান নতুন সরকার। সোমবার নবান্নে এক তড়িঘড়ি এবং জরুরি সাংবাদিক বৈঠকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্র ও পুলিশ মন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দুটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়ে রাজ্যজুড়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেশ করেছেন। যার একটি হলো জনপ্রিয় ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার মহাদুর্নীতি এবং অন্যটি হলো পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা (LOP) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে খোদ প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে নিজেদের বিধায়কদের সই জালের (Forgery) মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ।
১. লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে ‘পুরুষদের’ রাজত্ব! ৩০ লক্ষ ভুয়ো অ্যাকাউন্টের বিস্ফোরক পরিসংখ্যান
এদিন সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানান, মহিলাদের জন্য বরাদ্দ সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর টাকা দেদার লুট করেছে একশ্রেণীর রাজনৈতিক নেতা এবং অনুপ্রবেশকারীরা। বহরমপুর থানার একটি নির্দিষ্ট কেসের (Case No. 843/2026) সূত্র ধরে তদন্তে নেমে পুলিশ যে তথ্য পেয়েছে, তা হিমশৈলের চূড়ামাত্র।
সাংবাদিক বৈঠকে প্রকাশিত মূল তথ্য:
-
পুরুষদের অ্যাকাউন্টে টাকা: তদন্তে দেখা গেছে, মহিলারা নন, বরং একাধিক ভুয়ো অ্যাকাউন্ট তৈরি করে পুরুষরা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা তুলছেন।
-
নির্দিষ্ট নামের তালিকা: বহরমপুরের কেসে এখনও পর্যন্ত ২২টি সম্পূর্ণ ভুয়ো অ্যাকাউন্ট ধরা পড়েছে। যার মধ্যে ১টি অ্যাকাউন্ট সরাসরি রাকিবুল শেখের সাথে যুক্ত, ১৫টি অ্যাকাউন্ট মুস্তাফিজুর রহমান ও তার স্ত্রী তুহিনার দ্বারা পরিচালিত এবং ৬টি অ্যাকাউন্ট তারিকুল রহমানের নামে রয়েছে।
-
জঙ্গিপুর ব্লকের আশঙ্কা: মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, শুধুমাত্র জঙ্গিপুর ব্লক থেকেই আগামী দিনে প্রায় ৩,০০০ এই ধরনের ভুয়ো অ্যাকাউন্ট উদ্ধার হতে পারে। এমনকি পশ্চিম মেদিনীপুরে এক পুরুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যিনি ‘বিধবা ভাতা’ নিচ্ছিলেন!
-
৩০ লক্ষ ভুয়ো উপভোক্তার খতিয়ান: সামগ্রিক স্ক্রুটিনি এবং ভোটার তালিকা (SIR) থেকে নাম বাদ পড়াদের ডাটাবেস বিশ্লেষণ করে প্রাথমিক অনুমান, রাজ্যে প্রায় ৩০ লক্ষ ভুয়ো বা বেআইনি অ্যাকাউন্ট রয়েছে।
-
লুটের আর্থিক অঙ্ক: যদি ৩০ লক্ষ ভুয়ো অ্যাকাউন্টধারী প্রতি মাসে ১,৫০০ টাকা করে সরকারি কোষাগার থেকে তুলে থাকেন, তবে প্রতি মাসে এবং বছরে কত হাজার কোটি টাকা সাধারণ জনগণের ট্যাক্সের টাকা লুট হয়েছে, তার হিসাব দিতে গিয়ে শুভেন্দু অধিকারী একে “লুটেরাদের পার্টি” বলে তীব্র আক্রমণ করেন।
এই ব্যাপক আর্থিক তছরূপের তদন্তের জন্য রাজ্য পুলিশকে ‘সিট’ (SIT) গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এর মধ্যে যেহেতু মানি লন্ডারিং বা বিপুল আর্থিক প্রতারণা জড়িয়ে রয়েছে, তাই মামলাটি কেন্দ্রীয় বা বিশেষ আর্থিক তদন্তকারী সংস্থার এক্তিয়ারে হস্তান্তরের প্রক্রিয়াও শুরু করা হচ্ছে।
২. বিধানসভার গণতন্ত্রের মন্দিরে জালিয়াতি! নিজেদের বিধায়কদেরই সই জাল করার অভিযোগ
সাংবাদিক বৈঠকের দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে বড় চমক ছিল বিধানসভার বিরোধী দলনেতা নির্বাচন সংক্রান্ত জালিয়াতি। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, এই তদন্তের পেছনে বর্তমান সরকারের কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নেই, বরং তৃণমূলেরই দুই বিধায়কের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে সিআইডি আইনানুগ পদক্ষেপ নিচ্ছে।
