বিশ্ব সভ্যতার মোড় ঘুরিয়েছিল ভারতের জ্ঞান? বাগদাদ হয়ে ইউরোপে রেনেসাঁর অজানা ইতিহাস!
বিশেষ প্রতিবেদন: বর্তমান প্রযুক্তির যুগে আমরা যদি চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (AI) প্রশ্ন করি— ‘ক্লস ফুক্স (Klaus Fuchs) কে ছিলেন?’ উত্তর আসবে, তিনি ছিলেন ম্যানহাটন প্রজেক্টের এক প্রতিভাবান বিজ্ঞানী ও সোভিয়েত ইউনিয়নের এক দুর্ধর্ষ গুপ্তচর, যিনি আমেরিকার পরমাণু বোমার গোপন সূত্র চুরি করে রাশিয়ার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু যদি একই এআই-কে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘অ্যাডেলাইড অব বাথ (Adelard of Bath) কে ছিলেন?’ এআই উত্তর দেবে, তিনি ছিলেন ইংল্যান্ডের প্রথম মহান বিজ্ঞানী ও দার্শনিক।
কিন্তু এখানেই লুকিয়ে আছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিহাস ও ঔপনিবেশিক পক্ষপাতিত্ব। একাদশ শতকের ক্রুসেডের সময়কালের এই ব্রিটিশ নাগরিক অ্যাডেলাইড আসলে কোনো বিজ্ঞানী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ছদ্মবেশী ইউরোপীয় গুপ্তচর। তাঁর মূল কাজ ছিল তৎকালীন সময়ে আরব বিশ্বের কাছে থাকা অত্যাধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, গণিত, চিকিৎসা ও যুক্তিবাদ চুরি করে ইউরোপে নিয়ে আসা। আর সবচেয়ে বড় সত্য হলো, আরব দুনিয়া যে বিজ্ঞানের জোরে সে যুগে বিশ্ব শাসন করছিল এবং যার আলোয় পরবর্তীতে ইউরোপে ‘রেনেসাঁ’ বা নবজাগরণ এসেছিল—তার মূল উৎস ছিল প্রাচীন ভারত!
বাগদাদের ‘হাউস অব উইজডম’ এবং ভারতের জ্ঞান আহরণ
অষ্টম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়কালকে বলা হয় ইসলামের স্বর্ণযুগ (Islamic Golden Age)। আব্বাসীয় খলিফাদের আমলে বর্তমান ইরাকের বাগদাদ শহর হয়ে উঠেছিল বিশ্ব জ্ঞানচর্চার মূল কেন্দ্র। খলিফা হারুন আল-রশিদ এবং তাঁর পিতা খলিফা আল-মনসুরের উদ্যোগে বাগদাদে গড়ে উঠেছিল এক বিশাল গ্রন্থাগার ও গবেষণাগার, যার নাম ‘বায়াত আল-হিকমা’ বা ‘হাউস অব উইজডম’ (House of Wisdom)।
ইতিহাসের নথি এবং পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই হাউস অব উইজডম কোনো মৌলিক আরবীয় আবিষ্কারের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না; এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ভারতীয় পন্ডিতদের মস্তিষ্কের ওপর ভর করে। আনুমানিক ৭৭০ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আল-মনসুরের আমন্ত্রণে ভারতের উজ্জয়িনী থেকে বাগদাদে পাড়ি জমান মহান ভারতীয় গণিতজ্ঞ ও জ্যোতির্বিদ আচার্য কঙ্ক (বা কনক্ক্য)। তাঁর হাত ধরেই বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মোড় পরিবর্তন ঘটে।
শূন্য থেকে অ্যালগরিদম – গণিতে ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য
আচার্য কঙ্ক যখন বাগদাদে যান, তখন আরব বিশ্বে ‘আবজাত’ (Abjad) নামক এক আদিম সংখ্যাতত্ত্ব প্রচলিত ছিল, যেখানে ১০০০-এর বেশি বড় সংখ্যা লেখার কোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ছিল না। আচার্য কঙ্ক খলিফার দরবারে গিয়ে ভারতীয় গণিতবিদ ব্রহ্মগুপ্তের লেখা ‘ব্রহ্মস্ফুট সিদ্ধান্ত’ এবং ‘খন্ডখাদ্যক’ গ্রন্থদুটি তুলে ধরেন। তিনি আরবদের শেখান শূন্য (০) এবং দশমিকের জাদুকরী ব্যবহার।