ক্রোনোলজি এবং সিআইডি তদন্তের রিপোর্ট:
-
৯ মে, ২০২৬: তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বোসকে চিঠি দিয়ে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে ঘোষণা করার অনুরোধ জানান।
-
১৮ মে, ২০২৬: বিধানসভার প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি তৃণমূল নেতৃত্বকে দলীয় সভার ‘মিনিটস’ বা রেজুলেশন কপি জমা দিতে বলেন।
-
২০ মে, ২০২৬: তৃণমূলের পক্ষ থেকে ৭০ জন বিধায়কের সই সংবলিত একটি রেজুলেশন বুক জমা দেওয়া হয়।
-
ফাঁস হওয়া জালিয়াতি: তৃণমূলের নিজস্ব দুই বিধায়ক—ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহা স্পিকারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন যে, গত ৬ মে বা ১৯ মে এই ধরনের কোনো রেজুলেশন পাস হয়নি এবং জমা দেওয়া তালিকায় অন্তত ১৪টি সই ‘ব্লক লেটারে’ লেখা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ ভুয়ো ও ম্যানুফ্যাকচার্ড।
-
সিআইডি-র অ্যাকশন ও স্বীকারোক্তি: স্পিকার ও হোম সেক্রেটারির নির্দেশে মামলাটি সিআইডি-তে যাওয়ার পর, সিআইডি ১৩ জন বিধায়কের বাড়ি গিয়ে ভিডিওগ্রাফি এবং হ্যান্ডরাইটিং ভেরিফিকেশন করে। এর মধ্যে বাহারুল ইসলাম (ক্যানিং পূর্ব), অরূপ রায় (হাওড়া মধ্য), এবং শুভাশিস দাস (মহেশতলা)—এই ৩ জন বিধায়ক সিআইডি-র সামনে অন-ক্যামেরা স্বীকার করেছেন যে, রেজুলেশন বুকে থাকা সইগুলি তাঁদের নয়! বিধায়ক বাহারুল ইসলাম তো স্পষ্ট জানিয়েছেন, ঘটনার দিন তিনি কলকাতায় আসেননি, নিজের ভাঙ্গড়ের বাড়িতেই ছিলেন।
মুখ্যমন্ত্রী কটাক্ষ করে বলেন, “ভোট হেরে যাওয়ার পরেও চুরির অভ্যাস কাটেনি। নিজেদের দলের বিধায়কদের সই ফরজারি করে বিধানসভায় পাঠাচ্ছে! এটা পশ্চিমবঙ্গের গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত চিন্তার বিষয়। চোরের পাঠশালা এখন ধরা পড়ে গেছে।” ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) অনুযায়ী জালিয়াতিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তদন্তে সহযোগিতা না করলে আইন নিজের পথে চলবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
৩. অন্নপূর্ণা যোজনা ও ফ্রি বাস সার্ভিস নিয়ে বড় ঘোষণা
বিরোধীদের মিথ্যা প্রচারের জবাব দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্য সরকারের সংকল্পপত্র অনুযায়ী আজ থেকেই রাজ্যজুড়ে বোনেদের ও মায়েদের জন্য বিনামূল্যে সরকারি বাস পরিষেবা (Free Bus Services) চালু করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ নিয়ে অফলাইনের পাশাপাশি আজ থেকে অনলাইন পোর্টালও চালু করা হয়েছে। ২০ জন প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি পদমর্যাদার আধিকারিক জেলায় জেলায় এই কাজ মনিটরিং করছেন। আগামী বুধবার নবান্ন সভাঘর থেকে সরাসরি রাজ্য মন্ত্রিসভার উপস্থিতিতে উপভোক্তাদের অ্যাকাউন্টে বড় আকারে টাকা ট্রান্সফারের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
জনগণকে আশ্বস্ত করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কোনো যোগ্য মানুষ সরকারি সামাজিক ভাতা থেকে বঞ্চিত হবেন না। তবে ভুয়োদের কোনোভাবেই রেয়াত করা হবে না। পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ও দলীয় কর্মীদের আইন হাতে না তুলে নেওয়ার এবং পুলিশ-প্রশাসনের ওপর ভরসা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
#লক্ষ্মীরভাণ্ডার #শুভেন্দুঅধিকারী #পশ্চিমবঙ্গরাজনীতি #তৃণমূলভোরজারি #সিআইডিতদন্ত #নবান্নলাইভ #পশ্চিমবঙ্গসংবাদ #দুর্নীতিফাঁস #অন্নপূর্ণাযোজনা #বাংলাখবর
#LakshmirBhandarScam #SuvenduAdhikari #WestBengalPolitics #CIDInvestigation #SuvenduPressConference #TMCForgery #BengalGovernance #BreakingNewsBengal #Kolkata #PoliticalUpdate
![]()