খলিফার নির্দেশে এই ভারতীয় গ্রন্থগুলির আরবি অনুবাদ করা হয়, যার নাম দেওয়া হয় ‘জিস আল-সিন্ধহিন্দ’ (Zij al-Sindhind)। বিখ্যাত আরব বিজ্ঞানী আল-খোয়ারিজমি এই গ্রন্থটি গভীরভাবে অধ্যয়ন করে তাঁর নিজস্ব দুটি যুগান্তকারী বই লেখেন—‘হিসাব আল-হিন্দ’ এবং ‘আল-জাবর’। এই ‘আল-জাবর’ শব্দ থেকেই আজকের আধুনিক গণিতের শাখা ‘অ্যালজেব্রা’ (Algebra) বা বীজগণিতের উৎপত্তি। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, আল-খোয়ারিজমির নামের ল্যাটিন অনুবাদ ‘আলগরিথমি’ (Algoritmi) থেকেই আজকের কম্পিউটার বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি ‘অ্যালগরিদম’ (Algorithm) শব্দটির সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ, আজকের সিলিকন ভ্যালি যে অ্যালগরিদমে চলে, তার প্রাণ লুকিয়ে রয়েছে ভারতের সনাতন সংখ্যাতত্ত্বে।
চিকিৎসা শাস্ত্রে ভারতীয় বিপ্লব – সুশ্রুত থেকে ইবনে সিনা
কেবল গণিত নয়, চিকিৎসা শাস্ত্রেও আরবরা ভারতের কাছে ঋণী। বাগদাদে ভারতীয় চিকিৎসালয়ের আদলে গড়ে তোলা হয়েছিল এক বিশাল হাসপাতাল, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বিমারিস্তান’। এই বিমারিস্তানের প্রধান বা সুপারিন্টেন্ডেন্ট ছিলেন ভারতীয় চিকিৎসক আচার্য ধনপতি।
সে যুগে খলিফা হারুন আল-রশিদ যখনই কোনো কঠিন রোগে আক্রান্ত হতেন, তখনই ডাক পড়ত আরেক ভারতীয় আয়ুর্বেদাচার্য মংখ-এর। আচার্য মংখই প্রথম ‘চরক সংহিতাকে’ আরবিতে অনুবাদ করেন। একই সময়ে ভারতের ‘সুশ্রুত সংহিতা’ অনূদিত হয় ‘কিতাব ই সুশ্রুত’ নামে। প্রাচীন ভারতের এই শল্যচিকিৎসা (Surgery), চোখের ছানি অপারেশন ও ডায়াবেটিস শনাক্তকরণের পদ্ধতি দেখেই উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন বিখ্যাত আরব চিকিৎসক ইবনে সিনা (Avicenna)। তিনি ভারতীয় আয়ুর্বেদের ‘ত্রিদোষ তত্ত্ব’ (বায়ু, পিত্ত, কফ)-কে ভিত্তি করে নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি শুরু করেন, যা আজ বিশ্বজুড়ে ‘ইউনানী চিকিৎসা’ (Unani Medicine) নামে পরিচিত। চিকিৎসাবিদ্যায় কেবল পুরুষ নন, ভারতীয় নারী পন্ডিত আচার্য রূপা (আরবীয় ইতিহাসে যিনি ‘রুসা’ নামে খ্যাত) বাগদাদে গিয়ে ধাত্রীবিদ্যা (Gynaeocology) এবং বিষক্রিয়ার প্রতিষেধক বা অগদতন্ত্রের শিক্ষা দিয়েছিলেন।
ধাতুবিদ্যা ও রসায়ন – জাবির ইবনে হাইয়ান ও ভারতের রসায়ন বিজ্ঞান
যাঁকে আধুনিক রসায়নের জনক (Father of Chemistry) বলা হয়, সেই জাবির ইবনে হাইয়ান (Geber) তাঁর গবেষণার মূল রসদ পেয়েছিলেন ভারতীয় ধাতুবিদ্যা থেকে। প্রাচীন ভারতে পারদ (Mercury) এবং গন্ধকের (Sulphur) রাসায়নিক ব্যবহার, সোনা গলানোর পদ্ধতি এবং ডিস্টিলেশন বা পাতন প্রক্রিয়া অত্যন্ত উন্নত ছিল। জাবির এই সমস্ত সংস্কৃত পুঁথি অনুবাদ করে আরব তথা ইউরোপের সামনে তুলে ধরেন।
১০০ বছরের ব্যবধানে দুই পিঠস্থান ধ্বংস – আরব নিভে গেল, তবু ভারত জেগে রইল কেন?
ইতিহাসের এক অদ্ভুত ও বেদনাদায়ক মিল রয়েছে। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে (১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ) হালাকু খানের নেতৃত্বে মোঙ্গল বাহিনী বাগদাদ আক্রমণ করে ‘হাউস অব উইজডম’ জ্বালিয়ে ছারখার করে দেয়। বলা হয়, পন্ডিতদের রক্তে বাগদাদের মাটি লাল হয়ে গিয়েছিল এবং লক্ষ লক্ষ বই টাইগ্রিস নদীতে ফেলে দেওয়ার কারণে নদীর জল কালিতে কালো হয়ে গিয়েছিল। ঠিক এর কাছাকাছি সময়ে (১১৯৩ থেকে ১২০৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে) ভারতের বুকে বখতিয়ার খলজি নামক এক নরপিশাচ ধ্বংসলীলা চালায়। নালন্দা, বিক্রমশিলা ও ওদন্তপুরী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটি কোটি অমূল্য গ্রন্থ পুড়িয়ে দেওয়া হয়, যা নাকি টানা কয়েক মাস ধরে জ্বলছিল।
কিন্তু এখানেই আসে বড় প্রশ্ন। বাগদাদ ধ্বংস হওয়ার পর ইসলামের স্বর্ণযুগ চিরতরে শেষ হয়ে গেল, আরব দুনিয়া আজ পর্যন্ত আর কোনো বড় বিজ্ঞানী বা মৌলিক আবিষ্কার উপহার দিতে পারল না। কিন্তু ভারতের ওপর এত ধ্বংসলীলা, এত ইসলামিক ও ব্রিটিশ আক্রমণ সত্ত্বেও ভারতের জ্ঞানচর্চা স্তব্ধ হলো না কেন?
উত্তরটা স্পষ্ট—আরব দুনিয়ার জ্ঞান ছিল ধার করা বা সঞ্চিত জ্ঞান। উৎস কেটে দিতেই তা শুকিয়ে যায়। কিন্তু ভারতের জ্ঞান ছিল নিজস্ব এবং তা নদীর মতো বহমান। ঋষি-মুনি এবং আচার্যদের গুরু-শিষ্য পরম্পরায় সেই জ্ঞান ভারতের মজ্জায় মজ্জায় মিশে ছিল, যা তলোয়ার দিয়ে কেটে বা লাইব্রেরি পুড়িয়ে ধ্বংস করা সম্ভব ছিল না।
যেভাবে ভারতীয় জ্ঞান হয়ে উঠল ইউরোপের ‘রেনেসাঁ’
পরবর্তীতে স্পেনের টোলেডো এবং ইতালির সিসিলির সম্রাট দ্বিতীয় রজারের উদ্যোগে আরবে থাকা এই ভারতীয় অনুবাদ গ্রন্থগুলি ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করা শুরু হয়। ফিবোনাচি তাঁর ‘লাইবার অ্যাবাকি’ বইতে ভারতীয় সংখ্যা পদ্ধতির ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং একে ‘মোডাস ইন্ডোরাম’ (Modus Indorum) বলে উল্লেখ করেন। চিকিৎসা শাস্ত্রের মূল বই হয়ে ওঠে ইবনে সিনার গ্রন্থাবলি, যা আসলে ভারতীয় আয়ুর্বেদেরই রূপান্তর।
এমনকি ভাষাগতভাবেও ভারতের ‘শর্করা’ আরবে ‘শুক্কার’ হয়ে ইউরোপে ‘সুগার’ (Sugar) হলো। ভারতের ‘কার্পাস’ আরবে ‘কুতন’ হয়ে ইউরোপে ‘কটন’ (Cotton) হলো। ভারতের সুগন্ধি বা পারফিউম তৈরির প্রযুক্তি ইউরোপের অন্ধকার যুগের অবসান ঘটাল। চার্চের অন্ধকূপ থেকে ইউরোপের মুক্ত চিন্তা ও বিজ্ঞানের যে আলো ফুটে উঠেছিল—তা আসলে ভারতের প্রদীপেরই আলো।
দুর্ভাগ্যবশত, আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস বই কিংবা পশ্চিমা এজেন্ডায় চালিত এআই (AI) অ্যালগরিদমগুলো গ্রিক বা রোমান সভ্যতার অবদানকে বড় করে দেখালেও প্রাচীন ভারতের এই বিশ্বজয়ী অবদানকে সুকৌশলে এড়িয়ে যায়। আজ সময় এসেছে আমাদের গৌরবময় অতীতকে জানার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে বুক ফুলিয়ে তা তুলে ধরার।
#ইতিহাসেরসত্য #প্রাচীনভারত #ভারতেরবিজ্ঞান #ইসলামেরস্বর্ণযুগ #ইউরোপেররেনেসাঁ #নিউজআমারআলো #সবুজস্বপ্ন #ভারতীয়বিজ্ঞানচর্চা #নালন্দাইতিহাস #বাগদাদইতিহাস #অ্যালগরিদমউৎস #আয়ুর্বেদবিজ্ঞান #বাঙালিগবেষণা
#AncientIndianScience #IslamicGoldenAge #EuropeanRenaissance #HouseOfWisdom #Aryabhata #Brahmagupta #AlKhwarizmi #IndianHistoryDefended #HistoryOfMathematics #VedicScience #AlgorithmOrigin #AyurvedaInBaghdad #NewsAmarAlo #SabujSwapna
![]()





